📄 দৌড় ও আধুনিক বিজ্ঞান
চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্রীড়াবিদদের আধুনিক অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে নভেম্বর মাসের এক মনোরম সকালের কথা বলছি। আমি তখন বোষ্টনের উত্তরে এক ঝিলের কিনারায় দৌড়াচ্ছিলাম। আমার সামনে জনৈক বৃদ্ধ ব্যক্তি ছড়ির সাহায্যে ধীরে ধীরে চল্লিশ কদম হাটছিল। তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি তাকে সুপ্রভাত বললাম।
তিনি শান্ত ভাবে জবাব দিলেন। তারপর একটি প্রশ্ন অস্বাভাবিক ভাবে তার মনে দাগ কাটে।
"জনাব! আপনি দৌড়ানের মাধ্যমে কি রকম উপকৃত হয়েছেন?"
"আনন্দ ও প্রশান্তি লাভ করি!" আমি দৌড়াতে দৌড়াতে বললাম। আমার জবাব সঠিক হলেও অসমাপ্ত ছিল। বর্তমানে অধিকাংশ আমেরিকানদের দৈহিক আকৃতি বিগড়ে গেছে। চামড়া আছে তো ঢিলাঢালা হয়ে গেছে। উদর বেড়ে গেছে। পায়ের গোছা অনেক হালকা হয়ে গেছে। বাহু দুর্বল ও চেহারা বিমর্ষ হয়ে গেছে। এর প্রধান কারণ অতিরিক্ত ধুমপান ও মাদকাশক্তি। ক্যালিফোর্নিয়ার জনৈক প্যাথলজিষ্ট থমাস জি হিলারের অভিমত হল, প্রতি তিনজনের মধ্যে দু'জনেরই অকাল মৃত্যু ঘটে। স্থুলদেহীর হৃদপিণ্ড ধূমপানকারীদের প্লীহা ও মাদকাসক্তদের কলিজা এর কারণ হয়।
এলিনিউস বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস করটিনের মতে আমেরিকার তরুণরা মাঝারি গড়নের হয়ে থাকে। তারা এক ব্লক থেকে অপর ব্লকে পালাতে হলেও পারে না। কয়েক সিড়ি অতিক্রম করার পর তাদের নিঃশ্বাস বেড়ে যায়। বিশ বছর বয়সে তাদেরকে দৈহিক দিক থেকে চল্লিশ বছর বয়স্ক দেখা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর খেলাধূলায় অংশ গ্রহণের উৎসাহ অনেক বাড়তে শুরু করে। কিন্তু দূর্ভাগ্যের ব্যপার হল, জনসংখ্যার অতি অল্প সংখ্যক লোক কার্যতঃ এ কাজে অংশগ্রহণ করে। অবশিষ্ট লোক শুধু তামাশা দেখতে থাকে। আমেরিকার জনসংখ্যার অধিকাংশ এ পরিমাণ ব্যায়ামও করে না যে, যাতে দেহ সবল ও সুস্থ্য থাকে। সেখানকার পাঁচকোটি যুবক কোন প্রকার ব্যায়ামই করে না। বড়দের কথা কি বলব, শিশুদের চেহারা পর্যন্ত বিগড়ে গেছে। মিসাসুটাসের এক স্কুলের পঞ্চম গ্রেডের ৫২ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুধু আটজন ছাত্রের দৈহিক উচ্চতা পাওয়া যায়।
দৈনন্দিন জীবনে উপযুক্ত পরিবর্তন সাধনের এক সহজ পদ্ধতি হল, দৌড়। দৌড় অতি উত্তম এক ব্যয়াম। রাশিয়ার এক কারখানার কথাই ধরুন। শ্রমিকরা যখন থেকে দৌড়াতে শুরু করে, তখন থেকে অসুস্থতার কারণে গৃহীত বার্ষিক ছুটির পরিমাণ ৪৩৬ ঘণ্টা কমে ৪২ ঘণ্টায় এসে দাঁড়ায়। অভিজ্ঞতায় প্রমাণ হয়েছে যে, দৌড়াদৌড়ি ও খেলাধুলা যে কোন ব্যক্তির জন্য কার্যতঃ কল্যাণকর হয়। ম্যাসিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল ফর পারমানিস ল্যাবরেটরি চিকিৎসক শরডল ইলকুস রিচার্ড লিস্প ও ডিউড প্যাসকার্ডের অভিমত হল, অতিরিক্ত মোটা লোক শুধু তিন সপ্তাহ ব্যায়ামের দ্বারা নিজের দৈহিক অবস্থা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।
পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা লাভের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্রকাশ্য আন্তরিক প্রশান্তি অনুভব করা, যাতে করে দৌড়ে উন্নতি লাভ করা যায়। যদিও অন্যান্য ব্যায়াম দ্বারা শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। যথা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা, নৌকা বাইচ প্রতিযোগীতা ইত্যাদি। কিন্তু দৌড়ানো এমন এক ব্যায়াম, যার জন্য না কোন সাজ সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়, আর না কোন অর্থের প্রয়োজন হয়। তাছাড়া এটা যে কোন সময় যে কোন স্থানে করা যায়। এটা ফুট পাতে, সড়কে, পার্কে ও জমীনে বরং তা নিউইয়র্ক, লণ্ডন, শহরের মত বিখ্যাত বাজারসমূহে দৌড় প্রতিযোগীতা করা যায়। এর জন্য নির্দিষ্ট কোন সময়েরও প্রয়োজন নেই। সকালে হোক বা বিকালে হোক বা মাঝ রাতেই হোক, যে কোন সময় সমীচিন মনে করেন, এ ব্যায়াম করতে পারেন। মেলবোর্নের খ্যাতনামা দৌড়বিদ এমন্টিগার স্যাটিন আমাকে বলেছেন, দৈহিক সুস্থতাকে খুশি হবার আর কিছুই নেই। অতি প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠা আর কাজে যাবার প্রস্তুতি গ্রহণ করা, এই সবই হলো দৌড়ানোর পরিণতি।
নিউ জার্সীর এক খ্যাতনামা বক্ষব্যাধি চিকিৎসক জর্জ এশিহোনের মতে দৌড়ানো এক পূর্ণাঙ্গ শারিরিক ব্যায়াম। এর কারণে রান ও গ্রন্থীর পেশীসমূহ সক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম হয়। এটা অন্তরের শির সমূহ, আত্মা ও প্লীহার ক্রিয়াকর্মকেও প্রতিবিধানের এক উত্তম মাধ্যম।
রোজষ্টার ইস্কুল অফ মেডিসিনের চিকিৎসক রবার্ট জুনিজোর মতে পনেরটি অভ্যাস আছে, যা পিত্ত ব্যথার কারণ হয়। উচ্চরক্ত চাপ, ইংরেজী উত্তেজনা, ওজন, উদ্ভট ভাঁড়ামী, ব্লাড সুগার, ডায়ারিয়া, গ্যালমারাইন্ডি, প্যাাইরো নিউলাইসির, ধূমপান, খাদ্যাবাস, ইলেক্ট্রোকার্ডিগ্রাম রির্ডনগজন, রির্ডক বইমডিন, রিইবিপিল, গেলাকুজ, লোগরলিসি তাওয়রিদ, কোস্তইখোরিজ প্রভৃতি, এই পনর অভ্যাসের মধ্যে তাওয়ারিছ ব্যতীত বাকীসব অভ্যাস জীবন যাপনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যদিও ধুমপান ও খাদ্যাভ্যাস দৌড়ানোর মাধ্যমে সরাসরি পরিবর্তন করা যায় না, তথাপি কেউ যদি দৌড়ানোকে অভ্যাসে পরিণত করে, তাহলে আশাকরা যায় সে ধুমপান ছেড়ে দেবে এবং খাদ্যাভাসেও মধ্যম অবস্থা বহাল রাখাবে। সুতরাং দৌড়ানোর অভ্যাস হৃদপিণ্ডকে অনাকাঙ্খিত মারাত্মক ব্যাধি থেকে নিরাপদ করে দেবে। দৌড় দেহের মধে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে যদিও তা নাটকীয় হয় না, অবশ্য তা শানদার হয়। টেকসাসের ফিজিসিয়ান ওলিম ফার্নাও আমাকে বলেছেন, যখন তিনি দৌড়ানো শুরু করেন, তখন তার হৃদপিণ্ডের ব্যাথা দূর হয়ে যায়।
ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাথোলোজিষ্ট রোতনের অভিমত হল, রীতিমত দৌড়ানোর অভ্যাস করার কারণে শ্বাসনালীর বাইরের নালীতে অনেক কম চোট লাগে।
📄 দৌড়ের উপকারীতা
এটা দীর্ঘ দিনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরিক্ষার প্রতিফলন। দৌড়ে অভ্যস্ত ব্যক্তি ষাট-সত্তর বছর বয়সেও অতি সহজে চলা ফেরা করতে পারে। সে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারে। আর অনেক সময় তাদেরকে বেশী হাসি-খুশি ও আমোদ-ফূর্তি করতে দেখা যায়। বরং ত্রিশ বছর বয়সের কম লোক তাতে লজ্জিত হয়। দৌড়বিদ পুরুষ নারী উভয়ের কাজকর্মে অতি সুন্দর ও মনোরম প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হয়। এটা কোন বিষ্ময়কর ব্যাপার নয় যে, সুস্বাস্থ্য সব অনুভূতি ও অংগপ্রত্যংগে প্রতিফলিত হবে। এটা কোন বিষ্ময়কর ব্যাপার নয় যে, সুস্বাস্থ্য সব অনুভূতি ও অংগপ্রত্যংগে প্রতিফলিত হবে। এটা পর্যন্ত এই কাজের কোন সাক্ষ্য পাওয়া যায়নি যে, দৌড়নোর কারণে হায়াত দীর্ঘ হয়। ভবিষ্যতে হয়ত বা এর সমাধান পাওয়া যেতে পারে। সেকথা ভিন্ন। এ পর্যন্ত যা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে, তাতে প্রমাণ হয়েছে যে, অলস ও দুর্বল ইঁদুরের মুকাবিলায় চালাক, ধূর্ত ও দৌড়াদৌড়িতে লিপ্ত ইঁদুর শতকরা পঁচিশ বছর বেশী জীবিত থাকে।
দৌড় শুধু পায়ের নালার মাংস পেশী ও ফুসফুস যন্ত্র নয় বরং পূরো অংগকে শক্তিশালী করে তোলে। আপনি যখন রীতিমত দৌড়াতে থাকবেন, তখন আপনি দেহে নমনীয়তা, সবলতা শক্তি ও প্রশান্তি অনুভব করতে থাকবেন। আর তখন এরূপ অদৃশ্য শক্তির অধিকারী হয়ে যাবেন, তা সম্ভবতঃ অন্য কোনভাবে লাভ করতে পারেন না। তাছাড়া কয়েক মাইল দৌড়ানের কারণে ছোট ছোট অনেক ব্যাধি যেমন, মাথা ব্যথা, হজমের দুর্বলতা, ক্ষুধা মন্দা প্রভৃতির অভিযোগ এমনিতেই দূর হয়ে যাবে। একবার আমার জনৈক বন্ধু আমাকে অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে অভিযোগ করেছিল। তখন আমি তাকে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিলাম। কিন্তু সে আমাকে জবাব দিল যে, দৌড় হল আমার চিকিৎসা।
দৌড় দেহের যেসব বিষয়ের খবরদারি করে তার তালিকা অতি দীর্ঘ। আর কালাহমা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গ্রাজুয়েট ছাত্র ম্যাকলির্ডন মস্তকের ব্যথার শিকার হয়। এতদসত্ত্বেও সে দীর্ঘ দৌড় প্রতিযোগিতায় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান লাভ করে।
সিডনিকোট বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ প্যারডি দৌড়বিদের অভিমত হল, দৌড় আভ্যন্তরীন ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। দৌড়ে পারদর্শি ব্যক্তি ধুমপান করে না, যদিও এর কারণ পূরোপুরি জানা যায় নি। তথপি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, যে ব্যক্তি দৌড়ানোর ব্যায়ামে অভ্যস্ত হয়, সে নিজ থেকে ধুমপান ছেড়ে দেয়।
বসন্তকালের এক সকালের কথা, ভোরের মৃদু সমীরণ বৃক্ষের শুকনা পাতা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আপনি পাহাড়ী বাসস্থান থেকে বের হয়ে পার্ক অতিক্রম করে সড়কের দিকে যাচ্ছেন। পথটি উপকূলে পৌছার স্থান পর্যন্ত পৌঁছেছে। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আপনার মন-মেযাজ খুত খুত মৃদু স্বল্পগতি সম্পন্ন ছিল। কিন্তু কয়েক মিনিট পথচলার পর পা ও রানে প্রফুল্লতা ও সজীবতার ঢেউ অনুভব করতে শুরু করেন। আপনার চলার গতিও এখন এমনিতে সবল হয়ে গেছে। চকোর, খরগোশ, কঠবিড়ালী আপনার পদাঘাতের শব্দ শোনার সাথে সাথে এদিক সেদিক পালাতে শুরু করে। আধা কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পর আপনি ফুলের এক বাগিচায় গিয়ে পৌঁছান। তার নরম কচি ঘাসের বিছানায় দৌড়ে উপকূলে গিয়ে পৌঁছান। কিছুক্ষণ পর এমন হয়ে আপনি ঘরে ফিরে আসবেন, যেন আপনার দেহের দূষিত বর্জ্য পদার্থগুলো দেহ থেকে বেরিয়ে ঘাসের সাথে মিশে গেছে। শিরা-উপশিরাগুলো সতেজ নির্মল হাওয়ায় পরিপূর্ণ। নিজেকে অতি প্রফুল্ল হালকা এবং মনে প্রশান্তি অনুভব করছেন। এটা হল দৌড়ের প্রাথমিক উপকারীতা।
📄 আপনার মস্তকে দৌড়ের কোনো প্রতিক্রিয়া হয় কি?
বক্ষ্যমাণ গ্রন্থরচনার ধারাবহিকতায় আমাকে একাধারে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করতে হয়েছে। এ বিষয় গবেষণায় সবধরণের দৌড়ে পারদর্শিদের সাথে আলাপ আলোচনা করতে হয়েছে। তাদের অধিকাংশই দৌড়ানোর উপকারীতা স্বীকার করে বলেছেন, তারা এ দৌড়াদৌড়ির ব্যায়াম করে মানসিক উপকারীতাও পেয়েছেন। তাছাড়া চেতনা বোধ, ইচ্ছাশক্তি, চরম ক্লান্তি-অবসন্নতায় কর্মোদ্দিপনা, কষ্ট সহিষ্ণতা প্রভৃতি এমন বিষয়, যা একটি মানুষের জীবনে বিরাট প্রভাব ফেলে। আর উক্ত ব্যায়াম এসব ক্ষেত্রও যোগ্যতা উজ্জলতর করে তোলে।
দি নিউইয়র্কের তরুন সম্পাদক তানসী গ্রীস্টনের কথাই ধরুন। তিনি সপ্তাহে চার-পাঁচবার ছয় মাইল দৌড়ান। তার অভিমত হল, দৌড় আমাকে নিজ জীবন নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি জাগিয়েছে। আমার আত্মবিশ্বাস জন্মেছে যে, আমি পরনির্ভর না হয়ে নিজের জন্য কিছু করছি। আমি নিশ্চিত জানি, এ দৌড় শুরু করা ভীষণ কষ্টকর। কিন্তু দৌড় শেষে আমি যে প্রশান্তি ও খুশি অনূভব করি, তা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যই কঠিন। এলিন রিজ বিশ বছরের এক যুবক। অনেক দিন থেকে সে এজমা আক্রান্ত। তারপরও সে দৌড়াতে শুরু করে। অবশ্য সে দাবী করছে না যে, দৌড়ানোর কারণে তার এজমা দূর হয়ে গেছে। কিন্তু এতে এজমার ব্যথা সহ্য করার যোগ্য হয়ে গেছে।
ডিড ক্যারবিট ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক দৌড় প্রতিযোগীতায় আমেরিকান টিম অংশ নিয়ে ছিল। দু'বছরের মধ্যে তাদের একজন দীর্ঘ দৌড়ে আমেরিকান চেম্পিয়ন হয়ে যায়। তার অভিমত হল, দৌড়ানোর ফলে অংগ-প্রত্যংগের দুর্বলতা দূর হয়ে যায়। এ হল, আপনার জন্য কুদরতী চিকিৎসা। ফলে শুধু আপনার অভ্যন্তরে নয় বরং আপনার ব্যক্তি সত্ত্বাও আত্মসম্মানবোধ বেড়ে যাবে। স্বয়ং আপনিও প্রশান্তি অনুভব করবেন। বিভিন্ন পেশার লোকদের সাথে আলাপ আলোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে যে, যখনই দৌড়ানোর সময় হয়, তখনই সে নিজের মধ্যে আনন্দ-অনূভতি জাগ্রত হতে দেখে। দৌড় অস্থিরতা, হজমের দুর্বলতা ও অনেক প্রকার বদবস্থার শক্তিশালী প্রতিষেধক।
ব্রোকলিনের (নিউইয়র্ক) এক দৌড়বিদ মনটডেভি আমাকে বলেছেন, দীর্ঘ কঠোর দৌড় মানুষের-হজমের দুর্বলতা দূর করে দেয়। এছাড়াও দৌড় ও পেরেশানী একে অপরের প্রতিদ্বন্ধী। দীর্ঘ দৌড়ের পর সকল প্রকার পেরেশানী ও দুশ্চিন্তা খতম হয়ে যায়। ওসকুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রেণের ডাক্তার জন গ্র্যাট্স সীমাতিরিক্ত বদহজমের ব্যাধিগ্রস্থ একদল লোককে দু'ভাগে ভাগ করেন। একদলকে দশ সপ্তাহ দৌড়ানোর ব্যবস্থা পত্র দেন। অপরদলকে দেন প্রচলিত ব্যবস্থা পত্র। তাতে দৌড়ানো বহুগুণ বেশী কার্যকর প্রমাণিত হয়।
ক্যালিফোর্নিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ সাডরুনের মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার হার্বাট এবং একই বিশ্বাবদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর স্বীকার করেন যে, দৌড়ের কারণে মানুষের দুঃশ্চিন্তা ও অস্থিরতা দূর হয়ে যায়। তিনি পরীক্ষার উদ্দেশ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার অবসরপ্রাপ্ত চাকুরী জীবীদের এলাকায় ল্যাচরোলিড থেকে সেচ্ছাসেবক মনোনিত করেন। তাদের সকলের বয়স ৫৩ বছর থেকে ৭০ বছর ছিল। আর তাদের প্রত্যেকেরই প্রেসার, অনিদ্রা, অস্থিরতা, স্থায়ী পেরেশানী ছিল। এমনকি নিত্যনৈমিত্তিক সাধারণ ঘটনাবলীতে ভীতি ও হতাশা পরিলক্ষিত হত। এসব রোগীদেরকে বিপুল পরিমানে ব্যয়বহুল আরাম দায়ক ৪০০ মিলিগ্রাস খাইয়ে পরীক্ষা করা হয়। তারপর পনের মিনিট পর্যন্ত হালকা ব্যায়াম করানোর পর প্রমাণ হয় যে, দৈহিক দুর্বলতা রোধ করানোর জন্য আরাম দায়ক ঔষধ থেকে ঐ ব্যায়ামও বেশী কার্যকরী। জোসেফ প্যাপরীর অভিমত হল, যখন কোন নগন্য পরিশ্রমের জন্য সর্বোচ্চ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়, তখন মানুষ এ সম্পর্কে কুধারনার শিকার হয়ে যায়। দৌড়ের কিছু ব্যাপার এমনই। অথচ তাতে বিশেষ কষ্ট ও পরিশ্রম করতে হয়।
মনে করুন, আপনি এক মাইল দৌড়ে অভ্যস্ত। কিন্তু একদিন দুই মাইল দৌড়ালেন। তখন এক মাইল পর্যন্ত অনায়াসে দৌড়াতে সক্ষম হবেন। কিন্তু দ্বিতীয় মাইল অতিক্রম করার পর আপনি ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়বেন। আপনার গ্রন্থিগুলো ব্যথা শুরু করবে। আরো বেশী দৌড়াতে শুরু করলে অবস্থা আরো বেশী খারাপ হয়ে যাবে। এরূপ হওয়া সত্ত্বেও আপনি সকল প্রকার দুখ-কষ্ট ও ব্যথা-বেদনা হাসি মুখে সহ্য করে নিলেন। কিন্তু আমার মনে হয় দুঃখ কষ্ট ও হাসি-খুশি এক সূত্রে গ্রথিত। কারণ, দুঃখ ভোগ করার পর খুশি লাভ হয়। ওয়াসিংটনের ডাক্তার শিউক্যালের লেখা এক চিঠি আমার নিকট আছে। তখন তার ছিল বয়স পঞ্চাশের কোটায়। তাতে তিনি লিখেছেন, আমি সাত বছর থেকে দৌড়ানোর অভ্যাস করেছি। এর পূর্বে আমি আমার স্বাস্থ্য সম্পর্কে চিন্তিত ছিলাম। প্রায়ই মজলিশে বসে বসে আমার হৃদকম্পন বহুগুণ বেড়ে যেত। কিন্তু এখন আমি সর্বদা হাসি-খুশি ও প্রফুল্ল থাকি। একসাথে দুই ফালং পথ পায়ে হেঁটে আমার কর্মস্থলে পৌছে যাই। আমার রোগ-ব্যাধিও আমাকে নবউদ্যমে কাজ করতে দেখে খুশি হয়।
তার সাক্ষাতকারীদেরকে ভীষণ আগ্রহে বলতে থাকে। মিষ্টার লীর মত অন্যান্য দৌড়বিদরাও দৌড়াতে অভ্যস্ত নয় এমন লোকদের চেয়ে বেশী শক্তি রাখে। আর তাদের নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশী। অভিজ্ঞতায় এ কথা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। নিউইয়র্কের ডাক্তার এলব্যাট এস চলর্ডন একসুন ফিজিক্যাল ফিটনেস ল্যাবরেটরিতে ছয় মাসের ব্যায়ামের এক প্রোগ্রাম করেন। প্রোগ্রাম সমাপ্তির পর প্রায় সকলেই অভিমত প্রকাশ করে যে, এতে তাদের কর্মপ্রেরণা অনেক বেশী বৃদ্ধি লাভ করেছে। উল্লেখযোগ্য লোকের অভিমত হল, সারাদিন কাজ করার পরও পূর্বের তুলনায় তাদের অনেক কম দুর্বলতা অনুভূত হয়। স্বয়ং আমার নিজের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, যখন আমি দৌড়ানো শুরু করি নি, তখন দ্বি-প্রহরের খাবার খাওয়ার সাথে সাথে আমার তন্দ্রা এসে যেত। প্রায় দু'ঘন্টা এ ভাবে কেটে যেত। আর এখন আমি সারাদিন উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে কাজ করি এবং রাতে আরামের সাথে ঘুমিয়ে পড়ি।
আরো বড় দৌড়বিদ এ্যাডডোরেটের বলেন, দশ বছর পূর্বে আমি যখন দৌড়ানো শুরু করি, তখন আমি ভীষণ লজ্জিত ও চিন্তিত হয়ে পড়তাম। কিন্তু দৌড় আমার সে দুর্বলতা বিদূরীত করে, আমার মধ্যে আত্মনির্ভর শীলতা বাড়িয়েছে। ফলে যেসব কাজ সম্পর্কে তখন চিন্তা ভাবনা করাও আমার জন্য অসম্ভব হত, এখন সে সব কাজ অনায়াসে ভালোভাবে সমাধান করে ফেলি।
সন্দেহাতীত ভাবে বলা যায় যে, দৌড় ব্রেণের সতেজতা বৃদ্ধি করে। ব্রেণের কর্মক্ষমতাকে উজ্জীবিত করে দেয়। কিন্তু আপনি জানেন কি, কেন এই অবস্থা হয়? দৌড়ানোর কারণে মস্তিষ্ক খাদ্য গ্রহণের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অক্সিজেন সংগ্রহ করে। যার কারণে এর যন্ত্রপাতি উত্তমরূপে কাজ করতে শুরু করে। তাছাড়া দেহ ও মস্তিষ্কের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং দৌড়ানোর করণে যেমন দেহ উপকৃত হয়, তেমনি মস্তিষ্কও উপকৃত হয়।