📄 রোগের চিকিৎসা
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগের চিকিৎসা করাকে বৈধ করেছেন। তিনি রোগীকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে উপদেশ দিতেন। তাঁর শেষ অসুস্থতার সময় মদীনার ডাক্তারগণ তাঁর চিকিৎসা করেছেন। হযরত আয়েশা রাযি বর্ণনা করেন, 'আমি ডাক্তারদের বলে দেয়া ব্যবস্থা পত্র মুখস্থ করে নিতাম। পরবর্তীতে অনেক রোগী তার দ্বারা উপকৃত হতো।' এমনকি এভাবেই হযরত আয়েশা রাযি. চিকিৎসা বিদ্যায় নিজের অবস্থান দৃঢ় করেছিলেন। সে যুগে আরবের সবচেয়ে বড় ডাক্তার ছিল হারেছ বিন কিলাহ। তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচাতো ভাই ছিলেন। জ্ঞান গরীমায় অতুলনীয় যুবক সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মজলিসে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল 'হে আল্লাহর রসূল! তাকদীরের ব্যাপারে কি বলেন?' তিনি জবাব দেন, ঔষধও তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত। তিনি যাকে চান তার উপকার করেন এবং যাকে চান তার অপকার করেন।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য এক হাদীসে বর্ণনা করেছেন, 'আল্লাহ তা'আলা এমন কোন ব্যাধি সৃষ্টি করেন নি, যার ঔষধ রাখেন নি।' শেষোক্ত হাদীসটি অনুসন্ধান ও গবেষণার পথ উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে মাইল ফলক। অবশ্য খুব বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। বর্তমান শতাব্দীতেই ১৯৫০-৫৫ পর্যন্ত জীবাণু প্রতিষেধক এন্টিবায়োটিকস এর অস্তিত্ব ছিল না। বিভিন্ন রোগ জীবাণুর আক্রমণে লাখো লোক মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। নিউমোনিয়া, টাইফয়েড ইত্যাদি মারাত্মক ব্যাধি বলে গণ্য করা হতো। এমনকি এ রোগগুলোকে প্রাণনাশক পুরাতন জ্বর হিসাবে মনে করা হতো। অথচ বর্তমানে এসব কঠিন রোগের সহজ চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়েছে। যক্ষার মত মারাত্মক ও ঘাতক ব্যাধির জন্য এখন তিন মাসের চিকিৎসা যথেষ্ট। তদ্রূপ, কয়েক বছর পূর্বে ক্যান্সারের কোন চিকিৎসা ছিল না। কিন্তু বর্তমানে এর চিকিৎসা অনেকাংশে সফল হয়েছে। যখনই নতুন কোন রোগ নিরূপণ হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে অনুসন্ধান সংস্থাগুলো তার চিকিৎসা শুরু করে দেয়। একটা না একটা সমাধান বের হয়েই আসে। ফলে আল্লাহর রাসুলের সেই বাণীর সত্যতা প্রমাণিত হচ্ছে।
📄 চিকিৎসা ও দোয়া (Remedy and Provoking)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু দোয়া নয়, সাথে সাথে দাওয়ার প্রতিও গুরুত্ব দিতেন এবং অন্যদেরকেও এ জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন। বস্তুত আল্লাহ্ তা'আলা রোগ কখন আরোগ্য হবে তার একটা সময় নির্দিষ্ট করেছেন। কেবল সে নির্দিষ্ট সময়েই ডাক্তারের প্রতিবিধান ফলবতী হয় এবং ঔষধ-পথ্যাদি কাজে লাগে। রোগী আরোগ্য লাভ করে। রোগীর দোয়া অন্যদের জন্যও অত্যন্ত ফলপ্রসূ। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা রোগীর কাছে যাওয়ার পর তার নিকট দোয়া চাইবে। কারণ আল্লাহর নিকট ফেরেশতাদের দোয়া কবুল হওয়ার ন্যায় রোগীর দোয়া কবুল হয়।
📄 স্বাস্থ্য রক্ষা (Precaution health)
রোগের চিকিৎসা করার চেয়ে রোগাক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই সাবধানতা অবলম্বন করা শ্রেয়। বর্তমানে বিশ্বের সব প্রতিষ্ঠান এ বিষয়টির প্রতি মনোনিবেশ করেছে। এমনকি প্যারামেডিক্যাল কলেজে কমিউনিটি মেডিসিন নামে এ বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র বিভাগও খোলা হয়েছে। সারা বিশ্বে লাখ লাখ ডলার খরচ করে চেষ্টা চালানো হচ্ছে, যাতে রোগে আক্রান্ত হওয়ার পূর্বে সাবধানতা অবলম্বন করে রোগ থেকে বেঁচে থাকা যায়। অথচ আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চৌদ্দশত বছর আগে এমন কিছু অমূল্য নীতি রেখে গেছেন যেগুলো আজকে বিজ্ঞানের অনুসন্ধানের বিষয়। এ সব মূল নীতিগুলোর যথাযথ অনুসরণ করা হলে শতকরা ৯০ ভাগ রোগ চিকিৎসা ছাড়াই উপশম হবে। শরীরের ত্বক অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রক্ষক। ত্বক ক্ষত, কাটা-ছেঁড়া বা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে অভ্যন্তরীণ অঙ্গেও তার প্রভাব পড়ে। আল্লাহ তা'আলা শরীরের অন্যসব অঙ্গকে দ্বিন্তরী করে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু ত্বকে অনেকগুলো স্তর রয়েছে।
এবার লক্ষ্য করুন, শরীরের অঙ্গগুলোর হেফাজতের জন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলেছেন? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। শরীর সর্বদা পাক রাখা, পরিচ্ছন্ন কাপড় পরা, গোসল করা— এ সবই পবিত্র হওয়ার এক একটি মাধ্যম। এ অভ্যাসগুলো শরীরের অনেক রোগ দূর করে। পক্ষান্তরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জনে অবহেলা করা হলে শরীর জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় ও বিভিন্ন প্রকার রোগ-ব্যাধি দেখা দেয়। ত্বকের মাধ্যমে রোগ শরীরের অন্যান্য অঙ্গ যথা— অস্থি, গ্রন্থি ইত্যাদিতে সংক্রমিত হয়। এ সব ব্যাধি থেকে পরিত্রাণের জন্য বর্তমান মেডিকেল সাইন্সের উপদেশ হলো, নিয়মিত গোসল করা ও শরীর পবিত্র রাখা এতে করে জীবাণু দূর হয় এবং শরীর নীরোগ থাকে। দেখুন, আল্লাহ তা'আলা নামায ফরয করেছেন এবং নামাযের জন্য অযু করা অপরিহার্য করেছেন। আমরা অযুর প্রতি লক্ষ্য করলেও দেখব, অযু করার দ্বারাও উপরোক্ত কল্যাণগুলো অর্জিত হয়। কেননা অযুর সময় হাত-মুখ ধৌত করা, কুলি করা, নাকে পানি দেওয়া— এ সব বিধান নামাযীর শরীর থেকে সমস্ত জীবাণু দূর করে এবং এই অঙ্গগুলো রোগ-ব্যাধি থেকে নিরাপদ থাকে।
শল্যবিদ অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নেওয়ার পূর্বে উভয় হাত কনুই পর্যন্ত ভালোভাবে ধৌত করেন যেন জীবাণু দূর হয়। মাথা ও মুখমন্ডল আবৃত করে— যেন এ সব অঙ্গে বিদ্যমান কোন জীবাণু রোগীর ক্ষতি করতে না পারে। বলা বাহুল্য, একজন মুসলমান নামাযের পূর্বে প্রতিদিন পাঁচবার অযু করে মূলত শল্যবিদের অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতিমূলক কাজটি করেন। অযুতে মাথা ও গর্দান মাসাহ করার বিধানও রয়েছে। এতে করে সেখানে বিদ্যমান জীবাণু দূর হয়। মাথা ও গর্দানকে সজীব অনুভূত হয়। ফলে ইবাদতে একাগ্রতা সৃষ্টি হয়। তাছাড়া অযু এ সব অঙ্গে লেগে থাকা রাসায়নিক যৌগ দূর করে। এছাড়াও মাসাহ দ্বারা রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়।
📄 দশটি বিষয় (Ten in Talking)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশটি বিষয়কে মানব স্বভাবের অংশ হিসাবে গণ্য করেছেন। তন্মধ্যে কয়েকটি এখানে পেশ করছি।
১. গোঁফ কাটা; ২. দাড়ি লম্বা করা; ৩. মিসওয়াক করা; ৪. নাকে পানি দেওয়া; ৫. নখকাটা; ৬. আঙ্গুলের গ্রন্থি ধৌত করা; ৭. বগলের লোম পরিষ্কার করা।
আলোচ্য হাদীসে বর্ণিত বিষয়গুলোই কমিউনিটি মেডিসিনের ভিত্তি। ত্বকের উপকারিতা সম্পর্কে ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। বগল, নাভীর নীচের পশম, আঙ্গুলের নখ ও গোঁফ বহু জীবাণুর বাসস্থান। জীবাণুগুলো এসব স্থানের ত্বক ভেদ করে অভ্যন্তরীণ অঙ্গকেও আক্রান্ত করে। শুধু আঙ্গুল অপরিচ্ছন্ন থাকার কারণেই টাইফয়েড, ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি বিস্তার লাভ করে। নখের ভিতর বিভিন্ন পরজীবীর ডিম আটকে থাকে। সেগুলো মুখ হয়ে পেটে যায় এবং সেখানে সাপের মত বড় আকার ধারণ করে শরীরের পরিপাকতন্ত্রকে ধ্বংস করে। শরীরের যে যে অঙ্গের ত্বকে ভাঁজ পড়ে যেমন— বগল, আঙ্গুল ও নাভীর নীচ এ সব স্থানে রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শরীরের এসব অঙ্গে রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং জীবাণু দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে। অতএব, নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা, আঙ্গুলের গ্রন্থি ধৌত করা ও নাভীর নীচের পশম পরিষ্কার করা স্বাস্থ্য রক্ষাকারী মেডিসিনের মূল ভিত্তি।