📄 উত্তম মুরাকাবা (Better Meditation)
সারাদিন কাজ কর্মের ফলে যে ক্লান্তি ও অবসাদ দেহ-মনকে আচ্ছন্ন করে এবং মস্তিষ্কে ভারবোধের যে অনুভূতি জন্মে, তা হ্রাস করতে আপনি মুরাকাবার আশ্রয় নিতে পারেন। 'আল্লাহু আকবার', 'আল্লাহু কাইয়্যেমু' অথবা 'হে আল্লাহ! আমার প্রতি দয়া/রহম কর'— এ জাতীয় শব্দ পর্যায়ক্রমে একবার উচ্চশব্দে ও একবার নিরবে পনের বিশ মিনিট পড়তে থাকুন। দিনের মধ্যে অন্তত কয়েকবার এরূপ করুন। এতে আপনার শরীরের যাবতীয় তন্ত্রের (Systems) সজীবতা ও কার্যক্ষমতা ফিরে আসবে এবং আপনি প্রাণ-প্রাচুর্যপূর্ণ আনন্দঘন মনোভাবসহ সারা দিন অতিবাহিত করতে পারবেন。
আমাদের শরীরের কোন পরিবর্তনের জন্য ঐ পরিবর্তনের অনুকূল আগ্রহকে মন-মস্তিষ্কে স্থান দেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য চাই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ টানাপোড়ন ও খিঁচুনি থেকে মুক্ত করা এবং দেহের ওজন কমিয়ে ফেলা। এতে করে ক্যান্সার বিস্তারকারী কোষ সংকুচিত হয়। এর কর্ম-পদ্ধতি হলো আপনি সাদা রঙের একটা আলোক রশ্মি কল্পনা করুন যা আপনার মস্তিষ্ক থেকে পায়ের দিকে দ্রুত সঞ্চারণশীল। এছাড়া এমন অনুভূতি সৃষ্টি করুন যে, এই সাদা আলোক রশ্মি আপনার শরীরের প্রত্যেকটি নিশ্চল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সচল ও সতেজ করছে। দ্বিতীয়ত আপনার মস্তিষ্কের চাপ ও ভারবোধকে আরেকটি তরঙ্গায়িত বস্তু রূপে কল্পনা করুন এবং ভাবতে থাকুন এটা আপনার আঙ্গুল এবং পায়ের তলা থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। শ্বাস প্রশ্বাসকে স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারকারী প্রক্রিয়া বলে মনে করুন এবং প্রত্যেকটি শ্বাস-প্রশ্বাস আপনাকে শারীরিক সুস্থতার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে এ দৃঢ় প্রত্যয় আপনার অন্তরে সৃষ্টি করুন।
আপনি যে ধরনের মুরাকাবা করুন না কেন তাতে কোন ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া নাই। অধিকাংশ মুরাকাবাকারী অল্প কয়েকদিন মুরাকাবা করার পরই তা পরিত্যাগ করে। এতে করে মুরাকাবার কাঙ্ক্ষিত কল্যাণসমূহ সম্পূর্ণরূপে অর্জন করা যায় না। মুরাকাবায় সাধারণত একটি মাত্র বিষয়ে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হয়। কিন্তু সাধারণত প্রায়ই মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয় অথবা মনোযোগের বিষয়বস্তু পরিবর্তিত হয়। মন-মস্তিষ্ক আপনার চিন্তাকে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে, এক বিষয় থেকে ভিন্ন বিষয়ে নিয়ে যায়। এটাই মন-মস্তিষ্কের বৈশিষ্ট্য। এ জন্য মনোযোগকে এক বিষয়ে নিবদ্ধ করতেই কোন কোন ব্যক্তিকে বছরের পর বছর মুরাকাবা করতে হয়। জীবনে স্থিরতা ও প্রশান্তি নিয়ে আসার একটা পদ্ধতি হলো মুরাকাবা। এটাকে সঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রথমে ভালোভাবে এই পদ্ধতি শিক্ষা করা চাই। নামায প্রাথমিক পর্যায়ের মুরাকাবার এক সর্বোত্তম প্রতিকৃতি।
📄 মুরাকাবার কয়েকটি সূক্ষ্ম দিক (Points of Meditation)
১. কোন বিছানা অথবা চেয়ারের উপর স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে ঢিলে-ঢালা হয়ে বসে পড়ুন। পা দুটি বিছানার উপর রাখুন এবং কোমর সোজা উলম্বভাবে রাখুন। গভীর নিদ্রা আপনাকে আচ্ছন্ন না করা পর্যন্ত শয়ন করবেন না।
২. চক্ষু বন্ধ করে কয়েকবার দীর্ঘ ও গভীর শ্বাস নিন। নিজের মনকে বিশ্বস্ত করান যে, এই বিশ মিনিট নিতান্তই আপনার জন্য নিবেদিত এবং আপনার নিতান্তই নিজস্ব।
৩. শরীরকে স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ্য রাখুন। শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের খেয়াল মস্তিষ্কে রাখুন। বিশেষ করে বুক, ঘাড় ও মুখমণ্ডলের যে অংশে খিঁচুনি অনুভব হয়, সে সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে মনোযোগ নিবদ্ধ করুন। প্রতিটি শ্বাস ত্যাগ করার সময় আপনার শরীরের খিঁচুনি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে এমনটি কল্পনা করুন। নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সম্বোধন করে বারবার নির্দেশ দিন 'অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ তোমরা তোমাদের পূর্বের সুস্থ অবস্থায় প্রত্যাবর্তন কর।'
৪. কয়েক মুহূর্তের জন্য আপনি উপরোক্ত শব্দাবলীর উপর মনোনিবেশ করুন।
৫. আপনার ধ্যান ও কল্পনাকে কোন এক বিষয়ে অথবা স্থানে নিবদ্ধ করুন। এই অবস্থা কিছুক্ষণ বজায় রাখুন। প্রশ্বাস নেওয়ার সাথে সাথে ১, ২, ৩, এইভাবে ১০ পর্যন্ত গণনা করুন। একবার গণনা শেষ হলে পুনরায় প্রথম থেকে শুরু করুন।
৬. স্থিরভাবে উপবেশন করুন। কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করবেন না। যদি কোন অঙ্গকে নড়াচড়া করানোর ইচ্ছা হলে বা অনুভূতি দেখা দিলে আপনার দৈহিক অনুভূতির দিকে দৃষ্টি ফিরান ও অপেক্ষা করতে থাকুন যেন সে ইচ্ছা/আকাঙ্ক্ষা লোপ পায়। এতে যদি আপনার কষ্টবোধ হয় এবং এই কষ্ট যদি এতদূর বেড়ে যায় যে সে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া না করলে আপনি মরে যাবেন এমন অনুভূতি সৃষ্টি হয়, তাহলে আস্তে আস্তে সে অঙ্গটি নড়াতে থাকুন। এরপর পুনরায় আবার মনোযোগকে একীভূত করুন এবং একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে মনোযোগ নিবদ্ধ রাখুন। সেই বিষয় ব্যতীত অন্য সব কল্পনা মন থেকে দূর করুন।
৭. তন্দ্রা অথবা নিদ্রা হতে নিজেকে দূরে রাখুন। কোমর সোজা খাড়া রাখুন। কুঁজো হয়ে কোমরে ভর দিবেন না অথবা কোমর বাঁকা করবেন না।
৮. ঘড়ির দিকে নজর রাখুন। এতে করে আপনি যতটা সময় মুরাকাবার ব্যয় করবেন, তা পূর্ণ হয়েছে কিনা, তা বুঝতে পারবেন। অবশ্য এক্ষেত্রে আপনার অনুমানও সঠিক হতে পারে। অভিজ্ঞতা থেকে এটা অর্জন করা যায়।
৯. মন্থর গতিতে আপনার শরীরে নাড়া দিন। পা ও বাহু থেকে নড়া-চড়া শুরু করুন। ক্রমান্বয়ে এই নড়া-চড়া সমগ্র শরীরে বিস্তৃত করুন এবং শেষে মুরাকাবা থেকে অবসর নিন।
📄 মুরাকাবার জন্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা
* পেট খালি থাকা অবস্থায় মুরাকাবা করুন।
* সকাল বেলা মুরাকাবার উত্তম সময়।
* ঘুম দূর করার জন্য মুরাকাবা করলে মুরাকাবার পূর্বে হাত, পা ও মুখমণ্ডল ধৌত করা উচিত।
* জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন মনোভাব নিয়ে মুরাকাবা করবেন না; বরং সানন্দে নিজেই উৎসাহিত হয়ে মুরাকাবায় বসে যান।
* মোমবাতির মৃদু আলো, সুগন্ধি ইত্যাদি মুরাকাবার সহায়ক।
* মুরাকাবার সময়ও যদি অস্বস্তি বোধ হতেই থাকে, তবে এমন মুরাকাবা করা উচিত যাতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়া হয়। যেমন— ইউগা (এক ধরনের কারাতে জাতীয় কসরত), শরীর চর্চা ইত্যাদি।
* মুরাকাবা শেষ না হতেই উঠার ইচ্ছা হলে সেই ইচ্ছাকে শক্তি প্রয়োগে প্রতিরোধ করা চাই। তবে যদি এমনটি মনে হয় যে পনের-বিশ মিনিট অতিক্রান্ত হয়েছে, তবে মিনিট পাঁচেক পর পুনরায় শুরু করা দরকার।
* মুরাকাবার অভ্যাস চালু রাখা দরকার। কাঙ্ক্ষিত সফলতা লাভের উদ্দেশ্যে মুরাকাবার ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখুন। কখনো যদি মুরাকাবায় দক্ষ কাউকে পাওয়া যায় অথবা এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ আসে, তবে তা থেকে উপকৃত হওয়া উচিত। (মাকালাতে সাইন্স)
📄 আংটির যুগ
হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বরকতময় আগমনের পূর্বে হাতে গোণা দুই একজন ব্যক্তি নিজের অবস্থানুযায়ী জাতীয় পরিশুদ্ধির জন্য চেষ্টা চালাতেন। অন্তত জাতীয় দুরাবস্থা দূরকরণের চিন্তা-ফিকিরের কষ্টকে মেনে নিতেন। তখন জীবনের নানা বিষয়ে অনেক বিস্ময়কর ও বিরল প্রথা চালু ছিল। কেননা পথভ্রষ্টতার যুগে মানুষ উপদেশ অনুযায়ী আমল করবে— এটা তো দূরের কথা, উপদেশ শ্রবণকারীও সোনার হরিণ হয়ে উঠে। ঐ যুগে আংটির বেশ প্রচলন ছিল। সে যুগে যদি কেউ উপদেশ দেওয়ার জন্য বক্তৃতা শুরু করত আর তা যদি শ্রোতার নিকট অপছন্দনীয় মনে হত, তবে শ্রোতা বক্তাকে আংটি দেখিয়ে তার এই অপছন্দনীয় মনোভাব জানিয়ে দিত। সে যুগের প্রথানুযায়ী এটা বক্তার জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ছিল।
এমনই পরিস্থিতির শিকার ছিল এক ব্যক্তি। সমাজের কল্যাণকামী হয়ে লোকজনের সফলতার জন্য উপদেশ দানের স্পৃহাও তার ছিল। কিন্তু ঐ আংটির ভয়ে তিনি তার স্পৃহা অবদমন করেন। লোকালয় ছেড়ে বনে আশ্রয় নেয়। ঘাস, গাছের পাতা ইত্যাদি খেতে থাকেন এবং আল্লাহর সত্ত্বার বিভিন্ন বিস্ময়কর দিক নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতেন। তার এই ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তাকে কতিপয় অসাধারণ গুণাবলী দান করেন। তিনি পাখির দিকে দৃষ্টি দিলে পাখি মাটিতে পড়ে যেত। মনোযোগের সাথে পাথরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে পাথরও উপর থেকে পড়তে শুরু করত। এমনকি যে কোন বস্তুকেই মনোযোগ সহকারে দেখলে, তার দৃষ্টির বলে সে বস্তু প্রভাবিত হয়ে পড়ত। তাঁর এসব অলৌকিক গুণাবলী গোপন থাকে নি।
মক্কার জ্ঞানীরা তার নিকট আসা যাওয়া করত। এ সময়ই হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাবাসীকে সম্বোধন করে তাঁর নুবওয়তের ঘোষণা দেন। মক্কাবাসীরা ক্ষুব্ধ হয়ে নির্যাতন শুরু করে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার (নাউযুবিল্লাহ) চিন্তা করে এবং তাঁর কথাকে যাদুকরের কথা বলে বিবেচনা করে। এ কারণেই তারা সে যুগের বড় বড় যাদুকরদের সাহায্যে তাঁর আনীত ঐশীবানীকে খতম করতে উদ্যত হত। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
অবশেষে মক্কার নেতাজীরা ঐ সাধু ব্যক্তির কথা স্মরণ করে এবং তাকে কিভাবে মক্কায় ফিরিয়ে আনা যায় তা চিন্তা করতে থাকে। অবশেষে তারা তাকে মক্কায় প্রত্যাবর্তনের অনুরোধ জানিয়ে প্রতিনিধি প্রেরণ করে। প্রতিনিধি ঐ সাধুর কাছে তার আগমনের উদ্দেশ্যে বর্ণনা করলে সাধু তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সব বানীকে ঐশী বানী বলে প্রচার করতেন, সেগুলোকে মুখস্থ করে আনতে বলেন। এটাও জানিয়ে দেন যে, মুরাকাবায় থাকা অবস্থায় তাকে কথাগুলো বারবার শুনালে তিনি মগ্নতার চূড়ান্ত পর্যায়ে যে মন্তব্য করবেন সেটাই হবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনীত ঐশী বানীর জবাব।
এ নির্দেশনা অনুযায়ী ঐ প্রতিনিধিবর্গ মক্কায় ফিরে এসে সূরা কাউসার এর অংশবিশেষ মুখস্থ করে ফিরে যায়। অতঃপর মুরাকাবার সময় তাকে ঐ সূরা শুনানো হলে তিনি মন্তব্য করেন 'এটা সত্য এবং কোন মানুষের বাণী নহে। আমি তো মক্কার জনগণের আচরণে নিরাশ হয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছি। আমার এ জ্ঞান ছিল না যে এমন দূরদর্শী ও খোদায়ী সাহায্যপ্রাপ্ত কেউ ঐ ভূমিতে আগমন করতে পারেন যিনি মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান করবেন'। একথা শুনে তারা মুসলমান হওয়ার অভিপ্রায় নিয়ে ফিরে আসে। এভাবে মক্কার নেতাজীদের এ দূরভিসন্ধি ব্যর্থ হয়। উপরোক্ত ঘটনায় বর্ণিত ঐ সাধু ব্যক্তির শক্তি ও ক্ষমতার উৎস ছিল মুরাকাবা।