📄 মৌলিক বিষয়সমূহে বিশ্বাসের গুরুত্ব
(Importance of Fundamental Articles of Faith) আমাদের দেশের একজন প্রসিদ্ধ কবি মুনীর নায়াজীর মন্তব্য, 'আমি সুন্দরবনে গিয়েছিলাম। সেখানকার গাছ-গাছালির সাথে কথা বলে নিজের ভিতর এক আশ্চর্যজনক সুন্দর অনুভূতি অনুভব করেছি। আমার অন্য সাথীবর্গ এ অনুভূতি অনুভব করতে পারে নি।' সুতরাং বুঝা গেল, একই পরিবেশে বিভিন্ন জন বিভিন্ন রকমের অনুভূতি লাভ করতে পারে। মানুষের বিশ্বাস অনুপাতে মনের এ অবস্থা সৃষ্টি হয়। বিশ্বাস মানুষের জ্ঞান, অনুভূতি এবং চিন্তাকে সেভাবেই প্রভাবিত করে, যেভাবে মানুষের আবেগ ও বিভিন্ন আত্মিক অবস্থার সৃষ্টি করে। দোয়া বিশ্বাস অনুযায়ী বাহ্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে পরিবর্তনের কারণ হয়। যে বিশ্বাস পোষণ করে দোয়া করলে সেই দোয়া বাহ্যিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে নিজের চাহিদানুযায়ী পরিবর্তন করে নেয়, সে বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহ তা'আলাকে একক, লা-শরীক, অমুখাপেক্ষী এবং মুসাব্বিবুল আসবাব মেনে নিতে হবে। এ বিশ্বাসের বাস্তবতা প্রকাশ করার জন্য জরুরি হল তাকওয়া অবলম্বন করা, পরহেযগার হওয়া। কারণ রুহানী জীবন শুধু চিন্তা-ভাবনা পর্যন্ত সীমিত নয়। এটি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। রুহানী জীবনের উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তা'আলার মর্জি মাফিক জীবন যাপন করা এবং তদনুযায়ী মানবীয় সাফল্য অর্জনে সচেষ্ট হওয়া। এটা শুধু চিন্তার পদ্ধতিই নয়। আমল করারও পদ্ধতি। যখন কোন মানুষের পর-জীবনের মঙ্গল ছাড়া অন্য কিছুর আকাঙ্ক্ষা থাকে না, এবং যা কিছু চায় আল্লাহর জন্যই চায়, তখন সে সর্বোচ্চ প্রশান্তি, আনন্দ ও নিরাপত্তা লাভ করে।
📄 আল্লাহ তা‘আলার এরশাদ (Command of Allah, Almighty)
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে— (আমি ব্যতীত) সে কে (?), যে অস্থির চিত্তের আহ্বানে সাড়া দিবে? (সূরাতুন নমল)
আল্লাহ তা'আলা দয়ালু এবং রহমকারী। তিনি বান্দাদেরকে আরও বলেছেন, রহমত থেকে নিরাশ হওয়া গুনাহ বা অপরাধ। আল্লাহ তা'আলার সত্তার প্রকাশই তাঁর গুণাবলী এবং রহমতের উৎস। যদি আমরা তাঁর রহমতের শুকরিয়া আদায় না করি, তাহলে এর অর্থ হল তার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা। যদিও মানুষ মুখে মুখে তাওহীদ স্বীকার করে কিন্তু কর্মে তা প্রকাশ পায় না। তারপরও এটা আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকারোক্তির একটি অংশ। আমাদের উচিৎ হলো আমরা আল্লাহ তা'আলার উপর ঈমান আনার বিষয়টিকে মুখে ও অন্তরে স্বীকার করব, এবং আমল দ্বারা এ স্বীকারোক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটাব। আমরা যদি তাঁকে দয়ালু বলে স্বীকার করি, তাহলে মানতেই হবে যে, তিনি সবসময়, সর্বাবস্থাতেই একনিষ্ঠ মনের তওবা এবং ব্যাকুল চিত্তে প্রার্থিত দোয়া কবুল করেন।
তবে স্মরণ রাখতে হবে যে, আল্লাহ তা'আলা বান্দার কল্যাণকে সামনে রেখেই কখনো কখনো কিছু সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর কবুলকৃত দোয়ার ফলাফল প্রকাশ করেন। আবার তিনি কখনো কখনো দোয়ার প্রতিদান আখেরাতের জন্য সংরক্ষণ করে রাখেন। যে সব সমস্যা দূর করার জন্য আমরা প্রার্থনা করি, সেগুলোর সমাধান না হওয়ার অর্থ এ নয় যে, আমাদের দোয়া কবুল হয়নি। কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলাই বান্দাকে পরীক্ষা করেন যে তাঁর বান্দা কিরূপ ধৈর্য ধারণকারী এবং শোকরগুজার, তার ঈমান ও তাকওয়া কি পরিমাণ অটল।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, 'সমুদ্রে চলমান পর্বতসম জাহাজসমূহ আল্লাহ তা'আলার নিদর্শন। যদি আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছে করেন, তবে বাতাসের প্রবাহ বন্ধ করে জাহাজকে সাগর বুকে স্থির করে দিতে পারেন। এতে ধৈর্যশীল এবং শোকরগুজার বান্দাদের জন্য যথেষ্ট শিক্ষা রয়েছে। কিংবা তিনি মুসাফিরদেরকে তাদের বদ আমলের কারণে ডুবিয়ে দেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা অধিকাংশ লোকদের ক্ষমা করে দেন।' (সূরাতুশ শূরা)
📄 মার্কস এলিসের উক্তি
যদি মানুষ প্রথম থেকেই নিজের নফসের চাহিদাসমূহকে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির অধীন করে বলত (মার্কস এলিসের ভাষায়) 'হে আমার প্রতিপালক! যা কিছু আপনি পছন্দ করেন, তা আমিও পছন্দ করি। আপনার প্রতিটি কাজেই আমার মঙ্গল নিহিত রয়েছে', তাহলে তাকে অস্থির হতে হয় না।
📄 কুরআনুল কারীমের বাণী (Instruction of Quran Karim)
কুরআনে কারীমের ইরশাদ, 'যে সব লোক আমার সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, আমি তাদেরকে উন্নতির পথ প্রদর্শন করি। আল্লাহ তা'আলা সর্বদা সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন।'
যখন আমরা অসুস্থ কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হই, তখন কোন না কোন মানসিক, চারিত্রিক অথবা আত্মিক নিয়ম-কানুনের বিরুদ্ধাচরণের প্রতিফলন ভোগ করি। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে, 'নাফরমানদের উপর তাদের কৃতকর্মের কারণে সর্বদা কোন না কোন বিপদ আপতিত হয়।' কিন্তু আল্লাহ তা'আলা সৎকর্মশীলদের সম্পর্কে কুরআন মাজীদে এরশাদ করেন, 'আমি মানুষের অগ্রে ও পশ্চাতে পাহারাদার নিয়োগ করে রেখেছি। তারা আমার ইঙ্গিতে তাদেরকে সব বিপদাপদ থেকে হিফাযত করে।' (রাদ- ১১)
অন্য এক জায়গায় ইরশাদ করেন, 'সূর্যোদয়ের পূর্বে, সূর্যাস্তের পর, রাত্রি বেলায় এবং দিনের উভয় প্রান্তে আল্লাহকে স্মরণ কর যাতে তোমরা কল্যাণ প্রাপ্ত হও।' কিন্তু বড়ই আফসোসের বিষয়, দুনিয়া আমাদের নিকট এতই প্রিয় যে, 'আল্লাহকে স্মরণ করা'র কথা ভুলে আমরা শুধু দুনিয়া নিয়েই ব্যস্ত নই; বরং দুনিয়ার জন্য আমরা বান্দার হক নষ্ট করতেও ইতঃস্তত বোধ করি না। দুনিয়া উপার্জন করা নিষিদ্ধ নয়; বরং হালাল রিযিক অর্জন করে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের খাদ্য-বস্ত্রের সংস্থান করা বড় পূণ্যের কাজ। কিন্তু মহান আল্লাহ তা'আলার নির্দেশিত পথ ও পন্থা ছেড়ে দিয়ে শুধু উপার্জনে মগ্ন থাকা মহান আল্লাহ তা'আলার নাফরমানিরই শামিল। এটা মারাত্মক ধৃষ্টতা প্রদর্শন ও গুনাহের কাজ।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, 'তোমাদের উপর আপতিত প্রতিটি মুছিবত তোমাদের কৃত কর্মেরই ফল।' কুরআন মজীদে আরও ইরশাদ হয়েছে, 'এ ধন-সম্পদ, সৌন্দর্য-ঐশ্বর্য সবই দুনিয়া। যা কিছু আল্লাহ তা'আলার নিকট রয়েছে তা উত্তম ও চিরস্থায়ী।'
কিন্তু মানুষের এ বিশ্বাস নেই যে, এ জীবন অস্থায়ী এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনই চিরস্থায়ী। তাই আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সম্বোধন করে বলেন, 'ভবিষ্যত জীবনই আসল জীবন।' আরও ইরশাদ করেন, 'যে সব লোক আল্লাহ তা'আলাকে মাবুদ স্বীকার করার পর তার পথে দৃঢ় থাকে, তাদেরকে সম্বোধন করে ফেরেশতারা বলেন, ভয় পেয়ো না, চিন্তা করো না এবং নিজেদের উপার্জিত জান্নাত অর্জনে উল্লাস কর। আমরা বর্তমান ও পরবর্তী জীবনে তোমার সঙ্গী হয়ে থাকব। সেখানে যা কামনা করবে, তাই পাবে।' (হামীম সেজদা ২৯-৩০)
অন্য এক জায়গায় ইরশাদ করেন, 'সৎকর্মশী ঈমানদারদেরকে আমি পরিতৃপ্ত জীবন ও উত্তম প্রতিদানের সুসংবাদ দান করছি।' যারা নিজেদের ঈমানের মধ্যে গুনাহ প্রবেশ করতে দেয় না, তারা নিরাপত্তা, প্রশান্তি এবং হেদায়েতের নেয়ামত লাভ করে সৌভাগ্যশালী হবে।