📄 আরোগ্য লাভের সত্য ঘটনা (True Story of Getting Relief)
আমি অধিকাংশ সময় ঘটনা উল্লেখ করি। কারণ ঘটনা দ্বারা ঈমান বৃদ্ধি পায়। ড. যয়নুল আবেদীন সাহেব বার্লিনে মরহুম যাকের হোসাইন সাহেবের সঙ্গে অর্থনীতির উপর পি.এইচ.ডি করেছেন। তাঁরা উভয়ে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেছেন। ড. যয়নুল আবেদীন সাহেবের বাড়ি ভারতে। তবে তিনি বর্তমানে মক্কায় অবস্থান করছেন। তাঁর জামাতা ও ছেলেরা সৌদি আরবে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত। তার মুখে লম্বা দাড়ি দেখে মনে হয় তিনি এক বিরাট বুযুর্গ। তিনি প্রতিদিন হানাফী জায়নামাযে পনের বিশ মিনিট অবস্থান করতেন। এবার আল্লাহ তা'আলার অসীম কুদরতের নিদর্শনের একটি ঘটনা শুনুন।
একবার ডা. যয়নুল আবেদীন সাহেব যাকের হুসাইন সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সুদূর আরব থেকে এসেছিলেন। তিনি তখন সিন্ধুতে ছিলেন। লোকজন ডা. সাহেবকে জুমার খুতবা পাঠ করার জন্যে পীড়াপীড়ি করছিল। কেননা তার দীর্ঘ শুশ্রূষা তাকে আলেম হিসেবে পরিচিতি করেছিল। তখন তিনি বললেন, আমি আলেম নই। আমি বার্লিন থেকে পি.এইচ.ডি করেছি। বস্তুত আল্লাহ পাক তাঁকে আধ্যাত্মিকতায় আলেমদের চেয়েও বহুগুণ উপরে উঠিয়েছিলেন। তাঁর মুখমণ্ডল দেখে মনে হতো যেন নূরের জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। সে যুগে মাইকের ব্যবস্থা ছিল না। তাই হযরত মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করতেন আর নামায পড়াতেন সামনের মেহরাবে গিয়ে। মেহরাব থেকে মহিলাদের কাছেই মাইক রেখে দিতেন। ড. যয়নুল আবেদীন সাহেব হযরতের সেই মিম্বরে বসে বক্তৃতা করছিলেন। তার বক্তৃতা ছিল অত্যন্ত সুন্দর মর্মস্পর্শী। তিনি অনেকগুলো ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
ঘটনাগুলো এমন যেগুলি শুনলে ঈমান সজীব ও দৃঢ় হয়। তন্মধ্যে একটি ঘটনা আজও আমার মনে আছে। হেরেম শরীফে অবস্থান কালে তাঁর উক্ত ঘটনাটি পুনরায় জানতে চাইলে, তিনি বলেন, বার্লিনে অর্থনীতির একজন শিক্ষক ছিলেন। সে যুগে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও দক্ষ অর্থনীতিবিদ হিসাবে খ্যাত ছিলেন। ড. সাহেব তার শিক্ষকের নামও উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু তার নাম আমার স্মৃতি থেকে ঝরে গেছে।
ড. সাহেব আল্লাহ পাকের কুদরত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'একবার সেই শিক্ষকের স্ত্রীর পেটে প্রচণ্ড ব্যথা হয়েছিল। একদিনের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও ব্যথা উপশম হল না; বরং রোগীর চিৎকারে পরিবারের সবার চোখের ঘুম বিদায় নিয়েছিল। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হল। কিন্তু রোগ নির্ণয় করা কারো পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। রোগিণীকে কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে ইনজেকশন প্রয়োগ করে মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করার কথাও ভাবা হচ্ছিল। তখন আমি বললাম, 'আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা এ কাজ করবেন না। ইসলামে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার অনুমতি নেই। আল্লাহর রহমত থেকে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হওয়া হারাম, (ঐ সময়ে তারা খৃস্টান ও হিটলারের অনুসারী ছিলেন)'। তখন তিনি কুরআনের আয়াত পাঠ করেন, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আলোচ্য আয়াতের আশ্বাসে মুসলমানেরা আশাবাদী। তাই তাদের মাঝে আত্মহত্যার ঘটনা খুবই বিরল। পক্ষান্তরে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের আল্লাহ সম্পর্কে ধারণা হলো, তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। কিন্তু ইসলামে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কথা কল্পনাও করা যায় না। গোটা জীবন কুফর ও শিরকের পঙ্কিলতায় লিপ্ত থাকলেও, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ আল্লাহ পাক এমন ব্যক্তিকেও তওবা করার তাওফীক দান করতে পারেন। মৃত্যু যন্ত্রণা শুরুর পূর্বেই কেউ যদি তওবা করে তাহলে তার জান্নাতে প্রবেশ নিশ্চিত। রহমাতুল লিল আলামীন ইরশাদ করেন, 'যে ব্যক্তি কালেমা পাঠ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
উপরোক্ত হাদীসে শৈশবে কালিমা পাঠ করার কথা বলা হয়নি। বরং হাদীসের মর্ম হল, কোন ব্যক্তি যদি মৃত্যু যন্ত্রণা শুরু হওয়ার পূর্বে বিশুদ্ধ চিত্তে ইসলামের কালেমা পাঠ করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিওবা সে জীবনে এক ওয়াক্ত নামাযও আদায় না করে। ভেবে দেখুন, এর চেয়ে বড় নেয়ামত আর কি হতে পারে? যাই হোক, ড. সাহেব তাদেরকে বললেন, 'আমাকে একটা ব্যবস্থাপত্র পরীক্ষা করার সুযোগ দিন।' তিনি বলেন, এরপর আমি এক গ্লাস পানি নিয়ে অন্যদের থেকে সরে গিয়ে সূরা ফাতেহা পাঠ করে বিনয়ের সাথে দোয়া করলাম, হে আল্লাহ! এ ব্যক্তি তোমারই বান্দা, আমার কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আমি তোমার কালাম পাঠ করেছি। তোমার বাণীর ওসীলায় তাকে আরোগ্য কর। রোগিণী রোগ থেকে মুক্তি পেলে ইসলামের বড়ত্বের ছাপ তাদের অন্তরে বদ্ধমূল হবে এবং নবী প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি যে সাদা দাড়ি রেখেছি, তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে। আল্লাহর কি অসীম কুদরত! পানি পান করার সঙ্গে সঙ্গে রোগিণী সম্পূর্ণ সুস্থ হল। বড় বড় ডাক্তারা অভিভূত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কি তাকে জাদু করেছেন? বললাম, আমি কোন জাদু করি নি; বরং আল্লাহ পাকের কালাম তেলাওয়াত করেছি। আমি কি করেছি তা জানার জন্য তারা বারবার আমাকে অনুরোধ করছিল। কিন্তু আমি তা প্রকাশ করতে বারংবার অস্বীকৃতি জানাই। কারণ আমার ধারণা, তারা কুরআনে অবিশ্বাসী হেতু তাদের নিকট কুরআনের কথা উল্লেখ করা আর নিজের ও কুরআনের অবমাননা করা একই কথা। অনেক পীড়াপীড়ির পর কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করার কথা জানালে তারা মুগ্ধ হয়ে 'আল্লাহু আকবর' বলে উঠল। আল্লাহর কালামের ওসীলায় রোগ মুক্তি ঘটে তারা তা মেনে নিল।
ড. সাহেব বর্ণনা করেন, 'পরবর্তীতে কারো কোন অসুবিধা হলে তখন তখনই পানির গ্লাস হাতে আমার কাছে ছুটে আসতো এবং আমি যাদের জন্যই পানি পড়ে দিয়েছি, তারা সুস্থতা লাভ করেছে। পরবর্তীতে ঐ পরিবারের সবাই পাদ্রিদের ছেড়ে আমার ভক্ত হয়েছে। এরপর থেকে আমি নামাযের প্রতি বিশেষ যত্নবান হলাম যেন কেউ আমাকে একথা বলার সুযোগ না পায় যে, এ ব্যক্তি বড় ঈমানদার হয়েও নামাযের প্রতি যত্নবান নন। কারণ তাদের পাদ্রী অনেক উঁচু দরের আলেম ছিলেন। তাদের দেশে পাদ্রীদের যে মর্যাদা, আমাদের এখানে আলেমদের সে মর্যাদা নেই। এ কারণেই ড. সাহেব অনেকটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মত ধর্মের অনুসরণে আত্মনিয়োগ করেন এবং ঐ পাদ্রীদের চেয়ে তিনি বেশি ধর্মনিষ্ঠ এটা তাদের চোখেও তুলে ধরেছেন।
ড. সাহেব আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, আজ আমাদের মাঝে ঈমান থাকলে আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, আল্লাহ তা'লা হযরত ইবরাহীম আ.কে যেমন অগ্নি থেকে রক্ষা করেছেন, আমাদেরকেও তেমনি অগ্নি থেকে রক্ষা করতে পারেন। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে রক্ষা করেন কি-না এটা প্রমাণ চাইলে আপনারা আগুন প্রস্তুত করুন, আমি তাতে ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত আছি। ইনশাআল্লাহ আমার তাতে একটুও কষ্ট হবে না। কেননা আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মুহাব্বতে এ কাজ করব।
📄 সফরের সহযাত্রী। (Companion for Journey)
নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'একাকী সফরের অনিষ্টতা সম্পর্কে আমি যতটুকু জানি, অন্যেরা তা অবহিত হলে কেউ একাকী রাত্রি বেলায় সফর করত না'। (বোখারী শরীফ)
এক ব্যক্তি দীর্ঘ পথ সফর শেষে নবীয়ে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমীপে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার সফর সঙ্গী কে? মুসাফির বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার তো কোন সফর সঙ্গী নেই। আমি একাকীই এসেছি।' প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, 'নিঃসঙ্গ সফরকারী শয়তান, একজন সঙ্গীসহ সফরকারী শয়তান, কিন্তু তিনজন সফরকারী হল মুসাফির।'
📄 ‘হামফ্রে’ এর অভিজ্ঞতা
আমার জীবনের অভিজ্ঞতা হল, মানুষ যেন একাকী সফর না করে। আমি লার্নিয়ার জনশূন্য অঞ্চলে সফর করছিলাম। পথিমধ্যে এমন এক গ্রাম্য লোকের সাক্ষাত পেলাম ধরন-চলনে যাকে হিংস্র বলে মনে হচ্ছিল। সে তার কথার ম্যার-প্যাচে আমাকে ঝুপরির ন্যায় এক ঘরে যেতে বাধ্য করল। সেখানে আমাকে খড়-কুটা দিয়ে তৈরি বিছানায় শয়ন করতে দিল। ক্লান্তির শেষ ছিল না। তাই শয়ন করতে না করতেই ঘুমিয়ে পড়ি। জাগ্রত হওয়ার পর মনে হচ্ছিল যেন দু'দিন পর ঘুম ভাঙল।
ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে দেখেছিলাম খড়-কুটোর সাথে নেশা উদ্রেককারী ঘ্রাণ ও গুণাগুণ বিশিষ্ট কিছু বন্য শিকড়জাত ভেষজ রাখা অথচ আমার তল্পিতল্পা ও পাথেয় কিছুই নেই। নিঃসঙ্গ সফরে বের হওয়ার ক্ষতি সম্পর্কে আমি তখন থেকেই নিশ্চিত হই। আমি পথপ্রদর্শক ও সঙ্গীসহ সফর করার প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিতভাবে পরখ করেছি। এরকম সফর নিরাপদ ও কল্যাণকর। (সফর কি ইয়াদ বাতে)
📄 এশার নামাযের পর কথোপকথন ও জাগ্রত থাকা
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশার পর জাগ্রত থাকা ও কথা বলায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বলেন, এশার নামাযের পর ধর্মীয় ও পারিবারিক প্রয়োজনে ছাড়া কেউ জাগ্রত থাকবে না। (তাবগীব ও তারতীব)
এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সারা দিনের ক্লান্তির পর প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য রাতের প্রথম ভাগে শয়ন করা এবং প্রত্যুষে তাড়াতাড়ি শয্যা ত্যাগ করা উচিত। শয়নে দেরি করলে সূর্য উঠার পরও বিছানায় থাকতে হয়। ঘুমন্ত ব্যক্তির উপর সূর্যের কিরণ পড়লে মারাত্মক ব্যাধি জন্ম নিতে পারে। রাত্রি বেলায় ঘুম কম হওয়ায় প্রয়োজন মাফিক বিশ্রাম না হলে মানসিক চাপ, অস্থিরতা, দুঃস্বপ্ন ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। এ কারণেই নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশার নামাযের পরপরই শয়ন করতে বলতেন।