📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 ধর্মের অপর নাম যুক্তি না কি আনুগত্য

📄 ধর্মের অপর নাম যুক্তি না কি আনুগত্য


মানুষের যুক্তিবৃত্তি (Faculty of Reasoning) অপূর্ণ। কিন্তু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনীত ধর্ম পরিপূর্ণ। মানুষ স্বভাব ও প্রকৃতিগতভাবেই অনেক দুর্বল। অক্ষমতা তার ছায়া। মানুষের যুক্তি সবসময়ই উচ্চতর জীবন পরিক্রমার সফল প্রক্রিয়া বুঝে উঠতে পারে না। তার অবস্থাতো এমনই যে জীবনের কোন এক কিনারে কখনও উঁকি মারতে সক্ষম হলেও পার্শ্বস্থ স্থানের দিকে চোখ তুলে তাকাতেও সক্ষম নয়। তাও এ সামান্য প্রাপ্তির জন্য তাকে চরম কষ্ট স্বীকার করতে ও বারবার ব্যর্থতায় দৃঢ়পদ থাকতে হয়।

জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষার ইতিহাস পঠনে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠে। অনেকে ধর্মকে যুক্তির কষ্টিপাথরে বিচার করতে চায়। এ মন-মানসিকতা সম্পন্ন লোকের সংখ্যা অনেক। এদের এক অংশ তাদের অপূর্ণ যুক্তি ও বোধশক্তির মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ নয় বলে ধর্মের বড় বড় বিধানকে অস্বীকার করেছে, সে বিধানগুলোকে গুরুত্বহীন বলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আবার আরেক অংশ ধর্মের শুধু বাহ্য সাজসজ্জা পরখ করেই ধর্মের সারমর্ম অনুধাবন করতে চেয়েছে। প্রকৃত ধর্ম থেকে এদের দূরত্বও পূর্বোক্ত শ্রেণির চেয়ে কম নয়। কেননা ধর্ম তো কেবল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আপাদমস্তক, অন্তর-বাইরের পূর্ণ অনুকরণের নাম। আমার পর্যবেক্ষণ তা স্বীকার করুক বা না করুক বুদ্ধি তাকে বুঝে উঠতে সক্ষম হোক অথবা ব্যর্থ হোক, অন্যজনে সেটাকে সত্যায়ন করুক অথবা মিথ্যা বলে বিসর্জন দিক, আমি তো সর্বাবস্থাতেই পবিত্র কুরআনের ঐ আয়াতের অনুসারী 'শ্রবণ কর আর স্বীকার কর'। অবশ্য এটা একটা ভিন্ন বিষয় যে আজকে আধুনিক বিজ্ঞান ইসলামের নানা বিষয়ে অনুসন্ধান ও নিরীক্ষার যে নতুন প্রান্তরে পদার্পণ করেছে তার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এই ক্ষুব্ধ জীবন থেকে ইসলামের আলোকময় জীবনের দিকে প্রত্যাবর্তন করা। 'ইসলামে ফিরে যাও' এই স্লোগান বিজ্ঞানের অক্ষমতার প্রমাণ।

পরীক্ষা নিরীক্ষা থেকে যে সারবস্তু বেরিয়ে আসে তাতে এটা সুস্পষ্ট যে, মানুষের বাহ্য দৃষ্টি প্রতারণার শিকার হয়। তবে আমরা যদি ধর্মের আলোকে পথ-প্রদর্শক হিসেবে মেনে নিই, তবে আমাদের দৃষ্টিতে একমাত্র হক বা সত্যই ধরা পড়ে। পক্ষান্তরে ধর্মের আলো ছাড়া আমার দৃষ্টিও প্রতারণার শিকার; আপনার দৃষ্টিও এ থেকে মুক্ত নয়।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 ঘটনবলী (Events)

📄 ঘটনবলী (Events)


জুলিয়ান কিকস নৌবাহিনীর এক লেফটেন্যান্ট। তিনি তাঁর 'সমুদ্র ভ্রমণ কাহিনী' নামক গ্রন্থে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। (উল্লেখ্য যে নিম্নোক্ত ঘটনায় জ্ঞানী ও অজ্ঞ সকলেই আছে)

গ্রন্থাকার লিখেছেন, লেবারসার নামের একটি জাহাজ ঝড়ো হাওয়ায় পড়ে হারিয়ে যায়। পরে 'আবিল পুল' নামের আরেকটি জাহাজ ঐ জাহাজের অনুসন্ধানে নিয়োজিত ছিল। সময়টাও বেশ ভালো ছিল। সূর্যের আলো ও তাপে কোন কৃচ্ছ্রতা ছিল না। আকস্মিকভাবে একটা পতাকা দৃষ্টির সীমায় আসে এবং তা ছিল কোন ডুবন্ত জাহাজের ইঙ্গিত। জাহাজে এমন কেউ ছিল না যে এ দৃশ্য অবলোকন করেনি। একটা জনাকীর্ণ জাহাজ তার আরোহীসহ ডুবে যাচ্ছে এবং যাত্রীরা 'বাঁচাও' 'বাঁচাও' করে চিৎকার করছে। যে জাহাজের যাত্রীরা এ দৃশ্য দেখছিল, তাদের প্রত্যেকেরই কম-বেশি আগ্রহ থাকলেও জাহাজ-চালক তাদের সাথে আলোচনা ব্যতীতই ঐ জাহাজের ডুবন্ত আরোহীদের উদ্ধার করার জন্য রওনা হয়। তারা যতই ঐ ডুবন্ত জাহাজের নিকটবর্তী হচ্ছিল, ডুবন্ত যাত্রীদের চিৎকার ধ্বনি ততই উচ্চতর হচ্ছিল। কিন্তু যখন এই উদ্ধারকারী জাহাজ লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে তখন সেখানে কিছু বৃক্ষ ছাড়া আর কিছুই তাদের দৃষ্টিতে আসে নাই। সেখানে কোন মানুষের লক্ষণাদিও ছিল না, কোন জাহাজও ডুবে যায় নি। এতে করে তাদের পূর্বোক্ত ধারণা দূর হয়ে গেল।

এ ঘটনা থেকে অনুমান করুন এই জাহাজের সব আরোহী কিভাবে এক বিরল ও বিস্ময়কর ধারণা নিজেদের মন ও মস্তিষ্কে স্থান দিয়েছিল এবং সেটা যে সম্পূর্ণ নির্ভুল এ বিষয়ে তাদের বিশ্বাস এত দৃঢ় ছিল যে, কেউ তাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ করেনি। জাহাজের সব আরোহীই তাদের কল্পনার এক বিষয়কে বাস্তব ঘটনা বলে ভুল করেছে।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 মসু দেবির ঘটনা (Events of Mosu-Divy)

📄 মসু দেবির ঘটনা (Events of Mosu-Divy)


এই বিষয়কে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটা ঘটনা নিরীক্ষণ করা হয় যা পরবর্তীতে নাম করা মনোবিজ্ঞানী মসু দেবি কর্তৃক 'ইলমে নফসিয়াত' নামক দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ঘটনাটি এ রকম:

একবার মসু দেবি ইউরোপের প্রখ্যাত বিজ্ঞানীদের এক সম্মেলন আহ্বান করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ঐ বিজ্ঞানীগণ এক জায়গায় একত্রিত হয়ে তার বিস্ময়কর অতি-প্রাকৃতিক কার্যক্রম (তেলেসমাতি কার্যক্রম) সমূহ পর্যবেক্ষণ করবেন। নির্দিষ্ট সময়ে বিজ্ঞানীদের সবাই উপস্থিত হলে মসু দেবি তাদেরকে কিছু জিনিস দিয়ে সেগুলোকে ইচ্ছামত সীলমোহর মেরে দেওয়ার জন্য বললেন। ঐ জিনিসগুলো সীল মোহরকৃত হওয়ার পর তিনি ঐ বিজ্ঞানীদের প্রত্যেকের উপর আত্ম-বিনাশন ও আত্ম-গঠনে প্রচলিত সব কলা-কৌশল প্রয়োগ করে। তার এই সব কার্যক্রম এতই আশ্চর্যজনক ছিল যে, উপস্থিত জ্ঞানীগণ তা প্রত্যক্ষ করেই মসু দেবিকে এই সনদপত্র প্রদান করেন যে, এ কাজগুলোর সবই মানবীয় সামর্থ্য ও শক্তির বহির্ভূত অদৃশ্য জগতের অন্তর্ভুক্ত।

মসু দেবি এই সনদপ্রাপ্ত হওয়ার পর নিজেই প্রকাশ করে যে এসব কিছুই জাদু। কোন আত্মিক শক্তি, কাশফ অথবা অন্য কোন বাহ্য শক্তির সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। এই ঘটনা এখানে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল মসু দেবির এই বিস্ময়কর ঘটনা থেকে কোনটা বেশি বিস্ময়কর মনে হয়, মসু দেবির দক্ষতা; না-কি এ সব জ্ঞানী ব্যক্তি কিভাবে এই জাদুগুলোকে সত্যায়িত করল সে বিষয়টি- সেটা স্পষ্ট করা।

মসু তার যুক্তিকে আরও দৃঢ় করার জন্য তৃতীয় আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। প্যারিসের এক স্থানে এক বালকের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ঘটনাক্রমে ঐ লাশের পাশ দিয়ে আরেকটি বালক যাচ্ছিল। সে লাশ দেখেই জানালো যে এ লাশটি তার এক সহপাঠীর। দ্বিতীয় এই বালকের বর্ণনানুযায়ী তার বন্ধুর মাকে ঘটনাস্থলে আনা হলে তিনি লাশ দেখা মাত্রই নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হলেন না। তিনিও জানালেন যে এটা তাঁর ছেলের মৃতদেহ এবং তার এ ছেলেটি বেশ কিছু দিন থেকে নিখোঁজ। এরপর মায়ের বর্ণনা মতে তার চাচাকে এ বিষয়ে অবহিত করানো হলে সেও ঐ লাশ তার ভাতিজার-এ কথাই বলল। এরপর বিচারক সাক্ষ্য প্রমাণাদি মাধ্যমে বালকটির কাঁধে লটকানো পরিচয়সূচক বিশেষ চিহ্ন দেখে সনাক্ত করলেন যে, এটা ঐ মহিলার ছেলেরই মৃতদেহ। এভাবেই সমস্ত নিরীক্ষা সম্পূর্ণ হয়।

তিন সপ্তাহ পর জানা গেল প্রকৃত পক্ষে ওটা যে ছেলের মৃতদেহ, সে প্যারিসের অধিবাসী নয়; বরং অন্য শহরের। তাকে এক কোম্পানি প্যারিসে এনেছিল। অবশেষে ঐ মা, বন্ধু, চাচা, শিক্ষক-যারা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তারা নিজেদের ভুল বুঝতে সক্ষম হলেন।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 দৃষ্টির প্রতারণা

📄 দৃষ্টির প্রতারণা


দৃষ্টির ধোকা ও প্রতারণার বিষয়ে ডাক্তার লেবান যে উক্তি করেছেন তার গুরুত্ব অনেক বেশি। মানব সমাজে একমাত্র প্রেরিত পুরুষ বা নবী-রাসূল আলাইহি সালাম এবং উম্মতের সংশোধনকারীগণ ব্যতিত অন্য যে কোন ব্যক্তিই মানুষের পারস্পরিক আচার-আচরণের মূলতত্ত্ব অনুধাবনের ক্ষেত্রে দৃষ্টির প্রতারণার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে। দৃষ্টির এই প্রতারণা প্রত্যেক যুগেই মানব সমাজের অপরিসীম ক্ষতির কারণ হয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনায় এই জাতীয় প্রতারণার যত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, তার সংখ্যা কম নয়। এ কথা বললেও হয়তো অত্যুক্তি হবে না যে, মানব ইতিহাসের বৃহত্তম অংশই সবচেয়ে মেধাবী ব্যক্তিদের দৃষ্টির প্রতারণা সম্পর্কিত বর্ণনায় ভরপুর। প্রত্যেক যুগে নবী-রাসূলদের আগমন হয়েছে এ কারণেই যে, তাঁরা দৃষ্টিভ্রমে পতিত ব্যক্তিদের ভ্রান্তিসমূহকে প্রকাশ করে দিবেন এবং তাদেরকে জীবনের সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন।

সাম্প্রতিক সময়ে সোস্যালিজম ও পুঁজিবাদ নামের জীবন ব্যবস্থার যে দুটি রূপ আমাদের সামনে উপস্থিত, এগুলো বর্তমান যুগে যুক্তির/দৃষ্টির প্রতারণারই ভিন্ন নাম। গত ৭০ বছর যাবত সোস্যালিজমের ভক্ত কোটি কোটি বনী আদম সব মানুষের সমস্যাবলীকে এক ও অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অভিজ্ঞতা সোস্যালিজম সম্পর্কে এ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করে যে এটা শুধু যুক্তি/দৃষ্টির ভ্রষ্টতা। সমগ্র মানব জাতির সমস্যা দূর করা তো সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়, কিন্তু এ মতবাদ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখারও উপযুক্ত নয়।

পুঁজিবাদের অবস্থাও এ থেকে ভিন্ন নয়। সমগ্র পশ্চিমা দুনিয়া আজ এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে সর্বোত্তম, সাফল্যমণ্ডিত ও প্রগতিপন্থী বলে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছে। কিন্তু পুঁজিবাদী মতবাদ সমগ্র দুনিয়াতে অর্থনৈতিক জীবনে যে দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টি করেছে তার নজির ইতিহাসে বিরল। তার এ ব্যাধিকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে আশি বছরের বৃদ্ধের বার্ধক্যের সাথে তুলনা করে। বার্ধক্য এমন একটা অবস্থা যখন এক রোগের উপশম হতে না হতেই আরো এক বা একাধিক রোগ তাকে আক্রান্ত করে। অনুরূপ অবস্থার শিকার আজকের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা. দুনিয়ার সমগ্র সম্পদের ৮০ শতাংশ বিশ্বের মুষ্টিমেয় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের হাতে আবর্তিত হচ্ছে। পক্ষান্তরে কোটি কোটি বনী আদম ন্যূনতম মৌলিক ও মানবীয় প্রয়োজনগুলো পূরণের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা রাখে না। এতদসত্ত্বেও পুঁজিবাদী বিশ্ব তাদের অতৃপ্ত আত্মাকে তৃপ্তকরণার্থে দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ কুক্ষিগত করতে উন্মত্ত। এতে করে সমগ্র দুনিয়ার মানব সন্তানেরা আজ নানারূপ নির্যাতন ও দুর্দশার শিকার। তাদের সামনে এমন কোন নিয়ম-নীতিও নেই যা তাদেরকে পুঁজিবাদের পূজা ও অতৃপ্ত লোভ থেকে বিরত রাখতে পারে। আল্লাহ চাহে তো অতি শীঘ্রই দুনিয়া এর তাণ্ডবলীলা থেকেও মুক্ত হয়ে শান্তির নিশ্বাস ফেলবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00