📄 অস্ট্রেলিয়ান গবেষণা :
১৯৭৮ এর সেপ্টেম্বর মাসে অস্ট্রেলিয়ার একটি ছোট্ট শহর 'এলিন্সবার্গ' এ বিশ্বের এক হাজার এলাকা থেকে মনোস্তত্ত্ববিদ, উলামায়ে দ্বীন, ডাক্তার, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য চিন্তাবিদ সমবেত হয়ে এক সপ্তাহ যাবত মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করেন। অন্তিম মুহূর্তে মানুষ যে সব দৃশ্যাবলী অবলোকন করে তার মূলে কি রয়েছে? যাদেরকে মৃত বলে মনে হয়, তাদের সবার কথায় এক আশ্চর্য সাদৃশ্য পাওয়া যায়। সকলেরই অভিজ্ঞতা একই রকম হয়ে থাকে। কনফারেন্সের পর ঘোষক ঘোষণা করেন, 'এই সব অনুসন্ধান ও গবেষণার ফলে ডাক্তার, উলামায়ে দ্বীন ও বিজ্ঞানীগণও একমত পোষণ করেন যে কবরে যাওয়ার মাধ্যমেই জীবনের সমাপ্তি ঘটে না। বরং এর পরও জীবনের ধারাবাহিকতা চলমান থাকে।' তিনি আরো বলেন যে, 'এতদিন পর্যন্ত কনফারেন্সে অংশ গ্রহণকারী সবার মাঝেই এ বিষয়ে একটা অস্পষ্টতা ও সংশয় ছিল।'
ডাঃ কার্লস আওসাসজ এমন এক হাজার লোকের উপর সমীক্ষা চালান যাদের মৃত্যুর লক্ষণাদি প্রকাশ পেয়েছিল এবং চিকিৎসকগণ তাদেরকে Clinically Dead ঘোষণা করেছিলেন। তাদের তিন জন চেতনা ফিরে পেলে তাদের অন্তিম মুহূর্তের প্রত্যক্ষণ ও অনুভূত বিষয় সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তারা সবাই একই উত্তর দিয়েছিল: আমরা সাধারণভাবে মুক্তি লাভ করার মনোরম ও আনন্দময় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছি এবং পরলোক পাওয়া আপনজনদের সাক্ষাৎ পেয়েছি। তারা আমাদের বলেছেন যে, তারা আমাদের জন্য সৌভাগ্যের বাণী ও শুভ বার্তা নিয়ে এসেছেন।' কতক মনস্তত্ত্ববিদের ধারণা হল, অন্তিম মুহূর্তে মানুষ যে সব দৃশ্য অবলোকন করে তা মূলত তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিরই প্রতিচ্ছবি। ভারত ও আমেরিকার কিছু কিছু লোক অন্তিম মুহূর্ত থেকে পুনরায় চেতনা ফিরে পেয়েছে। তারা ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক রীতির সাথে পরিচিত থাকলেও আশ্চর্যের ব্যাপার হল তারা সকলেই সেই অন্তিম মুহূর্তে অত্যন্ত উজ্জ্বল আলো দেখেছে এবং নিজেদেরকে হাসি-আনন্দের সমুদ্রে অবগাহন করছে এমন অবস্থায় পেয়েছে। তাদের অনেকেই এমন তথ্যও দিয়েছে যে তারা পরলোকগত আত্মীয়-স্বজনের সাক্ষাৎ পেয়েছে।
📄 ইউরোপ ও আমেরিকার বিজ্ঞ মনস্তত্ববিদ ও বিজ্ঞানীদের তত্ত্ব
আত্মা সম্পর্কিত বিষয়াবলী তো ভিন্ন কথা আমরা বস্তুজগতের মধ্যেও 'দেখতে না পাওয়া' অনেক কিছুকে বিশ্বাস করতে বাধ্য হই। যেমন— আমরা কেউ 'পরমাণু' দেখি না। তবে সার্বজনীন ও লক্ষণগত প্রমাণাদির ভিত্তিতে তার অস্তিত্ব অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। অনেক বিজ্ঞানী উপরোক্ত ঘটনাবলীর এরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, অন্তিম মুহূর্তে রোগীকে যেসব সান্ত্বনা মূলক আশা দেওয়া হয় এবং ঔষধাদি সেবন করান হয়, উপরোক্ত আলো ও দৃশ্যাবলী তারই বহিঃপ্রকাশ। আবার অনেকের মতে ঐ সময় মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহে স্বল্পতা দেখা দেওয়ায় রোগী নানা রকম বিস্ময়কর জিনিষ প্রত্যক্ষ করে। ইউরোপ আমেরিকার বিজ্ঞানী ও মনস্তত্ত্ববিদদের মতামতের মূল কথাও এটিই।
যা হোক, যথাসাধ্য প্রয়াস ও গবেষণার পরও দুনিয়ার কোন বিজ্ঞানী মৃত্যু কি জিনিস (?), অন্তিম মুহূর্তে কি ঘটে (?)- এ প্রশ্নগুলোর উত্তর পাননি। এ বিষয়গুলো তিনিই জানেন, যিনি সৃষ্টি করেছেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেন : 'এটি মহান প্রভুর এক নির্দেশ'।
📄 মাওলানা ইউসুফ লুধায়নবীর ভাষ্য
মাওলানা মুহা. ইউসূফ লুধয়ানবী এক প্রবন্ধে মৃত্যু পরবর্তী জীবন সম্পর্কে লিখেন, 'মৃত্যুর পর মানুষ ভিন্ন এক জগতে চলে যায়। সে জগতকে 'আলমে বরযাখ' বলা হয়। সে জগতের সব অবস্থা ও ঘটনা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এ কারণেই তার পূর্ণ রূপ মানুষের কাছে প্রকাশ করা হয়নি। মানুষকেও তার প্রকৃত রূপ উদ্ঘাটনে বাধ্য করা হয়নি। তবে এ বিষয়টিকে আমাদের উপলব্ধির সামর্থ্য অনুযায়ী বর্ণনা করা হয়েছে। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তি জানে, তাকে কে গোসল দেয় (?), কে বহন করে নিয়ে যায় (?), কে কাফন পরিধান করায় (?), এবং কে কবরে রাখে (?)।
দাফন করার পর আত্মা কোথায় থাকে— কবরে না ঊর্ধ্ব জগতে; না-কি উভয় স্থানে, বিভিন্ন বর্ণনায় এ নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। সবগুলো মত বিবেচনায় এনে যা বলা যায়, তা হলো, নেক কর্মশীল আত্মার স্থান হল 'ইল্লিয়্যীন' আর অসৎ আত্মার স্থান 'সিজ্জীন'। তবে প্রত্যেকের শরীর ও আত্মার মাঝে একটি বিশেষ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। শরীর কবরে থাক, সমুদ্রে ভেসে বেড়াক, আগুনে পুড়ে ছাই হোক, কোন হিংস্র জন্তুর থাবায় ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হোক, দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেখানেই থাকুক না কেন, আত্মার সাথে তার এক বিশেষ সম্পর্ক থাকবে। তারই নাম হল 'আলমে বারযাখ'।
দুনিয়াতে ফিরে আসা ও চলা-ফেরারের ব্যাপারে আত্মা স্বাধীন না পরাধীন— এ ব্যাপারে পূর্বেই বলা হয়েছে— কাফেরদের আত্মা সিজ্জীনে বন্দি দশায় থাকে। কোথাও যাওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না। তবে সৎকর্মশীলদের আত্মা সম্পর্কে কোন সাধারণ বিধি বলে দেওয়া হয়নি। তাই নিশ্চিতভাবে কোন কিছু বলা দুষ্কর। আসল কথা হল, আত্মা তার কার্যক্রম পরিচালনায় দেহের মুখাপেক্ষী। আত্মাহীন দেহ যেমন নিষ্ক্রিয়, তেমনি দেহহীন আত্মাও অক্ষম। আর এ কথা স্পষ্ট যে, মৃত্যুর পর ইহলৌকিক দেহের কার্যক্ষমতা লোপ পায়। অতএব আত্মার কর্মক্ষমতা যদি থাকে, তাহলে আত্মাকে ইহলৌকিক দেহের সদৃশ আরেকটি দেহ দান করার প্রমাণ পাওয়া যায়।
মোটকথা, যে আত্মাকে ইহলৌকিক দেহের অনুরূপ কোন দেহ দান করা হয়, তার পক্ষে আল্লাহ্ তাআলার অনুমতিতে কোথাও পরিভ্রমণ করাকে অস্বীকার করা যায় না। মে'রাজের রাত্রিতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিছনে সমস্ত নবীগণের নামায আদায়, শহীদগণের জান্নাতে খানা-পিনা ও পরিভ্রমণ করা এবং অন্যান্য বুযুর্গানে দ্বীনের ঘটনাবলীকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এ জন্য সাধারণ কোন বিধি বলে দেওয়া হয়নি।'
📄 দুজন সাহাবীর বিস্ময়কর কাহিনী (Incident of Two Sahaba)
ইরাকের বাদশাহ ফয়সাল (১ম) এর শাসনামলে বাগদাদে সমাহিত দু'জন সাহাবীর ঐতিহাসিক ঘটনাও ঈমান দৃঢ়কারী এবং অত্যন্ত বিস্ময়কর। খৃষ্টীয় বিংশ শতাব্দীতে কোটি কোটি মুসলমান তাদের শারীরিক যিয়ারত লাভ করলেন। কবরে পানি স্পর্শ করার আশঙ্কায় কবর খনন করা হলে তাদের পবিত্র দেহকে অক্ষত পাওয়া যায়। মনে হচ্ছিল, দাফন করার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টা অতিবাহিত হয়েছে। অথচ দীর্ঘ চৌদ্দ শত বছর পূর্বে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। চোখ দু'টি খোলা ছিল। তাতে এমন অভিভূতকারী দীপ্তি ছিল যে উপস্থিত কেউ চোখ তুলে তাকাতে সাহস করেনি। একজন জার্মানী চক্ষু বিশেষজ্ঞ তো এই দৃশ্য অবলোকন করে মুসলমান হয়ে যান এবং তিনি ছাড়াও অনেক অমুসলিম ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। কোটি কোটি মুসলমানের ঈমান নবজীবন লাভ করে।