📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শিক্ষার আলোকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে সহিষ্ণুতার সূচনা
উপরে উল্লেখিত অসহিষ্ণুতার টানাপোড়নের যুগে রাসূলুল্লাহ এর শিক্ষা ও আমলের সুফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের উদারতা পূর্ণাঙ্গ শক্তি প্রদর্শনের সাথে সামনে অগ্রসর হয়েছে। এর নজির না ইসলামের পূর্বে ছিল, আর না ইসলামের পরে পেশ করা যাবে। রাসূলুল্লাহ এর কথা ও কাজ ছিল কুরআনের মুতাবিক। এ দিকে ইশারা করে হযরত আয়েশা রাযি. ইরশাদ করেছেন, كَانَ خُلُقُهُ القرآن "তার চরিত্র ছিল স্বয়ং কুরআন।"
📄 কুরআনের আলোকে সহিষ্ণুতা
এ কারণে সর্বপ্রথম কুরআনের আলোকে সহনশীলতার শিক্ষা পেশ করা হচ্ছে। সূরা আম্বিয়াতে মহান আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, "আমি আপনাকে নিছক রহমত স্বরূপ সমগ্র বিশ্বের জন্য প্রেরণ করেছি।” রাসূলুল্লাহ এর রহমত কাফির-মুশরিক সকল মানুষের জন্য সমান ছিল। যার ইচ্ছা সে রহমত ও নিরাপত্তার চাদরে আবৃত হতে পারত। সূরা আহযাবে বর্ণনা করা হয়েছে, “হে নবী! নিশ্চয় আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি, উপস্থিত পর্যবেক্ষণকারী করে, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে এবং আল্লাহর প্রতি তার নির্দেশে আহবানকারী আর আলোকোজ্জল সূর্য রূপে। সূরা সাবায়ও এর পুনরাবৃত্তি হয়েছে। আর সূরা আন্-নাহলে আদেশ দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা সকলের সাথে আদল-ইহসান ও সদাচরণের আদেশ দান করেছেন"। সূরা কাসাসেও এক কথার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। ধর্মীয় বিষয়ে উদারতা ও সহিষ্ণুতার চূড়ান্ত রূপ ও সূরা কাহাফে বলা হয়েছে, "যার ইচ্ছা ঈমান আনবে, আর যার ইচ্ছা কুফরী ইখতিয়ার করবে। সূরা বাককারাতে ইরশাদ করা হয়েছে, "দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর জবরদস্তী নেই"। সূরা আল কাফিরুনেও এর পুনরাবৃত্তি হয়েছে। কাজের সাথে কঠোরতা ও অসহিষ্ণুতার কোন সম্পর্ক নেই। বরং এটা হলো মহব্বতের জন্য। আল্লাহ তা'আলার বাণী হলো, আপন প্রভূর প্রতি বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞার সাথে লোকজনকে আহবান করা। আর তর্ক-বিতর্কে ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা প্রকাশ করা, যদি সে তোমার সাথে সীমালঙ্ঘনমূলক আচরণ না করে। তারপর আদেশ দেওয়া হয়েছে, যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করে তাদের প্রতিমাসমূহকে গালি দেবে না। নতুবা সে অজ্ঞতা বশতঃ তোমার সত্য খোদাকে গালি দিতে শুরু করবে। আর নিজের পরকালকে ধ্বংস করে দেবে। জোর জবরদস্তি করা আপানার কাজ নয়। বরং আপনার কাজ হল, শুধু আল্লাহর বাণী পৌছে দেওয়া। আর যে হিদায়াতের পথে চলে সে তার নিজের কল্যাণের জন্য চলে। আর যে পথ ভ্রষ্ট হয় সে নিজের ক্ষতি সাধন করে। এর চেয়ে অধিক বেশী সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা কোন ধর্ম দিয়েছে কি?
📄 প্রাচ্য বিশারদদের পক্ষ থেকে কুরআনের শিক্ষার অঙ্গীকার
খ্যাতনামা ইউরোপীয় মুসতাশরিক জজ সেল বলেছেন, মুসলমানদের ধর্ম ও কুরআনের ধর্ম তো এক শান্তি ও নিরাপত্তর ধর্ম। আউসিক্যাসল্ট কারের অভিমত হল, সারা বিশ্বে যদি কুরআনের বিধান জারি থাকে, তাহলে পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তা কখনো বিঘ্নিত হবে না। ফ্রান্সের প্রাচ্য বিশারদ মিসিসিউ সিডউল্টের অভিমত হল, যেসব মানুষ ইসলামকে সন্ত্রাসী ধর্ম বলে আখ্যায়িত করে, তাদের অন্তর অন্ধকারচ্ছন্ন হওয়ার স্পষ্ট দলীল হল, তারা ঐ স্পষ্ট আয়াতসমূহের প্রতি আলোকপাত করে না। যার প্রতিক্রিয়ায় আরববাসীদের সকল প্রকার চারিত্রিক কলঙ্ককে মুহূর্তের মধ্যে দূর করে অথচ তা দীর্ঘ দিন যাবত তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। প্রতিপক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করা বংশ পরম্পরায় শত্রুতা জিইয়ে রাখা। প্রতিহিংসা, অন্যায়ভাবে অত্যাচার নির্যাতন করা, খুন-খারাবি করা ইত্যাদি ঘৃণিত ও জঘন্য রীতিনীতিকে কুরআন চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত করে দিয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ বিষয় পূর্বে ইউরোপে বিরাজমান ছিল; বর্তমানেও আছে।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শিক্ষার আলোকে ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা
এ বিষয়ের সূচনালগ্নে রাসূলুল্লাহ এর শিক্ষার কিছু নমূনা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে আরেকটু বিস্তারিত আলোকপাত করা হচ্ছে। সহনশীলতার জন্য আরবী ভাষায় শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সহনশীলতার সংজ্ঞা হল. "উত্তেজনাপূর্ণ আচরণ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মানুষের ধৈর্য্য ধারণ ও সহিষ্ণু হওয়া" চেঁছড়ামীর ভাব প্রকাশ না করা বরং পাহাড়ের মত অটল থাকা। রাসূলুল্লাহ এর বাস্তব আদর্শ স্থাপন করেছেন। আর এ বিষয় শিক্ষাদান করেছেন। আরো ইরশাদ করেছেন, আমার প্রভূ আমাকে নয়টি বিষয় আদেশ দান করেছেন, তন্মধ্যে এক হল وَالْعَدُلُ فِي الرِّضَا وَالغَضَبِ "খুশি ও ক্রোধ উভয় অবস্থায় ইনসাফ করা।" রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, হযরত জিবরাঈল (আ.) আমার নিকট বর্ণনা করেছেন- يَا مُحَمَّدُ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَصِلَ مَنْ قَطَعَكَ وَتُعْطِي مَنْ حَرِمَكَ وَتَغْفِرُ عَمَّنْ ظَلَمَكَ “হে আল্লাহর রাসূল আল্লাহ তা'আলা আপনাকে আদেশ করেছেন, যে আপনার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, আপনি তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করুন। যে আপনাকে বঞ্চিত করে, আপনি তাকে দান করুন। যে আপনার উপর অত্যাচার করে আপনি তাকে ক্ষমা করুন।" সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, ওহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ দান্দান মুবারক শহীদ করে দেওয়া হয়। পবিত্র চেহারা মুবারক রক্তে রঞ্জিত করে দেওয়া হয়। তাতে হযরত সাহাবায়ে কিরাম ভীষণ ব্যথিত ও মর্মাহত হয়ে আরজ করেন, হে আল্লাহর রাসূলুল্লাহ! ঐ বজ্জাত নরখাদকদের জন্য যদি রাসূলুল্লাহ বদ দু'আ করতেন, তাহলে আল্লাহ তদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতেন। রহমতের নবী তার নিবেদিত প্রাণ সাহাবীদেরকে বললেন, হে আমার প্রাণপ্রিয় সাহাবাগণ! আমি অভিশাপ বর্ষণের জন্য প্রেরিত হইনি বরং আল্লাহ তা'আলা আমাকে সত্যের প্রতি আহবানকারী ও আপদ মস্তক রহমতরূপে প্রেরণ করেছেন। এ ইরশাদের পর রাসূলুল্লাহ স্বীয় পবিত্র হাত দু'আর জন্য আল্লাহ তা'আলার দরবারে উত্তোলন করেন, আর ঐ অত্যাচারীদের ধ্বংসের স্থলে নেক দু'আ করেন, হে আল্লাহ্! আমার জাতিকে হিদায়াত দান করুন। (তাদের অপারগতার জন্য আরজ করেন) হে আল্লাহ! তারা আমাকে না চেনার কারণে এ আচরণ করেছে। যদি তারা আমাকে চিনত, তাহলে আমার সাথে কখনোই এরূপ আচরণ করত না। জায়েদ বিন সানা ইয়াহুদী আলেম ছিল। সে রাসূলুল্লাহ এর মাঝে নবুওয়াত সব নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে। কিন্তু ঐ আলামতসমূহ যা পবিত্র কিতাব সমূহে উল্লেখ করা হয়েছে। যথা (১) ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা অজ্ঞতার উপর প্রবল হওয়া। (২) কঠোর অত্যাচার ও নির্যাতন তাঁর ধৈর্য্য সহিষ্ণুতাকে আরো বাড়িয়ে দেবে। যায়েদ নবীজীকে ঋণ দিয়ে তাঁর সাথে রুঢ় আচরণের মাধ্যমে তাঁর সেই মহিমান্বিত ও প্রশংসীত গুণাবলী জানার চেষ্টা করে এবং বেয়াদবী মূলক প্রশ্ন করে বসে। হযরত উমর রাযি, তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, হে উমর! আমি তোমার মুখ থেকে এর বিপরীত কথা শোনার আশাবাদী ছিলাম। তোমার উচিত ছিল আমার পক্ষ থেকে উত্তম রূপে তার পাওনা আদায় করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। আর তাকে আরো উত্তম শিক্ষা দান করা। যাও তার পাওনা তাকে পরিশোধ করে দাও। উপরন্তু তার পাওনার অতিরিক্ত তাকে আরো বিশ সা বেশী দান কর। হযরত উমর রাযি. তাই করেন। জায়িদ বিন সানা রাসূলুল্লাহ এর মহিমান্বিত আখলাখ দেখে অভিভূত হয়ে বলে, হে উমর! আমি রাসূলুল্লাহ এর নবুওয়াতের আলামত সহিষ্ণুতা প্রত্যক্ষ করার উদ্দেশ্যে এরূপ রূঢ় আচরনণ করেছি। فَاشْهَدُكَ أَنِّي رَضِيتُ بِالله رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَيُمَحَمَّدٍ نَبِيًّا এখন আপনি সাক্ষী থাকুন! হে উমর! আপনি সাক্ষী থাকুন। আমি স্বীকার করছি আল্লাহ আমার প্রভূ! ইসলাম আমার দ্বীন, আমার নবী হযরত মুহাম্মাদ।