📄 মৃত্যুর সময় কেমন অনুভূতি থাকে?
মৃত্যু এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা। দুনিয়াতে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে কেউ হয়ত ধর্মের অনুসারী, কেউ হয়তো আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর রাসূলের আগমন অস্বীকার করে, আবার কেউ হয়ত পারলৌকিক জীবনকে সত্য মনে করে না। কিন্তু মৃত্যুর বাস্তবতাকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। তিক্ত ঔষধের মতই সবাইকে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।
ইসলাম মানুষকে মৃত্যু সংশ্লিষ্ট অনেক অজানা বিষয়ের জ্ঞান দান করেছে। মৃত্যুকালীন অবস্থা ও এ সময়ের কষ্ট সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করেছে। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা হল, মুসলমান মৃত্যু এবং পরকালকে জীবনের লক্ষ্যস্থল বিবেচনা করে জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে সেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাবে। অধিক পরিমাণে মৃত্যুকে স্মরণ করবে। অন্তিম মুহূর্তে কি হয়, তারপর কি হবে, পারলৌকিক জীবন কেমন হবে ইসলাম এসব কিছু স্পষ্টাক্ষরে বর্ণনা করেছে। আধুনিক বিজ্ঞান কি বলে— একবার তাও আলোচনা করা যাক।
মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। এটা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু মানুষ মাত্রই মৃত্যু কি (?), আত্মা কি (?), মৃত্যুকালে মানুষের অবস্থা কি হয় (?), আর পরেই বা কি হবে (?) এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে চায়। আধুনিক বিশ্বের ডাক্তার, বিজ্ঞানী এবং গবেষকগণ মৃত্যু সম্পর্কে গবেষণারত। মৃত্যু পথযাত্রী হাজারো মানুষের ঘটনা তাঁরা লিপিবদ্ধ করেছেন।
১৯৫৭ সালে বিশ্ব বিখ্যাত ডা. রেমন্ড মুডি এর বই 'লাইফ আফটার লাইফ' প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নতুনভাবে অন্যান্য প্রাজ্ঞ ব্যক্তি ও সর্ব-সাধারণের আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। এই বইয়ে সবচেয়ে বিস্ময়কর যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল তা হলো দেহ ছাড়া আত্মার অস্তিত্ব। কারণ বর্তমান বিশ্বের অনেক বস্তুবাদী মনে করে দেহ ছাড়া আত্মার অস্তিত্ব কল্পনা করা সম্ভব নয়। এ বইয়ের দ্বিতীয় বিস্ময়কর তথ্য হল মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে পৌঁছে প্রতিটি ব্যক্তিই এক শক্তিশালী আলোক রশ্মি (যে আলোক রশ্মিকে তারা দেখেছে) কথা বিভিন্নভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা এ আলোক রশ্মির উষ্ণতা কিংবা গুরুত্ব বর্ণনা করতে যেয়ে অক্ষমতা প্রকাশ করে।
📄 টমাস এডিসন’ এর মৃত্যুবরণের ঘটনা
'টমাস এডিসন' (১৮৪৭-১৯৩১) একজন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ছিলেন। কিছু লোকের মতে তিনি আস্তিক ছিলেন। মৃত্যুর সময় তার স্ত্রী নিজের দুহাত দিয়ে তার হাতে ধরে রেখেছিল। মনে হচ্ছিল যেন তার হৃদপিণ্ড অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। কামরায় পিনপতন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। হঠাৎ সে অন্যের সাহায্য ব্যতীতই শোয়া থেকে উঠে কয়েক সেকেন্ড সামনে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। অতঃপর স্ত্রীর দিকে ফিরে বলল, 'কি সুন্দর দৃশ্য'। সে কি দেখেছিল তা নিজে ব্যক্ত করেনি, অন্য কেউও তা বলতে পারেনি।
আরেকটি ঘটনা বিখ্যাত বক্তা হিনরী ওয়ার্ড সম্পর্কিত। তিনি মানুষকে খোদ-প্রদত্ত শান্তি সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করতেন। অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় পারলৌকিক জীবনের অবস্থা বর্ণনা করে শোনাতেন। মৃত্যুকালে তিনি ডাক্তারকে কাছে টেনে চুপিসারে বললেন, পারলৌকিক জীবনের রহস্য এখন আমার সামনে প্রকাশিত। সে রহস্যটি কি (?) তিনি তাও বর্ণনা করেন। তবে তার এ বর্ণনার ফলে সেই বিষয়টির রহস্য আরো বেশি রহস্যময় হয়ে উঠে।
📄 অস্ট্রেলিয়ান গবেষণা :
১৯৭৮ এর সেপ্টেম্বর মাসে অস্ট্রেলিয়ার একটি ছোট্ট শহর 'এলিন্সবার্গ' এ বিশ্বের এক হাজার এলাকা থেকে মনোস্তত্ত্ববিদ, উলামায়ে দ্বীন, ডাক্তার, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য চিন্তাবিদ সমবেত হয়ে এক সপ্তাহ যাবত মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করেন। অন্তিম মুহূর্তে মানুষ যে সব দৃশ্যাবলী অবলোকন করে তার মূলে কি রয়েছে? যাদেরকে মৃত বলে মনে হয়, তাদের সবার কথায় এক আশ্চর্য সাদৃশ্য পাওয়া যায়। সকলেরই অভিজ্ঞতা একই রকম হয়ে থাকে। কনফারেন্সের পর ঘোষক ঘোষণা করেন, 'এই সব অনুসন্ধান ও গবেষণার ফলে ডাক্তার, উলামায়ে দ্বীন ও বিজ্ঞানীগণও একমত পোষণ করেন যে কবরে যাওয়ার মাধ্যমেই জীবনের সমাপ্তি ঘটে না। বরং এর পরও জীবনের ধারাবাহিকতা চলমান থাকে।' তিনি আরো বলেন যে, 'এতদিন পর্যন্ত কনফারেন্সে অংশ গ্রহণকারী সবার মাঝেই এ বিষয়ে একটা অস্পষ্টতা ও সংশয় ছিল।'
ডাঃ কার্লস আওসাসজ এমন এক হাজার লোকের উপর সমীক্ষা চালান যাদের মৃত্যুর লক্ষণাদি প্রকাশ পেয়েছিল এবং চিকিৎসকগণ তাদেরকে Clinically Dead ঘোষণা করেছিলেন। তাদের তিন জন চেতনা ফিরে পেলে তাদের অন্তিম মুহূর্তের প্রত্যক্ষণ ও অনুভূত বিষয় সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তারা সবাই একই উত্তর দিয়েছিল: আমরা সাধারণভাবে মুক্তি লাভ করার মনোরম ও আনন্দময় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছি এবং পরলোক পাওয়া আপনজনদের সাক্ষাৎ পেয়েছি। তারা আমাদের বলেছেন যে, তারা আমাদের জন্য সৌভাগ্যের বাণী ও শুভ বার্তা নিয়ে এসেছেন।' কতক মনস্তত্ত্ববিদের ধারণা হল, অন্তিম মুহূর্তে মানুষ যে সব দৃশ্য অবলোকন করে তা মূলত তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিরই প্রতিচ্ছবি। ভারত ও আমেরিকার কিছু কিছু লোক অন্তিম মুহূর্ত থেকে পুনরায় চেতনা ফিরে পেয়েছে। তারা ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক রীতির সাথে পরিচিত থাকলেও আশ্চর্যের ব্যাপার হল তারা সকলেই সেই অন্তিম মুহূর্তে অত্যন্ত উজ্জ্বল আলো দেখেছে এবং নিজেদেরকে হাসি-আনন্দের সমুদ্রে অবগাহন করছে এমন অবস্থায় পেয়েছে। তাদের অনেকেই এমন তথ্যও দিয়েছে যে তারা পরলোকগত আত্মীয়-স্বজনের সাক্ষাৎ পেয়েছে।
📄 ইউরোপ ও আমেরিকার বিজ্ঞ মনস্তত্ববিদ ও বিজ্ঞানীদের তত্ত্ব
আত্মা সম্পর্কিত বিষয়াবলী তো ভিন্ন কথা আমরা বস্তুজগতের মধ্যেও 'দেখতে না পাওয়া' অনেক কিছুকে বিশ্বাস করতে বাধ্য হই। যেমন— আমরা কেউ 'পরমাণু' দেখি না। তবে সার্বজনীন ও লক্ষণগত প্রমাণাদির ভিত্তিতে তার অস্তিত্ব অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। অনেক বিজ্ঞানী উপরোক্ত ঘটনাবলীর এরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, অন্তিম মুহূর্তে রোগীকে যেসব সান্ত্বনা মূলক আশা দেওয়া হয় এবং ঔষধাদি সেবন করান হয়, উপরোক্ত আলো ও দৃশ্যাবলী তারই বহিঃপ্রকাশ। আবার অনেকের মতে ঐ সময় মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহে স্বল্পতা দেখা দেওয়ায় রোগী নানা রকম বিস্ময়কর জিনিষ প্রত্যক্ষ করে। ইউরোপ আমেরিকার বিজ্ঞানী ও মনস্তত্ত্ববিদদের মতামতের মূল কথাও এটিই।
যা হোক, যথাসাধ্য প্রয়াস ও গবেষণার পরও দুনিয়ার কোন বিজ্ঞানী মৃত্যু কি জিনিস (?), অন্তিম মুহূর্তে কি ঘটে (?)- এ প্রশ্নগুলোর উত্তর পাননি। এ বিষয়গুলো তিনিই জানেন, যিনি সৃষ্টি করেছেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেন : 'এটি মহান প্রভুর এক নির্দেশ'।