📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পূর্বে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসহিষ্ণুতার স্বরূপ
রাসূলুল্লাহ এর মহিমান্বিত শিক্ষা অনুশীলন করার পূর্বে এ সম্পর্কে কার্যকরীভাবে পরিসংখ্যান করা উচিত কাজেই ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে বিভিন্ন জাতি ও মিল্লাতের মধ্যে বিদ্যমান অসহিষ্ণুতার সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান পেশ করা হচ্ছে। তাতে বুঝা যাবে, ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে মানুষ কিরকম হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতাপূর্ণ জীবন যাপন করেছে। এমনকি বর্তমানেও তার কার্যকরী রূপ প্রকাশ হচ্ছে।
📄 সৃষ্টি জগতের সর্বপ্রথম অন্যায় খুন অসহিষ্ণুতার প্রতিফল
মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে কারীমের সূরা মায়িদাতে এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। মহান আল্লাহ তা'আলা যখন হাবিলের কুরবানী কবুল করেন তখন কাবিল ভীষণ উত্তেজিত হয়ে হবিলকে খুন করার ধমকি দেয় এবং তা কার্যকরী করে। হাবিল স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, আমি উত্তেজনাপূর্ণ কথা ও কাজের কোন জবাব দেবো না। তারপর মৃত্যুকে কবুল করে নিয়ে পুরুষত্বের সর্বোচ্চ স্তরকে স্বীয় সহিষ্ণুতার মাধ্যমে জীবিত রাখেন। রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত অন্যায়ভাবে যত লোককে খুন করা হবে, তাদের খুনের এক অংশ আদমের পুত্র কাবিলের ঘাড়ে বর্তাবে। সে দুনিয়াতে সর্বপ্রথম অন্যায় খুন চালু করেছে। ইসলামের পূর্বে অসহিষ্ণুতা ও ধর্মীয় মতবাদ গ্রহণে কঠোরতার বিবরণ আল্লামা ফরিদ ওয়াজদি কিছুটা নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণনা করেছেন। "ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করার জন্য নিষ্ঠুরতা এতো বেড়ে গিয়েছিল যে, কোন ব্যক্তি ধর্ম গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে তাকে প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করতে দ্বিধাবোধ হত না। কখনও তাকে ক্ষুধার্থ হিংস্র প্রাণীর সামনে ছুড়ে ফেলা হত। অথবা তার দু'পায়ের গোড়ালী দুই ঘোড়ার পায়ের সাথে বেঁধে দু'দিকে হাকিয়ে দেওয়া হত। তাকে উত্তপ্ত সীসার পাত্রে ঢেলে দেওয়া হত অথবা তাকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের উপর একাধারে কয়েকদিন উপুড় করে ঝুলিয়ে রাখা হত। আর তার করুন আর্তনাদ ও চিৎকারের প্রতি কোন প্রকার ভ্রুক্ষেপ করা হত না। এ অবস্থায় তার দেহ থেকে গোশত টুকরা টুকরা হয়ে ঝরে পড়ত। দেহের চর্বি গলে গলে গড়িয়ে পড়ত। পবিত্র কুরআন মজিদের সূরা বুরূজে এ দিকে ইংগিত করা হয়েছে। নিহত হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে খন্দকের মালিক অর্থাৎ ইন্ধনের অধিকারীগণ।" তাফসীরবিদগণ উক্ত আয়াতের ধারাবাহিকতায় ইসলাম পূর্ব নৃশংসতার করুন চিত্র তুলে ধরেছেন। সত্যানুসারীদের উপর যা করা হত, ঐ সব ঘটনা বিস্তারিতভাবে তাফসীরে রূহুল মাআনী, ফতহুল বারী ও অন্যান্য তাফসীর ও হাদীসগ্রন্থ সমূহে বর্ণনা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ পৃথিবীতে তাশরীফ আনার পূর্বে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও যুদ্ধের ধরন ছিলো চরম হিংসাত্মক ও নির্মম। যুদ্ধের বিশেষ কৌশলই ছিল নিতান্তই ধ্বংসাত্মক ও হিংসাত্মক ছিলো। প্রতিপক্ষ ও অপ্রতিপক্ষ এর মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া সমাজের সর্বস্তরের লোকদের মধ্যে প্রভাব ফেলত। যে কোন লোককে নির্বিচারে হত্যা করা হত। বিশেষ করে মহিলাদেরকে হত্যার কেন্দ্রবিন্দু নির্ধারণ করা হত। যুদ্ধবন্দীদেরকে অকথ্য নির্যাতনের মধ্য দিয়ে হত্যা করা হত। জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন, মৃত দেহ বিকৃত করা, তাদেরা মাথার খুলিকে শরাব পানের কাজে ব্যবহার করা, কোন প্রকার ঘোষণা ছাড়াই অতর্কিত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, প্রতিশ্রুতি ভংগ করা প্রভৃতি ঐ যুগের যুদ্ধের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল।
📄 নরড্যান ব্যারগের অভিমত
১৮৭১ খ্রিস্টাব্দের পূর্ববর্তী সময় ইউরোপের মধ্যাঞ্চলের দেশ সমূহ লাগাতার যুদ্ধের কারণে প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।
📄 হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে জাতীয় আন্তর্জাতিক অসহিষ্ণুতার মনোভাব
ভারতবর্ষে আর্য ও অনার্য্যদের যুদ্ধ হয়েছে। আর্য্যরা স্বভাবগতভাবে অনার্য্যদের নিম্নজাত ও অশূচী মনে করত। বেদ-পুরানের মন্ত্র দ্বারা প্রমাণ হয়েছে যে, আর্য্যদের অন্তরে দুশমনদের প্রতি কঠোর নির্যাতন করার প্রচেষ্টা সচল ছিলো। জীবিত ব্যক্তির চামড়া খুলে ফেলা হত। এমনকি তার দেহের রগ কেটে ফেলা, আগুনে নিক্ষেপ করা, দেহ বিকৃত করে দেওয়া, হিংস্র প্রাণীর সামনে ফেলে দেওয়া, জীবিত অবস্থায় পশুর চামড়া মধ্যে ঢুকিয়ে সেলাই করে দেওয়া, তার পরিবার পরিজনকে ন্যাস্তনাবুদ করা সহ নানা ভাবে প্রতিপক্ষ লোকদের এ নিষ্ঠুর শান্তি দেওয়ার প্রচলন ছিল। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মগ্রন্থ অসহিষ্ণুতা ও হত্যা নির্যাতন, লুণ্ঠন ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ। জুজুর বেদে লিখিত আছে, হে অগ্নি! নির্মম, নিষ্ঠুর নির্যাতনের যুদ্ধে গনিমতের মাল নিয়ে এসো। হে অগ্নি। আমাদের বিরোধীদের পরাজিত করে দাও। আমাতের শত্রুদের তাড়িয়ে দাও। হে অর্জুন! দেবতাদের অমান্যকারী শত্রুদের ধ্বংস করে দাও। তাদের পূজারীদেরকে ইজ্জত ও সম্মানের অধিকারী করে দাও। রিগবেদে লিখিত আছে, সকল শ্রেণীর মন্দ লোকদের হত্যা করে ফেল। আর যারা গোপনে আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে চায়, তাদেরকে ধ্বংস করে দাও। দুশমন তাদের শক্তিবলে ভ্রান্ত ধ্যান-ধারনায় সজীব হচ্ছে। তাদের সমূলে ধ্বংস করে দাও। হে মনু। (ক্রোধের দেবতা) আমাদের বিরুদ্ধবাদীদের উপর জয়যুক্ত হয়ে যাও। তাদের মস্তক চূর্ণ করে দাও। তাদের ধ্বংস করে দাও। দুশমনদের নির্মূল করে দাও। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আন্তর্জাতিক অসহিষ্ণুতার সাথে সাথে স্বজাতির অসহিষ্ণুতার আলোচনা করলে আরো মারাত্মক করুন চিত্র ভেসে উঠবে। ব্রাম্মন ব্যতীত বাকী সকল হিন্দুধর্মাবলম্বী অচ্যুত অস্পর্শা, তারা ইজ্জত সম্মানের অযোগ্য ইত্যাদি কথা ধর্মশাস্ত্রে লিখিত আছে। এ পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার সবই ব্রাম্মনের জন্য। কেননা তারা সৃষ্টি জীবের মধ্যে ইজ্জত ও সম্মানের পাত্র। সুতরাং পৃথিবীর সব জিনিস তাদেরই হয়ে গেল। যদি ব্রাহ্মণ কোন নীচু জাত বা অচ্যুত (মুসলসমান, শিখ, বৌদ্ধ বরং পৃথিবীর সব মানুষ) কে হত্যা করে ফেলে, তাহলে এর জন্য তাকে কোন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। একমাত্র এ কারণে হিন্দু ধর্মাবলম্বীগণ তাদের স্বজাতি স্বমতবাদে বিশ্বাসীদের সাথে অসহিষ্ণুতার পন্থা অবলম্বন করেছে। নিম্নে এর একটিমাত্র উদাহরণ উল্লেখ করা হচ্ছে। পণ্ডিত দয়ান্দ তার রচিত "সতীর্থ প্রকাশ" নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছে, স্বামী শংকর আচার্য্য দীর্ঘ দশ বছর সব আর্য্য এলাকা ভ্রমণ করে জৈনদের ধর্মমত খণ্ডন করে বৈদিক ধর্মের মুণ্ডপাত করে দেন। শংকর আচার্য্যের যুগের জৈনদের প্রতিমাগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়। স্বয়ং জৈনরা নিজেদের প্রতিমাসমূহ রক্ষাকল্পে তা জমিনে পুঁতে ফেলে। যা এখনো প্রত্নতত্ত্ব খননে মানুষের সমানে আসছে।