📄 খ্রিস্টানদের সাথে সহিষ্ণুতা ও উদারতা
ইয়াহুদীদের পূর্বে খ্রিস্টানদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আবিসিনিয়ার অধিপতি নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমানদর আশ্রয় দেওয়ার কারণে খ্রিস্টানদের সম্পর্কে মুসলমানদের উত্তম ধারনা হয়। পবিত্র কুরআন মজিদের সূরা মাঈদায় বর্ণিত আয়াতে অন্যান্য জাতির মুকাবিলায় তাদেরকে উত্তম বলে উল্লেখ করা হয়। একবার নাজরানের এক খ্রিস্টান প্রতিনিধিদল মদীনাতে আগমন করে। রাসূলুল্লাহ তাদের জন্য ঝমকালো মেহমানদারীর আয়োজন করেন। শুধু তাই নয়। মসজিদে নববীতে তাদের থাকার ব্যবস্থাও করেন। এমনকি তাদেরকে নিজনিজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নামায আদায় করার অনুমতি দান করেন। রাসূলুল্লাহ এর সর্বপ্রথম সীরাত রচিয়তা হযরত ওরউয়া বিন যুবাইর রাযি. নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধিদলের সাথে গৃহীত চুক্তিপত্রের বিস্তারিত বর্ণনা উল্লেখ করে বলেন, তাতে এ শর্তও অন্তর্ভূক্ত করা হয় যে, মুসলমান খ্রিস্টানদের নিকট থেকে যে জিনিস ধার নেবে, তা নষ্ট হলে ক্ষতিপূরণ দান করতে হবে। নাজরানবাসীদের জানমাল, ধর্ম, গীর্জা ও ধর্মীয় নেতা সকলের অধিকার সংরক্ষণের জিম্মদার হবে। ৬ষ্ঠ হিজরীতে মিশরের সীনাই অঞ্চলের সিনেট ক্যাথোরিনের পাদ্রীদের সাথে যে চুক্তিপত্র করা হয়, তাতে এ শর্ত অন্তর্ভূক্ত করা হয় যে, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কোন প্রকার ক্ষতি সাধন করা হবে না। কোন পাদ্রীকে পদচুত্য করা হবে না। খানকাহ থেকে বের করে দেওয়া হবে না। তাদেরকে ধর্ম পরিবর্তনে বাধ্য করা হবে না বরং গীর্জা মেরামতের জন্য মুসলমানগণ সকল প্রকার সাহায্য সহায়তা করবে।
📄 প্রাচ্য বিশারদদের অঙ্গীকার
প্রসিদ্ধ প্রাচ্য বিশারদ আরল্যান্ড স্যার থমাস ইসলামের এ আদর্শকে অকপটে স্বীকার করে বলেছেন, আরবদের প্রাথমিক রাজ্যজয়ের যুগে জোরপূর্বক কাউকে মুসলমান করা হয়েছে, কারো প্রতি কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে, এমন ঘটনা আমার জানা নেই বরং বাস্তবতা হল, আরব বাসীরা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সাথে যে উদারতা ও সহিষ্ণুতাপূর্ণ আচরণ করেছে, তা তাদের রাজ্য জয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
📄 ইংরেজ ঐতিহাসিক ফ্যানির অভিমত
মুসলমানগণ রাজ্যশাসন কালে কোন অমুসলমানকে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য কঠোরতা আরোপ করেনি। খ্রিস্টানদের বিলুপ্তীর জন্যও কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। যদি ইসলামের খলীফাগণ এতদুভয়ের মধ্যে একটি পরিকল্পনাও গ্রহণ করতেন, তাহলে অতি সহজে খ্রিস্টানদের ভূ-পৃষ্ঠ থেকে চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত করে দিতে পারতেন। যত সহজে ফার্ডিনান্ড ও আজমাইলেনা তা করেছে। তারা ইসলামকে সাপানিয়া থেকে নির্মূল করে দিয়েছে। চতুর্দশ লুই ফ্রান্সে প্রোটেস্টাইন মতবাদকে শাস্তি যোগ্য ঘোষণা করে। ইয়াহুদীদেরকে সাড়ে তিনশ বছর পর্যন্ত ইংল্যান্ডে প্রবেশ করতে দেয়নি। এশিয়া মহাদেশে বর্তমান সময়ও খ্রিস্টানদের গীর্জা বিদ্যমান থাকা ঐ ব্যাপক উদারতা ও সহিষ্ণুতার অকাট্য প্রমাণ। যা ইসলামী শাসকগণ তাদের অমুসলিম প্রজাদের সাথে করেছেন। যুদ্ধে রক্তপাত ঘটত কিন্তু বিনারক্তপাতেও বিজয় গৌরব অর্জন করার অনেক উদাহরণ রয়েছে। মুসলমান সেনাপতিগণ কখনও শত্রু বাহিনীকে অস্ত্র ধরার সুযোগ না দিয়ে আক্রমণ পরিচালনা করেনি। মুসলমানদের এরূপ সৌযন্যমূলক আচরণ ছিল যে, রোমানদের আক্রমণের সময় মুসলমানগণ খ্রিস্টানদের কর ফেরত দিয়ে দেয়। স্বয়ং খ্রিস্টানরা রোমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের যুদ্ধে জয়লাভের জন্য দু'আ করত। মুসলমানদের বিজয়ী হওয়ার পর খ্রিস্টানরা বিজয় উৎসব পালন করে। উপরন্তু তারা নিজ দায়িত্বে কর পরিশোধ করে এবং বিপুল সংখ্যক স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে।
📄 আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা
জাপানীরা কী ব্যক্তিজীবনে রাসূলুল্লাহ সুন্নাতের অনুসারী? ভৌগোলিক দৃষ্টিতে জাপান অসংখ্য দ্বীপের দেশ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ এমনভাবে মিলিত হয়ে আছে, সাধারণ মানুষ কিছুতে বুঝতে পারবে না যে, এটা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংযুক্ত দ্বীপাঞ্চল। তাদের আধুনিক প্রযুক্তি তাদের দূরত্বকে একত্রে মিলিত করে নিয়েছে। প্রাচীন জাপানে সারা দেশের সাথে কোন সংযোগ ছিল না। সম্পূর্ণ একক পৃথক রাষ্ট্র, যারা শুধু নিজেদের শক্তি-সামর্থ ও যুদ্ধবাজ হওয়ার উপর দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল। শক্তিশালী ব্যক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী হত, সে বিভিন্ন গোত্রের আকারে পরস্পরে যুদ্ধবিগ্রহ করে একে অপরের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত। দুর্বল ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের কল্পনাই করত না, যুলুমের বাজার সরগরম ছিল। বিশেষ কোন নিয়মনীতির প্রচলন ছিল না। এক অঞ্চলের শাসক অন্য দুর্বল এলাকা জোরপূর্বক দখল করে নিত। রাষ্ট্রপ্রধানকে খোদায়ী অবতার ও বা প্রতিভূ মনে করা হত। যে যেভাবে ইচ্ছা রাজ্য শাসন করত। সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে সকল গোত্রবাসী পারস্পরিক মতবিরোধ দূর করে এক শক্তিশালী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। নির্বাচনের মাধ্যমে গঠন করে এক শক্তিশালী সরকার। সেখানে রাজতন্ত্রের সাথে সাথে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপান পুরোপুরি অংশগ্রহণ করে চীন দখল করে নেয়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় আমেরিকা জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে এটম বোমা বর্ষণ করে। যার ফলে ঐ দু’টি শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। জনবসতি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু জাপানীরা নিজেদের সভ্যতা ও নিজেদের প্রতিজ্ঞা রক্ষার মজবুত ভিত্তির উপর নির্ভর করে সামনে অগ্রসর হয়। এমনকি দ্বিতীয়বারও দেখিয়ে দেয়, তারা এক শক্তিশালী জাতি। যুদ্ধের অস্ত্র পরিত্যাগ করে প্রযুক্তিগত শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিজেদের একমাত্র লক্ষ্য স্থির করে এবং তারা নিজেরা পরস্পরে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামনে অগ্রসর হতে শুরু করে। সামনে অগ্রসর হওয়াকে প্রাধান্য দেয়। উন্নতি লাভ করতে করতে পৃথিবীর প্রথম নম্বর জাতিতে পরিণত হয়। তাদের উন্নতি লাভের মূলনীতি সেটিই যা আমরা মুসলমানদের নিকট শিক্ষা করেছি আজ থেকে প্রায় ১৫০০বছর আগে। কুরআন মাজিদে ইসলামী বিধান অনুযায়ী অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হল, আমরা ঈমান ও ইসলামের ধারকবাহক হওয়া সত্ত্বেও ঐ সমস্ত জাতি থেকে অনেক পেছনে পড়ে আছি। আর ঐ বিজাতিরা উন্নতির উচ্চ শিখরে আরোহন করেছে। আমাদেরকে যা করতে নিষেধ করা হয়েছে, ঐ মূলনীতিকে তারা নিজেদের করে নিয়ে প্রযুক্তির পৃথিবীতে নিজেদের ভাগ্য গঠন করে নিয়েছে। সহজ-সরল পথে চলে অনেক দূর সামনে অগ্রসর হয়ে গেছে। এখনো তাদের মধ্যে সময়ের মূল্য, পবিত্রতা, পরিবারের লালন-পালন, সততা সত্যবাদিতা প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা, সাম্য-সমতা, সহমর্মিতা, আইনানুগ জীবন যাপন, অন্যের হক আদায়, বিশ্বস্থতা, শিক্ষা-সংস্কৃতি এমনকি সর্বদিক থেকে তারা যে কোন দেশ ও জাতি থেকে উন্নত। আক্ষেপ! সেই মুসলমান নেই। যারা ধর্মকে আপন করে নিয়েছিল। তাই দ্বীনও তাদের হয়েছে, দুনিয়া তাদের হয়েছে। তাঁরাই ছিল খাঁটি মুসলমান। ইসলাম ধর্মের পরিপন্থী কোন কাজ তাঁরা করেননি। আমার বন্ধুদের ঘটনাচক্রে জাপান ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। তাই জাপানীদের জীবন-যাপন সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে। আমরা যেভাবে তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছি এবং তাদের মিলিত হওয়ার সুবাধে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছি, তা এখন বর্ণনা করছি।