📄 ব্যথা আল্লাহর নেয়ামত (PAIN A BLESSING OF THE CREATER)
কয়েক বছর আগের কথা। নিউইয়র্কের কেন্দ্রীয় হাসপাতালে এক যুবক ভর্তি হয় এবং কর্তব্যরত ডাক্তারের নিকটে গিয়ে বলে- জনাব! আমার বয়স বাইশ বছর। কিন্তু আমি ব্যথার কারণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। এক সপ্তাহ পূর্বে সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে আমার হাতে ম্যাচের কাঠি জ্বলে ওঠে। পুরো হাতে ফোসকা পড়ে যায়। কিন্তু কোন কষ্ট অনুভব করি নি। মনে হয় যেন আংগুলের উপর মাছি হাঁটছে। বাইশ বছরে আমার কোন কষ্ট পোহাতে হয় নি। আমার কখনো মাথা ব্যথাও হয় নি। শরীরের কোথাও কোন ফোঁড়া ওঠেনি। আমার কয়েকটি জখম হয়েছে। বেশ কয়েকবার আঘাত লেগেছে। বিষাক্ত বিচ্ছুও কামড়িয়েছে। কিন্তু ব্যথা কিংবা কষ্টের অনুভূতি হয়নি।
আপনারা হয়ত মনে মনে এ যুগের ব্যাপারে ইর্ষা বোধ করছেন এবং এ বর্ণনা শোনার পরে আপনাদের মুখে অনিচ্ছায় এসে গেছে- আহা! আমরাও যদি কষ্টের অনুভূতি থেকে মুক্তি পেতাম। কিন্তু থামুন। যে ব্যক্তিকে আপনারা একজন ভাগ্যবান মানুষ মনে করেছেন, সে এ পৃথিবীর সবচেয়ে হতভাগা মানুষ। তার শরীরে বিভিন্ন ধরনের অসুখ হতে থাকে। কিন্তু সে তা টেরও পেলো না। তার দাঁতে কখনো ব্যথা হয়নি। এজন্য দাঁত নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু সে জানে, যখন টের পেলো তখন তিনটি দাঁত অকেজো হয়ে গেছে। ডাক্তার তা তুলে ফেলার পরামর্শ দেয়। তার চোখেও কখনও অসুখ হয় নি। কিন্তু একবার যখন এক ক্লিনিকে গেল, তখন ধরা পড়ে, সে গত তিন বছর ধরে চক্ষুরোগে আক্রান্ত। ফলে তার বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতি ছয় মাস পরে এ যুবক শরীরের চেকআপ করায়। কেননা সে জানে না, কোন রোগ মুহূর্তেই তাকে শেষ করে দেবে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থাদি সত্ত্বেও সর্বদা তার এপেন্ডিসাইটিসের আক্রমণের ভয় লেগে থাকে। এখন আপনারা নিশ্চয়ই জানতে পেরেছেন, অসুখ বিহীন জীবন ঠিক তেমনই, যেমন সামুদ্রিক জাহাজ সফরে রওয়ানা হল। কিন্তু তাতে আগুন সম্পর্কে সতর্ক করার সিগন্যাল লাগানো হল না। হতে পারে জাহাজ গন্তব্য পৌছবে। কিন্তু ইতোপূর্বে নিচের অংশে প্রজ্বলিত আগুন হঠাৎ দাউ দাউ করে উঠবে। আর তখন তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। ব্যথাও এমনি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে বিপদ সংকেত। যা প্রথমেই মানুষকে কোন বিরাট বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দেয় এবং সে তখন তার প্রতিকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
ব্যথা বিশেষ এক ইন্দ্রিয়। মানব চামড়ার মধ্যে লাখ লাখ সংখ্যার ব্যথার জায়গা রয়েছে। এগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও জটিল শিরাতন্ত্র সম্বলিত। যা শুধু অণুবিক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা যায়। যদি আপনার পায়ে আঘাত লাগে, তাহলে ব্যথার জায়গাগুলো শিহরিত হয়ে এক বিশেষ ধরনের বিদ্যুৎ তরঙ্গ সৃষ্টি করে। যাতে পায়ের সেই সব গ্রন্থিগুলো শিহরিত হয়ে উঠে, সেগুলো ব্যথার সংবাদ পৌঁছানোর জন্য নির্ধারিত। এভাবে তরঙ্গমালা মেরুদণ্ডের হাড্ডিতে পৌঁছে যায়। মেরুদণ্ডের হাড্ডি থেকে এটি মস্তিষ্কের নিচের শূন্য অংশে পৌঁছে যায়। আর তখন আপনি ব্যথার দাহ অনুভব করেন। এটি যদি এখানেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে আপনি অনুমান করতে পারবেন না, আঘাত কোথায় লেগেছিল। মামুলি ধরনের ব্যথা অবশ্যই অনুভব হবে।
এসপিরিন, মরফিন ইত্যাদি ব্যথার তরঙ্গকে মস্তিষ্কের সেলে যে বাঁধার সৃষ্টি করে, তার ফলে বেশী কষ্ট অনুভব হয় না। এ সেলের উপরে এক ইঞ্চির ব্যবধানে আরো একটি সেল আছে। এটি সরাসরি ব্যথা ও আবেগের সাথে জড়িত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় এটিকে থালমূস বলা হয়। বিদ্যুৎ তরঙ্গ এখানে পৌঁছলে অনুভব হয় যে, আঘাত পায়ে লেগেছে। অবশ্য ব্যথার অনুভূতি পরিপূর্ণ রূপে পাওয়া যায় তখন, যখন ঐ তরঙ্গ-মালা থালমূস থেকে একদেড় ইঞ্চি উপরে মস্তিষ্কের সবচেয়ে উঁচু অংশে গিয়ে পৌঁছে।
মস্তিষ্কের এ শেষ অংশকে কর্টেক্স বলা হয়। এখানে কোটি কোটি সংখ্যক সেল রয়েছে। এসব সেলই আঘাতের সময়ে ব্যথার অনুভূতি সৃষ্টি করে। আজ থেকে কয়েক বছর পূর্বে টেক্সাসের এক মহিলা আশ্চর্য ধরনের শিরার ব্যথায় আক্রান্ত হয়। তার মুখমণ্ডলে প্রচণ্ড রকমের ব্যথা অনুভূত হয়। ফলে সে অস্থির হয়ে পড়ে। ব্যাথা এতই প্রচণ্ড ছিল যে, বাতাসের মামুলি ঝাপটায়ও সে লাফিয়ে উঠত। ডাক্তার এ রোগের চিকিৎসায় অপারগ হয়ে যায়। তিনি অদ্ভুত ধরনের এ ব্যাথা সারাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত কর্টেক্সের কিছু তন্ত্র অপারেশন করে কেটে ফেলে দেওয়া হয়। তাতে বিস্ময়কর ফল পাওয়া যায়। মহিলা বলল- মুখমণ্ডলের ব্যথা এখনও রয়েছে। আরও জানা যায়, ব্যথার অনুভূতির সাথে কর্টেক্সের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণ অবস্থায় ব্যথার পরিমাণ নির্ভর করে তার সিগন্যাল মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছানোর সময়ের ওপর। পায়ের আঙ্গুলে আঘাত লাগলে প্রথমে প্রচন্ড ব্যাথা দ্রুত বেগে মস্তিষ্কের দিকে ধাবিত হয়। ফলে মুহূর্তের মধ্যে কষ্টের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। কিন্তু পরে তার গতি হ্রাস পেয়ে ঘন্টায় দু তিন মাইল হয়ে যায়। ব্যথা তখন যন্ত্রণায় পরিণত হয়। তরঙ্গের গতি যদি আরো কমে যায়, তাহলে ব্যথার জায়গায় চুলকানি ও সুড়সুড়ি হতে থাকে।
অধিকাংশ সময় দেখা যায়, মারাত্মক আঘাত বা জখম হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ব্যথা অনুভব হয় না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, বন্দুকের গুলি বিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে প্রথমে ব্যথা অনুভব হয় না। চপেটাঘাতের ফলে সাময়িকভাবে ব্যথার অনুভূতি নিষ্ক্রিয় করে দেয়। আর এই তরঙ্গ মস্তক পর্যন্ত পৌছতে পারে না। ক্লোরফরম ও অন্যান্য নেশা জাতীয় ঔষধও এই কাজ করে। দেহের উপরের অংশে অর্থাৎ মাথার নিকট আঘাত লেগে গেলে তাহলে দেহের নিচের অংশ জখমের তুলনায় বেশী কষ্ট হয়। কারণ, দেহের উপরের অংশে ব্যথার কোষ সবচেয়ে বেশী পাওয়া যায়। চোখের মনি মানব দেহের সবচেয়ে বেশী মূল্যবান অংশ। তা অতি সূক্ষ্ম পর্দায় আবৃত হয় ও চোখের আলোকে ভিতরে চেপে রাখে। এই অংশ অতি অধিক সংখ্যক নাজুক নিরাপত্তা মূলক নিয়ম শৃংখলা দ্বারা আবেষ্টন করে রাখা হয়েছে। উত্তাপের স্তর স্বাভাবিকতার চেয়ে বেশী হয়। যদি এর প্রতিক্রিয়া চোখের উপর প্রতিফলিত হয়, তাহলে বিদ্যুৎ তরঙ্গসমূহ তাৎক্ষণিকভাবে মস্তকের প্রতি ধাবিত হতে থাকে এবং চোখে ব্যথা অনুভূত হতে থাকে।
আমাদের ব্যথার যন্ত্রনা সহ্য করার কতটুকু সামর্থ আছে, তার পরিসংখ্যান আমাদের মন-মেজাজের উপর নির্ভরশীল। প্রবৃত্তিগতভাবে দেখা যায়, যে সব মাতা-পিতা জীবনের শুরু থেকে দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে অভ্যস্ত, তাদের সন্তান ও সহনশীলতা প্রদর্শন করে। ব্যথা-বেদনাকে ধৈর্য্যও দৃঢ়তার সাথে বরণ করে নেয়। কিন্তু আবেগপ্রবণ মাতাপিতার সন্তানদের মধ্যে এ গুণাবলী নেই। তারা অতি সাধারণ ব্যথা-বেদনাও দুঃখ-কষ্টে বিমূর্ষ হয়ে অচেতন ভাবে কান্নাকাটি করতে শুরু করে। দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা জীবিকা ও জীবন যাপনের উপর নির্ভরশীল। যে সব লোক অফিস-আদালতে বসে কাজ করেন বা যারা কঠোর পরিশ্রম করতে অভ্যস্ত নয়, তারা সামান্য আঘাত বা জখমে অস্বাভাবিক যন্ত্রণা ও ব্যাথা অনুভব করেন। কিন্তু পরিশ্রমী লোকেরা কোন কোন সময় মারাত্মক আঘাত পাবার পরও ততটা যন্ত্রনা অনুভব করে না।
বুনিয়াদী ভাবে নারী-পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধদের উপর ব্যথা-বেদনা এক সমান প্রতিক্রিয়া করে। এটা অন্য কথা যে, কেউ বেশী ব্যথা অনুভব করে, আর কেউ কম অনুভব করে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, শিশুদের উপর আঘাতের প্রতিক্রিয়া বেশী প্রতিফলিত হয়। কিন্তু বয়স যত বাড়তে থাকে ব্যাথার তীব্রতা ততই কমতে শুরু করে। অভিজ্ঞতায় এটাও প্রমাণ হয়েছে যে, বেশী বয়স্ক ব্যক্তি স্বাভাবিক অভ্যাস অনুযায়ী আঘাতের ব্যথা অনুভব করে না। অনুভূতির এ অভিজ্ঞতা তাদের চিকিৎসায় জটিলতা সৃষ্টি করে।
সাধারণ ব্যথা-বেদনকে বিপদ বা শাস্তি বলা হয়। পক্ষান্তরে ঘটনার শুরু থেকে প্রমাণ হয়েছে যে, ব্যথা-বেদনা কবি সাহিত্যিক ও দার্শনিকদের নিকটেই নয় বরং ব্যস্ততার পৃথিবীতেও এটা আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত। এটা আমাদের সময় মতো বিরাট বিপদ সম্পর্কে অবগত করে দেয়।