📄 নাস্তা
আধুনিক সভ্যতার দাবীদার আমেরিকা ও ইউরোপে পর্যন্ত নাশতা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। অথচ দিন ভর সবচেয়ে বেশী উপাদেয় খাবার হল নাশতা। অভিজ্ঞ খাদ্য বিশেষজ্ঞগণ নাশতাকে বেশী গুরুত্ব দেন। তাদের মতে নাশতার প্রতি উদাসীনতা কাজকর্মে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। শারীরিক সুস্থতার বিঘ্ন ঘটায়। কারখানার শ্রমিকদের নাশতা না করা বা অসমাপ্ত নাশতা করার কারণে স্বাভাবিকভাবে বেশী ক্ষতির কারণ হয়। এমনকি বিনোদনমূলক খেলায়ও এরূপ ব্যক্তির কোন মনোযোগ থাকে না। যারা ভালোভাবে নাশতা করে না।
সম্প্রতি আমেরিকার মেডিক্যাল এসোসিয়েশন ও খাদ্য বিভাগ পঞ্চাশ হাজার ছাত্রের উপর পরীক্ষা চালিয়েছে। উক্ত পরীক্ষায় প্রমাণ হয়েছে, শতকরা ৬৫ ভাগ লোকের দৈহিক আকৃতির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তারা অনেক কম নাশতা করেছে। তন্মধ্যে আট হাজার তো কখনো নাশতাই করে না। একবার শিল্প কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানা গেছে, অর্ধেক শ্রমিকের অবস্থা এরূপ যে, তারা সকালে কাজে আসার পূর্বে কখনো নাশতা করে না। মোটকথা যেসব লোক কঠোর মেহনত ও পরিশ্রমের কাজ করে, তারা যদি নাশতা না করে, তাহলে এটা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
আমেরিকার সৈন্যবাহিনীর কার্যপরিদর্শক সমরাস্ত্র কারখানা সমূহে এক হাজার সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করেছিল। তাদের পরীক্ষায় প্রমাণ হয়েছে, যে সব শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তারা নাস্তা করা ব্যতীত কাজ করতে আসত। পরিণামে তাদের মধ্যে হতাশা উদাসীনতা দেখা দিত এবং তারা সমস্যার সম্মুখীন হত।
জন হ্যাকামপনস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার এ,বি, ম্যাক মানবদেহে খাদ্যের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তার অভিমত হল, চাপা ক্ষুধা ভীষণ ক্ষতিকর। এমনকি তা প্রাণ নাশের কারণ হয়। ফ্যাডার্ক তদ্রুপ সুন্ডরন "ক্রিস্টেন হ্যারলিড" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আমি প্রথম খাসা ভারী নাশতা করতাম, কিন্তু পরে আমি ধীরে ধীরে কম নাশতা করতে শুরু করি। অবশেষে এক সময় আমার নাশতা শুধু ছোট একটা টোষ্ট ও এক কাপ কপিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে সকাল নয় ঘটিকা পর্যন্ত আমি খুশি থাকতাম।
কিন্তু নাস্তার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার পর দেখেছি, বেলা যতই বাড়তে থাকত, আমি ততই দুর্বল ও অক্ষমতা অনুভব করতাম। এগারোটা বাজতে বাজতে আমার মন বিষণ্ণ হয়ে যেত। এমন কি তখন আমি চলা ফেরা করতেও ভীষণ কষ্ট হত। দ্বি-প্রহর আসতে আসতে আমার মেজাজ খিটখিটে যেত। আর তখন আমার ক্ষুধা অনুভূত হত। কিন্তু দ্বি-প্রহরের খাবার বেশী হালকা হওয়ার কারণে আমার ঘুম এসে যেত। একঘণ্টা না ঘুমিয়ে আমি কারো সাথে কথাও বলতে পারতাম না।
আমার মনে হল, আমার জটিল কোন রোগ হয়েছে। সুতরাং আমি চিকিৎসকের নিকট গমন করি। ব্যাপক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর আমার দেহে বিশেষ কোন সমস্যা ধরা পড়েনি। চিকিৎসক আমাকে প্রশ্ন করেন, নাশতায় কি খান? আমি নাশতার অবস্থা বর্ণনা করি। এবার চিকিৎসক আমাকে বললেন, এ হচ্ছে তোমার ব্যাধি। চাপা ক্ষুধা তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে। আমি নিজের উন্মুক্ত হওয়া পেটের প্রতি ইশারা করি। চিকিৎসক আমাকে বললেন, নিশ্চয় তোমার পেট বের হয়ে আছে। কিন্তু এর যথার্থতা হল, তুমি সঠিক পদ্ধতিতে খাবার খাচ্ছ না। বস্তুতঃ অধিকাংশ লোকের অবস্থা হচ্ছে, তারা তাড়াতাড়ি সামান্য পরিমাণ নাশতা করে নেয়।
অনুরূপ তাড়াতাড়ি দ্বি-প্রহরের খাবার খায়। আর মনে করে, এগারো ঘণ্টা পর্যন্ত কঠোর মানসিক ও দৈহিক পরিশ্রমের জন্য এ খাদ্যই যথেষ্ট। পরে তারা সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাড়ী এসে খুব পরিতৃপ্তির সাথে রাতের খাবার খায়। তাদের ঐ খাবারে যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য উপকরণ থাকে। অথচ তা নাশতা ও দ্বি-প্রহরের খাবারে বিদ্যমান থাকা উচিত ছিল। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় অকাট্য ভাবে প্রমাণ হয়েছে যে, রাতের খাবার আমাদের দেহের কর্মশক্তিতে পরিবর্তন করে না বরং দেহের চর্বিতে পরিবর্তন ঘটায়।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আমি নাশতায় ফল, সব্জি, ডিম, টোষ্ট ও কপি পরিতৃপ্তির সাথে খেতে শুরু করি এবং খুব ধীরে ধীরে বাড়াতে শুরু করি। বারবার ঘড়ি দেখতাম না। তাতে ভীষণ উপকৃত হতে শুরু করি। সকালে আমার মধ্যে যে দুর্বলতা ও বিমূর্ষতা পরিলক্ষিত হত, তা ক্রমেই দূর হতে শুরু করে। মানসিক রুক্ষতাও দূর হতে শুরু করে। অনুরূপভাবে দ্বি-প্রহরের খাবারেও পরিবর্তন এনেছি। এর অতি উত্তম প্রতিক্রিয় সন্ধ্যা পর্যন্ত বহাল থাকত। ঐ দিন থেকে সর্বদা সকালের নাশতা আমার গুরুত্বপূর্ণ খাবারে পরিণত হয়।
সুন্তরীনের কথা থেকে আমাদের প্রত্যেকের উপদেশ গ্রহণ করা উচিত। নাস্তার গুণাবলী পরীক্ষার উদ্দ্যেশ্যে আইউদা বিশ্ব বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীগণ বর্তমানে বিভিন্ন বয়সের স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে অত্যাধুনিক প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করেছেন। তাদের মধ্যে একদলের কর্মক্ষতা, মস্তিস্কের কার্যকারীতা ও দুর্বলতার আকর্ষণকে সঠিকভাবে মূল্যায়ণ করেছেন। প্রথম দু'সপ্তাহ পর্যন্ত স্বেচ্ছাসেবকদেরকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভারী নাশতা দেওয়া হয়। পরবর্তীদের পুরো সপ্তাহে বিন্দুমাত্র নাশতা দেওয়া হয়নি। তারপর কিছুদিন পর্যন্ত শুধু এক কাপ কপি দেওয়া হয়। এরপর কয়েকদিন পর্যন্ত সামান্য পরিমাণ নাশতা করতে দেওয়া হয়। এ গবেষণায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রমাণ হয়েছে। এতে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত পরিমাণ ভারী নাশতার বিপরীতে অপর্যাপ্ত ও হালকা নাস্তায় উক্ত শক্তি ও কর্মক্ষমতা বেকার ও অস্থির হওয়ার রূপ সুস্পষ্ট। অপর্যাপ্ত নাস্তায় সার্বিক কার্যক্ষমতা মস্তিষ্কের কার্যকারীতা অনেক কমে যায়। পিঠে জোর কম্পন শুরু হয়। যা শারীরিক দুর্বলতার সুষ্পষ্ট নিদর্শন। এ কারণে কারখানায় বেশী দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়।
ঐ দু'সপ্তাহে যখন কোন নাশতা দেওয়া হয়নি, তখন সার্বিক কাজকর্মে ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতায় স্বাভাবিক যেরূপ হওয়া উচিত ছিল, তা থেকে অর্ধেক কমে যায়। আর পিঠের কম্পন মারাত্মক আকার ধারন করে।
এ সব গবেষণা ও অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষার উপর ভিত্তি করে খাদ্য বিজ্ঞানীগণ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, প্রত্যেক ব্যক্তির দৈনিক খাবারের প্রয়োজনীয়তার এক-চতুর্থাংশ ও এক তৃতীয়াংশ নাশতায় পূর্ণ করা উচিত। আর তাতে খাদ্য উপাদানের প্রয়োজনীয় উপকরণাদি বিদ্যমান থাকতে হবে।
আমেরিকার গবেষণা কাউন্সিল এর খাদ্য বিভাগের খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞগণ অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাতে তারা বিভিন্ন বয়সের ও বিভিন্ন পেশার লোকদের জন্য মৌলিক খাদ্যের এক তালিকা প্রস্তুত করেন। ঐ খাদ্য বোর্ড এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, যারা বসে বসে কাজ করে, তাদের জন্য কমপক্ষে যে নাশতার প্রয়োজন হয়, তাতে ফল বা ফলের রস জীবনী শক্তি বর্ধক সব্জি, চিনি দুধের মালাই, টোষ্ট, মাখন ও পানির জাতীয় দ্রব্য যথা দুধ বা কোকো থাকতে হবে। তের থেকে বিশ বছরের যে সব বালক বেশী শক্তি ব্যয় করে, আর যাদের দ্বারা লালিত পালিত হয়, তাদের দেহে রাসায়নিকের প্রয়োজন বেশী। ঐ সব বস্তুর সাথে নাশতায় গোশত ও ডিমের বেশী প্রয়োজন। এতদুভয় বস্তু দৈহিক পরিশ্রমিদের জন্য নাশ্তায় বেশী প্রয়োজন।
উপরোল্লেখিত যেসব বস্তুকে নাস্তার জন্য নির্ণয় করা হয়েছে, তন্মধ্যে প্রত্যেক বস্তু কোন না কোন প্রয়োজন পূর্ণ করে। ফল বা ফলের রসে ভিটামিন সি থাকে। এটা আমাদের দেহের জন্য ভীষণ প্রয়োজন। তা আমাদের দেহের মেকানিকজমকে রাতের বিশ্রামের পর পুনরায় কর্মোজ্জীবিত করে। এ ভিটামিন শিশুর দৈহিক গঠনের জন্য অতিব প্রয়োজন। তাছাড়া আমাদের দেহের গ্রন্থিসমূহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। অনুরূপভাবে সব্জির মধ্যে সুস্থতার বিভিন্ন উপকরণ রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হল, ভিটামিন বি-কম্পেক্স। থায়ামিন রাইনোপ্লোমিন ও পনিয়্যাসিন আর ভিটামিনের সাথে সংশ্লিষ্ট উপকরণের ঘাটতি বিরক্তি ভাব, দুর্বলতা, কর্মঅক্ষমতা, ক্ষুধা মন্দা নিদ্রাহীনতা দেখা দেয়। শক্ত শস্য বা শস্যের রুটিতে প্রোটিন বা মাংসের গুণাগুণ বেশী থাকে। তাতে দৈহিক শক্তি বৃদ্ধি হয় এবং ফসফরাস ও লৌহ পাওয়া যায়। এটা মানুষের হাড়ের জোড়ার গঠন ও জীর্ণতা দূর করার কাজে সহায়তা করে। আর ভিটামিন এ চামড়াকে মসৃন রাখা এবং স্থিতিশীলতা রক্ষার কাজে সহায়তা করে। এ সবের মধ্যে নাশতায় কোনো একটির ঘাটতি পূরণ করা ব্যতীত বেশী পরিমাণে খাবার গ্রহণেও তা পূরণ হয় না।
অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, অধিকাংশ মহিলাদের ধারণামতে কম নাশতা করা বা একেবারে নাস্তা না করায় দৈহিক ওজন কমানোর উত্তম পদ্ধতি। আর তা চেহারার লাবণ্যতাও বৃদ্ধি লাভ করে। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত বলে প্রমাণ হয়েছে। অপর্যাপ্ত নাশতা অপর্যাপ্ত ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের ঘাটতির কারণে রক্ত শূন্যতা বা এমোনিয়া দেখা দিতে পারে। তাতে রক্ত দূষিত হয়ে যেতে পারে। আর চামড়া ফ্যাকাশে ও মলিন হয়ে যেতে পারে। তাতে দেহে বিভিন্ন প্রকার খোঁস-পাঁচড়া দেখা দিতে পারে। আর চোখের নিচে ভাঁজ পড়তে পারে। দুধের এক উল্লেখযোগ্য খাদ্য উপাদান হল ক্যালসিয়াম। তাতে দেহের হাড় শক্তিশালী হয় এবং হাড়ের জীর্ণতা দূরীভূত হয়। দুধ ব্যতিরেকে দেহের হাড়ের গঠনে ঘাটতি থাকে। আর তা অপূর্ণাঙ্গ থেকে যায়। খাদ্য বিশেষজ্ঞদের সবসম্ম মত হচ্ছে, যুবকদের জন্য দৈনিক দেড় পোয়া আর শিশুদের জন্য তিন ছটাক দুধের প্রয়োজন। ডবল রুটি ও মাখন যে কোনভাবে হোক থাকতে হবে। টোষ্ট, চাপাতি বেশী প্রোটিন বা গোশতের উপকরণ সমৃদ্ধ খাদ্য। চর্বি কর্বোহাইড্রেডের ঘাটতি পূরণ করে। তাতে ক্যালোরিজ বা তাপ বৃদ্ধি পায়। যা আমরা ভারী কাজে ব্যয় করি।
📄 দৈহিক প্রশান্তি ও খাদ্য নিরাপত্তা
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, দৈহিক প্রশান্তি ও সারা দিনের খাদ্যের নিশ্চয়তা লাভ করেছে, সে যেন নিজের জন্য সারা দুনিয়া একত্রিত করে ফেলেছে। (ইবনে কায়েম)