📄 সহিষ্ণুতার শক্তি পয়দা করার পদ্ধতি
ইসলাম বিধানাবলী শিক্ষা দান করে এর দর্শনও মাসায়ালা বর্ণনা করার সাথে এর সমাধানও বলে দিয়েছে। যাতে এর উপর আমল করা সহজ হয়। মুসনাদে আহমদে বর্ণিত এক হাদীসে বলা হয়েছে, أَذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْكُنْ যখন রাগান্বিত হবে তখন নীরবতা অবলম্বন করবে। কারণ, এমতাবস্থায় মুখ দিয়ে অজান্তেই ভ্রান্ত কথা বের হয়ে যেতে পারে। অথচ তা আরো বেশী ক্ষতির কারণ হতে পারে। সুনানে আবু দাউদের এক বর্ণনায় আছে, اذا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسُ যখন ক্রোধ-উত্তেজনা আসবে, এর দ্বিতীয় প্রতিষেধক হল, যদি দাঁড়ানো থাকো তাহলে বসে যাবে আর যদি বসা থাক, তাহলে শুয়ে যাবে। এভাবে সহিষ্ণুতার শক্তি পয়দা করার প্রতিষেধক বলে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ দৈহিক অবস্থার পরিবর্তনের কারণে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমূহের উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে যায় এবং ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে আসে। রাসূলুল্লাহ এর মাঝে এ মহিমান্বিত গুণাবলী পূর্ণাঙ্গরূপে বিদ্যমান ছিল, যার কারণে তিনি বিশ্ববাসীর সামনে বিশ্বজনীন আমলী আদর্শ নমুনা পেশ করেছেন, বিশেষজ্ঞগণ এটাকে অকপটে স্বীকার করেছে।
📄 বিশেষজ্ঞদের অঙ্গীকার
এনসাইক্লোপিডিয়া অফ বৃটানিকার বর্ণনা হল, রাসূলুল্লাহ এর মহিমান্বিত ও প্রশংসিত সীরাতে সবচেয়ে উল্লেখ্যযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বয়কর প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা হল, বিরাট বিরাট বিজয় গৌরব অর্জন করা সত্ত্বেও তার মাঝে মহানুববতা ও মানবতা বিকাশে কোন প্রকার ঘাটতি দেখা দেয়নি বরং তা দিনদিন বৃদ্ধি লাভ করেছে। এমনকি তিনি কখনো নিজের প্রাণের শত্রু থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। খ্রিস্টান জগত যে মহান সত্ত্বা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী ঘৃণা প্রকাশ করেছে এবং অন্ধকারের শাহযাদা উপাদিতে ভূষিত করেছে (নাউযুবিল্লাহ)। মূলতঃ সেই মহান সত্ত্বাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী সম্মান ও শ্রদ্ধাযোগ্য। খ্যাতনামা দার্শনিক অধ্যাপক ফ্যাংগের অভিমত হল, যদি পৃথিবীতে ইসলামের আবির্ভাব না হত, তাহলে সম্ভবতঃ পৃথিবী দীর্ঘদিন মানবতা, সভ্যতার আলোকে উদ্ভাসিত হত না। এটা বাস্তব সত্য যে, আজ পৃথিবীতে সাম্য, পারস্পরিক জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিযোগিতা আর বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠির সাথে সহমর্মিতার যে আন্দোলন চলছে, তার সবই ইসলাম থেকে ধার করে নেওয়া হয়েছে। ইসলাম পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে রাষ্ট্র ও সরকারের কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন সাধন করেছে। পৃথিবীর সামাজিক অবস্থায় যুগান্তকারী বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। ইসলাম এমন এক যুগান্তকারী পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, যা শুধু মুসলমানদের জন্যই নয় বরং সারা বিশ্ববাসীর জন্য কল্যাণকর প্রমাণ হয়েছে। এটা এমন এক আদর্শ যার নমুনা শুধু আমাদের জন্য নয় বরং যে কোন ইনসাফপ্রিয় মানুষ এর সামনে স্বেচ্ছায় মস্তক অবনত করতে বাধ্য।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পূর্বে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসহিষ্ণুতার স্বরূপ
রাসূলুল্লাহ এর মহিমান্বিত শিক্ষা অনুশীলন করার পূর্বে এ সম্পর্কে কার্যকরীভাবে পরিসংখ্যান করা উচিত কাজেই ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে বিভিন্ন জাতি ও মিল্লাতের মধ্যে বিদ্যমান অসহিষ্ণুতার সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান পেশ করা হচ্ছে। তাতে বুঝা যাবে, ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে মানুষ কিরকম হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতাপূর্ণ জীবন যাপন করেছে। এমনকি বর্তমানেও তার কার্যকরী রূপ প্রকাশ হচ্ছে।
📄 সৃষ্টি জগতের সর্বপ্রথম অন্যায় খুন অসহিষ্ণুতার প্রতিফল
মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে কারীমের সূরা মায়িদাতে এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। মহান আল্লাহ তা'আলা যখন হাবিলের কুরবানী কবুল করেন তখন কাবিল ভীষণ উত্তেজিত হয়ে হবিলকে খুন করার ধমকি দেয় এবং তা কার্যকরী করে। হাবিল স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, আমি উত্তেজনাপূর্ণ কথা ও কাজের কোন জবাব দেবো না। তারপর মৃত্যুকে কবুল করে নিয়ে পুরুষত্বের সর্বোচ্চ স্তরকে স্বীয় সহিষ্ণুতার মাধ্যমে জীবিত রাখেন। রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত অন্যায়ভাবে যত লোককে খুন করা হবে, তাদের খুনের এক অংশ আদমের পুত্র কাবিলের ঘাড়ে বর্তাবে। সে দুনিয়াতে সর্বপ্রথম অন্যায় খুন চালু করেছে। ইসলামের পূর্বে অসহিষ্ণুতা ও ধর্মীয় মতবাদ গ্রহণে কঠোরতার বিবরণ আল্লামা ফরিদ ওয়াজদি কিছুটা নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণনা করেছেন। "ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করার জন্য নিষ্ঠুরতা এতো বেড়ে গিয়েছিল যে, কোন ব্যক্তি ধর্ম গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে তাকে প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করতে দ্বিধাবোধ হত না। কখনও তাকে ক্ষুধার্থ হিংস্র প্রাণীর সামনে ছুড়ে ফেলা হত। অথবা তার দু'পায়ের গোড়ালী দুই ঘোড়ার পায়ের সাথে বেঁধে দু'দিকে হাকিয়ে দেওয়া হত। তাকে উত্তপ্ত সীসার পাত্রে ঢেলে দেওয়া হত অথবা তাকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের উপর একাধারে কয়েকদিন উপুড় করে ঝুলিয়ে রাখা হত। আর তার করুন আর্তনাদ ও চিৎকারের প্রতি কোন প্রকার ভ্রুক্ষেপ করা হত না। এ অবস্থায় তার দেহ থেকে গোশত টুকরা টুকরা হয়ে ঝরে পড়ত। দেহের চর্বি গলে গলে গড়িয়ে পড়ত। পবিত্র কুরআন মজিদের সূরা বুরূজে এ দিকে ইংগিত করা হয়েছে। নিহত হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে খন্দকের মালিক অর্থাৎ ইন্ধনের অধিকারীগণ।" তাফসীরবিদগণ উক্ত আয়াতের ধারাবাহিকতায় ইসলাম পূর্ব নৃশংসতার করুন চিত্র তুলে ধরেছেন। সত্যানুসারীদের উপর যা করা হত, ঐ সব ঘটনা বিস্তারিতভাবে তাফসীরে রূহুল মাআনী, ফতহুল বারী ও অন্যান্য তাফসীর ও হাদীসগ্রন্থ সমূহে বর্ণনা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ পৃথিবীতে তাশরীফ আনার পূর্বে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও যুদ্ধের ধরন ছিলো চরম হিংসাত্মক ও নির্মম। যুদ্ধের বিশেষ কৌশলই ছিল নিতান্তই ধ্বংসাত্মক ও হিংসাত্মক ছিলো। প্রতিপক্ষ ও অপ্রতিপক্ষ এর মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া সমাজের সর্বস্তরের লোকদের মধ্যে প্রভাব ফেলত। যে কোন লোককে নির্বিচারে হত্যা করা হত। বিশেষ করে মহিলাদেরকে হত্যার কেন্দ্রবিন্দু নির্ধারণ করা হত। যুদ্ধবন্দীদেরকে অকথ্য নির্যাতনের মধ্য দিয়ে হত্যা করা হত। জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন, মৃত দেহ বিকৃত করা, তাদেরা মাথার খুলিকে শরাব পানের কাজে ব্যবহার করা, কোন প্রকার ঘোষণা ছাড়াই অতর্কিত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, প্রতিশ্রুতি ভংগ করা প্রভৃতি ঐ যুগের যুদ্ধের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল।