📄 মুরাকাবা চিকিৎসার মাধ্যম
(Meditation : Source of Cure or Medical Treatment)
মুরাকাবাকে আপনি 'একনিষ্ঠতা' কিংবা 'একাগ্রতা' শব্দের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে পারেন। এই দুই শব্দ শোনা মাত্রই মানুষের মনে সভ্য ও শালীন ভাবধারা উঁকি মারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এ শব্দটির প্রয়োগক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত হয়েছে। যে সমস্ত দেশে এ পদ্ধতি স্বীকৃত এবং যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হয়েছে, সেখানে জনসাধারণ স্বাস্থ্য রক্ষার্থে এটাকে যথেষ্ট কল্যাণকর হিসেবে পেয়েছে। আপনি মুরাকাবাকে দেহ ও মনের মাঝে যোগসূত্র স্থাপনকারী হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। সে সমস্ত দেশে রক্তচাপজনিত রোগী মুরাকাবার মাধ্যমে রোগ দূর করে পূর্ণ সুস্থতা অর্জন করেছে। আমেরিকায় রোগীদেরকে ঔষধপত্রাদি ব্যবহারের পূর্বেই মুরাকাবার প্রতি আগ্রহী করে তোলা হয়। কেননা আজকাল ঔষধ সেবনের মাধ্যমে রোগ-মুক্তি অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তবে মুরাকাবার সহায়তায় রোগ আরোগ্যের প্রবণতা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আরও বৃদ্ধি পাওয়া উচিত। কিন্তু এর বিপরীত হলেও সত্য যে, এই প্রবণতা উন্নত দেশগুলোতেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নিজেকে নিজের চূড়ান্ত/সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে অবহিতকরণের প্রশিক্ষণকেও মুরাকাবা বলা যেতে পারে। সাধারণভাবে এ জন্য যে পদ্ধতি অথবা কৌশল অবলম্বন করা হয় তার বিবরণ নিম্নরূপঃ
এ জন্য প্রথমত সুনির্দিষ্ট কোন বস্তুর দিকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত (উদাহরণস্বরূপ আধা ঘণ্টা) অপলক নেত্রে দৃষ্টিকে স্থির রাখার জন্য বলা হয়। এর সাথে সাথে নির্দিষ্ট কোন শব্দ অথবা বাক্য পুনঃপুনঃ উচ্চারণ অথবা দিলে দিলে স্মরণ করার নির্দেশও দেওয়া হয়। এতে করে সময় অতিক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে দেহের শিরা উপশিরাসমূহের গতি ক্ষীণ হতে থাকে, রক্তের উচ্চচাপ কমতে থাকে। এছাড়া চিত্তাকর্ষক মানসিক অবস্থায় সবাই নিজেকে পেশীর খিঁচুনি ও টানাপোড়ন থেকে মুক্ত বলে অনুভব করে। সাথে সাথে অন্তরে প্রশান্তির এক আনন্দঘন স্পর্শে মনে হয় জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় মুহূর্ত এটিই।
📄 মুরাকাবা থেকে প্রাপ্ত কল্যাণসমূহ (Advantages of Meditation)
মুরাকাবার ফলে অন্তর সজীব ও নতুন, শরীর পাতলা ও স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং নিজেকে শক্তিশালী মনে হয়। এ বিষয়ে পারদর্শী ও নিয়মিত অনুশীলনকারী বেশ কিছু মনীষী তো মুরাকাবার কল্যাণ ও গুরুত্ব বর্ণনায় এত দূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছেন যে, তাদের মতে দুনিয়াতে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রেও মুরাকাবার বিরাট ভূমিকা আছে। এ বিষয়ে যে ব্যক্তির কিছুটা অভিজ্ঞতা ও চর্চা আছে, সে তো হতবাক যে তারা এর একেবারে শুরুর দিকে অবস্থান করেই মাত্র কয়েক পলকেই খিঁচুনি ও পেশীর টানাপোড়ন থেকে মুক্তি, নবীন ও সুস্থ-সবল হবার অনুভূতি, জীবনকে দীর্ঘায়িত করার প্রত্যাশা ইত্যাকার কল্যাণসমূহ পায়। সুতরাং এটার পূর্ণতা তাদেরকে সাফল্যের সুউচ্চ চূড়ায় পৌঁছাবে।
মুরাকাবার নিখাদ মূলনীতি হলো অন্তর ও মস্তিষ্কের স্থিরতার উপর ভিত্তি করে মানুষের দৈহিক ও মানসিক সুস্থতা পরিপূর্ণ রূপে প্রতিষ্ঠিত করা। মুরাকাবায় পারদর্শীদের আরো মত হলো, মুরাকাবার সাথে আরও কতিপয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে এবং প্রচলিত জীবনধারা ও কর্মজীবনে পরিবর্তন এনে নানা দৈহিক রোগ-ব্যাধি, উদ্যম ও সাহসিকতার ঘাটতি, খাদ্য গ্রহণের অনিয়ম, মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ, কোলেস্টেরল এর মাত্রাধিক্য, নেশার প্রতি আসক্তি, মস্তিষ্কের চাপ এবং ক্যান্সারের মত অনিষ্টকর ও প্রাণঘাতী রোগ থেকে আরোগ্য লাভ সম্ভব হতে পারে।
📄 আমেরিকান হাসপাতালের গবেষণা (Reserch of American Hospital)
সম্প্রতি আমেরিকার এক বড় হাসপাতালে ৯ হাজার রোগীর উপর পরীক্ষা চালানো হয়। এইডস এবং সন্তান জন্ম দানে অক্ষমতার মতো রোগে আক্রান্ত মহিলারাও ঐ রোগীদের মধ্যে ছিল। মুরাকাবার কয়েকটি স্তর/পর্যায় অতিক্রম করার পর মাত্র ছয় দিনের প্রোগ্রাম সম্পন্ন করে প্রায় ৩৬ শতাংশ মহিলা গর্ভধারণ করেন এবং অবশিষ্ট রোগীরাও যথেষ্ট আরোগ্য বোধ করেন।
যে সমস্ত লোক কয়েক বছর যাবৎ মুরাকাবায় অভ্যস্ত, তাদের শরীরে ডি.এইচ.ই.এ (DHEA) হরমোনসমূহ, মুরাকাবায় অভ্যস্ত নয় এরূপ লোকের শরীরের তুলনায় বেশি মাত্রায় পাওয়া যায়। অথচ বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এ হরমোনের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার কথা। এ জাতীয় লোকেরা তুলনামূলকভাবে কম রোগাক্রান্ত হয় এবং হৃদরোগ তো বলা যায় তাদের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে।
📄 মনস্তাত্ত্বিক রোগের প্রতিকার
(Treatment of Psychologial and Mental Diseases)
উন্নত দেশসমূহে চিকিৎসকবৃন্দ রোগীদেরকে মুরাকাবার প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। এতে করে রোগী স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যথা এবং কষ্টকে জয় করে, শরীরে ক্ষত থাকলে তা দ্রুতগতিতে সেরে উঠে। শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য বিশুদ্ধ রক্তের প্রয়োজন। রক্ত অক্সিজেন এবং অন্যান্য আর্দ্র উপাদান বাহিত রোগ-ব্যাধিকে শরীরের প্রতিটি কোষে পৌঁছে দেয়। অসুস্থতা, ক্ষত, ভীতি, অস্থিরতা, স্নায়ু চাপ, ক্রোধ এবং এ রকম আরো কারণে রক্তবাহী ধমনী ও শিরা বন্ধ হয়ে যায় এবং শরীরের খিঁচুনি ও টানাপোড়ন সৃষ্টি হয়। রোগী এতে করে আরাম ও কষ্টের পর্যায়ক্রমিক আবর্তে পতিত হয় এবং এ অবস্থা তাকে 'আর কখনও সুস্থ হবো না'—এমন ভীতিকর মানসিক অবস্থায় উপনীত করে।
এসব ক্ষেত্রে মুরাকাবা রোগীর অস্থিরতা ও কষ্ট দূর করে এবং রোগী শান্তি অনুভব করে। রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করে। মনস্তাত্ত্বিক রোগ-ব্যাধির ক্ষেত্রেও নিয়মতান্ত্রিক মুরাকাবার ফলে জ্ঞানগত উপলব্ধি ক্ষমতা ফিরে আসে এবং দৈহিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। মুরাকাবা আপনার কর্মস্পৃহা ও দক্ষতা উভয়কেই বৃদ্ধি করে। চিন্তা ও কল্পনার জগতে পরিপূর্ণ মনোনিবেশ সহকারে বৎসরে ১০ দিনের এমন মুরাকাবা যাতে মুরাকাবাকারী প্রতি মুহূর্তে নিজের মনোযোগ দৈহিক অনুভূতি সম্পন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর নিবিষ্ট করে এবং এক ঘণ্টা সময় কোন রকম নড়াচড়া ছাড়াই বসে থাকে, এর মাধ্যমে শারীরিক অনুভূতি লোপ করার অনুশীলন হয়ে থাকে।