📄 খাদ্যদ্রব্য এবং ঔষধ মজুদকারী
খাদ্যদ্রব্য এবং ঔষধ জমা করে রাখা ইসলামী শরীয়ত-পরিপন্থী। এর প্রমাণও রয়েছে। মজুদ করাকে আরবী ভাষায় 'এহতেকার' বলা হয়। এর অর্থ হচ্ছে খাদ্য ও পানীয় উচ্চ মূল্য পাওয়ার আশায় বিক্রয় না করে মজুদ করে রাখা। কিছু কিছু ফকীহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় দ্রব্যসমূহকেও এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের আশায় প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্র গুদামজাত করে রাখলে সাধারণ মানুষের কষ্ট হয়। এটা কবীরা গোনাহ। মক্কা নগরীতে মজুদ করাকে ধর্মদ্রোহিতার শামিল বলা হয়েছে। এক হাদীসে বলা হয়েছে "মজুদদার অভিশপ্ত”। (ফিকহি বিশ্ব কোষ-কুয়েতী ছাপা)
ফকীহগণ এ ব্যাপারে একমত যে, মজুদদারির ফলে যদি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, তবে সরকার তাদের মজুদকৃত সম্পদ জোর করে বিক্রি করে দিতে পারবে। ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, এ অপরাধে অপরাধীদেরকে সরকার ইচ্ছা করলে শারীরিক শাস্তিও দিতে পারে। কেননা এরা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত করে। মূলত এ বিষয়টি জনকল্যাণমূলক নীতি সাথে সম্পৃক্ত এবং ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার আওতাধীন। গুদামজাত করার প্রবণতা রোধ করার জন্য অবস্থাভেদে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। মজুদদারির কারণে উদ্ভূত ফলাফলের ভিত্তিতে কম বা বেশি শাস্তির সুপারিশ হতে পারে। কিন্তু নবীজির পক্ষ হতে লানতপ্রাপ্ত হওয়া কোন মুসলমানের জন্য কিভাবে সম্ভব হতে পারে? হাদীস শরীফে ব্যবসার প্রশংসা করা হয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের কুপ্রবৃত্তি সম্পর্কীয় একটি হাদীসও আমাদের সামনে আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, অসৎ ব্যবসায়ী সে-ই যে ইসলামী নীতি লংঘন করে ব্যবসা করে। এর কারণ হল ব্যবসায়ীরা লোভের বশীভূত হয়ে মিথ্যা বলে, গুদামজাত করে, মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লাভের জন্য বিভিন্ন প্রতারণা এবং বাহানার আশ্রয় নেয়।
📄 পুরো সমাজের দুর্গতি
আরেকটি চিন্তার বিষয় হল, সাধারণত অন্যভাবে বান্দার হক নষ্ট করলে এক বা অল্প কয়েকজন ব্যক্তি কষ্টের সম্মুখীন হয়। কিন্তু গুদামজাত করার কারণে একজন নয়, বরং পুরো শহর অথবা পুরো দেশ কষ্টে নিপাতিত হয়। বলা যেতে পারে একজনের এ অপরাধের ফলে লাখ লাখ অথবা কোটি কোটি লোক কষ্ট পায়। ভুক্তভোগীদের মধ্যে নিষ্পাপ শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ব্যক্তিও থাকে। ব্যবসায়ী যদি অধিক মূল্যের আশায় ঔষধপত্র জমা করে রাখে, তবে ভেবে দেখুন, তার এ কাজটি রোগীদের উপর জুলুম বলে গণ্য হবে কি-না? অথচ দরিদ্রদের মধ্যেই রোগীর সংখ্যা বেশি হয়ে থাকে। এক হাদীসে এসেছে আমাদের রিযিক গরিব এবং দুর্বলদের নামায এবং দোয়ার বরকতে পৌঁছানো হয়। অর্থাৎ গরিব ও দুর্বলদের বদৌলতে ধনীরাও রিযিক পেয়ে থাকেন। কুরআন শরীফে সূরায়ে আহযাবের ৫৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য গুনাহের অভিযোগে অভিযুক্ত।
এ সম্পর্কীয় আরেকটি হাদীসও শুনুন। একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমআর খুতবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি লোকজনকে টপকিয়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'বসে যাও। কেননা তুমি লোকদেরকে কষ্ট দিয়েছ।' অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে 'প্রথমত তুমি দেরিতে এসেছ, দ্বিতীয়ত তুমি মানুষের ঘাড় টপকিয়ে তাদেরকে কষ্ট দিয়েছ।' এখন চিন্তা করে দেখুন, গুদামজাত করে রাখার কারণে ক্ষুধার্ত ব্যক্তির প্রয়োজনীয় সংস্থান কত কঠিন হয়। কখনো কখনো খাবার সংস্থানে দেরি হয়। এমতাবস্থায় সে কি পরিমাণ কষ্ট পায়! ঔষধ গুদামজাত করে রাখার কারণে যদি রোগী ঔষধ না পায় অথবা এত অধিক মূল্যে সংগ্রহ করতে হয় যা তার পক্ষে ক্রয় করা সম্ভব নয়, অথবা তাকে অনুনয়-বিনয় করে কর্জ নিতে হয়, তবে এ ধরনের নিপীড়িত ব্যক্তির কি পরিমাণ কষ্ট হতে পারে! নিঃসন্দেহে এই সব হতভাগ্য নবী আদমের কষ্ট ঐ লোকদের কষ্টের চেয়ে অনেক বেশি যাদের টপকিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার কথা হাদীসে বলা হয়েছে। যখন শুধু গর্দান টপকানোর মামুলি কষ্টের জন্য এত বড় ধমক এসেছে, তখন খাদ্যদ্রব্য এবং ঔষধ গুদামজাত করে লোকদেরকে কষ্ট দেওয়ার কারণে দুনিয়া আখেরাতে কি পরিমাণ শাস্তি ভোগ করতে হবে?
📄 নৈতিকতা বিরূদ্ধ কাজ
মজুতদারি এমন একটি অপরাধ যার কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতি অন্যান্য দেশেও গোপন থাকে না। অনেক সময় বিদেশ থেকে খাদ্যদ্রব্য আমদানি করতে হয়। মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটে। এই বলে ইসলামের দুর্নাম করা হয় যে, মুসলিম দেশের ব্যবসায়ীরা অনেক লোভী। তারা সম্পদের জন্য সর্বসাধারণকে কত কষ্ট দিচ্ছে। আমাদের মুসলমান ভাইয়েরা একথা বলে থাকেন যে, আমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উম্মত। নাত, ইসলামী কবিতা, সংগীত ইত্যাদিতে নবীজীর দয়ার কথা প্রায়ই বলে থাকেন। অথচ বাস্তব ক্ষেত্রে সাধারণ লোকদের কষ্ট দিয়ে ইসলাম এবং নবীজীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছেন। পাঠকরা লক্ষ্য করুন, মজুতদারি কত বড় অপরাধ! অথচ ব্যবসায়ীরা সম্পদের লোভে এমনটি করে থাকেন। (ইসলামী জীবিকা ব্যবস্থা)
📄 শরীরের হক (Right of Body)
১. ইবাদতের আধিক্য ও পরিশ্রম দ্বারা নিজের আত্মাকে কষ্ট দিও না, সারা রাত জাগ্রত থেকো না। সর্বদা রোযাও রেখো না। নফসকেও আরাম দাও। (সহীহ মুসলিম)
২. নফস সম্পর্কে এমন মন্তব্য করো না যে, আমার নফস দুর্বৃত্ত হয়ে গিয়েছে; বরং এভাবে বল-আমার নফস দুর্বল হয়ে পড়েছে। (সহীহ বুখারী)
৩. নিজের নফসকে সমৃদ্ধ বানাবে। ধন সম্পদের মুহাব্বত থেকে আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখবে। (সহীহ বুখারী)
৪. নফসকে এমন পরীক্ষায় ফেল না যা তার সহ্যের বাইরে। (ইবনে মাজাহ, আহমদ)
৫. নফসের সঙ্গে জিহাদ করবে। অর্থাৎ নিজের নফসকে আল্লাহর আহকামের অনুগামী করবে। (আহমদ, হাকেম)