📄 প্রাচ্য বিশারদদের পক্ষ থেকে কুরআনের শিক্ষার অঙ্গীকার
খ্যাতনামা ইউরোপীয় মুসতাশরিক জজ সেল বলেছেন, মুসলমানদের ধর্ম ও কুরআনের ধর্ম তো এক শান্তি ও নিরাপত্তর ধর্ম। আউসিক্যাসল্ট কারের অভিমত হল, সারা বিশ্বে যদি কুরআনের বিধান জারি থাকে, তাহলে পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তা কখনো বিঘ্নিত হবে না। ফ্রান্সের প্রাচ্য বিশারদ মিসিসিউ সিডউল্টের অভিমত হল, যেসব মানুষ ইসলামকে সন্ত্রাসী ধর্ম বলে আখ্যায়িত করে, তাদের অন্তর অন্ধকারচ্ছন্ন হওয়ার স্পষ্ট দলীল হল, তারা ঐ স্পষ্ট আয়াতসমূহের প্রতি আলোকপাত করে না। যার প্রতিক্রিয়ায় আরববাসীদের সকল প্রকার চারিত্রিক কলঙ্ককে মুহূর্তের মধ্যে দূর করে অথচ তা দীর্ঘ দিন যাবত তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। প্রতিপক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করা বংশ পরম্পরায় শত্রুতা জিইয়ে রাখা। প্রতিহিংসা, অন্যায়ভাবে অত্যাচার নির্যাতন করা, খুন-খারাবি করা ইত্যাদি ঘৃণিত ও জঘন্য রীতিনীতিকে কুরআন চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত করে দিয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ বিষয় পূর্বে ইউরোপে বিরাজমান ছিল; বর্তমানেও আছে।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শিক্ষার আলোকে ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা
এ বিষয়ের সূচনালগ্নে রাসূলুল্লাহ এর শিক্ষার কিছু নমূনা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে আরেকটু বিস্তারিত আলোকপাত করা হচ্ছে। সহনশীলতার জন্য আরবী ভাষায় শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সহনশীলতার সংজ্ঞা হল. "উত্তেজনাপূর্ণ আচরণ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মানুষের ধৈর্য্য ধারণ ও সহিষ্ণু হওয়া" চেঁছড়ামীর ভাব প্রকাশ না করা বরং পাহাড়ের মত অটল থাকা। রাসূলুল্লাহ এর বাস্তব আদর্শ স্থাপন করেছেন। আর এ বিষয় শিক্ষাদান করেছেন। আরো ইরশাদ করেছেন, আমার প্রভূ আমাকে নয়টি বিষয় আদেশ দান করেছেন, তন্মধ্যে এক হল وَالْعَدُلُ فِي الرِّضَا وَالغَضَبِ "খুশি ও ক্রোধ উভয় অবস্থায় ইনসাফ করা।" রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, হযরত জিবরাঈল (আ.) আমার নিকট বর্ণনা করেছেন- يَا مُحَمَّدُ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَصِلَ مَنْ قَطَعَكَ وَتُعْطِي مَنْ حَرِمَكَ وَتَغْفِرُ عَمَّنْ ظَلَمَكَ “হে আল্লাহর রাসূল আল্লাহ তা'আলা আপনাকে আদেশ করেছেন, যে আপনার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, আপনি তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করুন। যে আপনাকে বঞ্চিত করে, আপনি তাকে দান করুন। যে আপনার উপর অত্যাচার করে আপনি তাকে ক্ষমা করুন।" সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, ওহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ দান্দান মুবারক শহীদ করে দেওয়া হয়। পবিত্র চেহারা মুবারক রক্তে রঞ্জিত করে দেওয়া হয়। তাতে হযরত সাহাবায়ে কিরাম ভীষণ ব্যথিত ও মর্মাহত হয়ে আরজ করেন, হে আল্লাহর রাসূলুল্লাহ! ঐ বজ্জাত নরখাদকদের জন্য যদি রাসূলুল্লাহ বদ দু'আ করতেন, তাহলে আল্লাহ তদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতেন। রহমতের নবী তার নিবেদিত প্রাণ সাহাবীদেরকে বললেন, হে আমার প্রাণপ্রিয় সাহাবাগণ! আমি অভিশাপ বর্ষণের জন্য প্রেরিত হইনি বরং আল্লাহ তা'আলা আমাকে সত্যের প্রতি আহবানকারী ও আপদ মস্তক রহমতরূপে প্রেরণ করেছেন। এ ইরশাদের পর রাসূলুল্লাহ স্বীয় পবিত্র হাত দু'আর জন্য আল্লাহ তা'আলার দরবারে উত্তোলন করেন, আর ঐ অত্যাচারীদের ধ্বংসের স্থলে নেক দু'আ করেন, হে আল্লাহ্! আমার জাতিকে হিদায়াত দান করুন। (তাদের অপারগতার জন্য আরজ করেন) হে আল্লাহ! তারা আমাকে না চেনার কারণে এ আচরণ করেছে। যদি তারা আমাকে চিনত, তাহলে আমার সাথে কখনোই এরূপ আচরণ করত না। জায়েদ বিন সানা ইয়াহুদী আলেম ছিল। সে রাসূলুল্লাহ এর মাঝে নবুওয়াত সব নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে। কিন্তু ঐ আলামতসমূহ যা পবিত্র কিতাব সমূহে উল্লেখ করা হয়েছে। যথা (১) ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা অজ্ঞতার উপর প্রবল হওয়া। (২) কঠোর অত্যাচার ও নির্যাতন তাঁর ধৈর্য্য সহিষ্ণুতাকে আরো বাড়িয়ে দেবে। যায়েদ নবীজীকে ঋণ দিয়ে তাঁর সাথে রুঢ় আচরণের মাধ্যমে তাঁর সেই মহিমান্বিত ও প্রশংসীত গুণাবলী জানার চেষ্টা করে এবং বেয়াদবী মূলক প্রশ্ন করে বসে। হযরত উমর রাযি, তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, হে উমর! আমি তোমার মুখ থেকে এর বিপরীত কথা শোনার আশাবাদী ছিলাম। তোমার উচিত ছিল আমার পক্ষ থেকে উত্তম রূপে তার পাওনা আদায় করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। আর তাকে আরো উত্তম শিক্ষা দান করা। যাও তার পাওনা তাকে পরিশোধ করে দাও। উপরন্তু তার পাওনার অতিরিক্ত তাকে আরো বিশ সা বেশী দান কর। হযরত উমর রাযি. তাই করেন। জায়িদ বিন সানা রাসূলুল্লাহ এর মহিমান্বিত আখলাখ দেখে অভিভূত হয়ে বলে, হে উমর! আমি রাসূলুল্লাহ এর নবুওয়াতের আলামত সহিষ্ণুতা প্রত্যক্ষ করার উদ্দেশ্যে এরূপ রূঢ় আচরনণ করেছি। فَاشْهَدُكَ أَنِّي رَضِيتُ بِالله رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَيُمَحَمَّدٍ نَبِيًّا এখন আপনি সাক্ষী থাকুন! হে উমর! আপনি সাক্ষী থাকুন। আমি স্বীকার করছি আল্লাহ আমার প্রভূ! ইসলাম আমার দ্বীন, আমার নবী হযরত মুহাম্মাদ।
📄 অমুসলমানদের নিকট থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শিক্ষার প্রতিক্রিয়ার অঙ্গীকার
রাসূলুল্লাহ এর শিক্ষার এরূপ প্রতিক্রিয়া ছিল, তা স্বীকার করে গোপাল কৃষ্ণ বলেছে, বৃষী মুহাম্মাদ এর জীবনের প্রতি যখনই আলোক করা হয় তখন এ কথা স্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে, ঈশ্বর জগত সংসার সংশোধনের উদ্দেশ্যে তাঁকে প্রেরণ করেছেন। তার মধ্যে ঐ শক্তি বিদ্যমান ছিল, যা একজন গ্রেট রিফরমার (মহান সংস্কারক) এবং এক মহাপুরুষ (মহান সত্ত্বা) এর মাঝে বিদ্যমান থাকা উচিত। রাসূলুল্লাহ আরবের রাখালদের উপর যারা অত্যাচার নির্যাতনে অভ্যস্ত ছিল, তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ বানিয়েছেন। তাদের মধ্যে দয়া অনুগ্রহ করুনা, ধৈর্য্য সহিষ্ণুতা বিনয় নমনীয়তা পয়দা করে তাদের মধ্যে দয়া মমতা, প্রেম প্রীতি ভালবাসার উৎস সৃষ্টি করেছেন, এরা অজ্ঞ নির্বোধ হিংস্র ছিল। কিন্তু মাত্র হাতে গোনা কয়েক দিনের মধ্যে তাদেরকে শাসন ক্ষমতার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করে দেন। তারা নিজের ভাইয়ের রক্ত পানে অভ্যস্থ ছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ এর মহিমান্বিত শিক্ষা এমনভাবে সংশোধন করে দিয়ে তাদেরকে করুনার সিন্ধুতে পরিণত করে দেন, যার ফলে তারা পৃথিবীর হারানো ভাবমূর্তি ও নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। আর নিজেরাও শান্তি ও নিরাপত্তার সংরক্ষক হয়ে যায়। ঈশ্বর মুহাম্মদ কে "হরদে" (অন্তর) এর পোশর (পবিত্র) বানিয়েছেন। তিনি সর্বোত্তম কোমল অন্তরের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু তার হাত কখনো ইনসাফের আচল ত্যাগ করেন নি। তিনি রাসূলুল্লাহ আরবের মহান বিজয়ী ছিলেন। কিন্তু বিজিত জাতির জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার পয়গাম বাহক ছিলেন। যারা তাঁর সাথীদের উপর কঠোর নির্যাতন করেছে, তিনি ইচ্ছা করলে তাদেরকে শূলে চড়াতে পারতেন। কিন্তু তিনি স্বীয় মহানুভবতায়, নিদ্বির্ধায় তাদের সব এপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাদের নিকট থেকে বিন্দুমাত্র প্রতিশোধও গ্রহণ করেননি। এটা এমন এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যার উদাহরণ আমরা খুঁজে পাই না। রাসূলুল্লাহ এর জীবন-চরিত্রে এ আশ্চর্য ও বিস্ময়কর বিষয় পরিলক্ষিত হয় যে, তিনি শান্তি ও নিরাপত্তার দুশমনকে কখনো ক্ষমা করেন নি। কিন্তু তিনি তাঁর ব্যক্তিগত শত্রু থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। কেননা এরূপ করা নোংরামী। মানবতার পরিপন্থী। স্বীয় সত্ত্বার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ক্ষমা ও দয়ার পূর্ণাঙ্গ অনুসারী ছিলেন। তাঁর কোমলতা ও দয়ার অবস্থা এই ছিল যে, যদি কেউ তার নিকট কোন বিষয় আবেদন করত, তাহলে একান্ত মনোযোগ ও প্রশান্তির সাথে তার আবেদন শুনতেন। রাসূলুল্লাহ এর মহিমান্বিত জীবনে এরূপ একটি উদাহরণও কেউ পেশ করতে পারবে না যে, রাসূলুল্লাহ তাঁর ব্যক্তিগত কোন দুশমন থেকে প্রতিশোধ নিয়েছেন।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সন্ধি চুক্তিতে উদারতা ও সহিষ্ণুতা
লিসানুল আরব গ্রন্থের বর্ণনা মোতাবেক مَعَاهَدَات শব্দটি مَعَاهَدَةً এর বহুবচন। بَابُ مُفَاعَلَهُ থেকে গঠিত হয়েছে। অর্থ হল, শপথ করে পাকা পোক্ত প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হওয়া। রাসূলুল্লাহ এর চুক্তিপত্র প্রকাশ হয়েছে বিশেষ করে মদীনাতে তাশরীফ রাখার পর, যা বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মাবলম্বীদের সাথে করা হয়েছে। এখানে বিশেষ উল্লেখযোগ্য কথা হল, নবীজীর আর্বিভাবের একমাত্র উদ্দেশ্য আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর চুক্তির তিন যুগ ছিল। প্রথমে বদর যুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়। দুই ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধিচুক্তি স্থাপনের সময়। তিন মক্কা বিজয়ের সময়। পবিত্র কুরআন মজিদে পঁচিশের অধিক স্থানে পূর্ণাঙ্গ সতর্কতা ও দৃঢ়তার সাথে প্রতিশ্রুতিপূর্ণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এর জন্য বিরাট পুরষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ এর শান্তি চুক্তির সূচনা হয়েছে প্রথম আকাবার শপথ থেকে। আর বিশেষ শান্তিচুক্তি হয়েছে মদীনায়। রাসূলুল্লাহ প্রত্যেক স্তরের লোকদের সাথে ৫০ এর আধিক শান্তিচুক্তি করেছেন। তন্মধ্যে আরবের মুশরিক, মুনাফিক, ইয়াহুদী, খ্রিস্টান ও অগ্নিপুজারীরাও অন্তর্ভূক্ত ছিল। রাসূলুল্লাহ নিজ প্রতিশ্রুতি রক্ষার শিক্ষা দিয়েছেন। তথাপি মুসলমানদের সাথে সর্বদা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়েছে। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, মুসলমানদের সাথে অতি নির্লজ্জতার সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বিশ্বাস ঘাতকতা করা হয়েছে। রায়াল, জাকওয়ান, আসবা ও বনী লিহিয়ান গোত্রগুলো তাদের শত্রুদের প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ এর নিকট ফৌজী সাহায্যের আবেদন করেছিল। রাসূলুল্লাহ তাদের সাহায্যার্থে ৭০ জন কারী সাহাবী প্রেরণ করেন। কিন্তু বীরে মাউনা নামক স্থানে পৌঁছার পর ঐ সব লোক বিশ্বাসঘাতকতা করে নিরস্ত্র হাফেযে কুরআন মুসলমানদের নির্মমভাবে শহীদ করে দেয়। যখন হযরত আসেম রাযি. এর বাহিনীকে বনী লিহিয়ান গোত্রের দু'শত তীরন্দাজ বাহিনী ঘেরাও করে ফেলে, তখন তাদের নিকট থেকে ওয়াদা নেওয়া হয় যে, যদি তোমরা নিচে নেমে আস, তাহলে তোমাদের সাথে কোন প্রকার দুষ্কৃতি করা হবে না। এরপর একদল নিচে নেমে আসার সাথে সাথে তাদের অধিকাংশকে কৃতদাস বানিয়ে বিক্রয় করে দেওয়া হয়। এরূপ প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ ও বিশ্বাস ঘাতকতা করা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ এর মহিমান্বিত আখলাকে নিরাপদ অবস্থায় যে রূপ আখলাখের সুদৃঢ়তা ছিল, যুদ্ধের ময়দানে সংঘাতময় মুহূর্তেও অনুরূপ দৃঢ়তা ছিল। তাঁর মহিমান্বিত সত্ত্বাগত বিষয় ও তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার এ আদর্শ নমুনা ছিল যে, নবুওয়াতের পূর্ব যুগের ঘটনা হল, আব্দুল্লাহ ইবনুল আমামা এক বিষয়ে রাসূলুল্লাহ এর সাথে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হয়ে এক স্থানে নবীজীকে বসিয়ে রেখে চলে যায়। ঘটনাচক্রে সে নিজেই তা ভুলে যায়। তিন দিন পর ফিরে আসে, তখন রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, আমি তিন দিন পর্যন্ত তোমার অপেক্ষায় এ স্থানে বসে আছি। অথচ রাসূলুল্লাহ এর পক্ষ থেকে প্রতিজ্ঞা রক্ষার আদর্শ নমুনা সম্পূর্ণ বিপরীত। বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের সংখ্যা কম ছিল। হযরত আবু হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান ও আবু হাসান রাযি. মক্কা থেকে মদীনা অভিমুখে আসছেন। পথিমধ্যে কাফিররা তাদেরকে গ্রেফতার করে ফেলে। পরে তাদেরকে রাসূলুল্লাহ এর পক্ষে যুদ্ধে যোগদান না কারার শর্তে মুক্তি করে দেয়। তাঁরা উভয়ে রাসূলুল্লাহ এর দরবারে হাজির হয়ে পুরো ঘটনা পেশ করেন। রাসূলুল্লাহ তাঁদেরকে বললেন, তোমরা উভয়ে ফিরে চলে যাও। আমি যে কোন অবস্থায় ওয়াদা পূর্ণ করব। রাসূলুল্লাহ এর প্রতিজ্ঞাসমূহের একাধিক বেশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে দুটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এমন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে কোন শান্তিতে চুক্তিতে পাওয়া যায় না। প্রথমতঃ চুক্তিপত্রে উদারতা ও সহিষ্ণুতা। দ্বিতীয়তঃ চুক্তির সমতার বুনিয়াদকে আগ্রহের সাথে গ্রহণ করা। তাঁর চুক্তিতে বিজয়ের নমুনা পরিলক্ষিত হত না বরং নিরাপত্তার নমুনা উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে তাঁর সামনে এসে হাজির হত। মদীনা সনদ, হুদাইবিয়ার সন্ধিচুক্তি ও অন্যান্য চুক্তিপত্র এর স্পষ্ট উদাহরণ। পক্ষান্তরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ২৮ জুন ১৯১৯ খ্রিঃ চুক্তিপত্র লেখার স্থানে লিখিত চুক্তি শান্তিচুক্তি নামে গৃহীত হয়। এনসাইক্লোপিডিয়া বৃটানিকার বর্ণনা মোতাবেক জার্মানীকে যুদ্ধের একক জিম্মদার স্থির করা হয়। তাদের সৈন্য বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করে দেওয়া হয়। বিজয়ী প্রতিনিধিদের সামনে জার্মানীর পরাজিত বাহিনীকে অত্যন্ত লজ্জাজনক অবস্থায় পেশ করা হয়। চুক্তিপত্রের নমুনা তৈরী করার সময় তাদেরকে অপরাধীর মত দাঁড় করে রাখা হয়। পরিণামে জার্মানীর যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ প্রায় ১২৫ কোটি ডলার জরিমানা আরোপ করা হয়। যা পরিশোধ করার মূলতঃ জার্মানীর ক্ষমতা ছিল না। এমন কি স্বয়ং ইংরেজ এইচ,জি, বিলিজও এটাকে বিজয়ী চুক্তিপত্র বলে ঘোষণা দেয়। রাসূলুল্লাহ ইয়াহুদীদের সাথে যে সহনশীলতা ও উদারতাপূর্ণ আচরণ এবং অমুসলমান জাতির সাথে যে সব চুক্তিপত্র করেছেন, তা তাঁর উদারতা ও সহিষ্ণুতার আদর্শ নমুনা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন স্তরে লোকদের সাথে রাসূলুল্লাহ ব্যক্তিগতভাবে যে উদারতা ও সহনশীলতা প্রদর্শন করেছেন, তাদের মধ্যেও একদল ইয়াহুদী ছিল। ইয়াহুদীরা ইসলামের অনুসারীদের যে অসহিষ্ণু ও অনৈতিক ব্যবহার করেছে, তা এখন উল্লেখ করা হচ্ছে। পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহ সহিষ্ণুতা ও উদারতা প্রদর্শন করেছেন, তা হল এই। মুজিব উল্লাহ নদভী লিখেছেন, মদীনার ইয়াহুদীদের সমবেত হওয়ার মাদরাসা ছিল, রাসূলুল্লাহ ও একাধিক সাহাবায়ে কিরাম ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তথায় যাতায়াত করতেন। বিশেষ করে হযরত উমর রাযি. বেশী যাতায়াত করতেন। হিজরতের প্রথম দিকে ইয়াহুদীরা নিজেদের শক্তি ও সামর্থের নেশায় অন্ধ হয়ে ইসলামকে তোয়াক্কা করত না। কিন্তু বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের সৌভাগ্যের সূর্য অস্তমিত হতে দেখে, তারা নিজেদের ভবিষ্যত অন্ধকার দেখতে শুরু করে। রাসূলুল্লাহ মদীনাসনদ নামে যে শান্তি চুক্তি করেছেন, তা ইয়াহুদীদের প্রতি উদারতা ও সহিষ্ণুতার উত্তম নমুনা। এর কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য শর্তাবলী নিম্নে উল্লেখ করা হচ্ছে। ১. বনী আউফ গোত্রের ইয়াহুদীরা মুসলমানদের সাথে এক জাতি হিসেবে বসবাস করবে। ২. আর যদি কেউ ঐ চুক্তিবদ্ধ জাতি সমূহের উপর আক্রমণ করে তাহলে সকলে মিলে যৌথভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৩. চুক্তিবদ্ধ জাতিসমূহ পরস্পরে একে অপরের কল্যাণ কামনা করবে। একে অপরের হিতাকাঙ্খি হবে। কেউ কারও ক্ষতি ও অমঙ্গলকামী হতে পারবে না। ৪. যুদ্ধ চলাকালীন সময় ইয়াহুদী ও মুসলমান উভয় একযোগে কাজ করবে। ৫. ইয়াহুদীদের মিত্র গোত্রসমূহ ইয়াহুদীদের সমান। তারও সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে। ৬. কোন ব্যক্তিকে চুক্তিবদ্ধ করে তার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা যাবে না। ৭. অত্যাচারিত ও উৎপিড়ীত ব্যক্তিকে সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগীতা করতে হবে। ৮. পারস্পরিক মতবিরোধপূর্ণ বিষয় রাসূলুল্লাহ কে মীমাংসাকারী মান্য করতে হবে। রাসূলুল্লাহ হযরত সাহাবায়ে কিরামকেও সহিষ্ণুতা ও উদারতা প্রদর্শনের আদেশ করেন। ৭ম হিজরীতে খাইবার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলমানগণ ইয়াহুদীদের জীবজন্তুও অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠন করে নিয়ে আসে। এতে রাসূলুল্লাহ ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়ে হযরত সাহাবায়ে কিরামকে সমবেত করে ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্য বৈধ করেন নি যে, বিনা অনুমতিতে তোমরা জোরপূর্বক আহলে কিতাবদের গৃহে প্রবেশ করবে। আর না তাদের নারীদের মারধর করবে। আর না তাদের বাগানের ফল ও ফসল খাবে। যাবত না তারা তোমাদেরকে তা প্রদান করে, যা তাদের উপর অত্যাবশ্যক করা হয়। সবচেয়ে বেশী চিত্তাকর্ষক কথা হল, খাইবার দূর্গ অবরোধের সময় জনৈক ইয়াহুদীর রাখাল কৃতদাস মুসলমান হয়ে যায়। ইসলামী আইন মোতাবেক সে তাৎক্ষণিকভাবে আযাদ হয়ে যায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাকে আদেশ করেন, স্বীয় মনিবের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করা যাবে না। সুতরাং সে স্বীয় মনিবের পশুপালকে হাঁকিয়ে দূর্গের নিকট তাড়িয়ে নিয়ে যায়। তারপর পশুপালকে ভয় দেখিয়ে উত্তেজিত করে দেয়। পশুরপাল অভ্যাস অনুযায়ী নিজ মনিবের গৃহে পৌঁছে যায়। আর ঐ বিশ্বস্থ কৃতদাস পুনরায় ফিরে এসে মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়। অবশেষে দূর্গবাসীরা হাতিয়ার ছেড়ে দেয়। খাইবরের ইয়াহুদীরা পরাজিত হওয়ার পর আবেদন করে, আমাদের জমিন আমাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে না নেয়া হোক। রাসূলুল্লাহ তাদের আবেদন কবুল করেন। সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, অর্ধেক জমিন মুসলমানদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ স্বীয় প্রতিনিধিদেরকে আদেশ দেন, তারা যে অংশ ছেড়ে দেবে শুধু তা গ্রহণ করবে। হযরত সুফিয়া রাযি. ইয়াহুদী সর্দারের কন্যা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে বিবাহ বন্ধনে নিয়ে আসেন। এর চেয়ে আরও বেশী কোন বিজয়ী পরাজিতদের এরূপ সহিষ্ণুতা ও উদারতা প্রদর্শন করেছে কি?