📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 ইউ এন এ -এর সহায়তায় পাকিস্তানে এনজিও -এর তামাশা

📄 ইউ এন এ -এর সহায়তায় পাকিস্তানে এনজিও -এর তামাশা


পশ্চিমা শক্তিবর্গের বাকচাতুর্য্যপূর্ণ নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ার উদ্দেশ্য হল, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র সমূহের শাসকদেরকে অনুগত ও আজ্ঞাবহ করার পদ্ধতি হচ্ছে, তাদের দ্বারা ইউ এন ও-এর বিভিন্ন চুক্তির উপর স্বাক্ষর করানো। তাহলে তারা ইসলামকে ভুলের চরে উঠিয়ে আমাদের পরামর্শের সামনে অবনত হয়ে পড়বে। প্রথমতঃ সাধারণ জনগণ যাতে স্বাভাবিক ইসলামী বিধান পালন না করে বরং তারা যেন তাকে ভীষণ ঘৃণা করতে শিখে। আর এর বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলে। এর জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন হল, সাধারণ জনগণের অভিমত নিয়ন্ত্রণ করা, এর জন্য টেলিভিশনই যথেষ্ট। এর মাধ্যমে অনর্থক, অশ্লীল, বেহায়াপনার যত দ্রুত বিস্তার করানো সম্ভব।

এক্ষেত্রে তা নিজেই তার একক উদাহরণ। তবে এর সাথে আরো অতিরিক্ত কিছু উপকরণের প্রয়োজন রয়েছে। সুতরাং এর জন্য দেশে এনজিও বা বেসরকারী সেবা সংস্থার প্লাবন বয়ে চলেছে। এটা হল, বিদেশী ইয়াহুদী খ্রিস্টানদের সংগঠন। যা ইউএনও-এর এজেণ্ডা অনুযায়ী মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ দেশ সমূহে ব্যাপক আকারে পরিচালনা করা হচ্ছে। তারা জাতিসংঘ সাহায্য তহবিল থেকে কিছু মূলধন পায় আর কিছু কিছু মূলধন স্থানীয় সরকার থেকেও পায়। এ বিদেশী ধর্মহীন ও লিভারেল সংস্কৃতি দেশে বিস্তার লাভের অতি সহজ ও কার্যকরী পন্থা হল সমাজে প্রভাব বিস্তার করার পর উন্নয়ন ও সংস্কার সাধনের নামে জনসাধারণকে ধর্মবিমূখ করে প্রবৃত্তি পুজারী বানানো।

অনুরূপ আরো এক উপায়ে বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা আমাদের ঋণ দেওয়ার সাথে সাথে শিক্ষা প্রদানে মনোনিবেশ করেছে। এভাবে তারা সমাজের সর্বনিম্ন শ্রেণী পর্যন্ত পৌছে তাদের মন-মগজ থেকে ইসলামের মহব্বতকে নির্মূল করে দিচ্ছে। তাদের বুঝানো হচ্ছে, দুনিয়াতে শুধু এক আদেশ ও এক সংগঠন তা হল ইউ এন ও। তোমরা ইসলাম ছেড়ে দাও। এটা হল, সেকেলে রীতিনীতি। যদি উন্নতি করে সামনে অগ্রসর হতে চাও, তাহলে তোমদের জন্য ইউ এন ও এর প্রদত্ত এজেণ্ডা বাস্তবায়নে কাজ করা জরুরী। নতুবা তোমরা উন্নয়নের ধারা থেকে অনেক পিছিয়ে যাবে। সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভ্রান্ত বর্ণমালার মত পৃথিবীর ইতিহাস থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

বেইজিং সম্মেলনের পর এ জন্মভূমিতে একক আধিপত্তও লেবারিজম বিস্তারের চেষ্টায় ব্যাপক উন্নতি সাধন করা হয়েছে। রেডিও টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন উলংগপনা, বেহায়াপনার ব্যাপক প্রসার ঘটানো হচ্ছে। এনজিওদের কার্যক্রম দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। তারা এ উদ্দেশ্যে শিক্ষা বিভাগকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পাঠক্রমের রূপ রেখা নির্ধারণ করতে হয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের প্রদত্ত রূপরেখা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। বিভিন্ন স্থানে গোষ্ঠীগত বৈঠক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে জনসাধারণকে পরিকল্পিত পরিবার সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করা হয়। আর বিনামূল্যে পরিবার পরিকল্পনার দ্রব্যসামগ্রী সরবরাহ করা হয়।

এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিশেষভাবে গ্রাম্য লোকদের মনোনীত করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও এস. এস. সি. স্তরের শিক্ষার্থীদের তিন মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদেরকে মতবিনিময় কেন্দ্রের কর্মী নিয়োগ করা হয়। এত কম শিক্ষাপ্রাপ্তা মেয়ে যাদের ঔষধের নাম পর্যন্ত শুদ্ধরূপে পড়ার যোগ্যতা নেই, তাদের মাধ্যমে গ্রাম্য অশিক্ষিত নারীদের নিকট পরিবার পরিকল্পনার বড়ি প্রেরনের সংগঠন পরিচালনা করা হয়।

অপর দিকে বিশ্ব ব্যংকের সহায়তায় শিক্ষার উন্নয়নের নামে অপর এক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। মেট্রিক, এম, এ ও বি, এ পাশ ছাত্রীদেরকে তিন মাসের কোর্সে প্রশিক্ষণ দান করে গ্রাম্য বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের প্রশিক্ষণ কোর্সকে বিশেষ পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা হয়।

গ্রামের এম এ ও বি এ পাস ছাত্রী যারা স্বাভাবিক অস্বচ্ছলতা ও বেকারত্বে কারণে উপযুক্ত কোন চাকুরী প্রার্থী হয়। তখন তাদের বেশী পারিশ্রমিকের বিনিময়ে চাকুরীর প্রলোভন দেখিয়ে তাদের এ কোর্স সমাপ্ত করায়। তাদেরকে আমাদের মৌলিক চাহিদা ও সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা শিখানো হয়। এ ধরনের এক কোর্স গত ৯৭সনের গ্রীস্মকালিন ছুটির সময় কতিপয় ছাত্রীকে লাহোরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাঠপুস্তক সমূহ তারা নিজেরা সরবরাহ করে। বিশ্বব্যংকের সাহায্যে এ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। প্রশিক্ষণার্থী ছাত্রীদের উন্নত মানের হোটেলে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এটা তিন মাসের প্রশিক্ষণ কোর্স ছিল। সব আয়োজনের সাথে সাথে ছাত্রীদের যাতায়াত ভাতাও প্রদান করা হয়। ঐ সময়ের ঐ প্রশিক্ষণ কোর্সের পুস্তক পর্যালোচনা করা উচিত।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 জাতীয় রিপোর্ট

📄 জাতীয় রিপোর্ট


সেপ্টেম্বর ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্বনারী সম্মেলনে পাকিস্তানের নারী সমাজের উন্নয়নে পেশকৃত এক রিপোর্ট। যা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশ করা হয়। ১৫০ পৃষ্ঠার এ রিপোর্ট পাকিস্তানের নারী ও যুব উন্নয়ন মন্ত্রনালয়ের সচিব সালমা ওয়াহিদ তৈরি করেন। উক্ত রিপোর্টের ভূমিকায় উল্লেখ করা হয় যে, এ রিপোর্ট শিল্প কারখানায় কর্মরত পেশাদার, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, চলমান কর্মপরিকল্পনাবিদ, সরকারী ও বে-সরকারী সংস্থা সমূহের দীর্ঘ ২১ মাসের পরামর্শ ও সাহায্য সহায়তার প্রতিফলন।

নারীদের সমস্যাসমূহ বিশেষভাবে চিহ্নিত করার জন্য এবং তাদের একসূত্রে আবদ্ধ করার জন্য জাতীয়, প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে অসংখ্য বৈঠক, কনফারেন্স ও ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠান করা হয়। যাতে নারী সমাজের মাঝে সামাজিক সমতা, নারীর উন্নয়ন ও নারী ব্যক্তি স্বাধীনতা লাভ করে জাতীয় উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়নও কর্মকৌশল নির্ধারণ করে সে সম্পর্কে গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। উক্ত রিপোর্ট ইংরেজী ভাষায় প্রণয়ন করা হয়। এর উর্দু অনুবাদ করে সাহী ফাউণ্ডেশন (শিক্ষা উন্নয়ন সোসাইটি), আসমা আজমলও ফারিয়াহ জাফরের তত্ত্বাবধানে এ কাজ সমাপ্ত হয়। পুস্তকটি সুন্দর মনোরম ও উন্নত গ্রেট আপের দাবীদার। পরিচিতি পর্বে উল্লেখ করা হয় যে, উক্ত কনফারেন্স সমূহে (যা নারী সংক্রান্ত বিষয় ইউ এন ও জের প্লাটফরম থেকে সময় সময় প্রকাশ করা হয়।) নারীদের জন্য ব্যাপক কর্মসূচী প্রণয়নের ধারকবাহক। কেননা বর্তমান বিশ্বে নারীদের বিষয়কে অন্যান্য বিষয় থেকে পৃথক করা চলবে না।

উক্ত বিষয় সমূহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট হল, দারিদ্রতা, সমাজিক বৈষম্য, মানবাধিকার আদায়ে অবিশ্বস্ততা, ন্যায় বিচারের বিলুপ্তি, বিশৃঙ্খলা, নিরাপত্তাহীনতা। এখন এসব বিষয়ে সময় ক্ষেপন বিশ্ব ভ্রাতিত্ব স্থাপনের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে না। এ সমস্যা দু'ভাবে সমাধান করা সম্ভব। প্রথমতঃ উল্লেখিত সমস্যা সমূহকে সামনে রেখে অন্ততঃপক্ষে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নিশ্চিত প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। দ্বিতীয়তঃ এ সব সমস্যা নিরসনের জন্য সামাজিক সমতা বিধান কল্পে দীর্ঘ মেয়াদী উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা জরুরী। বিগত দুই দশকে পাকিস্তানের জাতীয় সমস্যা সমূহের মধ্যে নারী উন্নয়ন ও নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। বর্তমানেও পাকিস্তানের (বাংলাদেশের) নারী সমাজ পুরুষ শাসিত শাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলিত। এহেন উন্নয়নকামী ও প্রবীণ রীতিনীতি অনুসারীদের মধ্যে দৃষ্টিভংগীর যুদ্ধ এখনো চলছে।

পক্ষান্তরে জাতিসংঘের অধীনে জাতিসংঘের অর্ন্তভূক্ত এক সদস্য দেশ হিসেবে পাকিস্তানী (বাংলাদেশী) জনগণের সমস্যা নিরসন কল্পে একক অংশীদার। এছাড়াও সম্মিলিত জাতিসংঘের বুনিয়াদী উদ্দেশ্য পূরণ করার বিষয় অঙ্গীকারাবদ্ধ। এর অধীনে জনগণের অধিকার রক্ষা, মানবাধিকার বাস্তবায়ন, ইজ্জত-সম্মান রক্ষা, তাছাড়া নারী ও পুরুষের সমঅধিকার বাস্তবায়ন করা একান্ত অপরিহার্য্য।

এ হল ঐ ধারাবাহিক কোর্সের উদ্দেশ্য। শুধুমাত্র এ শিক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নে পাকিস্তানকে (বাংলাদেশকে) বৈদেশিক সাহায্য প্রদান করা হয়। এখানে ধর্মীয় যথসামান্য নিদর্শনাবলীর প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন, সমাজিক লজ্জা-শরম বাকী আছে, তাও সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। তারা এমনভাবে আলাপ-আলোচনা করে মনে হয় যেন পূর্বে মূসলমান ছিল বলেই ভুলে গেছে। আর এখন ইউ এন ও এর সদস্য হয়েছে। আল্লাহ, রাসূল, কুরআন ও সুন্নাহর প্রতিশ্রুতি পালন করা তাদের ঈমানের দাবী। আর এর বিপরীত যে কোন আদেশ পালন হল, ঈমানের পরিপন্থী। অথচ সে অতি উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে ইউ এন ও এর সদস্য হয়েছে। কিন্তু স্মরণ রাখুন, মুসলমান হওয়ার জন্য আপনার বুনিয়াদী ও প্রাথমিক সনদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অতি বেশী জরুরী। সেটি ইউ এন ও এর সনদ নয় বরং তা হল, কুরআন ও সুন্নাহের সনদ। আল্লাহ ও রাসূলের ফরমান। যে বিধান এবং যে প্রজ্ঞাপন আল্লাহ ও রাসূলের আহকামের সাথে বিরোধপূর্ণ হবে, তা মুসলমানদের নিকট অপ্রয়োজনীয় কাগজের ঝুড়িতে নিক্ষেপ যোগ্য।

বেইজিং সম্মেলনে নির্ধারিত সরকারী প্রতিবেদনে নারী সম্পর্কিত ১২টি সমস্যা চিহ্নিত করে তাতে বর্তমান নারীদের অবস্থা তুলে ধরা হয়। নারীদের এসব সমস্যা সমাধান কল্পে সরকারী-বেসরকারী সংস্থা সমূহের পদক্ষেপের সংক্ষিপ্ত বিবরন পেশ করা হয়। (১) নারী ও দারিদ্রতা। (২) নারী ও শিক্ষা। (৩) নারী ও স্বাস্থ। (৪) নারী ও কর্মদক্ষতা। (৫) নারী ও দেশী বিদেশী মতবিরোধ। (৬) নারী ও অর্থ উপার্জন। (৭) নারী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ। (৮) নারী ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। (৯) নারী ও অধিকার। (১০) নারী ও পরিবেশ। (১১) নারী ও উপস্থাপনা মাধ্যম। (১২) কন্যা সন্তানের জন্মের পর থেকে বিবাহ পর্যন্ত পৃথক ব্যবস্থার (এর অধীনে পাকিস্তানে ১৯৯০ সালকে সার্ক ডিকডেটড অফ দি গোল্ড চাইল্ড বছর হিসেবে পালন করা হয়) দশ বছর ১৯৯০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।

এ প্রতিবেদন বেহজিং সম্মেলনে ইউ এন ও এর প্রতিনিধিদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। আল্লাহ মাফ করুন। আমাদের সব চিন্তাভাবনা হল ইউ এন ও কে সন্তুষ্ট করা। আফসোস! যদি আল্লাহ তা'আলাকে রাজী ও সন্তুষ্ট করার জন্য এর অর্ধেক চিন্তা-ভাবনা করা হত, তাহলে নারীদের উপকৃত সকল প্রকার অন্যায় অত্যাচার নির্মূল হয়ে যেত। যদি সম্পূর্ণ নির্মূল নাও হত, তবু অন্তত এ ধরনের অপরাধ স্বল্প মাত্রায় সংঘটিত হত।

"প্রতিমাদের নিকট তোমাদের যত প্রত্যাশা আর আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে শত নৈরাশ্যতা, তোমরাই বল তাহলে কুফরী আর কাকে বলবে?

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 নারীদের শ্রম সাধনার একশত বছর

📄 নারীদের শ্রম সাধনার একশত বছর


(প্রাথমিক ও মাধমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবগতির জন্য।)

উক্ত গ্রন্থের প্রকাশক সাহী ফাউণ্ডেশন। ১৯৯৭ সালে তা প্রকাশ করা হয়। ১১৯ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থের মূল্য ১১০ রুপি। আসমা আজমল কর্তৃক লিখিত ও ফারিহা জাফর কর্তৃক প্রকাশিত হয়। উক্ত গ্রন্থ তিন অধ্যায় বিন্যাস করা হয়।

১. উপমহাদেশে মুসলিম নারীদের শ্রম সাধনা ১৮৮৬ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত নারী উন্নয়নে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের মূল্যায়ন করা হয়।
২. বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্বনারী সম্মেলন। এটা হল পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত ও সরকারী প্রতিবেদনের সারমর্ম। এ সম্পর্কে পূর্বে আলোকপাত করা হয়েছে।
৩. নারী বিরোধী সকল প্রকার বৈষম্যকে স্বতন্ত্রভাবে নির্মূল করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের নির্ধারিত সনদ (cedaw) এর উর্দু অনুবাদ পেশ করা হয়।

তাতে লিখিত হয়, (cedaw) জাতিসংঘ কর্তৃক নারী উন্নয়ন সম্পর্কিত ত্রিশ বছরের কর্ম পরিকল্পনার প্রতিফলন। ১৯৪৬ সালে এ কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের কাজের সফলতা ততোখানি মর্যাদা লাভ করে নি। নারীদের উন্নয়নে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে, তার সফলতায় আরো অনেক সুপারিশ প্রস্তাব আকারে গৃহীত হয়। তন্মধ্যে (cedaw) হল, এক ব্যাপক বিস্তৃত সনদ, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে উক্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৮১ সালে ২০টি দেশ উক্ত প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন পেশ করে। এভাবে এটা এক আন্তর্জাতিক কনভেনসন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। সুপারিশের দশম বাষিকী বৈঠক অনুষ্ঠানে প্রায় শতাধিক দেশ উক্ত চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর প্রদান করে। আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার সংরক্ষণের সব চুক্তিতে cedaw এক গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা লাভ করে। এ কমিশন পৃথিবীর অর্ধেক জনসংখ্যা অর্থাৎ নারীদের মানবাধিকার সমস্যাকে চিহ্নিত করে। কনভেনসনের প্রাণ জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট। তাতে মানুষের মৌলিক অধিকার, মানুষের মর্যাদা রক্ষা ও ক্ষমতায়ণ, নারী ও পুরুষের সমতায়ণ নিশ্চিত করার উপর ভীষণ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 আমি জেগে উঠেছি (নারী ও শিক্ষা)

📄 আমি জেগে উঠেছি (নারী ও শিক্ষা)


প্রাথমিক ও মাধমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবগতির উদ্দেশ্যে উক্ত গ্রন্থ ও সাহী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রকাশ করা হয়। (শিক্ষা প্রসার সোসাইটি)। ৯৬ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থের মূল্য ৬০ রুপি। আসমা আজমল, ফারিহা জাফরের তত্ত্বাবধানে উক্ত গ্রন্থ প্রকাশ করে। বাঁধাইও অতিচমৎকার। উক্ত গ্রন্থ চার অধ্যায় বিন্যাস করা হয়।

১. (পাকিস্তানে) নারী সমাজের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও এর সমস্যাবলী।
২. নারী সংক্রান্ত বিষয়ে সামাজিক বুনিয়াদের ভিত্তি নির্ধারণ।
৩. আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা।
৪. উন্নয়ন মূলক পদক্ষেপ।

ভূমিকায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, উক্ত গ্রন্থে নারীদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার পর্যালোচনা, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয় চুড়ান্ত পর্যালোচনা করা হয়। তাতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাঠ্যসূচীর মূল্যায়ণ পর্যালোচনাকে অর্ন্তভূক্ত করা হয়। এছাড়াও নারীদের উন্নততর শিক্ষা ব্যবস্থা চালু, তাদের আত্মনির্ভরশীলতা, ব্যক্তিগত বিষয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে করণীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। সাহী ফাউণ্ডেশনের সূচনা লগ্ন থেকে সমাজে শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। উক্ত ফাউণ্ডেশন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য এভাবে বর্ণনা করেছে, সাহী ফাউণ্ডেশনের একমাত্র উদ্দেশ্য হল, উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার চালু করা। উন্নত নিয়মশৃঙ্খলা প্রবর্তন করা। প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যা সমূহ চিহ্নিত করে তা নিরসনের করার ব্যবস্থা করা। এ কারণে সাহী ফাউণ্ডেশনে শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়কে বেশী গুরুত্ব দিয়ে এর জন্য বিশেষ এক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর লক্ষ্য হল, নারীদের মাধ্যমে বর্তমান প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাঠ্যসূচী মূল্যায়ন করা। আর শিক্ষা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা।

সুতরাং তারা ইউ এন ও র এজেন্ডোকেই উক্ত গ্রন্থের প্রথমে সংযোজন করেছে। তাদের মতে পাকিস্তানী নারীদের অবনতির একমাত্র কারণ পাকিস্তানে প্রথম আইন প্রণয়ন, যা ১৯৭৯ সালে প্রবর্তিত শাস্তি প্রদান সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে এ ধরনের শর্তাবলী অর্ন্তভূক্ত করা হয়। তাতে নারীদের আইনগত অধিকার মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। শরী'আতের নির্ধারিত শাস্তি (যার বেশীর ভাগ কুরআন মজীদে নির্ধারণ করা হয়েছে) প্রয়োগের ক্ষেত্রে নারীর সাক্ষী প্রদানকে শুরু থেকে খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যখন নারীকে শাস্তি দেওয়ার কথা হয়। ঐ আইনের অধীনে যে কোন অপরাধে সমবয়সী পুরুষের মোকাবিলায় নারীকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। চাই তার বয়স নয় বা দশ বছর হোক না কেন। যেহেতু ঐ বয়সে কন্যা প্রাপ্তা বয়স্কা হয়ে যায় আর এ আইনের অধীনে জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার নারীরা দ্বিগুন অন্যায় অত্যাচারের শিকার হয়। প্রথমতঃ সে কঠোর পাশবিক নির্যাতনের নিদর্শন হয়। দ্বিতীয়তঃ তাকে ব্যাভিচারের অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। ঐ সময়ে কারাগারে বন্দী অধিকাংশ নারীকে এ অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়।

এর ফলে এক দিকে এক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব প্রতিফলিত হয়। বেশীর ভাগ নারী যৌন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এবং স্বেচ্ছায় জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়। আর অপর দিকে আরো এক মনোভাব প্রকাশ হয় যে, যাদের উপর পাশবিক নির্যাতন করা হয় তাদের নিরাপত্তার অজুহাতে তাদের উপর আরো কঠোর বিধি-নিষেধ জারী করা হয়। ফলে তারা গৃহবন্দী হয়ে যায়। এ ধরনের অপরাধীরা ভবঘুরে হয়ে যায়। যার বেশী বাড়াবাড়ী করে তাকে বন্দী করে রাখা হয়। এটা ন্যায় নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ১৯৮৪ সালে প্রবর্তিত সাক্ষ্য আইনে আর্থিক বিষয় সত্যায়ণ বা মৌলিক সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে এক পুরুষের মোকাবিলায় দু'জন নারীর সাক্ষ্য প্রদানকে সমর্থন করা হয়েছে। অর্থাৎ একজন শিক্ষিতা মহিলার মোকাবিলায় একজন অশিক্ষিত পুরুষের সাক্ষ্যকে বেশী প্রধান্য দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও চার জন মহিলাও সাক্ষ্য প্রদান করতে পারবে না। একজন পুরুষের সাক্ষ্য অত্যাবশ্যক। উক্ত শর্ত নারীদের আইনগত অধিকারকে মারাত্মক আকারে সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাবও প্রতিফলিত হয়েছে। এভাবে একজন নারীকে এক আধা ব্যক্তি বানিয়ে দিয়েছে। ১৯৬১ সালের জারী কৃত আইন (তাতে পুরুষের একাধিক বিবাহের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।) সত্ত্বেও পুরুষের দ্বিতীয় বিবাহের রীতি বন্ধ করা হয়নি। কেননা আইন সঠিকভাবে কার্যকরী হচ্ছে না। পুরুষ স্বীয় আর্থিক স্বচ্ছলতা ও দৈহিক শক্তির দাপটে নিজের বিষয় মানিয়ে নেয়। আর নারী পেছনে পড়ে যায়।

তাদের ঘোরতর আপত্তি হল, আমাদের এখানে প্রচলিত পাঠ্যসূচীতে নেতিবাচক পার্থক্যও তীব্রভাবে উস্কে দেওয়া হয়েছে। মেয়েদেরকে শুধু ঐ শিক্ষাই দেওয়া হয়, যাতে তারা উত্তম গৃহিনী ও উত্তম মা হওয়ার যোগ্য হয়। তাদের আরেক কঠিন আপত্তি হল, প্রাথমিক ও মাধমিক পাঠ্যসূচীতে ছেলেদের বেশীর ভাগ ছবি দেওয়া হয় কেন? শুধুমাত্র শতকরা ২৫ ভাগ ছবি মেয়েদের। এখানে নেতিবাচক পার্থক্য করা হয়েছে। গ্রন্থের শেষ ভাগে মেয়েদের জন্য দু'চারটি কবিতা ও কাহিনী সংযোজন করা হয়েছে। এক গল্পের শিরোনাম হল, "বুদ্ধিমতি বালিকা"। তাতে বলা হয়েছে-

মেয়েরা লেখা পড়ার পর তাদের অধিকার আদায়ে স্বেচ্ছায় আন্দোলনে নেমে পড়ে। বিবাহ সংক্রান্ত বিষয় আসলে তখন আমি যেন সাহস না হারিয়ে ফেলি। আমরা পিতা উক্ত বিষয় জানার পর তিনি আমাকে অনেক কথা বলেন কিন্তু আমি তাকে আমার সিদ্ধান্তের বিষয় পরিস্কার জানিয়ে দেই যে, যদি বিবাহ করতেই হয় তাহলে আমি আমার পছন্দের ঘরে বিবাহ করব। তাছাড়া অন্য কোন ঘরে বিবাহ করব না। নতুবা বিষ খেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেব। অবশেষে আমার পিতা আমার ও পরিবারের অন্যদের কথায় আমার মতামত মেনে নিতে বাধা হয়। এভাবে আমার বান্ধবীর দেবরের সাথে আমার বিবাহ হয়। ঠিক ঐ সময় আমার চাকুরীর নিয়োগপত্র পেয়ে যাই। আর বিবাহের অল্পকিছু দিন পূর্বে আমি চাকুরীতে যোগদান করি। বিবাহের পরও ঐ চাকুরী করতে থাকি। বর্তমানে আমি স্কুলের শিক্ষয়ীত্রির দায়িত্ব পালন করছি। আর নিজের ছেলে মেয়েদের ও শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করছি।

উক্ত গল্পে বুদ্ধিমতি বালিকার দু'টি বুদ্ধিমত্তার উল্লেখ করা হয়েছে। এক মাতাপিতাকে ভয় দেখিয়ে নিজে পছন্দ অনুযায়ী বিবাহ করা। দুই চাকুরী করা। এ কাহিনীতে উক্ত গ্রন্থ সমাপ্ত করা হয়েছে। যেন পূর্বে বারী ঘুমিয়ে ছিল। যখন তার মধে এ সব বিষয় সৃষ্টি হয়েছে, তখন সে সঠিক অর্থে জাগ্রত হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তান গ্লোর্ডেন জুবলীর ধারাবাহিক উৎস আয়োজনে অপ্রচলিত প্রাথমিক শিক্ষার করনীয় বিষয়ক কনফারেন্স বাণিজ্যিক ভবন লাহোর চিল্ড্রেন কমপ্লেক্সে ৮, ১ আগষ্ট ১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত হয়।

উক্ত গ্রন্থও সাহী প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ শিক্ষা বিস্তার সোসাইটি প্রকাশ করে। কনফারেন্সের প্রথম দিনে ৮টি বক্তব্য সম্বলিত এ গ্রন্থ রুবিনা মাহগোল তৈরি করেন।

মোট ১১৬ পৃষ্ঠার মধ্যে ৬০ পৃষ্ঠার এক বিষয় বস্তু খোদ রুবিনা মাহগোলের লিখিত। অনিয়মিত প্রাথমিক শিক্ষার অর্থ হল, ঐ শিক্ষা পদ্ধতি খ্যাতনামা পরিচিত শিক্ষা সংগঠনের বাইরে দেওয়া হয়। সুতরাং ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আর্ন্তজাতিক শিক্ষা সংক্রান্ত কনফারেন্সে "সবার জন্য শিক্ষা" ঘোষণা পত্রে পাকিস্তান স্বাক্ষর করে। বর্তমানে প্রিয় মাতৃভূমির শিক্ষা বিস্তার ও ব্যাপক প্রসারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা জরুরী। সুতরাং ব্যবস্থাপকের অভিমতে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনেক বেসরকারী সংগঠনের কার্যালয়ে স্কুল পরিচালনার কার্যক্রম চালানো হয়। কেননা শিক্ষাখাতের উন্নয়নে সরকার যে বাজেট দেয়, তা খুবই অপ্রতুল। এ কারণে শিক্ষা সংস্থা ধারাবাহিকভাবে যে শিক্ষা প্রদান করে, তাতে দেশের প্রয়োজনীয় চাহিদা আদৌ পূরণ হয় না। ফলে ঐসব বে-সরকারী সংস্থা এন. জি. ও. আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বিস্তারের আন্দেলন গড়ে তোলে। তারা হাসি মুখে এসব সমস্যার মোকাবিলা করে সফলতার সাথে অসংখ্য স্কুল পরিচালনা করছে। উক্ত প্রোগ্রাম পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হল, প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলের। শিক্ষা বঞ্চিত শিশুরা বিশেষ করে গৃহহীন, উপার্জনক্ষম শ্রমিক শ্রেণী, অল্প বয়স্ক মেয়ে শিশু। যাদের কঠের পরিশ্রমের কাজে নিয়োজিত করা হয়।

রুবিনা মাহগোলে তার আলোচনায় শিক্ষার কর্মকৌশল নির্ধারণে শ্রেণী বৈষম্যের সংশোধনের উপায়কে তিন ভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন।
১. পুরুষ ও নারীর মধ্যে পৌরুষ্যত্ব ও নারীত্বের পার্থক্য নিরূপণ। এ দু'টোকে সম্পূর্ণ পৃথক সত্ত্বা মনে করা।
২. পৌরুষত্বের বৈশিষ্ট্য ও নারীত্বের বৈশিষ্ট্যকে পরস্পর বিপরীত মনে করা।
৩. সর্বক্ষেত্রে নারীদের দুর্বল ও নিকৃষ্ট মনে করা। অথচ পুরুষকে সবল ও উত্তম ও শ্রেয় মনে করা হয়। তারপর তিনি বলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ভারত উপমহাদেশে ইস্টইণ্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে লর্ড ম্যকেল কর্তৃক প্রবর্তিত। আর তখন ইংরেজীকে সরকারী ভাষা ঘোষণা করা হয়। প্রথমে মুসলমানগণ নতুন এ শিক্ষা ব্যবস্থার ঘোরতর বিরোধীতা করে। কিন্তু হিন্দুরা নতুন এ শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকারী কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা লাভ করতে শুরু করে। অবশেষে মুসলমানগণ প্রয়োজনের তাগিদে ও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রবর্তিত শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করে।

তখন স্যার সৈয়দ আহমদ ও অন্যান্য উন্নয়নকামীগণ আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞান শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। কিন্তু এর সাথে সাথে তারা নারীদের আধুনিক শিক্ষার ঘোর বিরোধীতা করেন। প্রয়োজন ও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী যদিও মেয়েদের স্কুলে পাঠানো হয়, কিন্তু মেয়েদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয় পড়ানো হত না বরং তাদের ধর্মীয় বিষয়, সামান্য হিসাব জ্ঞান, গৃহস্থালীর কাজ, এক প্রকার শূচীকর্ম, সেলাই করা, রান্না-বান্না, শিশু পরিচর্চা ইত্যাদি বিষয় শিক্ষা দেওয়া হত। যা তাদের উত্তম মা ও উত্তম গৃহিনী হতে সহায়ক মনে করা হত। যেন নারীকে তার সত্ত্বার জন্য শিক্ষা দেওয়া হত না বরং পরিবার, গোত্র ও জাতীয় স্বার্থে শিক্ষা দেওয়া হত।

নারী শিক্ষা প্রসারের বিষয় স্যার সৈয়দ আহমদ খাঁনের উন্নত ধ্যান-ধারনা, নতুনত্ব পছন্দ, আল্লামা ইকবালের মত দার্শনিক ধ্যান-ধারনা, মৌলভী আশরাফ আলী থানবীর মত বুনিয়াদী সহায়তাকারী, চিন্তাশীল ব্যক্তিদের ধ্যান-ধারনা ব্যতিক্রম ছিল। যেন নারী শিক্ষার বিষয়ে ধমযুদ্ধাদের মধ্যে মতবিরোধের লড়াই চলেছে।

স্যার সৈয়দ আহমদ খাঁন মেয়েদের শুধু, ধর্মীয়, গার্হত্য বিষয় শিক্ষা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তিনি মেয়েদের ইতিহাস, ভূগোল, ত্রিকোনমিতি ইত্যাদি পড়ানোর ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, পশ্চিমা নারী সমাজ যে শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, ভারত উপমহাদেশের নারীদের ঐ পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা অনুচিত ও অযৌক্তিক। যেন স্যার সৈয়দ আহমদের দৃষ্টিতে নারীদের শুধু চরিত্র গঠনমূলক শিক্ষার প্রয়োজন বেশী। আর এই আখলাখ কি ছিল মুসলিম নারী সমাজকে অমুসলিম নারী সমাজ থেকে রক্ষা করতে হবে। তাদের মধ্যে আপন-পর, মুহরেম-গায়েবে মুহরেমের পার্থক্য মজবুত করতে হবে। যেন নারীকে আত্মমর্যাদার লক্ষ্যস্থল নির্ধারণ করে তাদের উপর অনেক কঠোর শর্তারোপ করে দেওয়া হয়। তাদেরকে চাদর ও চার দেওয়ালের মাঝে অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়। আকবর এলাহাবাদের কবিতায় তাই প্রকাশ হয়েছে "নারীদের জিজ্ঞেস করা হলো আপনাদের যে পর্দা ছিল তার কি হল? তারা বলতে শুরু করে যে, তা পুরুষদের বিবেক-বুদ্ধির উপর পড়েছে।"

নারীদের পর্দাহীনতার কারণেই যেন জাতীয় আত্মমর্যাদা মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। স্বয়ং আল্লামা ইকবাল নারীর নারীত্বের রক্ষক হিসেবে শুধু পুরুষকে চিহ্নিত করে আকবর এলাহাবাদী থেকেও দু'হাত সামনে অগ্রসর হয়েছেন। তিনি পর্দা প্রথাকেও নারীর নারীত্ব রক্ষার জন্য যতেষ্ট মনে করতেন না বরং তার ধারনা নারীকে শুধু পুরুষই রক্ষা করতে সক্ষম। এ মনোভাব তার কবিতায়ও তিনি প্রকাশ করেছেন। তিনি নারীদের আধুনিক ও প্রাচীন শিক্ষার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি জাতি গঠনে নারীর সতীত্ব রক্ষার একক রক্ষক শুধু পুরুষকে মনে করতেন। এভাবে গোত্রের নারীদেরকে আপন-পর ও অন্যদের নিরাপদ রাখা এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে যে, এ নিয়ে স্যার সৈয়দ আহমদ, ইকবালের মত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি বর্গ, মাওলানা আশরাফ আলী থানবী, ডিপুটি নাজির আহমেদ দেহলভীর মত উন্নয়ন প্রিয় লোকজন পরস্পর মত বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরেও নারীদের শিক্ষা লাভের ক্ষেত্রে শ্রেণী বৈষম্য বহাল থাকে। পরবর্তীতে এ চিন্তা-ধারাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বুঝানো হয়। এভাবে প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খাঁনের যুগের শিক্ষার নীতি নির্ধারক বলেন, "আমাদের মতে নারী সমাজ আবেগ-অনুভূতিতে ও শারীরিক ক্ষেত্রে, সন্তানের লালন-পালন, শিক্ষা দীক্ষায় ও শিশুদের যোগ্যতা বিকাশে উত্তম বলে প্রমাণ হয়েছে।
(জাতীয় শিক্ষানীতি ১৯৫৯ সালের রিপোর্ট) পাকিস্তান যেন স্বয়ং আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও শিল্প কারিগরীর যুগে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক ছিল তথাপি সে খানে নারীদের সম্পর্কে প্রাচীন রীতি-নীতি ও বিস্মৃত ধ্যান-ধারনা প্রসার ঘটানো হয়। অপর দিকে যাদের গৃহকর্মে দৈনিক গড়ে ষোল ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রমের কাজ করতে হয়, তাদেরকে মমতার বন্ধনের প্রশান্তি ও নারীর শারীরিক অক্ষমতা ঘোষণা দিয়ে সঠিক মূল্যায়ন করা হয় না। না এর জন্য তাদের কোন আর্থিক বিনিময় দেওয়া হয়। জুলফিকার আলী ভূট্টোর সময় নারীদের মর্যাদা সম্পর্কে কিছুটা উন্নত ধ্যান-ধারনা পোষণ করার মন-মানসিকতা জন্মে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট 'জিয়াউল হকের সময় পূনরায় নারীদের চাদর ও চার দেওয়ালের মাঝে দ্বিতীয়বারের মত বন্দী করে ফেলা হয়। ইসলামীক করণের ছদ্মাবরণে অনেক সতন্ত্র আইন পাশ করা হয়। তাতে পুরুষের মোকাবিলায় নারীর মর্যাদা অনেক কমে যায়। এসব ব্যবস্থার প্রাতিক্রিয়া শিক্ষা ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হয়। মুসলমান বীর যেমন মহাম্মদ বিন কাশেম, মাহমুদ গজনবী প্রমুখের আলোচনা করা হলে তাদের বীরত্ব, সাহসিকতা, বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, ন্যায়-পরায়ণতা ও বিজয়ী হিসেবে গুনাবলী আলোচনা করা হয়।

কিন্তু মুসলিম নারীদের যেমন হযরত খাদীজা বা ফাতেমা রাযি. এর আলোচনা করা হলে তাদেরকে শুধু উত্তম স্ত্রী ও উত্তম মা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তাদের সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে কখনো বীরত্ব ও সাহসিকতার বিষয়ে আলোচনা করা হয় না। অথচ পুরুষদেরকে কখনো গৃহকর্ম করতে বা সন্তান প্রতিপালনের কাজ করতে দেখানো হয় না। যেমন সেবা করা, কুরবানী দেওয়া, আনুগত্য করায় ও পদাঙ্ক অনুসরণে পুরুষদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়। নারীর বীরত্ব, বাহাদুরী ও সাহসিকতাপূর্ণ ইতিহাস বর্ণনা করা নারীদের ক্ষেত্রে অসমিচীন মনে করা হয়। তদোপুরি এ বৈষম্য মূলক মনোভাবের মাধ্যমে পরবর্তী বংশধরদের কর্মবিমূখ ও অলস করে দেওয়া হয়।

অবশ্য বর্তমানে হাতে গোনা কিছু সংখ্যক নারী চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে লেখা পড়া করছে। এ ক্ষেত্রে তাদের সফলতাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু সামগ্রীকভাবে জাতীয় পর্যায়ে তেমন কোন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। পাঠ্যভুক্ত গ্রন্থসমূহে কোথায়ও পুরুষদের রান্না করা বা মহিলাদের জাহাজ চালাতে দেখা যায় না। যেন দুর্বল ও অক্ষমতাকে এককভাবে নারীদের জন্য আর শক্তি ও সক্ষমতাকে এককভাবে পুরুষদের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তারপর এ পাঠ্যসূচীতেও পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বাহির ও ভিতর বলে বৈষম্যের সূচনা করেছে। তাদের অভ্যাস, অভিরুচি, চিত্তাকর্ষক বিষয়, কর্মক্ষেত্রেও বৈষম্য জন্ম দিয়েছে। অনুরূপভাবে রাজনৈতিক চর্চা এবং ধর্মের নামেও শ্রেণী বৈষম্যকে উস্কে দেওয়া হয়েছে।

আর নারীদের গণতান্ত্রিক অধিকার স্বাধীনতা ও উন্নতিকে তো সর্বদা ঘৃণাই করা হয়। বইয়ের পাঠ্যসূচীর শ্রেণী বৈষম্য এ যেন গা সহা হয়ে গেছে। এটা নারীদের সাথে অন্যায় আচরণ ও বেইনসাফীকরাকে উস্কে দেয়। ফলে গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও বিঘ্নিত হচ্ছে। সুতরাং বর্তমানে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য হল, তাদেরকে সরকারী ও বেসরকারী পাঠ্যসূচীতে পরিবর্তন আনতে হবে। তা যেন শ্রেণী বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়। শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য যদি গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে সর্বপ্রথম শিক্ষা ক্ষেত্রে শ্রেণী বৈষম্য ও প্রতিহিংসা দূর করতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00