📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 আপনার মস্তকে দৌড়ের কোনো প্রতিক্রিয়া হয় কি?

📄 আপনার মস্তকে দৌড়ের কোনো প্রতিক্রিয়া হয় কি?


বক্ষ্যমাণ গ্রন্থরচনার ধারাবহিকতায় আমাকে একাধারে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করতে হয়েছে। এ বিষয় গবেষণায় সবধরণের দৌড়ে পারদর্শিদের সাথে আলাপ আলোচনা করতে হয়েছে। তাদের অধিকাংশই দৌড়ানোর উপকারীতা স্বীকার করে বলেছেন, তারা এ দৌড়াদৌড়ির ব্যায়াম করে মানসিক উপকারীতাও পেয়েছেন। তাছাড়া চেতনা বোধ, ইচ্ছাশক্তি, চরম ক্লান্তি-অবসন্নতায় কর্মোদ্দিপনা, কষ্ট সহিষ্ণতা প্রভৃতি এমন বিষয়, যা একটি মানুষের জীবনে বিরাট প্রভাব ফেলে। আর উক্ত ব্যায়াম এসব ক্ষেত্রও যোগ্যতা উজ্জলতর করে তোলে।

দি নিউইয়র্কের তরুন সম্পাদক তানসী গ্রীস্টনের কথাই ধরুন। তিনি সপ্তাহে চার-পাঁচবার ছয় মাইল দৌড়ান। তার অভিমত হল, দৌড় আমাকে নিজ জীবন নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি জাগিয়েছে। আমার আত্মবিশ্বাস জন্মেছে যে, আমি পরনির্ভর না হয়ে নিজের জন্য কিছু করছি। আমি নিশ্চিত জানি, এ দৌড় শুরু করা ভীষণ কষ্টকর। কিন্তু দৌড় শেষে আমি যে প্রশান্তি ও খুশি অনূভব করি, তা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যই কঠিন। এলিন রিজ বিশ বছরের এক যুবক। অনেক দিন থেকে সে এজমা আক্রান্ত। তারপরও সে দৌড়াতে শুরু করে। অবশ্য সে দাবী করছে না যে, দৌড়ানোর কারণে তার এজমা দূর হয়ে গেছে। কিন্তু এতে এজমার ব্যথা সহ্য করার যোগ্য হয়ে গেছে।

ডিড ক্যারবিট ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক দৌড় প্রতিযোগীতায় আমেরিকান টিম অংশ নিয়ে ছিল। দু'বছরের মধ্যে তাদের একজন দীর্ঘ দৌড়ে আমেরিকান চেম্পিয়ন হয়ে যায়। তার অভিমত হল, দৌড়ানোর ফলে অংগ-প্রত্যংগের দুর্বলতা দূর হয়ে যায়। এ হল, আপনার জন্য কুদরতী চিকিৎসা। ফলে শুধু আপনার অভ্যন্তরে নয় বরং আপনার ব্যক্তি সত্ত্বাও আত্মসম্মানবোধ বেড়ে যাবে। স্বয়ং আপনিও প্রশান্তি অনুভব করবেন। বিভিন্ন পেশার লোকদের সাথে আলাপ আলোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে যে, যখনই দৌড়ানোর সময় হয়, তখনই সে নিজের মধ্যে আনন্দ-অনূভতি জাগ্রত হতে দেখে। দৌড় অস্থিরতা, হজমের দুর্বলতা ও অনেক প্রকার বদবস্থার শক্তিশালী প্রতিষেধক।

ব্রোকলিনের (নিউইয়র্ক) এক দৌড়বিদ মনটডেভি আমাকে বলেছেন, দীর্ঘ কঠোর দৌড় মানুষের-হজমের দুর্বলতা দূর করে দেয়। এছাড়াও দৌড় ও পেরেশানী একে অপরের প্রতিদ্বন্ধী। দীর্ঘ দৌড়ের পর সকল প্রকার পেরেশানী ও দুশ্চিন্তা খতম হয়ে যায়। ওসকুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রেণের ডাক্তার জন গ্র্যাট্স সীমাতিরিক্ত বদহজমের ব্যাধিগ্রস্থ একদল লোককে দু'ভাগে ভাগ করেন। একদলকে দশ সপ্তাহ দৌড়ানোর ব্যবস্থা পত্র দেন। অপরদলকে দেন প্রচলিত ব্যবস্থা পত্র। তাতে দৌড়ানো বহুগুণ বেশী কার্যকর প্রমাণিত হয়।

ক্যালিফোর্নিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ সাডরুনের মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার হার্বাট এবং একই বিশ্বাবদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর স্বীকার করেন যে, দৌড়ের কারণে মানুষের দুঃশ্চিন্তা ও অস্থিরতা দূর হয়ে যায়। তিনি পরীক্ষার উদ্দেশ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার অবসরপ্রাপ্ত চাকুরী জীবীদের এলাকায় ল্যাচরোলিড থেকে সেচ্ছাসেবক মনোনিত করেন। তাদের সকলের বয়স ৫৩ বছর থেকে ৭০ বছর ছিল। আর তাদের প্রত্যেকেরই প্রেসার, অনিদ্রা, অস্থিরতা, স্থায়ী পেরেশানী ছিল। এমনকি নিত্যনৈমিত্তিক সাধারণ ঘটনাবলীতে ভীতি ও হতাশা পরিলক্ষিত হত। এসব রোগীদেরকে বিপুল পরিমানে ব্যয়বহুল আরাম দায়ক ৪০০ মিলিগ্রাস খাইয়ে পরীক্ষা করা হয়। তারপর পনের মিনিট পর্যন্ত হালকা ব্যায়াম করানোর পর প্রমাণ হয় যে, দৈহিক দুর্বলতা রোধ করানোর জন্য আরাম দায়ক ঔষধ থেকে ঐ ব্যায়ামও বেশী কার্যকরী। জোসেফ প্যাপরীর অভিমত হল, যখন কোন নগন্য পরিশ্রমের জন্য সর্বোচ্চ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়, তখন মানুষ এ সম্পর্কে কুধারনার শিকার হয়ে যায়। দৌড়ের কিছু ব্যাপার এমনই। অথচ তাতে বিশেষ কষ্ট ও পরিশ্রম করতে হয়।

মনে করুন, আপনি এক মাইল দৌড়ে অভ্যস্ত। কিন্তু একদিন দুই মাইল দৌড়ালেন। তখন এক মাইল পর্যন্ত অনায়াসে দৌড়াতে সক্ষম হবেন। কিন্তু দ্বিতীয় মাইল অতিক্রম করার পর আপনি ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়বেন। আপনার গ্রন্থিগুলো ব্যথা শুরু করবে। আরো বেশী দৌড়াতে শুরু করলে অবস্থা আরো বেশী খারাপ হয়ে যাবে। এরূপ হওয়া সত্ত্বেও আপনি সকল প্রকার দুখ-কষ্ট ও ব্যথা-বেদনা হাসি মুখে সহ্য করে নিলেন। কিন্তু আমার মনে হয় দুঃখ কষ্ট ও হাসি-খুশি এক সূত্রে গ্রথিত। কারণ, দুঃখ ভোগ করার পর খুশি লাভ হয়। ওয়াসিংটনের ডাক্তার শিউক্যালের লেখা এক চিঠি আমার নিকট আছে। তখন তার ছিল বয়স পঞ্চাশের কোটায়। তাতে তিনি লিখেছেন, আমি সাত বছর থেকে দৌড়ানোর অভ্যাস করেছি। এর পূর্বে আমি আমার স্বাস্থ্য সম্পর্কে চিন্তিত ছিলাম। প্রায়ই মজলিশে বসে বসে আমার হৃদকম্পন বহুগুণ বেড়ে যেত। কিন্তু এখন আমি সর্বদা হাসি-খুশি ও প্রফুল্ল থাকি। একসাথে দুই ফালং পথ পায়ে হেঁটে আমার কর্মস্থলে পৌছে যাই। আমার রোগ-ব্যাধিও আমাকে নবউদ্যমে কাজ করতে দেখে খুশি হয়।

তার সাক্ষাতকারীদেরকে ভীষণ আগ্রহে বলতে থাকে। মিষ্টার লীর মত অন্যান্য দৌড়বিদরাও দৌড়াতে অভ্যস্ত নয় এমন লোকদের চেয়ে বেশী শক্তি রাখে। আর তাদের নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশী। অভিজ্ঞতায় এ কথা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। নিউইয়র্কের ডাক্তার এলব্যাট এস চলর্ডন একসুন ফিজিক্যাল ফিটনেস ল্যাবরেটরিতে ছয় মাসের ব্যায়ামের এক প্রোগ্রাম করেন। প্রোগ্রাম সমাপ্তির পর প্রায় সকলেই অভিমত প্রকাশ করে যে, এতে তাদের কর্মপ্রেরণা অনেক বেশী বৃদ্ধি লাভ করেছে। উল্লেখযোগ্য লোকের অভিমত হল, সারাদিন কাজ করার পরও পূর্বের তুলনায় তাদের অনেক কম দুর্বলতা অনুভূত হয়। স্বয়ং আমার নিজের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, যখন আমি দৌড়ানো শুরু করি নি, তখন দ্বি-প্রহরের খাবার খাওয়ার সাথে সাথে আমার তন্দ্রা এসে যেত। প্রায় দু'ঘন্টা এ ভাবে কেটে যেত। আর এখন আমি সারাদিন উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে কাজ করি এবং রাতে আরামের সাথে ঘুমিয়ে পড়ি।

আরো বড় দৌড়বিদ এ্যাডডোরেটের বলেন, দশ বছর পূর্বে আমি যখন দৌড়ানো শুরু করি, তখন আমি ভীষণ লজ্জিত ও চিন্তিত হয়ে পড়তাম। কিন্তু দৌড় আমার সে দুর্বলতা বিদূরীত করে, আমার মধ্যে আত্মনির্ভর শীলতা বাড়িয়েছে। ফলে যেসব কাজ সম্পর্কে তখন চিন্তা ভাবনা করাও আমার জন্য অসম্ভব হত, এখন সে সব কাজ অনায়াসে ভালোভাবে সমাধান করে ফেলি।

সন্দেহাতীত ভাবে বলা যায় যে, দৌড় ব্রেণের সতেজতা বৃদ্ধি করে। ব্রেণের কর্মক্ষমতাকে উজ্জীবিত করে দেয়। কিন্তু আপনি জানেন কি, কেন এই অবস্থা হয়? দৌড়ানোর কারণে মস্তিষ্ক খাদ্য গ্রহণের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অক্সিজেন সংগ্রহ করে। যার কারণে এর যন্ত্রপাতি উত্তমরূপে কাজ করতে শুরু করে। তাছাড়া দেহ ও মস্তিষ্কের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং দৌড়ানোর করণে যেমন দেহ উপকৃত হয়, তেমনি মস্তিষ্কও উপকৃত হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00