📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 নির্বাচনের পদ্ধতি

📄 নির্বাচনের পদ্ধতি


এটা এক রাজনৈতিক বিষয়; সামাজিক কোন বিষয় নয়। প্রাণ উৎসর্গ হয়ে যায় যে, জাপানী জাতি এ কঠিন সমস্যাকে অতি সহজ পদ্ধতিতে সমাধান করে থাকে। যা দেখে সত্যি অভিভূত হতে হয়। আমি দীর্ঘ সাত বছরে জাপানে চার বার প্রধান মন্ত্রি পরিবর্তন হয়ে চার বার নির্বাচন হতে দেখেছি। কিন্তু এর জন্য না কোন বার প্রতিবাদ করতে হয়েছে। আর না কোন বৈঠক করতে হয়েছে। আর না কোন হরতাল করতে হয়েছে। বরং আমাদের জন্য বিস্ময়ের ব্যাপার হল, ভোট গ্রহণের দিন সর্বদা রবিবারে ধার্য করা হয়। যাতে রাষ্ট্রীয় কল্যাণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব থাকে; জাতির অনর্থক সময় নষ্ট না হয়। লোকজন নিজ নিজ পরিবার ও সন্তানদের সাথে নিয়ে স্বেচ্ছায় আনন্দ ভ্রমণে বের হয়ে যায়। আর যেতে যেতে সড়কের পাশে নিজের নির্বাচনী কেন্দ্রে পৌঁছে নির্বাচনী বৃথে নির্বিঘ্নে নিজ নিজ ভোট দিয়ে বের হয়ে আসে। স্বাভাবিক সময়ের মত সম্পূর্ণ নীরবতা ও শান্তি বিরাজমান থাকে। না দেওয়ালগুলোতে চিকা মারা হয়, না রং বেরংয়ের বড় বড় পোস্টার তৈরি করা হয়, আর না দেওয়ালে বড় বড় ছবি ঝুলানোর মাধ্যমে ভোট প্রার্থনা করা হয় বরং প্রত্যেক মহল্লার প্রসিদ্ধ স্থানে ১২x১৪ ইঞ্চি দশ-বারটি ছবি ঝুলিয়ে রাখা হয়।

ওখান থেকে তারা ঐ এলাকার প্রর্থীর পরিচয় জেনে নেয়। এছাড়া অন্যত্র আর কোন বিজ্ঞাপন জারী করা হয় না। প্রত্যেক প্রার্থী প্রত্যেক লোকের নিকট ব্যক্তিগত জানা শুনা ও পরিচিত। এছাড়াও গাড়িতে মাইক লাগিয়ে প্রার্থী ও তার কতিপয় সমর্থক নারী পুরুষ মহল্লায় ও অলি গলিতে চক্কর দিয়ে ভোটা প্রার্থনা করে। তাও শুধু দশ পনের দিনের জন্য, এর জন্যও আবার সময় নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। সকালে সাত ঘটিকা থেকে সন্ধা সাত ঘটিকা পর্যন্ত। এর পর নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধ করে দিতে হবে। কখনো কখনো কাউকে ভাষণ দিতে দেখা যায়। কোন লোক তার ভাষণ শোনার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে না বরং চোখের পলক পড়ার সময় পরিমান দাড়িয়ে যে যা শুনতে পারে শুনে চলে যায়। অথচ ভোটপ্রার্থী বিরামহীন ভাবে নিজ বক্তব্য পেশ করতে থাকে।

নির্বাচনের পর বিজয়ী দলের উপর রাষ্ট্রের ক্ষমতা সোপর্দ করে দেওয়া হয়। এর পরই গণতান্ত্রিক রীতিনীতি পূর্ণ উদ্দ্যমে শুরু হয়। না পূর্ববর্তী সরকারের আর্থিক লেনদেনের বিষয় খোঁজ খবর নেওয়া হয়। আর না রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুটাপাটের ডাকঢোল বাজানো হয়। আর না ঋণ নিয়ে রাষ্ট্রীয় নির্মানাধীন কাজের গাপলা বের করা হয়। তবে হাঁ, খোদা না করুন যদি দুর্নীতিপরায় কাউকে পাওয়া যায়, তাহলে তাকে পুরো জাতির সামনে এমন অপমান ও অপদস্ত করা হয় যে, সে ব্যক্তি স্বয়ং মরে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করে। অর্থাৎ সে বাধ্য হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তারা জাতির সামনে অপমান ও অপদস্ত হওয়াকে এতো বেশী ভয় করে। স্বয়ং আমি এরূপ অনেক লোককে আত্মহত্যা করতে দেখেছি। এর একমাত্র কারণ হল, তারা দুর্নীতি করাকে জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা বলে ধারণা করে। আর সবগুলো মিডিয়া চাই সংবাদপত্র হোক, চাই টি.ভি বা রেডিও হোক কোমলমতি শিশুদের পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে যে, এই দুর্নীতিবাজ লোককে কি শাস্তি দেওয়া উচিত।

মনে রাখবেন, আমি আমার বক্তব্যের মাধ্যমে জাপানীদের ফিরেশতা প্রমাণ করছি না। বরং আপনি নিশ্চিত বিশ্বাস করবেন যে, সত্যই তারা বিরাট এক গৌরবের অধিকারী জাতি। যদি তারা এরূপ অকল্পনীয় অতুলনীয় সৌন্দর্য্যের অধিকারী না হত, তাহলে আজ বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি গৃহে তাদের নাম স্মরণ করা হত না। তবে হাঁ, পৃথিবীর সব দেশে কম বেশী কিছু কিছু অন্যায় ও দুর্নীতি আছে। জাপানীদের মধ্যে খারাপ লোকও আছে। কিন্তু তা খুবই নগন্য। যদি কোন ব্যক্তিকে অপরাধের কারণে গ্রেফতার করা হয়, তাহলে সে পুরো জাতিকে অপরাধমূলক কাজ না করার আহবান জানায়। অতীতে নীরবতা ও নিরাপত্তার সাথে সরকার পারবর্তন হয়।

আক্ষেপ! আমরা যদি ঐ সব নেতাদের মত খাঁটি নির্লোভ দেশ ও জাতির কল্যাণকামী নেতা পেতাম। তাহলে আমরাও পৃথিবীতে উন্নতির প্রথম সারীর অন্তর্ভূক্ত হতে পারতাম। বারবার আমাদেরকে দূর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হতে হত না। কিন্তু এর জন্য না আমাদের রাজনৈতিক নেতাগণ লজ্জাবোধ করছে, আর না পুরো জাতি লজ্জিত হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের অবস্থা হল, পুরো জাতিকে এমনভাবে অভ্যস্থ করে নেওয়া হয়েছে যে, টাকা পেতে হবে, চাই তা অবৈধ উপায়ে হোক বা বৈধ পন্থায়ই হোক না কেন। অর্থাৎ বৈধ অবৈধতার ধারনাই নিঃশেষ হয়ে গেছে।

না জানি কখন আমরা নিজেদের পূর্ব পুরুষদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ঐ সমস্ত অন্যায়ের সাথে মিশে যাই। এক বার এ অবস্থা হয়েছে যে, গিমার কোন এলাকায় স্থানীয় নির্বাচন হচ্ছিল। উক্ত নির্বাচনে এলাকার থামুরা পরিষদের সদস্য নির্বাচন করার কথা ছিল। একজন প্রার্থী ইতোপূর্বে পরপর দু'বার বিজয়ী হয়েছিল। একবার দু'জন প্রতিদ্বন্দীর সাথে প্রতিযোগীতা করে বিজয়ী হতে হয়েছে। তৃতীয় বার যখন নির্বাচন শুরু হয়, নির্বাচনের ঠিক আগের দিন বিজয়ী প্রার্থীর নিকট গিয়ে প্রতিপক্ষেরা বলে, আমি গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, ইতোপূর্বে আপনি যেভাবে এলাকার উন্নতি ও শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছেন। সম্ভবতঃ আমাদের উভয়ের দ্বারা তা সম্ভব হবে না। সুতরাং আমরা উভয়ে আপনার পক্ষে নিজ নিজ প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নিলাম। কেননা ভোট দানের ব্যবস্থা করে অনর্থক জনগনের টাকা ও সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। আমার মনে হয় সম্ভবতঃ আমাদের দেশে এমন কোন দৃষ্টান্ত নেই। এখানে তো নির্বাচনের দিন অনেক মূল্যবান জীবন নষ্ট হতে দেখা যায়। এর জন্য কেউ দুঃখ পর্যন্ত প্রকাশ করে না। বরং প্রত্যেকে নির্বাচনে সেই পুরাতন রীতি নীতি অবলম্বন করে। বর্তমানে তো নির্বাচনের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের প্রতিফলন হতে দেখা যায়। পিতার পরে পূত্র নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছে। আর এটাকে তারা নিজেদের পাওনা মনে করছে। আপনি পাকিস্তানের (বাংলাদেশের) পুরো ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখুন, এ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি কিভাবে বংশগত ধারায় শাসন কাজ পরিচালনা করে আসছে। মুসলমানদের পূর্বসূরীগণ কি এরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন?

ইসলাম কি আমাদেরকে এ শিক্ষাই দিয়েছে? না, কস্মিনকালেও ইসলাম আমাদেরকে এ শিক্ষা দেয়নি। এটা হল আমাদের ব্যক্তিগত আবিষ্কার। এ বিষয় আমাদের মতবিরোধ হতে পারে। আমার উদ্দেশ্য তাদের ভালো গুণাবলী সমূহ উল্লেখ করা। বরং আমার উদ্দেশ্য ইসলামের শিক্ষা ও এর উপর ভিত্তি করে এসব লোকদের জীবন-যাপনের সাথে তুলনা করা। সুতরাং কম বেশী ভুল ভ্রান্তির জন্য দুর্বলতা স্বীকার করছি। এটা হল আমার দীর্ঘ সাত বছর জাপানে অবস্থান করার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00