📄 আরববাসীদের মধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অসহিষ্ণুতা
মুসলমানদের মক্কা ও মদীনাতে শুধু তিন শ্রেণীর লোকদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়েছে। মক্কাতে মুশরিকদের সাথে, আর মদীনাতে ইয়াহুদী ও মুনাফিকদের সাথে। এছাড়া দুটি প্রদেশেই অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের অবস্থান সমান ছিল। সুতরাং মুসলমানদের ঐ তিন শ্রেণীর লোকদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়েছে। আর ঐ তিন দলই মুসলমানদের সাথে অসহিষ্ণুতা ও অসহমর্মীতা পূর্ণ আচরণ করেছে। তারা ইসলাম ব্যতীত সবধর্মই গ্রহণ করেছে। অন্যান্য জাতি ও মিল্লাত যেখানে পরস্পরে একে অপরের সাথে অসহিষ্ণুতার মনভাব প্রকাশ করেছে, ওখানে ইসলামের অনুসারীদের সাথেও সেই অসদাচরণ করেছে। তার সংক্ষিপ্ত নমুনা নিম্নে উল্লেখ করা হচ্ছে। রাসূলুল্লাহ এর নবুওয়াতের সূচনালগ্নে পৃথিবীতে বিরাট বিরাট সভ্য রাজত্ব ছিল। মাইনে ইরানী। কনসটান্টিনোপলে বরজিবী, আর খানাবাইনে চীনারা পৃথিবী তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। মানবীয় চিন্তাধারা মিশরের পিরামিড তৈরী করেছে। তাওরাতের উত্তাপও পৃথিবীতে এসেছিল। আর ইঞ্জিলের নমনীয়তাও ছিল। বেদের জাতপাতও বিদ্যমান ছিল। ইংরেজ ভাগ বণ্টনের উষ্ণতার পরিণতির প্রতিফলনও মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। আর কানপুশের শিক্ষা মোতাবেক একশ' এক পুরুষ পর্যন্ত আত্মীয়তার সম্পর্ক স্মরণ রাখার প্রচেষ্টাও করা হয়েছিল। আর এরিষ্টটলের রাজনীতি ও হিন্দুদের মহাভারতও লিপিবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু পৃথিবীতে তখনও এমন এক ধর্মের ভীষণ প্রয়োজন ছিল, যা পূর্ণাঙ্গ উদারতা ও সহিষ্ণুতার মাধ্যমে বিশ্ব জগতে বসবাস কারী মানুষকে নিজের নিরাপত্তার চাদরে আবৃত করে নিতে সক্ষম হবে। আর এ ছিল ঐ পথপ্রদর্শন, সমস্ত আম্বিয়ায়ে কিরাম যার আগমনের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন।
📄 ইয়াহুদীদের ইসলামকে অসহ্য করা
বড়ই বিস্ময়কর যে, এ ইয়াহুদীরাই এক সময় মানুষকে আখেরী নবী রাসূলুল্লাহ এর আগমনের সুসংবাদ শোনাত। কিন্তু সে কাঙ্খিত শেষ নবী রাসূলুল্লাহ এর তাশরীফ আনার পর এরাই সর্বপ্রথম বিরোধীতা করে এবং ঘোরতর শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। এমন কি চিরস্থায়ী অভিশাপের যোগ্য চিহ্নিত হয়। ডক্টর হামিদুল্লাহ খাঁন ইয়াহুদীদের বিরোধীতার কারণ উল্লেখ করে বলেন, প্রথমতঃ মুসলমানগণ বাইতুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে কা'বাকে কিবলা বানিয়েছে। দ্বিতীয়তঃ বনী কাইনুকার ঘটনার পর ইয়াহুদীরা মুসলমানদেরকে তাদের জন্য মহাবিপদ মনে করতে শুরু করে। এ কারণে তারা মক্কার মুশরিকদের সাথে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কাব বিন আশরাফকে গোপন ষড়যন্ত্রের কারণে হত্যা করে ফেলা হয়। অবশেষে বনী নাযীর গোত্রের ইয়াহুদীদেরকে মদীনা থেকে বহিষ্কার করা হয়। ইয়াহুদীরা সর্বদা ইসলামের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকত। অন্যান্য লোকদেরকেও যুদ্ধের জন্য উৎসাহ দিত। মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করা তাদের অভ্যাসে পরিণতি হয়ে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ এর السَّلَامُ عَلَيْكُمْ (আসসালামু আলাইকুম) এর স্থলে رَاعِنَا (রাইনা (আপনি ধ্বংস হোন) বলত। রা'য়েনা এর স্থলে انْظُرْنَا , অর্থাৎ “আমাদের প্রতি করুনার দৃষ্টি দান করুন” বলার পরিবর্তে “আমাদের রাখাল” বলত। অতঃপর তাদের এ ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণের দায়ে তাদেরকে মদীনা এবং পরবর্তীতে খায়বারের দূর্গসমূহ থেকেও বহিষ্কার করা হয়। ইয়াহুদীরা যে কোন উপায়েই মুসলমানদের সহ্য করতে অপ্রস্তুত ছিল। কারণ, তাদের জ্ঞানের রাজ্য হস্তচ্যুত হয়ে যাওয়া। আরবের মধ্যে রাসূলুল্লাহ এর তাশরীফ আনা, আর মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধিও তাদের অসহ্যের কারণ ছিল। প্রাচ্য বিশারদ আরভিসি বুডলি ইয়াহুদীদের অসহিষ্ণুতাপূর্ণ মনোভাবে পরিণতিকে ইনসাফপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখ করে বলেছে। ইয়াহুদীদের অসহিষ্ণু মনোভাব তাদের এক বিরাট অংশের দ্বিতীয় অভ্যাসে পরিণত হয়ে পড়েছে। যার কারণে তাদের একাধিকবার তাদের আবাসস্থল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সর্বপ্রথম তাদেরকে তাদের আবাসস্থল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তা ছিলো বড় বহিষ্কার। হযরত ঈসা মসীহের ৫৮৬ বছর পূর্বে একবার তারা নিজ আবাসস্থল থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছে। দ্বিতীয়বার ৬৩ খ্রিস্টাব্দে তারপর ৭০ খ্রিস্টাব্দে আর সর্বশেষ ১৩৫ খ্রিস্টাব্দে তাদেরকে তাদের স্বদেশ থেকে বহিস্কার করা হয়। এ ধারাবাহিক বহিস্কারের কারণে ইয়াহুদীরা দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অধিকাংশ ইয়াহুদী জেরুজালেমের আশেপাশের আরব দেশগুলোতে থেকে যায়। তাদের মধ্যে খ্যাতনামা তিন গোত্র বনী কাইনুকা, বনী নাযীর ও বনী কোরাইযা মদীনাতেই থেকে যায়। মদীনার ঐ ইয়াহুদীরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার সাথে সাথে মুসলমানদের ইজ্জত-সম্মান ক্ষুণ্ণ করার প্রতিও অগ্রসর হতে শুরু করে। বনী কাইনুকার এক ব্যক্তি এক মুসলমান যুবতী কন্যাকে উন্মুক্ত বাজারে উলঙ্গ করে চরম হঠকারীতায় মেতে উঠে, উপহাস করে। এ অবস্থা দেখে এক মুসলমান তাকে তাৎক্ষণিকভাবে হত্যা করে এর জবাব দেয়। ইয়াহুদীরা ঐ মুসলমানকে শহীদ করে ফেলে। এ নিয়ে অবশেষে মুসলমানদের সাথে ইয়াহুদীদের ধর্মযুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ইয়াহুদীরা পরাজিত হওয়ার পর তাদের মদীনা থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়।
📄 মুনাফিকদের ইসলামকে অসহ্য করা
চৌধুরী আফযাল হক বলেন, সফলতার সাথে যুদ্ধ থেকে নিস্কৃতি লাভ করা সহজ। পার্থিব সম্পদকে দ্বীনের জন্য উৎসর্গ করা সহজ। কিন্তু মুনাফিকদের সাথে তাল মিলিয়ে চলা, তাদের হাজারো ষড়যন্ত্রের পরও একবারও তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করা রাসূলুল্লাহ এর অভিপ্রায় ছিল। যখন মুসলমানগণ মক্কাতে বাস করেছিল তখন মুনাফিকদের অস্তিত্ব ছিল না। রাসূলুল্লাহ মদীনায় হিজরত করার পর তাদের অস্তিত্ব সামনে আসে। এদের নেতা ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই। মদীনাবাসীরা তাকে সরদার মনোনীত করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে মুকুট পরিয়ে সিংহাসনে আরোহণ করানোর অপেক্ষায় ছিল। ইত্যাবসরে রাসূলুল্লাহ এর মদীনায় তাশরীফ নেওয়ায় মদীনাবাসীরা উবাইয়ের পরিবর্তে রাসূলুল্লাহ কে ঐ আসনে অধিষ্ঠিত করে। এটা উবাইয়ের নিকট অসহনীয় হয়। তাই সে তার চেলা-চামুণ্ডাদের সাথে নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। বনী মুস্তালিকের বিজয়ের পর পঞ্চম হিজরীতে নিজ সম্প্রদায়কে বলল, মদীনাতে পৌছামাত্রই সম্মানীতদের (মদীনাবাসী) অসম্মানীদের (নাউযুবিল্লাহ) অর্থাৎ মুসলমানদের বের করে দেবে। মুসলমানদের বিজয়ে তাদের গাত্রদাহ হয়েছে। বনী নাযীর গোত্রের ইয়াহুদীদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে উৎসাহ দেয়। মুসলমানদেরকে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে ওহুদের যুদ্ধে সংকটময় মুহূর্তে ৩০০জন সঙ্গী-সাথীকে নিয়ে রণে ভংগ দিয়ে মদীনায় চলে আসে। খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে যোগদান না করে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র করার জন্য মসজিদে জিরার তৈরী করে। মুসলমাকনদেরকে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদানে ভয় দেখিয়ে বলে لَا تَنْفِرُوا فِي الْحَرِّ ভীষণ গরমের মৌসুম। যুদ্ধে যোগদান করো না। কুরআন মজিদে এর প্রতিবাদ করে জবাব দেওয়া হয়েছে,- قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرَّا বলুন! জাহান্নামের আগুন তদপেক্ষা অধিক উত্তপ্ত হবে। তোমরা তা থেকে মুক্তি লাভের প্রস্তুতি গ্রহণ করো। মোটকথা, মুনাফিকরা মদীনাতে না এ প্রতিজ্ঞা রেখেছিল, আর না চারিত্রিক কোনও বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখেছিল বরং তারা মুসলমানদের ক্ষতিগ্রস্থ করার জন্য সর্বদা মরিয়া ছিল।
📄 আরবের মুশরিকদের ইসলামকে অসহ্য করা
আল্লাহ তা'আলার আদেশ فَانْذِرُ )উঠুন ভয় দেখান) ইসলাম প্রচারের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। আল্লাহর তাওহীদ প্রচার করার আদেশ দান করুন। বিস্তারিতভাবে এসব কথা অবতীর্ণ হয়। তখন রাসূলুল্লাহ ইসলামের প্রচার শুরু করেন। প্রাচ্যবিশারদ ডবিল লিখেছেন, যারানের পর্বত চূড়ায় তাওহীদের বর্ণনা শোনার পর আবু লাহাব ক্ষোভে-দুঃখে উত্তেজিত হয়ে শুধু রাসূলুল্লাহ কে ইসলাম প্রচারে বাঁধা দেয়নি বরং রাসূলুল্লাহ এর প্রতি পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করা শুরু করে। আর রাসূলুল্লাহ এর উপর অত্যাচারের স্ট্রিমরোলার চালাতে থাকে। এমনকি রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে দিত, কাবা গৃহে নামায আদায়ের সময় পিঠের উপর উটের নাড়ীভুঁড়ি চাপিয়ে দিত। এ সম্পর্কে কোসটান লিখেছেন, এ শাস্তিসমূহ ছিল এক ধরনের মৃত্যু। রাসূলুল্লাহ এর প্রতি ঈমান আনয়ণ কারীদের উপর কঠোর নির্যাতন ও তাদের হত্যা করা ছিল সাধারণ কাজ। তখন প্রাণ রক্ষার্থে মুসলমানদেরকে দু'বার আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে হয়েছে। রাসূলুল্লাহ মক্কাবাসীদের বাদ দিয়ে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তায়েফে গমন করেছেন। সেখানেও তায়েফের কিশোর তরুনদের দ্বারা অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। পাথর নিক্ষেপ সারা দেহ রক্তাক্ত করে তায়েফ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তখন কোনো উপায়ান্তর না দেখে শিয়ায়ে আবু তালেবে অবরুদ্ধ করে পুরোপুরি সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়। অবশেষে রাসূলুল্লাহ হিজরত করতে বাধ্য হন। কিন্তু মক্কার মুশরিকরা তাও সহ্য করতে রাজী হয়নি। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। প্রতারিত করে মুসলমানদের হত্যা করতে শুরু করে। যে সন্ধি চুক্তিই করা হত তার বিপরীত করত। এ অবস্থা মক্কা বিজয় পর্যন্ত চলতে থাকে। (এ সম্পর্কে সামনে আলোচনা করা হবে।)