📄 আপনি আপনার বংশকে সুদৃঢ় ও মজবুত বানাতে চান কি?
পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণের অর্ন্তভূক্ত ছয়টি গোপন রহস্য
বর্তমানে কোন সুদৃঢ় ও মজবুত বংশ কি আছে? যখন ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞ পারিবারিক ও সামাজিক খান্দানী পরামর্শ দানকারীর সামনে পেশ করা হয়, তখন তিনি জবাব দিবেন, "আল্লহর শোকর, এ পর্যন্ত এর জবাব হ্যাঁ বাচক রয়েছে।" কিন্তু ঐ বিশেষজ্ঞ এ নিয়ে ভীষণ চিন্তিত ছিলেন যে, অবশেষে উপায়-উপকরণ বহনের সব কিছু পারিবারিক জীবনের নেতিবাচক দিক সমূহের উপর পুঞ্জিভূত হল কেন? তিনি চিন্তা করেন, এ নেতিবাচক মনোভাবের কারণ হতে পারে খান্দানী জীবন যাপনের বিস্তারিত ইতিবাচক বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞতা। সুতরাং তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, খান্দান সমূহের অবস্থা জানার জন্য ব্যাপক গবেষণা করতে হবে। হয়ত বা তাতে এ নেতিবাচক মনোভাব খতম হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সাহায্য হবে। তাই ঐ বিশেষজ্ঞ আমেরিকার ২৫ টি রাজ্যের চার ডজন পত্রিকায় এ সংক্রান্ত এক বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। "যদি আপনি কোন সুদৃঢ় অভিজাত খান্দানের বংশধর হন, তাহলে অনুগ্রহ করে আমার সাথে যোগাযোগ করুন। খান্দানকে অকার্যকর বানানোর বিষয় আমি অনেক কিছু অবগত আছি। এখন আমি ঐ সব বিষয় জানতে ইচ্ছুক, যা আপনাকে সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে পারে।"
উক্ত বিজ্ঞপ্তি বিশেষ কার্যকরী হয় এবং অসংখ্য চিঠি আসতে শুরু করে। পত্রের জবাবদাতা প্রত্যেক খান্দান এক প্রশ্ন তালিকা প্রেরণ করতে শুরু করে। আর এভাবে "ফ্যামিলি সনফ রিচার্জ প্রজেক্ট" অর্থাৎ খান্দান সুদৃঢ় করার গবেষণা কেন্দ্র অস্তিত্ব লাভ করে। এ পর্যন্ত তিন হাজারের অধিক খান্দানী ব্যক্তি ঐ পর্যবেক্ষণে অংশগ্রহণ করে। বিস্ময়কর ব্যাপার সমূহের মধ্যে খান্দান গুলোর পক্ষ থেকে প্রায় প্রত্যেকে বিশেষ ছয় প্রকার বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করে। যা তাদের ধারণা অনুযায়ী খান্দানগুলোকে সুদৃঢ় ও মজবুত রাখার ব্যাপারে বুনিয়াদী ভূমিকা পালন করে। উক্ত বৈশিষ্ট্য ছয়টি নিম্নরূপ।
দৃঢ়তার শর্তে প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করা
যে কোন খান্দানের সফলতার গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হল সময়। আন্তরিক উৎসাহ উদ্দীপনা ও মনোবল, পুঁজি বিনিয়োগ করা, মজবুত সুদৃঢ় খান্দানের অন্যান্য সকল লোকদের উপর প্রাধান্য দেওয়া পরস্পর কল্যাণকামীতা, সফলতা ও উন্নতি বিধান কল্পে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দেওয়া যে কোন অবস্থায় একে অপরের সাহায্য সহায়তায় এগিয়ে আসা। খান্দানের স্থিতিশীলতায় দৃঢ় বিশ্বাসী হওয়া।
এ ধরনের খান্দান সমূহের প্রতিশ্রুতি অর্থাৎ একাগ্রতা, একনিষ্ঠতা, অনুগ্রহ সুখী সমৃদ্ধ পারিবারিক সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি। একজনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকে অপরের অন্তর ভাঙ্গার পয়গাম মনে করা হয় অর্থাৎ তোমার এটা পরিবর্তন করা সম্ভব।
কিছু খান্দান কাজে ব্যয়িত হওয়া সময় ও শক্তিকে খান্দানের সবচেয়ে বড় দুশমন নির্ধারণ করেছে। এক সন্তানের পিতা লিখেছেন,
"কোন কোন সময় মনে হয়, এ সময় কর্মস্থলে ব্যয় করা বেশী উপকার হত। তারপরও চিন্তা-ভাবনা করি, কাজকর্মের প্রতিবেদন যা আমার জীবনের বিগত কয়েক দিনের বা সপ্তাহের উপর প্রভাবান্বিত মনে হয়েছে কিন্তু একজন পিতা হিসেবে আমার কাজ ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমি শিশুদের জন্য উত্তম পিতা হই, তাহলে আমার সন্তানও উত্তম পিতা-মাতা বলে প্রমাণ হবে। তারপর আমি যখন থাকব না, তখন ঐ কাজকর্মের প্রতিবেদন ও অকার্যকর হয়ে যাবে। তখন আমার পৌত্র ও পৌত্রী প্রপৌত্র ও প্রপৌত্রীরা এক উত্তম পিতা হবে। এ কারণে আমি উত্তম ছিলাম।"
একত্রে সময় ব্যয় করা
যখন ১৫০০ শিশুকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাদের ধারণা অনুযায়ী সমৃদ্ধ ও সুদৃঢ় মজবুত খান্দান গঠনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কি? তখন তারা সম্পদ, মনোরম গাড়ী-বাড়ী সম্পর্কে কোন কথা বলেনি। তাদের সকলেরই জবাব ছিলো "একত্রে কাজ করা আর খেলা-ধুলা করা" খান্দানের লোকদের মতেও এ জন্য প্রয়োজন তারা বেশীর ভাগ সময় একত্রে মিলেমিশে কাজ করা, খেলাধুলা করা, ইবাদত করা ও পানাহারে অতিবাহিত করা। তাদের মতে আপনি কি করছেন অতিগুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, একত্রে মিলেমিশে থাকা। জনৈকা মহিলা লিখেছিল, "আমি যে সময় খেলাধুলায় ব্যয় করি, ঠিক তত সময় সবাই একত্রে কাজ করায় ব্যয় করি। কাপড় ধোয়া, কাপড় ইস্ত্রি করা, ওগুলো ভাঁজ করা, ঘাস কাটা ইত্যাদি। কিন্তু এ সব কিছু কষ্টকর মনে হয় না। এটা হল আমাদের জীবনের অতিগুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। যখন আমরা সকলে মিলে একত্রে কাজ করি, এবং একে অপরের অতি নিকটবর্তী হই।"
যতদূর জানা যায় সুদৃঢ় মজবুত খান্দানের জবাব হল, শুধু একত্রে এক সাথে অতিবাহিত সময় মনোরমই নয়, তা আরও পর্যাপ্ত হওয়া উচিত। কেননা সময়ের উত্তম অবস্থা কয়েক মুহূর্তের সান্নিধ্য লাভের কারণে সৃষ্টি হয় না। এক কর্মজীবী মেয়ের মা লিখেছে, "আমি আমার মেয়ের সাথে কম সময় ব্যয় করার ব্যাপারে বলছি যে, সে তো ছিল মাত্র পনর মিনিট, কিন্তু তা ছিল অতি সুখকর। অথচ আমি জানি যে, এটা হল জিম্মাদারী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং নিজেকে নিজে ধোঁকা দেওয়া।"
উত্তম প্রতিদান প্রদান
অন্যের পক্ষে থেকে প্রতিদান লাভের অনুভূতি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা পাঠ এবং হাজারো ইন্টার্ভিউর পর প্রমাণ হয়েছে যে, মজবুত অভিজাত খান্দানের মধ্যে একে অপরের উপকার ও প্রতিদান দানের মনোভাব ধারনার চেয়ে অনেক বেশী। জনৈকা মা লিখেছেন, আমরা উভয়ে সর্বদা শয়নের পূর্বে নিজ শিশুদের কক্ষে যাই। তাদের কোলে তুলে নিয়ে আদর করি, চুমো দেই। তাদের সারা দিনের কাজের প্রশংসা করি। প্রত্যেক দিন কাজের শেষে তাদের এ পয়গাম পৌছানো আমাদের ধারণা অতি জরুরী।"
এক যুগল দম্পতি লিখেছে, পারস্পরিক গুণাবলী ও প্রশংসা বর্ণনা করা মূলতঃ তাদের পুরো জীবনকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। নতুবা আমাদের ধ্বংস অনিবার্য ছিল। ঐ মহিলার মন্তব্য হল যে, "বিবাহের পরপর আমাদের মেলামেশা এমন কিছু যুগল বন্ধুদের মত থাকে যে, তাদের মধ্যে প্রত্যেকে নিজেকে নিজে অতিউত্তম ও উন্নত মনে করত। আর বাকী সবাইকে নিকৃষ্ট ও হেয় মনে করত। তারা যে কোন লোকের কোন না কোন দোষ-ত্রুটি ও ব্যর্থতা খুঁজে বেড়াত এবং তাকে আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করত। তাদের তিরস্কার ও ভর্ৎসনা থেকে কেউ নিরাপদ ছিল না। অকল্পনীয়ভাবে তাদের এ অভ্যাসে আমি প্রভাবান্বিত হয়ে পড়ি। আমার নিকট দাম্পত্য জীবন-যাপন অসহনীয় মনে হতে শুরু করে। আমাদের চিন্তাধারাও নেতিবাচক হতে শুরু করে।
"সৌভাগ্যক্রমে অবশেষে একদিন আমার অবস্থা সম্পর্কে সঠিক অনুভূতি লাভ হয়। তখন আমি সর্বপ্রথম পুরাতন সে বন্ধুদের ত্যাগ করে নতুন বন্ধু খুঁজতে শুরু করি। তারপর আমার চিন্তাধারায় ইতিবাচক দিক সমূহ জাগ্রত করার প্রচেষ্টা শুরু করি। এখন আমার স্বামী ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই বলতে শুরু করে, বৌ! শোনো! আমার মনে হয়, তুমি আজ বাচ্চাদের নিয়ে বেশী ব্যস্ত ছিলে। তাদের চুল কাটিয়েছ। সম্ভবতঃ বাজারও করেছ। "আমার স্বামী তার আলোচনায় সেই বাগানের কথা এক বারও উল্লেখ করেনি, যা সারা দিনেও আমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিনি।"
"আর যখনই সে কাজ নিয়ে বিষণ্ণ হয়ে বাড়ী ফিরে আসত, তখন আমি তাকে বিগত সপ্তাহের ঐ তিন দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দিতাম যে, ঐ দিন তো কাজকর্ম ভালোই চলছিল। এ কয়দিন খারাপ চলেছে, তাতে কি হয়েছে, আমি নিজেকে নিজে এই মূলনীতির অনুসারী করিনি যে, কি পাইনি সে বিষয় চিন্তা করব না বরং কি পেয়েছি তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করব।"
পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে পারস্পরিক যোগাযোগ পারস্পরিক সম্পর্ককে গভীর করে। তাতে অনেক আশা আকাংখার তুফান বন্ধ হয়ে যায়।
জনৈক পিতা লিখেছেন, "আমরা সাধারণ আলোচনায় অনেক সময় ব্যয় করে দেই। ঐ সময় আমরা কখনো কখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উপনীত হই অথবা এরূপ উৎসাহ উদ্দীপনায় মনোযোগী হই, যার বহিঃপ্রকাশ অবশেষে আমাদের সবার জন্য কল্যাণকর প্রমাণ হয়। যদি আমার পুত্র আমার সাথে গাড়ী, খেলাধুলা ও অন্যান্য হাসি-খুশির বিষয় কথাবার্তা বলতে না পারে, তাহলে পরে স্কুল বা জমিনের বিষয় সম্পর্কে তার সাথে কথা বলার আশা কি ভাবে করা যায়? পারস্পরিক সম্পর্ক বা উত্তম যোগাযোগের উদ্দেশ্য হল পারস্পরিক ভুল ভ্রান্তি সমূহ নিরসন করা। সুদৃঢ় মজবুত খান্দানের লোকের একে অপরের গোপনীয় অপ্রকাশ্য বিষয় সমূহ সমাধানের পেছনে লেগে থাকে।"
মেক্সিকার জনৈক স্বামী লিখেছে "আমার স্ত্রী কয়েক বার বলেছিল, বর্তমানে শহরে অনেক ভালো ছবি প্রদর্শিত হয়। তার উদ্দেশ্য ছিল, সে যে কোন ছবি দেখতে ইচ্ছুক। কিন্তু তার সঠিক উদ্দেশ্য জানার পর আমি সংবাদ পত্রের পাতা থেকে ছবির নাম পড়ে তাকে শোনাতে শুরু করি। তাতে সে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে যেত। আর আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতাম যে, তার হলো কি? এর পর হঠাৎ একদিন তার উদ্দেশ্য আমার বুঝে আসে। যখন সে তার অভ্যাস অনুযায়ী ভালো ছবি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখনই আমি সংবাদপত্র একদিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তাকে ছবি দেখানোর উদ্দেশ্যে নিয়ে যাই। এ দিনই আমাদের মাঝে সম্পর্কের অবনতির সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এখন সে ইশারায় কথা বলার স্থলে স্পষ্ট করে বলে, ছবি দেখতে হবে, আর আমিও তাকে ছবি দেখানোর স্পষ্ট প্রোগ্রাম করে তাকে জানিয়ে দেই।"
সুদৃঢ় মজবুত খান্দানের লোকেরা যারপর নাই তাগিদ দিয়ে বলেন, উত্তম সম্পর্ক এমনিতে স্থাপিত হয় না। এর জন্য উদ্দেশ্য, প্রচেষ্টা সময় ও অনুশীলন জরুরী।
আত্মীক পবিত্রতা
সফলকাম ও মজবুত খান্দানের লোকদের মতে আত্মীক পবিত্রতা এক আভ্যন্তরীন বিষয়। তাতে আমাদের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতি ভালবাসা, একে অপরের দুঃখ দুর্দশায় সমবেদনা ও সহমর্মীতা প্রকাশ এবং সৌহার্দ সৃষ্টি হয়। কিছু কিছু লোকের মনে করে ধর্মীয় ইবাদতে তা প্রকাশ পায়। অথচ কারও মতে পবিত্র লোকদের আসল নিদর্শন হল, তারা যখন নিজেদের চার পাশের লোকদের কথা স্মরণ করে, তখন তারা নৈতিক মূল্যায়নের অনুসারী হয়ে যায়।
আত্মীক মূল্যায়নের বহিঃপ্রকাশের কার্যকারীতা মজবুত খান্দানের লোকদের নিত্যদিনের কাজের অংশে পরিণত হয়। তারা নিজের কথামত কাজ করে। তাদের মধ্যে বিশ্বস্ততা, দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা ও উদারতা অক্ষুণ্ণ পাওয়া যায়। জনৈক ভদ্রলোক লিখেছেন,
আমাদের নিত্যদিনের কাজকর্মে আত্মীক মূল্যায়ন প্রকাশ করা জরুরী। তা কিভাবে সম্ভব হবে- আমরা বাচ্চাদের সামনে তো বিশ্বস্ততার ডাকঢোল বাজিয়ে থাকি। আর দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতারণার আশ্রয় নেই। দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে বক্তৃতা বিবৃতি দান করি। কিন্তু প্রয়োজনের সময় পাড়া পড়শীর প্রতি লক্ষ্য রাখি না। আমি ভালো করেই জানি, যদি আমি দ্বি-মুখি নীতি অবলম্বন করি, তাহলে আমার সন্তানরাও কপটতা পূর্ণ আচরণ করবে।
ভুলভ্রান্তির মোকাবিলা করা
সুদৃঢ় অভিজাত খান্দানও এ থেকে নিরাপদ নয়। তাদেরও অনেক ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকে। কিন্তু তারা সফলতার সাথে তার মোকাবিলা করে। সমস্যার সমাধানের জন্য তাদের চিন্তা-ভাবনা, পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন ও আত্মীক মূল্যায়ন করে। এ সম্পর্কে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার তাদের সাথে সমঝোতা করতে অক্ষম হয়। যখন তারা পারিবারিক অবস্থাকে নিজেদের মানের মিলাতে পারে না। তারা তাকে জীবনের রোগব্যাধিতে পরিণত করার স্থলে স্বয়ং নিজেই নতুন উদ্ভাবিত অবস্থার অনুকূলে ঝুঁকে যায়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি. ডিগ্রী লাভ কারী চল্লিশ বছর বয়স্ক কর্নেল অধ্যাপকের নিকট জীবন যাপনের জন্য ভোগ-বিলাসের সকল প্রকার নিয়ামত বিদ্যমান ছিল। মনের মত স্ত্রী, সন্তান, বিলাসবহুল বাড়ী, ইজ্জত সম্মান-সুখ্যাতি সবই ছিল তার। হঠাৎ একদিন সে খবর পায়, তার স্ত্রীর ভাই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে। স্ত্রী এ খবর শোনার পর তাৎক্ষণিকভাবে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য মাল সামান বেঁধে ভ্রাতার সেবা-যত্নের উদ্দেশ্যে চলে যায়। তখন অধ্যাপক দুই বিপদে পতিত হন। প্রথমতঃ আত্মীয় সম্পর্কিত ভাইয়ের ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়া। দ্বিতীয়তঃ নিজ পরিবারের ধ্বংস হওয়া। এক মজবুত খান্দানের সৌভাগ্য অধ্যাপকের সাহেবের নজরে পড়ে। তিনি জানতেন, খান্দান এমন এক সংস্থা যেখানে মানুষ প্রশান্তি লাভ করে। শক্তি পূর্ণবহাল হয়। তারপর মানুষ এক নব উৎসাহ-উদ্দীপনা ও পূর্ণ মনোবলের সাথে উত্তম থেকে উত্তম জীবন গঠনের রূপ রেখা প্রণয়নের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। অধ্যাপক সাহেব দ্রুত নিজেকে নিজে নব উদ্ভাবিত ধাঁচে ঢেলে সাজাতে শুরু করেন। সন্তানদের প্রস্তুতি, নাশতা তৈরি করা, স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, তাদের সাথে গাল গল্প করা খেলাধুলা করা, সবকিছুই আয়ত্ব করে নেন।
এ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে জনৈকা মহিলা লিখেছে, "আমি আমার বংশধরদের ভবিষ্যতের স্বার্থে ভালোবাসার পুঁজি বিনিয়োগ করে রেখেছি। এর চেয়ে উত্তম পুঁজি আর কিছুই হতে পারে না।"
📄 দৃঢ়তার শর্তে প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করা
যে কোন খান্দানের সফলতার গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হল সময়। আন্তরিক উৎসাহ উদ্দীপনা ও মনোবল, পুঁজি বিনিয়োগ করা, মজবুত সুদৃঢ় খান্দানের অন্যান্য সকল লোকদের উপর প্রাধান্য দেওয়া পরস্পর কল্যাণকামীতা, সফলতা ও উন্নতি বিধান কল্পে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দেওয়া যে কোন অবস্থায় একে অপরের সাহায্য সহায়তায় এগিয়ে আসা। খান্দানের স্থিতিশীলতায় দৃঢ় বিশ্বাসী হওয়া।
এ ধরনের খান্দান সমূহের প্রতিশ্রুতি অর্থাৎ একাগ্রতা, একনিষ্ঠতা, অনুগ্রহ সুখী সমৃদ্ধ পারিবারিক সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি। একজনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকে অপরের অন্তর ভাঙ্গার পয়গাম মনে করা হয় অর্থাৎ তোমার এটা পরিবর্তন করা সম্ভব।
কিছু খান্দান কাজে ব্যয়িত হওয়া সময় ও শক্তিকে খান্দানের সবচেয়ে বড় দুশমন নির্ধারণ করেছে। এক সন্তানের পিতা লিখেছেন,
"কোন কোন সময় মনে হয়, এ সময় কর্মস্থলে ব্যয় করা বেশী উপকার হত। তারপরও চিন্তা-ভাবনা করি, কাজকর্মের প্রতিবেদন যা আমার জীবনের বিগত কয়েক দিনের বা সপ্তাহের উপর প্রভাবান্বিত মনে হয়েছে কিন্তু একজন পিতা হিসেবে আমার কাজ ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমি শিশুদের জন্য উত্তম পিতা হই, তাহলে আমার সন্তানও উত্তম পিতা-মাতা বলে প্রমাণ হবে। তারপর আমি যখন থাকব না, তখন ঐ কাজকর্মের প্রতিবেদন ও অকার্যকর হয়ে যাবে। তখন আমার পৌত্র ও পৌত্রী প্রপৌত্র ও প্রপৌত্রীরা এক উত্তম পিতা হবে। এ কারণে আমি উত্তম ছিলাম।"
📄 একত্রে সময় ব্যয় করা
যখন ১৫০০ শিশুকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাদের ধারণা অনুযায়ী সমৃদ্ধ ও সুদৃঢ় মজবুত খান্দান গঠনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কি? তখন তারা সম্পদ, মনোরম গাড়ী-বাড়ী সম্পর্কে কোন কথা বলেনি। তাদের সকলেরই জবাব ছিলো "একত্রে কাজ করা আর খেলা-ধুলা করা"। খান্দানের লোকদের মতেও এ জন্য প্রয়োজন তারা বেশীর ভাগ সময় একত্রে মিলেমিশে কাজ করা, খেলাধুলা করা, ইবাদত করা ও পানাহারে অতিবাহিত করা। তাদের মতে আপনি কি করছেন অতিগুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, একত্রে মিলেমিশে থাকা। জনৈকা মহিলা লিখেছিল, "আমি যে সময় খেলাধুলায় ব্যয় করি, ঠিক তত সময় সবাই একত্রে কাজ করায় ব্যয় করি। কাপড় ধোয়া, কাপড় ইস্ত্রি করা, ওগুলো ভাঁজ করা, ঘাস কাটা ইত্যাদি। কিন্তু এ সব কিছু কষ্টকর মনে হয় না। এটা হল আমাদের জীবনের অতিগুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। যখন আমরা সকলে মিলে একত্রে কাজ করি, এবং একে অপরের অতি নিকটবর্তী হই।"
যতদূর জানা যায় সুদৃঢ় মজবুত খান্দানের জবাব হল, শুধু একত্রে এক সাথে অতিবাহিত সময় মনোরমই নয়, তা আরও পর্যাপ্ত হওয়া উচিত। কেননা সময়ের উত্তম অবস্থা কয়েক মুহূর্তের সান্নিধ্য লাভের কারণে সৃষ্টি হয় না। এক কর্মজীবী মেয়ের মা লিখেছে, "আমি আমার মেয়ের সাথে কম সময় ব্যয় করার ব্যাপারে বলছি যে, সে তো ছিল মাত্র পনর মিনিট, কিন্তু তা ছিল অতি সুখকর। অথচ আমি জানি যে, এটা হল জিম্মাদারী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং নিজেকে নিজে ধোঁকা দেওয়া।"
📄 উত্তম প্রতিদান প্রদান
অন্যের পক্ষে থেকে প্রতিদান লাভের অনুভূতি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা পাঠ এবং হাজারো ইন্টার্ভিউর পর প্রমাণ হয়েছে যে, মজবুত অভিজাত খান্দানের মধ্যে একে অপরের উপকার ও প্রতিদান দানের মনোভাব ধারণার চেয়ে অনেক বেশী। জনৈকা মা লিখেছেন, "আমরা উভয়ে সর্বদা শয়নের পূর্বে নিজ শিশুদের কক্ষে যাই। তাদের কোলে তুলে নিয়ে আদর করি, চুমো দেই। তাদের সারা দিনের কাজের প্রশংসা করি। প্রত্যেক দিন কাজের শেষে তাদের এ পয়গাম পৌছানো আমাদের ধারণা অতি জরুরী।"
এক যুগল দম্পতি লিখেছে, পারস্পরিক গুণাবলী ও প্রশংসা বর্ণনা করা মূলতঃ তাদের পুরো জীবনকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। নতুবা আমাদের ধ্বংস অনিবার্য ছিল। ঐ মহিলার মন্তব্য হল যে, "বিবাহের পরপর আমাদের মেলামেশা এমন কিছু যুগল বন্ধুদের মত থাকে যে, তাদের মধ্যে প্রত্যেকে নিজেকে নিজে অতিউত্তম ও উন্নত মনে করত। আর বাকী সবাইকে নিকৃষ্ট ও হেয় মনে করত। তারা যে কোন লোকের কোন না কোন দোষ-ত্রুটি ও ব্যর্থতা খুঁজে বেড়াত এবং তাকে আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করত। তাদের তিরস্কার ও ভর্ৎসনা থেকে কেউ নিরাপদ ছিল না। অকল্পনীয়ভাবে তাদের এ অভ্যাসে আমি প্রভাবান্বিত হয়ে পড়ি। আমার নিকট দাম্পত্য জীবন-যাপন অসহনীয় মনে হতে শুরু করে। আমাদের চিন্তাধারাও নেতিবাচক হতে শুরু করে।
সৌভাগ্যক্রমে অবশেষে একদিন আমার অবস্থা সম্পর্কে সঠিক অনুভূতি লাভ হয়। তখন আমি সর্বপ্রথম পুরাতন সে বন্ধুদের ত্যাগ করে নতুন বন্ধু খুঁজতে শুরু করি। তারপর আমার চিন্তাধারায় ইতিবাচক দিক সমূহ জাগ্রত করার প্রচেষ্টা শুরু করি। এখন আমার স্বামী ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই বলতে শুরু করে, 'বৌ! শোনো! আমার মনে হয়, তুমি আজ বাচ্চাদের নিয়ে বেশী ব্যস্ত ছিলে। তাদের চুল কাটিয়েছ। সম্ভবতঃ বাজারও করেছ।' আমার স্বামী তার আলোচনায় সেই বাগানের কথা এক বারও উল্লেখ করেনি, যা সারা দিনেও আমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিনি।"
"আর যখনই সে কাজ নিয়ে বিষণ্ণ হয়ে বাড়ী ফিরে আসত, তখন আমি তাকে বিগত সপ্তাহের ঐ তিন দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দিতাম যে, ঐ দিন তো কাজকর্ম ভালোই চলছিল। এ কয়দিন খারাপ চলেছে, তাতে কি হয়েছে, আমি নিজেকে নিজে এই মূলনীতির অনুসারী করিনি যে, কি পাইনি সে বিষয় চিন্তা করব না বরং কি পেয়েছি তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করব।"