📄 ভুলভ্রান্তির মোকাবেলা করা
সুদৃঢ় অভিজাত খান্দানও এ থেকে নিরাপদ নয়। তাদেরও অনেক ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকে। কিন্তু তারা সফলতার সাথে তার মোকাবিলা করে। সমস্যার সমাধানের জন্য তাদের চিন্তা-ভাবনা, পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন ও আত্মীক মূল্যায়ন করে। এ সম্পর্কে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার তাদের সাথে সমঝোতা করতে অক্ষম হয়। যখন তারা পারিবারিক অবস্থাকে নিজেদের মানের মিলাতে পারে না। তারা তাকে জীবনের রোগব্যাধিতে পরিণত করার স্থলে স্বয়ং নিজেই নতুন উদ্ভাবিত অবস্থার অনুকূলে ঝুঁকে যায়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি. ডিগ্রী লাভ কারী চল্লিশ বছর বয়স্ক কর্নেল অধ্যাপকের নিকট জীবন যাপনের জন্য ভোগ-বিলাসের সকল প্রকার নিয়ামত বিদ্যমান ছিল। মনের মত স্ত্রী, সন্তান, বিলাসবহুল বাড়ী, ইজ্জত সম্মান-সুখ্যাতি সবই ছিল তার। হঠাৎ একদিন সে খবর পায়, তার স্ত্রীর ভাই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে। স্ত্রী এ খবর শোনার পর তাৎক্ষণিকভাবে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য মাল সামান বেঁধে ভ্রাতার সেবা-যত্নের উদ্দেশ্যে চলে যায়। তখন অধ্যাপক দুই বিপদে পতিত হন। প্রথমতঃ আত্মীয় সম্পর্কিত ভাইয়ের ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়া। দ্বিতীয়তঃ নিজ পরিবারের ধ্বংস হওয়া। এক মজবুত খান্দানের সৌভাগ্য অধ্যাপকের সাহেবের নজরে পড়ে। তিনি জানতেন, খান্দান এমন এক সংস্থা যেখানে মানুষ প্রশান্তি লাভ করে। শক্তি পূর্ণবহাল হয়। তারপর মানুষ এক নব উৎসাহ-উদ্দীপনা ও পূর্ণ মনোবলের সাথে উত্তম থেকে উত্তম জীবন গঠনের রূপ রেখা প্রণয়নের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। অধ্যাপক সাহেব দ্রুত নিজেকে নিজে নব উদ্ভাবিত ধাঁচে ঢেলে সাজাতে শুরু করেন। সন্তানদের প্রস্তুতি, নাশতা তৈরি করা, স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, তাদের সাথে গাল গল্প করা খেলাধুলা করা, সবকিছুই আয়ত্ব করে নেন।
এ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে জনৈকা মহিলা লিখেছে, "আমি আমার বংশধরদের ভবিষ্যতের স্বার্থে ভালোবাসার পুঁজি বিনিয়োগ করে রেখেছি। এর চেয়ে উত্তম পুঁজি আর কিছুই হতে পারে না।"
📄 উদাসীনতা থেকে মুক্তি লাভ
উদাসীনতা সহজাত ও ক্ষুদ্র শব্দ। বাহ্যতঃ এর জন্য ভীত ও সন্ত্রস্ত হওয়ার কোন কারণ নেই। স্বভাবের দিক থেকে উদাসীনতা এর অর্থ হল, দুর্ভাগ্য ও বঞ্চনার শিকার হওয়া। কিন্তু লাখো মানুষ যারা এ চিন্তায় ও দুঃখে আচ্ছন্ন হয়ে যায়, তাদের উপর বদহজমী এভাবে অবতারিত হয় যে, তাদের পুরো ব্যক্তি সত্ত্বাকেই পরিবর্তন করে যন্ত্রণাদায়ক করে দেয়। তাদের মতে উদাসীনতার একাধিক অর্থ হতে পারে। যা মারাত্মক ও রূহের জন্য কষ্টকর। তাদের জন্য এ শব্দ মৃত্যুর বার্তাবাহক হতে পারে। এসব ব্যক্তি বিনা কারণে অন্তরে বোঝা অনুভব করে। যেন কোন বিরাট গুনাহ হয়ে গেছে। মানসিক এক বিরাট বিপদের বোঝা তাদের উপর প্রবল হয়ে যায়। ফলে তাদের জীবনে খুশি ও সফলতা নামের কোন বস্তুই আর থাকে না। তাদের জন্য উত্তম পরামর্শ হল, তারা যেন নিজেদের বিষাদের কালো কম্বলকে ছিন্ন করে এ বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে দ্রুত বের হয়ে আসে। নতুবা এ অন্ধকার তাদেরকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলবে। তারা যেন ঐ সব লোকদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে, যারা তাদের চেয়েও বেশী দুর্ভাগ্যবান, যারা সাহায্য সহায়তা লাভের স্থলে পায় শুধু ধিক্কার ও ঘৃণা। কেননা প্রত্যেক মানুষ স্বাভাবিক ভাবে উদাসীনতাকে ঘৃণা করে। কোন কোন মানুষ উদাসীনতায় ভাসতে ভাসতে অজানায় হারিয়ে যায়। এ ধরনের কিছু পরিস্থিতির সাথে আমারও মোকাবিলা করতে হয়েছে। আমি উদাসীনতার স্রোতে এমনভাবে ভেসে গিয়েছিলাম যে, তা থামানোর জন্য সুখ-স্বাচ্ছন্দের ক্ষুদ্রতর সম্বলও হাতের নাগালে পাইনি। আর কবরের দ্বার প্রান্তে গিয়ে পৌছেছিলাম। তখন জানুয়ারী মাস ছিল।
একদিন আমি বাবুর্চিখানায় থালা বাসন ধুচ্ছিলাম। তখন আমার এমন অবস্থা হয়েছিল যে, অন্তর ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। আর চোখ থেকে অশ্রু বৃষ্টি শুরু করে। অথচ আমার কান্না কাটির কোন কারণ ছিল না। কিন্তু এমনিতে অন্তর ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। আমি কান্নাকাটি করতে থাকি। অবশ্য আমার স্মরণে ছিল যে, আমার অন্তর সর্বদা সতেজ প্রাণবন্ত থাকত, তা সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে গেছে। আমার সিন্ধান্ত গ্রহণের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়।
সত্যিই আমার কোন বিষয় চিন্তা-ভাবনা করার বা বুঝার কোন ক্ষমতা বাকী ছিল না। বাজারে জিনিসপত্র কেনাকাটার উদ্দেশ্যে গমন করলে তা আমার মাথা ব্যথায় পরিণত হয়ে যেত যে, আমি মটর গাড়ী খরিদ করব, না ফলফলাদি খরিদ করব। কখনো কোন সাক্ষাত হয়ে গেলে তার মুখ দেখার পরও তার নাম আমার স্মরণ হত না। বিড়বিড় করে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করতাম। আর আমার এ অবস্থা দেখে আমার স্বামী বেচারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেত, তার ভয় ছিল আমার এ পেরেশানীর ফলে না জানি কখন কোন দুর্ঘটনা ঘটে যায়। অথবা আমার যেখানে যাবার কথা সেখানে না গিয়ে অন্য কোথায় চলে যাই। এ ভয়ে আমি গাড়ী চালানোও বন্ধ করে দেই।
যদি ঘরে টেলিফোনের রিং বাঁজত, তাহলে আমি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ফোন উঠিয়ে কথা বলার স্থলে রিসিভার নিচে রেখে দিতাম। দরজায় গাড়ীর শব্দ শুনলে আমি পাথরের মত স্থির হয়ে যেতাম। ভয় হত, না জানি আগন্তুক ব্যক্তির সামনা সামনি হয়ে যাই। ভীত হয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যেতাম অথবা কোন চেয়ারের পেছনে বা বিছানায় লুকিয়ে থাকতাম। আমার উপর সর্বদা এক প্রকার ভয়-ভীতি অবতারিত হতে থাকত।
প্রথম প্রথম আমার স্বামী ওয়ালডার আমার অবস্থা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করত। সে আমার অহেতুক বিস্মিত চোখের প্রতি অবাক হয়ে দেখত। আর ভীষণ আদরের সুরে জিজ্ঞেস করত, আমি তোমার কি সাহায্য করতে পারি? তার মনভুলানো আদর সোহাগের জবাবে আমি খুশি হওয়ার স্থলে কর্কশ ভাষা শুনিয়ে দিতাম। তখন তার অন্তর জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যেত। আমি উত্তেজনাকর অবস্থায় ব্যাকুল হয়ে থাকতাম। নিজের অবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করতাম। কিন্তু কিছুই করতে পারতাম না। সম্পূর্ণ অসহায় অক্ষম হয়ে থাকতাম। যা কিছু করতাম তাও খারাপ হয়ে যেত, হতাশার কারণে আমার আঙ্গুলগুলো কাঁপতে থাকত। আমার উদাসীনতা, উন্মাদনা ও বিষণ্ণতা দেখে নিরুপায় হয়ে সে আমাকে আমাদের পারিবারিক চিকিৎসকের নিকট নিয়ে যায়। গভীর পর্যবেক্ষণের পর তিনি আমার উদাসীনতাকে চোখ ও অশ্রু থেকে দূর করে দেন।
আমার ধারণাকে পাত্রে বন্ধ করে এ ঘোষণা জারি করে যে, তার কোন রোগ নেই। সে নির্বোধ শিশুর মত সুস্থ। চিকিৎসক এ মন্তব্যও করেন যে, আমার রোগ হলো নিজের আবিষ্কৃত। আমি জেনে শুনে নিজেকে রুগ্ন বানিয়ে নিয়েছি। আর রোগের আলামত সমূহ খাঁটি নয় বরং নিজেরই কল্পনাপ্রসূত। তিনি আমাকে উপদেশ দিয়ে বলেন, বিবি! আপনার চিকিৎসা ও ঔষধের কোন প্রয়োজন নেই। শুধু মানুষের সাথে মেলামেশা করা বাড়িয়ে দিন। হাসি-খুশি ও আনন্দ বিনোদনে অংশগ্রহণ করুন। এমনিতে সুস্থ হয়ে যাবেন। আমি যখন তাকে বললাম, আমাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে কারণ আমি লোকজনের সাথে মেলামেশা করলে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে যাই। কোন প্রকার হাসিখুশিতে অংশগ্রহণ করতে আদৌ আমার মন চায় না। তখন চিকিৎসক শুধু কাঁধ ঝুকিয়ে নেন। আর আমি এক নতুন চিন্তা নিয়ে ফিরে আসি। এক শোকার্তের মত নিজের দুঃখ-বেদনার কুৎসা রটনাকারী হয়ে যাই। আমি গভীর মনোযোগের সাথে নিজের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার পর অনুভব করি যে, আমার মধ্যে কি যোগ্যতা নাই, আধামরা হয়ে পড়ে থাকার অন্ধকার পর্দা ছিন্ন করে বের হয়ে আসব। আমি সম্পূর্ণরূপে তার থাবায় বন্দী হয়ে আছি। আমি চেয়ারের উপর বসে শুধু জানালার প্রতি তাকিয়ে দেখতাম। জানালা থেকে বাইরে তাকাবার শক্তিও আমার মাঝে বিদ্যমান ছিল না। আমি অবসন্ন বেকার অনড় হয়ে চেয়ার উপর পড়ে থাকতাম। প্রতি পলকে মুহুর্মুহু করে সময় অতিবাহিত হয়ে যেত।
এভাবে সারা দিন উদ্দেশ্যহীন কেটে যেত। ঘরের অনেক কাজ করতে হত, অতি জোর করে সন্ধ্যায় খাবার তৈরীর চেষ্টা করতাম। কিন্তু চুলার দুধ উথলে পড়ত। রুটি পুড়ে যেত, তরকারী যেত খাবার অযোগ্য হয়ে। বাসন পত্র ভেংগে টুকরা টুকরা হয়ে যেত। ওয়ালডর উত্তেজিত হয়ে উঠত। ভীষণ দুঃখ ও আক্ষেপের সূরে বলত, ভাগ্যবতী! তোমার কি হয়েছে? একটি কাজও সুস্থ্যমত করতে পারছ না। আমি বিব্রত অসহায় ও হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় কখনো স্বামীর প্রতি আবার কখনো আমার পুত্র মার্কের প্রতি তাকিয়ে দেখতাম। সে তখন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লেখা পড়া করত। আমাকে দেখে সেও পালিয়ে যেত। সে কতদিন আমার এ অবস্থা সহ্য করবে? আমি তার ভালবাসাকে ঘৃণায় পরিবর্তন হতে দেখে নিজের দুঃখের উপর কিভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখব? এ সব কথা চিন্তা করে আমি কাঁদতে শুরু করতাম।
এক পর্যায়ে আমি অতিথিদের কক্ষে শয়ন করতে শুরু করি। যাতে ওয়ালডারের ঘুমের ব্যাঘাত না হয়। কেননা আমি সকাল হওয়ার অনেক আগে জেগে যেতাম বা কোন প্রকার ভয়-ভীতি আমাকে জাগিয়ে দিত। এটা আমার জন্য অত্যন্ত দুঃসময় ছিল। আসমানের উপর তখনো অন্ধকার চেপে আছে। নক্ষত্র রাজী মিটমিট করে জ্বলছে। আর আমার চোখ খুলে যেত। এ ভয়ে আমার দেহ অনুভূতিহীন ও শক্তি ধারণে অক্ষম হয়ে পড়ত যে ব্যাস। এ ভাবে দিনের আলো ফুটে উঠত। চতুর্দিকে কোলাহল শুরু হয়ে যেত। আমার অন্তর চাইত আফসোস! যদি দিন না হয়ে সর্বদা রাতই থাকত। আফসোস! যদি আমি সর্বদা শুয়ে থাকতে পারতাম।
অবশেষে আমার এ অবস্থার জন্য আমার নিজেরই ঘৃণা হতে শুরু করে। আর আমার নিজের জীবন শেষ করে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আমাকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোন কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি। আমি রাতের আহার শেষ করে ওয়ালড ও মার্ককে শুভ রাত্রি বলে বিদায় জানাই, তারা ছবি দেখার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। আমি তাদেরকে বললাম, তারা মাঝ রাতে ছবি দেখে ফেরত এসে আমাকে যেন ঘুম থেকে না জাগায়।
আমি পূর্বেই মদের বোতল লুকিয়ে রাখি। তা ঢেলে এক গ্লাসে হুইস্কির সাথে ঘুমের টেবলেট ভালো করে মিশিয়ে নেই। এ বিষপান করার পূর্বে আমি অনুশোচনা ও লজ্জাবোধ অনুভব করার চেষ্টা করি। কিন্তু আমার উৎসাহ উদ্দীপনা একদম নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল। কোন কাজ না করার ইচ্ছা প্রকাশ করতে অক্ষম ছিলাম। আমি চোখ বন্ধ করে বিষ গলাধঃকরণ করে ফেলি। অতঃপর বিছানা বিছিয়ে মশারীর টানিয়ে শুয়ে পড়ি। বাতিও নিভিয়ে দেই।
"তিনদিন পর আমি চোখ খুলে আমার চার পাশে বিস্ময়কর অবস্থা দেখি। তাৎক্ষণিকভাবে আমার মনে হয়েছে, সম্ভবতঃ আমার মৃত্যুর পর আমাকে মুনকীর-নকীরের সামনে হাজির করা হচ্ছে। কিন্তু যখন সামান্যতম সম্বিৎ ফিরে আসে, তখন বুঝতে পারি পাশে দণ্ডায়মান সব লোকগুলো ডাক্তার ও নার্স। সুতরাং আমার আত্মহত্যার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে যায়। আফসোস! মৃত্যুও আমার অস্তিত্ব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। আমি চার পায়ার সাথে বাঁধা ছিলাম। আমার উভয় বাহুতে ঔষধের সূইসমূহ ঢুকানো ছিল। আমি হাত পা ঝাকিয়ে ঐ বাঁধন মুক্ত হওয়ার জোর প্রচেষ্টা চালাই। আমাকে উত্তেজিত হতে দেখে ডাক্তার কটাক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কঠোর ভাষায় নিষেধ করে, খবরদার! এই সূই খোলার চেষ্টা করবেন না। চুপচাপ শুয়ে থাকুন।"
আমি আত্মহারা আওয়াজে প্রতিবাদ করে বললাম "আমার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আপনাদের কে দিয়েছে?"
ডাক্তার ক্ষীণশব্দে বললেন, "নিশ্চয় আপনি সত্য কথা বলছেন। কিন্তু আপনার স্বামী আমাকে এ অধিকার দিয়েছেন, আমি যেন আপনার চিকিৎসা করি। আপনার জানা উচিত যে, আপনি তিন দিন ধরে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। আপনার স্বামী বলেছে, তিনি সিনেমা না দেখে ফেরৎ চলে এসেছেন। কেননা সিনেমায় অনেক ভীড় ছিল। তিনি দীর্ঘ সময় লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট ক্রয় করার কষ্ট স্বীকার করতে রাজী ছিলেন না। তাই সিনেমার প্রতি ধিক্কার জানিয়ে বাড়ী ফিরে আসেন। আপনি আপনাকে জাগাতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু ঐ সময় আপনার বড় ছেলের কলেজ থেকে ফোন আসে। আপনার স্বামী জিজ্ঞেস করার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন, আপনি ফোনে ছেলের সাথেও কথা বলা অপছন্দ করেন কেন। তিনি আপনার কক্ষে পৌঁছে আপনাকে মারাত্মক বিপজ্জনক অবস্থায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখেন।"
এ কথা শুনে আমি লজ্জা শরমে হাত দিয়ে নিজের চেহারা আবৃত করে ফেলি। আমি যে আচরণ করেছি, এর পর আমি স্বামী ও পুত্রকে মুখ দেখাব কিভাবে? ডাক্তার আমাকে নমনীয় স্বরে বললেন "মিসেস ব্রাউন! আপনার চিকিৎসা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার পরামর্শ হল, আপনি আপনার পছন্দমত যে কোন বিশেষজ্ঞ মনোস্তাত্ত্বিক দিয়ে আপনার চিকিৎসা করান।"
আমি পুনরায় উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে বলতে শুরু করি, "আমি না চিকিৎসা করতে চাই, আর না আপনার পরামর্শের আমার কোন প্রয়োজন আছে।"
আমার কথা শুনে ডাক্তার রাগান্বিত হয়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে চলে যায়। এর পর আমাকে একা ফেলে সবাই চলে যায়। এর অল্প কিছুক্ষণ পর দু'জন লোক এসে আমাকে খাটের উপর রেখে ঠেলতে ঠেলতে হাসপাতালের এক ওয়ার্ডে নিয়ে তালাবদ্ধ কক্ষে আবদ্ধ করে দেয়। ঐ ওয়ার্ডের জানালা ছিল জালি লাগানো। সর্বদা দরজায় তালা ঝুলানো থাকত। এমনকি বৈদ্যুতিক বাটন সমূহের উপরও লোহার জারি লাগানো ছিল, এখানে বিশেষজ্ঞ মনোস্তাত্ত্বিক ডাক্তার "ক" আমার চিকিৎসার জন্য আসেন।
ডাক্তারের লম্বা লম্বা গোঁফের তীক্ষ্ম প্রান্ত উপরের দিকে মোড়ানো ছিল। যেন তাতে মোম লাগানো হয়েছে। ওখানের ডাক্তারগণ সাদা পোশাক পরিধান করার স্থলে টেরিলিনের উন্নত মানের স্যুট পরিহিত থাকত। তাদের চেহারা দেখলে স্পষ্ট বুঝা যেত, তারা উত্তেজনা ও আলোর উজ্জ্বলতাকে গোপন করে নমনীয়তা ও সহানুভূতি প্রকাশ করছে। তিনি এসেই জিজ্ঞেস করেন, "এক থেকে দশ পর্যন্ত গণনায় আপনি কোন সংখ্যা পছন্দ করবেন?"
"না" আমি ঠোঁট চাপিয়ে জবাব দেই।
তিনি বললেন! 'তাতে আপনার কোন অপরাধ হয়নি।" (সম্ভবতঃ তিনি সহমর্মিতা দেখানোর উদ্দেশ্যে এই কথা বলেছেন।)
"সবাই এ কথাই বলে থাকে।" (আমি চোখের অশ্রু মুছে ফেলি।)
"ঠিক আছে। কিন্তু আমি জানি যে কথা আপনার অনুভূতিকে নেতিবাচক বানিয়ে দিয়েছে তা এক মারাত্মক বিপজ্জনক ব্যাধি। আপনি দীর্ঘ দিন যাবত এ মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে আছেন।"
ডাক্তার তার ব্যক্তিগত অভিমত প্রকাশ করে। আমি নীরব থাকি। আমি নিজে কোন রোগ নির্ণয় করতে পারিনি। আর আমাকে সম্পূর্ণ সুস্থ বলে দিত। ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করেন, "আপনি কখনো উন্মাদনা মূলক উদাসীনতার আলামত সম্পর্কে (Manic Depressive System) কিছু শুনেছেন কি?"
আমি বললাম, জী হ্যাঁ। আমি মুখে তা স্বীকার করি। একদিন উলঙ্গ গলিতে নাচতে ছিলাম। কিন্তু বেশী সময় পর্যন্ত এরূপ ভাবে নাচতে পারিনি।
তার ঠোঁটে সুন্দর মুচকি হাসির রেখা ফুটে উঠে। সে বলল, "অনেক লোকত মনে করে, মূলতঃ এ ধরনের ব্যাধি গ্রস্ত ব্যক্তি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এরূপ উল্টাপাল্টা আচরণ করতে পারে না। কিন্তু এই মাতলামী কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত অবতারিত থাকে। আর উদাসীনতা তো মাসের পর মাস পেছন ছাড়তে চায় না। বরং কোন কোন সময় সারা জীবনেও তা থেকে মুক্তি লাভ হয় না। উন্মাদনাপূর্ণ আচরণ ও উদাসীনতা উভয় অবস্থায় পর্দার অন্তরাল থেকে সে উপকরণ কার্যকর হয়। তার সম্পর্ক ব্রেণের রাসায়নিক উপাদান অর্থাৎ অবস্থার আকৃতির মিশ্রণের কারণে হয়। ব্রেণের অবস্থার পরিবর্তন বা বিকল হওয়ার কারণে মানুষের স্বভাবিক স্বভাব পরিবর্তন হয়ে যায়।"
আমি লজ্জাবনত হয়ে বললাম, "আমি জানি আপনি আমার উপকার করতে ইচ্ছুক। কিন্তু আমার আক্ষেপ যে, আমি এরূপ হতে চাইনি। আমার জীবনের মালিক আমি। সুতরাং যখন ইচ্ছা এ জীবন সমাপ্ত করে দেব।"
ডাক্তার জিজ্ঞেস করল, "যদি আপনি পুনরায় অনুরূপ হাসি-খুশি অনুভব করতে শুরু করেন, যা পূর্বে কখনো আপনি অনুভব করেছেন, তবুও কি আপনি মৃত্যুর জন্য দৃঢ় সংকল্প বদ্ধ থাকবেন? আপনার সিদ্ধান্তে অনড় থাকবেন?"
আমি ডাক্তারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল, অভিজ্ঞ চিকিৎসক বুঝতে সক্ষম হোক যে, সে আমার অবস্থা সঠিক ভাবে আন্দাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, অবশ্য আমি প্রভাবান্বীত হইনি। "আমার মনে হয় আপনি আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছেন না যে, আপনি পূর্বের মতো স্বাভাবিক জীবন-যাপনে ফিরে যাবেন। কিন্তু আপনি কি আমার কথা শুনতেও অপছন্দ করছেন? আমাকে শুধু একবার সুযোগ দিন।"
আমি কাঁধ ঝুকিয়ে দিলাম। তার মন যা ইচ্ছা তা করুক। সে বলতে থাকে, "আমি জানি, এটা হলো ব্রেণের কোন কোন রাসায়নিক উপাদানের বিলুপ্তি বা তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘাটতি দেখা দেওয়া। এ ধরনের ঘাটতিতে স্বভাবে উদাসীনতা বিপজ্জনক বিষণ্ণতার কারণ হয়। আর সাধারণ অভ্যাস যথা পানাহার, শোয়া, মেলামেশা করা কোন কিছুই স্বাভাবিক থাকে না। এর গতিধারা ভাটা পড়ে যায়, আধ মরা হয়ে বিছানায় পড়ে থাকা ও উদাসীনতা কি কোন কিছু জন্ম দেয়? কোন কোন সময় এ ধরনের ঘটনাবলী যেমন বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটা ধারাবাহিক দুঃশ্চিন্তা ও পেরেশানী, স্বভাবের উত্তেজনা প্রভৃতি দেখা দিতে পারে।
কিন্তু কখনো কখনো এর কোন কারণ পাওয়া যায় না। রোগী অনর্থক নিজে নিজে কাঁদতে শুরু করে। অথবা অবচেতন মনে ভীষণ ব্যতিব্যস্ত ও বিবৃত হয়ে যায়। সর্বদা এভাবে বিনা কারণে চিন্তিত ও বিষণ্ণ হয়ে থাকে। এ ধরনের অবস্থা সাংঘাতিক বিপজ্জনক। স্বয়ং রোগী, তার আত্মীয়-স্বজন ও আপন-জনকে তার মানসিক দূরবস্থার কারণে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। সুতরাং আমি এ ধরনের ঔষধের মাধ্যমে চিকিৎসা করাতে চাই, যা ব্রেণকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রগের জাল সমূহে টানা বানার মধ্যে অবস্থিত যন্ত্রণাকে দূর করে তার কার্য ক্ষমতা পুনঃবহাল করে দেবে।"
মিসেস ব্রাউন! আপনি শুধু একবার প্রস্তুত হন। আমি এক বিশেষ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আপনার চিকিৎসা করব। অবশ্য ঔষধের কার্যকারীতা দেখাতে বিলম্ব হবে। আর আপনিও পূর্ণাঙ্গ সুস্থ হওয়া পর্যন্ত সম্ভবতঃ আমার কথায় নিশ্চিত সন্দেহ পোষণ করবেন। আপনি কি এ জুয়া খেলায় রাজী আছেন?
আমি চিন্তা করে দেখলাম তাতে আমার কি আর হবে। শুধু সময় নষ্ট হবে। মোটকথা, আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁধা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখবে কে? এর পর আমি আত্মহত্যার নতুন এক পথ বেছে নেবো। যা কোন ভাবেই ব্যর্থ হবে না।
আমি এসব কথা চিন্তা করে তার প্রস্তাবে রাজী হয়ে যাই। তিনি আমাকে হাসপাতালেই রেখে দেন। কেননা তিনি ভালভাবে জানতেন, আত্মহত্যাকারী একবার ব্যর্থ হওয়ার পর পুনরায় আত্মহত্যার চেষ্টা করে। নির্দিষ্ট ঐ সময়ে তিনি প্রতি চার ঘণ্টা অন্তর অন্তর আমাকে ঔষধ সেবন করাতে থাকেন। আমি সুস্থ হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত অবিশ্বাস সত্ত্বেও তাৎক্ষণিকভাবে ঔষধ খেয়ে ফেলতাম। আমার সন্দেহ ও অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে কয়েক সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পর আমার হতাশা ও উদাসীনতা কমতে শুরু করে। আত্মহত্যা করার ইচ্ছাকে পরিত্যাগ করে দিয়েছেন কি? জ্বী হ্যাঁ! বিশেষভাবে এ ব্যাধি থেকে মুক্ত হওয়ার পর প্রথম বার মার্ক ও ওয়ালডারের সাথে সাক্ষাত করি। চিকিৎসা সফল হতে চলেছে।
হঠাৎ একদিন আমার ভীষণ ক্ষিধা লাগে। আমি বেশী খাবার খাই। এটা কি কোন গর্বের বিষয় হল? আহা! যে খাবার খেয়েছি, কয়েক মাস হয়ে গেছে। লোকমা মুখে দেওয়ার পরও গলার নিচে নামত না। যার কণ্ঠনালী এত বেশী শুকিয়ে গেছে যে, মুখ দিয়ে থুথু পর্যন্ত বের হত না। আর আজ তাকে ক্ষিধা ব্যতিব্যস্ত করে দিয়েছে। তাই আজ সে পূর্ণতৃপ্তির সাথে আহার করছে। তাই চারদিক খুশির জোয়ার বইছে। আজ ঘণ্টি বাজিয়ে সবাইকে শুনিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমি পাখিদের একটা একটা করে খড় কুটা এনে বাসা বানাতে দেখেছি। জালিযুক্ত কক্ষ থেকে বের হয়ে সূর্যকে সারাদিন ভ্রমণ করে অস্ত যেতে দেখেছি। এক গৌরবমূলক খুশি আমার প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে সতেজ করে দিয়েছে। ডাক্তার আমাকে উদাসীনতা সম্পর্কে পড়ার জন্য যতগুলো বই দিয়েছেন, আমি বইগুলো পড়তে শুরু করি।
ডাক্তার ঘনঘন আসতেন না। কখনো কখনো দু'একবার আসতেন। আমি কেমন আছি সে বিষয় আলাপ আলোচনা করতেন। আমি যেগুলো পাঠ করেছি তা পরিবর্তনের খেয়াল করতেন। নাথন কার্লাইনের (Nathan Kline) রচিত 'দুঃখ থেকে খুশি পর্যন্ত'। আর নিউইয়র্কের এক অভিজ্ঞ মনোস্তাত্তিক রোনাল্ড ফিভে (Ronald Fieve) এর রচিত 'Mood Swing' আমাকে বিশেষ প্রভাবান্বিত করে। তাতে আমি বেশ উৎসাহ বোধ করি।
একদিন আমি রাগান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করি, এতো কিছুর পরও আমার পারিবারিক চিকিৎসক আমার রোগ নির্ণয় করতে পারেনি কেন?
ডাক্তার "ক" আমতা আমতা করে জবাব দেন, "যদি প্রথমে আপনার সাথে আমার সাক্ষাত হত তাহলে ব্যাধির কারণ নির্ধারণ করা অনেক সহজ হত। আর অনেক ডাক্তার রয়েছেন তারা যে যুগে লেখা পড়া করেছে, তখন ব্রেণ সম্পর্কে এত কিছু আবিষ্কৃত হয়নি। স্বয়ং আমার পর দাদীও আঁত ফেটে যাবার কারণে মারা গেছেন। এতে কি ডাক্তারের কোন অপরাধ ছিল? ঐ সময় আঁতের ব্যাধি সম্পর্কে গবেষণা করতে সক্ষম হয়নি।" তিনি আমার বাহুতে চিমটি দেন। যাতে আমার দেহে সহমর্মিতার এমন ঢেউ বয়ে যায়, যা কোন ঔষধ দ্বারা সম্ভব হত না।
মূলতঃ ব্যাধিগ্রস্থ ব্যক্তির প্রতি সহমর্মিতাপূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করা একাগ্র মনে আপন করে নেওয়া, এমন এক স্তরের পূনর্জীবন দানের মর্যাদা রাখে, তা ঔষধ থেকে বেশী মনোরম ও ব্যাধি নিরাময়ক প্রভাব বিস্তারকারী হয়। চিকিৎসার সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তি সহনশীল ও দয়ালু হতে হয়। আমি চার সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় আমার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাই। এ সব কথা চিন্তা-ভাবনা করে আমার মাথায় চক্কর এসে যেত যে, আমি হতাশাগ্রস্ত ও উদাসীনতার সময় আমার নিকট আপন জনদেরকে তাদের সহানুভূতিপূর্ণ কথার জন্যও ঝাড়ি দিতাম, তারা আমার মন সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করত, আর আমি প্রতি উত্তরে তাদের অন্তর চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতাম। যে দিন আমি হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে আসি। তখন সর্বপ্রথম আমার নজরে পড়ে এক কচি পদ্মফুলের ওপর। মনে হয় তা আজই এ মুহূর্তে ফুটেছে। আর মনের আনন্দে বাতাসের সাথে খেলা করছে। সেই মনোরম দৃশ্য দেখে আমার অন্তর যারপর নাই খুশি। আমি হাঁটু ভর করে ঝুঁকে অতি ধীরে স্থির তা হাত দিয়ে ধরে তার উপরে চুমো দেই। আমি চতুর্দিকের রূপবৈচিত্রের দৃশ্য অবলোকন করতে থাকি। আমার মনে হয় তখন চতুর্দিকে এক অপূর্ব সুরভী ছড়িয়ে পড়েছে। অজানা আনন্দের উৎসাহে আমার চোখ শীতল হয়ে যায়।
যখনই আমি দরজা খুলি, তখন ভুলে যাওয়া এক উৎসাহ দৌড়ে এসে আমার অন্তরে প্রবেশ করে। তা আমার সুখের হাসির উৎসাহ যোগায়। আমার পুত্র আমার উপর প্রশ্নাবলীর বোঝা চাপিয়ে দেয়। আমার জবাব গুলো সে এমনভাবে শুনতে থাকে, মনে হয় যেন আমি তার এক উন্মাদ মায়ের স্থলে অন্য কোন ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছি। তারপর সর্বপ্রথম আমার স্বামী খুশির আনন্দে আমার বাহুদ্বয় ধরে আমাকে তার বক্ষে লুকিয়ে নেয়। আমি তার আদর-সোহাগে মত্ত হয়ে যাই। অনিন্দ্য আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই।
তখন আমি এক অনুভূতিহীনের মত কোথায়ও লুকানোর স্থলে টেলিফোন বাজার শব্দ বন্ধ করেছি। আর আমি নিজেকে দরজাহীন গম্বুজে বন্দী করার স্থলে ঐ আলৌকিক মুজিযার বরকতে যিনি আমাকে পূর্বের মত জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন, আমি প্রত্যেকের নিকট তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে শুরু করি।
আমার মনে হয়, আমি সবলোকদের একত্রে সমবেত করি। যারা আমার মত এরূপ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আছে। যাকে চিকিৎসকগণ উদাসীনতা ও হীনমন্যতা বলেন। আর তাদের সবাইকে বলি, আপনার অন্তরের গোপন বোঝাকে অন্তর থেকে দূরে নিক্ষেপ করে দিন, সর্বজন স্বীকৃত নৈতিক আচার-আচরণের মূলনীতিকে নিজের বানিয়ে নিন। চিকিৎসকদের পরামর্শ গ্রহণ করুন, যাতে তারা আধুনিক গবেষণার মাধ্যমে এ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। আর তারা মনোস্তত্ত্বে অভিজ্ঞতা অর্জন করুক। তারপর আপনি নিজেও যেন এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন। আর প্রত্যেক ব্যাধিগ্রস্থ লোকজন যেন জীবনের নিয়ামতের ভাণ্ডার লাভ করতে সক্ষম হয়। যেমন আজ আমি লাভ করেছি।
📄 ক্যামো থেরাফী (Cheomotherapy)
এক গবেষণায় দেখা যায় যে, পনের লাখ আমেরিকান লোক উদাসীনতা ও হীনমন্যতায় আক্রান্ত হয়ে আছে। উদাসীনতা ও হীনমন্যতায় আক্রান্ত হওয়া ভীষণ কষ্টকর। এটা এক চরম ক্ষতিকর জটিল ব্যাধি। যার চিকিৎসায় অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ চিকিৎসকের প্রয়োজন হয়। এ কারণে অনেক চিকিৎসক ক্যামোথেরাফীর মাধ্যমে এ রোগের চিকিৎসা করানো উত্তম পন্থা বলে নির্ধারণ করেছেন। এ বিষয়ে বেশী অভিজ্ঞতা অর্জনের উদ্দেশ্য রিডার ডাইজেষ্ট কর্তৃক উইক লিও রিচার্জ ইনিষ্টিটিউট নিউইয়র্ক ষ্টেট অফিস অফ হেলথ আরনজবার্গ নিউ ইয়র্কের পরিচালক ও ক্যামোথেরাফীকে উদাসীনতার অতুলনীয় চিকিৎসা নির্ধারণ করার ব্যাপক প্রসারের উদ্দেশ্যে খ্যাতনামা চিকিৎসক নাথন এইচ ক্যালাইলের সাথে সাক্ষাতকার দিয়েছেন।
প্রশ্নঃ ডাক্তার ক্যালাইন, উদাসীনতার লক্ষণ সমূহ কি কি?
উত্তরঃ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও প্রাথমিক লক্ষণ হলো হাসিখুশি, আনন্দ ফুর্তি উধাও হয়ে যাওয়া। হতাশায় নিমোজ্জিত ব্যক্তি এ অবস্থায় কোন কর্মসূচী গ্রহণ করে না, যা গর্ব ও আনন্দকে জাগ্রত করার কারণ হয়। স্বভাবে পরাজিত ও আধামরা হয়ে যাওয়া। বিষণ্ণতা ও মন মেজাজ খিটখিটে রূক্ষ হয়ে যাওয়া। অলসতা দেখা দেওয়া। মানুষ থেকে দূরে দূরে থাকা। স্মরণ শক্তি লোপ পাওয়া। মন-মেজাজ খারাপ হয়ে যাওয়া প্রভৃতি স্বাভাবিক ভাবে দেখা দিতে পারে। যেসব কথায় ও কাজে মনে হয়, রোগী নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না। ভীষণ পেরেশানী ও উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া। স্মরণ রাখতে হবে, এসব লক্ষণ রোগীর প্রাথমিক অবস্থায় দেখা দেয় তখন উদাসীনতা চিকিৎসা করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু যদি প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা না করানো হয়, তাহলে রোগীর অবস্থা বিপজ্জনক হয়ে যায়। আর শেষ অবস্থায় রোগী আত্মহত্যা করতে প্রস্তুত হয়।
প্রশ্নঃ আমরা সকলে কোন কোন সময় উদাসীনতা অনুভব করি। কিভাবে বুঝবো যে, আমরা এ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছি। কিংবা এ অবস্থা শুধু সাময়িকের জন্য হয়েছে?
উত্তরঃ চিকিৎসকগণের দৃষ্টিতে উদাসীনতা ক্রমাগত চলতে থাকে। তাতে কোন প্রকার বিরতি হয় না বরং তা দিন দিন বাড়তে থাকে এবং গভীরতর হতে থাকে। সময় বাড়ার সাথে সাথে তা মানুষের কর্মক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।
প্রশ্নঃ আপনি উদাসীনতার জন্য কোন ধরনের চিকিৎসা কার্যকরী মনে করেন?
উত্তর: মিসেস ব্রাউনের মত অবস্থার রোগীদেরকে, যাদের চিকিৎসাযোগ্য উদাসীনতা দেখা দেবে, আমি তাদেরকে ক্যামোথেরাফীর পরামর্শ দিয়ে থাকি। এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা করার কারণে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ সফলতা প্রমাণ হয়েছে।
প্রশ্ন: চিকিৎসা পদ্ধতিতে ক্যামোথেরাফী কি ধরনের ব্যবস্থা?
উত্তর: প্রত্যেকের মস্তকের নিচে খুলির মাঝে সামান্য স্থান খালি থাকে। যেটাকে সাইনোফস (Synapses) বলা হয়। তা এক প্রকার তরল রাসায়নিক পদার্থ ও উত্তেজক শক্তিতে পরিপূর্ণ থাকে। তা এক রগের স্পন্দনকে অন্য রগে পৌঁছে দেয়। অপর এক রগের মধ্যে প্রবেশ করার জন্য ঐ শূন্যস্থান অতিক্রম করে। স্পন্দন এ কাজকে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পাদন করে। রগগুলো সাইনোকমের মধ্যে বিশেষ এক ধরনের উপাদান বের করে দেয়। তাকে বায়ু জিংগ এ্যাসমিনারেজ বলা হয় (দ্রুত স্পন্দনের সাহায্যে আংশিকভাবে উৎপাদিত উপকরণ দেহে সরবরাহ করে) তারপর দেহ তা গ্রহণ করে নেয়। এ আকাঙ্খা (Amines) স্পন্দনকে এক রগ থেকে অন্য রগে পৌঁছে দেয়।
সাধারণ অবস্থায় এ কাজ যথারীতি চলতে থাকে, কিন্তু উদাসীনতায় আক্রান্ত ব্যক্তির এ অবস্থা হয় না কিংবা হতে পারে উদাসীনতায় আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে এ আকাঙ্খা পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরী হবে না। অথবা তৈরী হয় বটে, কিন্তু তা অতি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। অথবা অন্য কোন ভাবে ওখানে কোন প্রকার ক্ষতি বা বাঁধার সৃষ্টি হতে পারে। আমাদের সামনে দু'প্রকারের ঔষধ রয়েছে। (Tricycle Antidepressant) ও (Monoamine-oxide Inhibitors) উক্ত ঔষধ সমূহ এ দিক থেকে অতি উপকারী ও কার্যকরী প্রমাণ হয়েছে যে, এটা সাইনোফসকে সরবরাহ কারী আকাঙ্খা সমূহের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
📄 নিজের উপর ইনসাফ করুন
সৃষ্টি জগতের সকল কাজ মহান আল্লাহ তা'আলার মর্জি ও আদেশেই সমাধা হয়। তারপরও আমাকে-আপনাকে যে কোন কাজের জন্য পেরেশান হওয়ার কি প্রয়োজন? আমজাদের মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। কোন ব্যাপারে মালিকের সাথে ঝগড়া হয়েছে। যাতে তিক্ততা দেখা দিয়েছে। কথা বলা শুরু করার পর আমজাদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা ক্ষোভ ফেটে পড়ে। তারা মানবতা ও ইনসাফের সকল নীতি পেছনে ফেলে দিয়েছে। প্রতি কদমে কদমে বে-ইনসাফী ও হক নষ্ট করা আমার সহ্য হয় না। কয়েক সপ্তাহ পর উভয় দ্বিতীয় বার মুখোমুখি হয়। তখনও তার কথার কর্কশতা ও বে-ইনসাফীর অভিযোগ মানুষের অন্তরে বিদ্যমান ছিল। এ ঘটনা বানানো নয়, আমাদের সকলের জীবনে কোন না কোন সময় লোকদের সাথে এ ধরনের বাড়াবাড়ী ও বে-ইনসাফীর সমস্যা দেখা দেয়।
কঠোর অনুভূতিহীনতার চাপে পরিপূর্ণ এ পৃথিবী সঠিক সহমর্মিতা প্রদর্শন কারী ও দুঃখ প্রকাশ কারী থেকে খালি দৃষ্টি গোচর হয়। আর তখন মনে হয় যেন আমাদের অস্তিত্ব এক অসহায় অক্ষম কাকের মত হয়ে আছে যে ভাবে চতুর্দিকে বে-ইনসাফীর ঢেউ তীব্র স্রোতের আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। আর আমাদের সকলকে অন্ধকারে নিমোজ্জিত করছে। পৃথিবীর রঙ্গ মঞ্চে আমাদের অবস্থা যেন কাঠের পুতুলের মত। প্রত্যেকে অপরের হক নষ্ট করে নিজের ভাগ্য গড়ার চিন্তায় আচ্ছন্ন। তথাপি আমি অতি ধীরস্থিরে ঠাণ্ডা মাথায় অবস্থা পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করছি। তাই এক প্রতিচ্ছবির রূপ সামনে উপস্থিত হয়েছে। মানুষের মধ্যে অসংখ্য নিচুতা, আত্মতৃপ্তি, স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রতারণা বিস্তৃত। কিন্তু তারপরও নিশ্চিত দৃঢ় বিশ্বাস করুন যে, পৃথিবী এখনো সৎ ও ভালো মানুষ আছে। খোঁজ করলে এখনো এ ধরনের অসংখ্য মানুষ পাওয়া যাবে, যাদের মধ্যে মানবতা, ভদ্রতা, আতিথেয়তা ও ন্যায় পরায়নতা অতি উত্তমরূপে বিদ্যমান।
অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীগণ মানুষের মন-মানসিকতায় এ ধরনের বিভ্রান্তি, অনুভূতিহীনতা, বঞ্চনা, শঠতা, অন্যের হক নষ্ট করা, ন্যায়নীতি বিসর্জন দেওয়ার একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন। তথাপি তাদের সাথে আমরা সকলে ঐক্যমতে উপনীত হয়েছি যে, যত নষ্টের মূল হল এ পৃথিবী। দ্বিতীয় আর কোন মানুষ হতে পারে না বরং স্বয়ং মানুষের আপন সত্ত্বার ও এক বিরাট বড় অংশকে এর জিম্মাদার নির্ধারণ করা হয়েছে। বস্তুতঃ নিজের সমপর্যায়ের ব্যক্তি ও বন্ধু-বান্ধবদের সামনে মানুষ তার অভিযোগ সম্পর্কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ-আলোচনা করে মনের বোঝা হালকা করে নেয়। কিন্তু যখন আপনার চেয়ে পদমর্যাদার কোন ব্যক্তি বা উর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উঠে বা দুঃখকষ্ট আঘাত হানে তা আপনি আমি প্রকাশ্যে আলাপ-আলোচনা করতে ঘৃণাবোধ করি। আমরা অধিকাংশ সময় একথা সেকথা বলে নিজের অভিযোগকে গলাটিপে ধরে হত্যা করে ফেলি। বলি কে শুনবে আমার অভিযোগ? তাই সে এ বিষয় কারো নিকট মুখ খুলতে রাজি হয় না। যদি এ ধরনের অবস্থা নিয়মিত চলতে থাকে, তাহলে অতি দ্রুত মানুষের মন-মানসিকতায় এ ধরনের অনুভূতির বঞ্চনা সহনীয় হয়ে যায়। যা অবশেষে তাকে অনুভূতিহীনতার শিকার বানিয়ে দেয়। অবশেষে সে তা অনুভবই করতে পারে না। এমতাবস্থায় প্রশ্ন হতে পারে, মানুষকে যে লোক ব্যক্তিগতভাবে কোন দুঃখ কষ্ট দেয়, সে তার সাথে সরাসরি কথা বলতে ঘৃণা বোধ করে কেন? সে তার সাথে কৃত বাড়াবাড়ী বা বে-ইনসাফীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করার স্থলে নিজে নিজে অন্তরে জ্বলে পুড়ে মরতে রাজী হয় কেন? এর জবাব অতি সহজ ও সরল।
অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীগণ এ ধরনের ব্যথিত লোকদের মানসিক বিপর্যয় সম্পর্কে গবেষণা করার পর যে ফলাফল উপস্থাপন করেছে, তাতে এ বাস্তবতা উপস্থিত হয়েছে যে, এ ধরনের ব্যক্তি সাধারণতঃ স্মরণশক্তির উৎসাহ উদ্দীপনার ব্যাপারে অপরিপক্ক ও অপ্রাপ্ত হয়। উপরিউক্ত ধরনের লোক সঠিক সময়ের পূর্বে স্বীয় অন্তরে এ ধরনের সমস্যা কবলিত হয় যে, তাদের অস্তিত্ব অকর্মন্য হয়ে পড়ে। অন্যদের সাথে নিজের অবস্থান মিলিয়ে নেওয়ার কোন বাঁধা বিপত্তি থাকতে পারে। এ ধরনের অনুভূতির শেকড় অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত থাকে।
অধিকাংশ সময় বাল্যকালে এ অবস্থার সূচনা হয়ে থাকে। সাধারণতঃ দেখা যায় যে, মাতা-পিতা সন্তানকে সময় অসময় অনেক বেশী আদর স্নেহ করেন। কিন্তু যদি কোন সন্তান স্বেচ্ছায় তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করার বা আদর-স্নেহ লাভ করার ইচ্ছা করে, তখন তাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ধমক দিয়ে নিবৃত করা হয়। এ ধরনের কাজ কোন সময়ই সুফল বয়ে আনে না। এর ফলে শিশুদের সাধারণ উৎসাহ-উদ্দীপনা ও লালন-পালনে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাতে শিশু নিজের উপর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে আর তখন তার উপর সর্বদা এক অজানা ভয়-ভীতি বিরাজ করে। একবার এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হয়ে গেলে পরে সারা জীবনেও তা থেকে মুক্তি লাভ করা দুরূহ হয়ে যায়। বঞ্চনা ও স্বীয় সত্ত্বার কম আকর্ষণের ফলে এ ভয়ানক অনুভূতি বয়স বাড়ার সাথে সাথে কঠিন রূপ ধারণ করে। অবশেষে এমন অবস্থায় উপনীত হয় যে, মানুষ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে।
অতএব অবসর সময়ে নিজের লাভ ক্ষতির হিসাব মিলিয়ে নিন। তাহলে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, আপনি শিশুকালে যেভাবে মাতাপিতার ধমকি শুনে নীরব হয়ে যেতেন, আপনার অনুভূতি শক্তিই বিলুপ্ত হয়ে যেত, ঠিক অনুরূপভাবে আজ যখন আপনার কর্মজীবনে মনিব বা উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দ্বারা আপনি কষ্টপান বা উৎপীড়িত হন, অনুভূতিহীনতার ঐ ভয় ও ভীতির শিকার হয়ে যেতে থাকেন শৈশবকাল যার অভিজ্ঞতা লাভ হয়েছিল। কেননা এতদুভয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। নিশ্চিত বিশ্বাস করুন যে, আজও আপনি স্মরণশক্তি ও উৎসাহের দিক থেকে এক ভীত সন্ত্রস্ত ও ব্যথা বেদনা সহনীয় শিশুর মত জীবন-যাপন করছেন। তবে এতদুভয়ের মাঝে পার্থক্য এই যে ঐ মনিব বা উর্ধতন কর্তৃপক্ষ আপনার মাতা-পিতার স্থান দখল করে নিয়েছেন।
অনুভূতিহীনতার বঞ্চনা ও অন্যায়ের শিকার ব্যক্তির সব চেয়ে বড় যন্ত্রণা হল, তারা জীবনের শুরু থেকেই স্বীয় অস্তিত্বকে অকর্মন্য বলে মেনে নিয়েছে। পরিণামে তাদের মধ্যে হতাশা ও নৈরাশ্যতা সৃষ্টি হতে থাকে। কেননা যদি এরূপ কোন ব্যক্তি কোন সময় স্বীয় অনুভূতি হীনতার কারণে নিজের গা বাঁচানোর চেষ্টা করে তাহলে তুলনামূলক তাকে আরো বেশী দুঃখ-কষ্টের মোকাবিলা করতে হবে। এমতাবস্থায় সফলতার সাথে গুরুত্বপূর্ণ পদে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের চিন্তাভাবনায় নীতিগত পরিবর্তন জরুরী। আপনি একজন দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তি। তা থেকে বিরত থাকা আপনার জন্য সমীচীন নয়।
জীবনের বাস্তবতাকে গ্রহণ করে স্বীয় পদমর্যাদা অনুযায়ী বড়দের সাথে নির্মল ও সুসম্পর্ক গড়ে তুলুন। আপনার উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ বা মালিক কোন আসমানী সৃষ্ট জীব নয়। তিনিও আপনার মত রক্তমাংসে গড়া এক মানুষ। আপনি শুধু কতিপয় মনগড়া মূলনীতির কারণে আপনার ও তাদের মাঝে ভয়ভীতির এক অহেতুক বাঁধা দাঁড় করে রেখেছেন। এসব বাঁধা-বিপত্তিকে দূর করে আপনার অভিযোগ ও আবেদন নিবেদন তাদের নিকট পেশ করার যে, আপনার মনগড়া সব বাঁধা বিপত্তি ভুল ও ভিত্তিহীন ছিল। এভাবে অন্যায় ও বাড়াবাড়ী সম্পর্কে আপনার সব ওজর আপত্তি এমনিতে খতম হয়ে যাবে।
এ বাস্তবতাকে যথাযথভাবে মনে বদ্ধমূল করে নিন যে, পৃথিবীতে আপনার মত অসংখ্য মানুষ বসবাস করছে। আপনি নিজেকে তাদের চেয়ে বড় মনে করে তাদেরকে অবমাননা বা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন না। নতুবা সর্বদা তাদের সাহায্য ও সহানুভতি থেকে বঞ্চিত থেকে যাবেন। আর তাদের এ অসহযোগীতার পরিণামে আপনার স্বীয় উদ্দ্যেশ্য ও লক্ষ্যে পৌঁছা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। জীবনে প্রতিটি মানুষ উচ্চ পদে উপনীত হয়ে একচ্ছত্র ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির অধিকারী হওয়ার সোনালী স্বপ্ন দেখে। আর তার জন্য পরিকল্পনা তৈরি করে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে বর্তমানে এ ধরনের লোক কোন বাঁধা অথবা অন্য কোন অসহনীয় প্রতিবন্ধকতার কারণে ঐ উদ্দেশ্য লাভে ব্যর্থ থেকে যায়। তারা তখন স্মৃতিশক্তির অনুভূতি নষ্ট করে দেয়। আর ব্রেণ সন্দেহের (Persecution Complex) শিকারে পরিণত। নিশ্চিত বিশ্বাস করুন, অন্যান্য মানসিক ব্যাধির মত এ ব্যাধিও মারাত্মক যন্ত্রণাদায়ক হয়। এ ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া মাত্র এক দীর্ঘ মেয়াদী হতোদ্যম অবস্থার সূচনা হয়। ফলে মানুষ সারা জীবনের জন্য ব্যর্থতা ও হতাশার হয়ে যায়। পক্ষান্তরে নিজেকে অন্যান্যদের তুলনায় অতি নগন্য ও হীন মনে করা আদৌ সমীচীন হতে পারে না। এ অবস্থায়ও মানুষ হতাশা, উদাসীনতা ও দুঃশ্চিন্তার শিকার হয়ে যেতে পারে। আর তার খোদা প্রদত্ত যোগ্যতা সমূহ বিলুপ্ত হতে শুরু করে। জীবনে সফলতা ও লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা সর্বোত্তম পন্থা। অনুভূতির উন্নতির সাথে সাথে নিজের স্মৃতিপটে এটা সংরক্ষণ করে নিন যে, আপনিই সব কিছু নন।
আপনার চেয়ে অনেক উত্তম লোক রয়েছে। অন্যদিকে অনুভূতিহীনতার সাথে সাথে এ ব্যাপারেও নিশ্চিত দৃঢ় বিশ্বাসী হন যে, আমি সব কিছু সহ্যকারী নই। তথাপি অবশ্যই আমি কিছু না কিছু হয়েছি। ডেল কার্নেগী এক গ্রন্থে হেনরী ফোর্ডের সাথে তার সাক্ষাতের বিষয় উল্লেখ করে লিখেছেন, ঐ সময় হেনরী ফোর্ডের বয়স ছিল ৭৫ বছর। সারা জীবন তাকে কঠোর অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করার কারণে এ বৃদ্ধ ব্যক্তি অবশ্যই পরিশ্রান্ত ও অবসন্নতার শিকারে পরিণত হয়ে পড়েছে। আর তার অবয়বে দুঃশ্চিন্তা ও হতাশার অসংখ্য সালামের নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু তার সাথে সাক্ষাত হওয়ার পর তাকে নবীন যুবকদের মতো সুস্থ সবল কর্মচঞ্চল প্রশান্ত দেখি। তখন তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত স্বস্থির থাকতে পারিনি। আপনি জীবনে কখনো পেরেশানির শিকার হয়েছেন কি? হেনরী ফোর্ড তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দেন, "আমি একচ্ছত্র সার্বভৌম ক্ষমতাধরের উপর পূর্ণ বিশ্বাসী। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, সৃষ্টি জগতের প্রতিটি কাজ তাঁর মর্জি ও আদেশে সমাধা হয়। এ সম্পর্কে আমার কারো সাথে পরামর্শ করার কোন প্রয়োজন নেই। এখন আপনি বলুন তো! আমার কোন কাজ সম্পর্কে পেরেশান হওয়ার কোন প্রয়োজন আছে কি?"
ফ্রান্সেস বেকন বলেছিল, দর্শনের অস্পষ্ট জ্ঞান মানুষকে নাস্তিকতার প্রতি ধাবিত করে। কিন্তু এর গভীরতা ও আবেষ্টন মানুষকে ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে। স্মরণ রাখুন, যদি আপনি অনুভূতির বঞ্চনা ও অন্যায়ের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে ধর্ম আপনার জন্য উত্তম সহায় ও আশ্রয় স্থল।
আধুনিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞগণ বর্তমানে এটা অনুভব করতে শুরু করছেন যে, সঠিক ধর্মীয় আকীদা, ছহীহ্ আমল মানুষকে ব্যক্তিগত হতাশা পেরেশানী, দুঃখ-কষ্ট, ব্যাথা বেদনা ভয়ভীতি ও দৈহিক দুঃখ কষ্টের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভে বেশী সাহায্যকারী।
খ্যাতনামা আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ডাক্তার এম.এ. ব্যারন বলেছেন, সঠিক অর্থে ধর্মীয় বিধান সমূহ অনুসরণ ও পালনকারী ব্যক্তি কখনো দৈহিক ও মানসিক ব্যাধির শিকার হয় না। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ ও সংশয় নেই। মূলতঃ ব্যর্থতা ও বাড়াবাড়ী মানুষের অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। আর তখন সে হাত পা ছুঁড়ে ভাগ্যকে গালি দিতে শুরু করে। কিন্তু যদি আপনি একক অদ্বিতীয় অংশীদার ও সমকক্ষহীন সত্ত্বার উপর দৃঢ় বিশ্বাসী ও নির্ভরশীল হন, তখন নিশ্চিত দৃঢ় চিত্ত হন যে, ভাগ্যের এ সাময়িক অসহযোগীতা আপনার নিকট গুরুত্বহীন ও তুচ্ছ। ধর্মের প্রতি দৃঢ়তা মানুষের মাঝে দৃঢ় প্রত্যয়ত উচ্চাকাঙ্খা স্বভাবের দৃঢ়তা মূল্যবান বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে দেয়। আর এর বদৌলতে সে আন্তরিক প্রশান্তি, মানসিক স্বস্তি ও নিরাপত্তা বোধ করার এক বিস্ময়কর অনুভূতি ও আনন্দ লাভ করে।
এ ধর্মীয় আকাঈদের অনুসরণ অনুকরণ করে ব্যাপক বিস্তৃতি ও অনাদী অনন্ত বাস্তবতার উপর নিজের কর্তৃত্ব মজবুত করার চেষ্টা করুন, তাহলে পৃথিবীর স্বাভাবিক বাড়াবাড়ী ও বে-ইনসাফীর অনুভূতি এমনিতে দূর হয়ে যাবে।