📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা

📄 রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা


দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্বয়ং একটি বিস্ময়কর কর্মকৌশল। জটিলতার দিক থেকে এটা মস্তিষ্কের চেয়ে কম নয়। এই ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে বুঝে উঠাও এ পরিমাণই কঠিন। মৌলিকভাবে এটি রক্তের বিভিন্ন প্রকারের শ্বেত কণিকা (WBC) সমূহের সমষ্টি। এ ধরনের কণিকা থাইমাস গ্রন্থি, অস্থিমজ্জা এবং অন্যান্য অস্থিসন্ধিতে তৈরি হয়। এরা রক্ত চলাচলের সময় সঙ্ঘটিত রাসায়নিক পরিবর্তনের প্রতিও অতি সংবেদনশীল। এ কণিকাগুলো রণাঙ্গনের সম্মুখ ভাগে অবস্থানকারী আত্মরক্ষা ব্যুহে লড়াইকারী সিপাহীদের ন্যায়। এরা সবসময় সক্রিয় থাকে এবং এন্টিবডি সৃষ্টি করে শরীরে অনুপ্রবেশকারী জীবাণুকে খুব দ্রুত শেষ করে। অনেক সময় এগুলো এত বেশি সংবেদনশীল হয় যে নির্দোষ অণুজীবের বিরুদ্ধেও কঠোর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে থাকে। এটাকে আমরা এলার্জি হিসাবে আখ্যা দিয়ে থাকি। এক প্রকারের শ্বেত কণিকা শরীরে সৃষ্ট ক্ষয় পুনর্গঠন কাজে নিয়োজিত। এদেরকে 'মাইক্রোফেগাস' বলা হয়। এছাড়া অন্য আরেক প্রকার শ্বেত কণিকা রয়েছে যাকে ন্যাচারাল কিলার বা সংক্ষেপে এন.কে বলা হয়। এটি ভাইরাস এবং টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াই করে। গবেষণায় এ কথা জানা গেছে যে, এন.কে বিভিন্ন আবেগ দ্বারা প্রভাবিত হয়। মহিলাদের স্তন ক্যান্সারের উপর এক দীর্ঘ গবেষণায় একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, এন.কে এর (স্বাভাবিকের চেয়ে) কম সক্রিয়তাও এ রোগের একটি বড় কারণ।

"পিটসবার্গ ইনস্টিটিউট" এর মহিলা গবেষক 'লেভী' উদঘাটন করেন যে, মনস্তাত্ত্বিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ এবং খিঁচুনি রোগীর N. K এর স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের উপর এতটা প্রভাব ফেলে যে, এ সব কণিকার কর্ম শক্তি অর্ধেক হ্রাস অথবা দ্বিগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে。

পেনসিলভিনিয়া ভার্সিটির গবেষক 'সেলগম্যান' নিজের অসহায় মুহূর্তের উদ্ভূত অনুভূতির উপর গবেষণা চালিয়ে প্রমাণ করেন, যে সব লোক স্বভাবত হতাশাগ্রস্ত হয়, তারা যে কোন বিষয়ে কেবল নেতিবাচক দিককেই বিবেচনা করে এবং নিরাশ থাকে। অন্যভাবে বলা যেতে পারে তারা নিজেদেরকে অক্ষম অনুভব করে এবং অপরকেও তাদের অক্ষমতাকে বোঝাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। জীবনকে পরিবর্তন করার ইচ্ছা তাদের থাকে না। প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলে উঠার শক্তিও তাদের ধীরে ধীরে লোপ পায়। পক্ষান্তরে প্রতিকূল অবস্থাকে প্রতিরোধ করার আবেগ যদি কারো মাঝে সক্রিয় থাকে, তখন তার শরীরও রোগ-ব্যাধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে প্রস্তুত হয়。

প্রমাণ হিসাবে সেলগম্যান তার নিজস্ব মূলনীতির আলোকে পরীক্ষা চালান। তিনি কয়েকটি ইঁদুরের উপর হালকাভাবে বিদ্যুতের শকট লাগান। তাদের মধ্যে কয়েকটি ইঁদুরকে শকটের আঘাত থেকে পালিয়ে যাওয়ারও সুযোগ দেয়া হয়। পরবর্তীতে দেখা যায় যেসব ইঁদুর পালাতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের মধ্যে সহজেই নৈরাশ্য দেখা দেয়। এমনকি কোন বিপদ থেকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করে দিলেও তারা সে সুযোগ ব্যবহার করে না; বরং উদাসীন হয়ে বসে থাকে।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের পক্ষে নতুন যুক্তি

📄 ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের পক্ষে নতুন যুক্তি


শরীরবৃত্তীয় নতুন চিন্তা-গবেষণার দ্বারা কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা এখনো মেলে নি। স্নায়ুতন্ত্র মস্তিষ্কের কেন্দ্র থেকে শাখা প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে আছে। স্নায়ুতন্ত্রের এমন বিন্যাস থেকেই মূলত শরীরের প্রতিটি কর্মের উপর এর প্রতিক্রিয়া অনুমান করা যায়। মনে করা হয়, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অত্যন্ত সূক্ষ্ম সংযোগের মাধ্যমে শ্বসনতন্ত্র, রক্ত সংবহনতন্ত্র ইত্যাদি স্বয়ংক্রিয়তন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্রীয় স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের সাথে যুক্ত। এ সম্পর্কের কারণে মনে হতে পারে মস্তিষ্কের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করে। প্রশ্ন হল, যদি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা মস্তিষ্ক ছাড়াই সমস্ত কাজ করতে পারে তবে মস্তিষ্কের প্রয়োজনীয়তা কি? ৭০ দশকে সানডিয়াগোর কিরন রোজ এ ধাঁধার সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি ইঁদুরের থাইমাস গ্রন্থিতে একটি রঙ্গীন ধাতব পদার্থ প্রবেশ করান। ঐ রঙ্গীন ধাতুর চলাচল পদ্ধতি থেকে রোজ প্রমাণ করেন যে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাঝে দ্বিমুখী সম্পর্ক রয়েছে。

সম্ভবত ঐ সময়েই আলবামা বার্মিংহাম-এর এডভেন বেলি লক আবিষ্কার করেন যে, দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও পেপটাইড হরমোন সৃষ্টি করতে পারে। অথচ পূর্বে ধারণা করা হত যে, এ হরমোন শুধু মস্তিস্কেরই পাওয়া যায়। এ কারণে এদেরকে নিউরো পেপটাইড বলা হয়। পরে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, মস্তিষ্ক যে সব হরমোন সৃষ্টি করে রোগ প্রতিরোধক কণিকাগুলোও সে সব হরমোনের প্রায় সবগুলোই সৃষ্টি করে থাকে। বেলি লকের গবেষণা দ্বারা গুরুত্বপূর্ণ এ তথ্যটি উদঘাটিত হয় যে, শরীরে অনুভূতি সৃষ্টিকারী আরো একটি ব্যবস্থা বিদ্যমান যা পরিচিত পঞ্চ ইন্দ্রিয় যথা- চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক থেকে পৃথক। আর তার নাম হচ্ছে প্রতিরোধ ব্যবস্থা। প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ শরীরে জালের মত বিস্তৃত এ ব্যবস্থা ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধকারী একটি অভ্যন্তরীণ অনুভূতি। যদি এ অনুভূতিটি ঠিক থাকে তবে অন্যান্য ইন্দ্রিয় সমূহের ন্যায় এটিও মস্কিষ্ককে শরীরের ভবিষ্যৎ বিপদ সম্পর্কে অবহিত করে। বাইরের পরিবেশের সাথেও তার সম্পর্ক আছে। বেলি লকের চিন্তাধারা অনুযায়ী মস্তিষ্ক এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কয়েকটি বিষয়ে একে অপরের অনুরূপ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শ্বেতকণিকা সমূহও মস্তিষ্কের ন্যায় নিউরো পেপটাইড এর প্রতিক্রিয়া গ্রহণে সক্ষম। আর উভয়েই হরমোন সমূহের প্রতি সমানভাবে প্রতিক্রিয়াশীল যদিও সেগুলোর উৎস ভিন্ন।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 বোতলের মধ্যে আবেগ (Emotions in Bottle)

📄 বোতলের মধ্যে আবেগ (Emotions in Bottle)


এটা জ্ঞাত বিষয় যে, মস্তিষ্ক এবং স্বয়ংক্রিয় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা একটি নির্দিষ্ট ও নিজস্ব প্রক্রিয়ায় একে অপরের কাছে ধারাবাহিকভাবে বার্তা পাঠাতে থাকে। গবেষণা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, দীর্ঘ দিনের মানসিক চাপের কারণে বৃক্কের গ্রন্থিগুলো করটি-কো-স্টেরয়েড নামক হরমোনটি অধিক হারে নিঃসরণ করে। এ রাসায়নিক বার্তা দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ফলে নির্জনতা, অসহায়ত্ব, নির্জীবতা ইত্যাদি দেখা দেয় এবং মানুষ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ মানসিক অবস্থা কার্যত মানুষকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার কারণ হয়。

অন্য দিকে জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের একজন বায়োকেমিস্ট এবং থাইমাস গ্ল্যান্ড বিষয়ক প্রধান গবেষক আবালন গোল্ডস মার্টিন জানতে পারেন, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কিছু উপকরণ যেমন- লিমোলোকেন নিজের অদৃশ্য প্রভাবের মাধ্যমে ডিপ্রেশন সৃষ্টি করে। এতে প্রমাণিত হয় যে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার খাঁটি মৌলিক উপকরণগুলো নিজস্ব প্রভাবের দ্বারা মস্তিষ্ককে প্রভাবান্বিত করে। অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ কাজে নিয়োজিত উপাদানসমূহ মস্তিষ্কের সাথে সম্বন্ধযুক্ত。

একে অপরের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার এ দ্বিমুখী প্রক্রিয়া এভাবেই শেষ হয় না। গোল্ডস মার্টিন বলেন, যদি এ উপাদানসমূহ বাস্তবেই মস্তিষ্কের বিপাকীয় এবং শরীর তত্ত্বীয় কার্যাবলীর উপর প্রভাব বিস্তার করে, তবে তা অন্যান্য কর্মকাণ্ডের উপরও প্রভাব ফেলবে। যদি শরীরে উৎপাদিত রাসায়নিক পদার্থ মানসিক অবস্থার উপর প্রভাব ফেলে, তবে তার অর্থ হবে আমরা আবেগকে জড় পদার্থে পরিবর্তিত করেছি। এখন তাকে বোতলের ভেতরেও ভরে রাখা সম্ভব হবে।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 মন একটি জটিল আই.সি

📄 মন একটি জটিল আই.সি


মন এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মূলতত্ত্ব যতই সামনে আসছে ততই দিবালোকের ন্যায় একথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আমরা ক্রমান্বয়ে এক রহস্যাবৃত জগতের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। একটি বিস্ময়কর রহস্যের জাল আমাদেরকে জড়িয়ে ফেলছে। শরীর এবং মন একটি আরেকটির সাথে এমনভাবে সম্পৃক্ত যে, তাদেরকে আলাদা করা এবং দুই বস্তু গণ্য করা কঠিন। এখন তিনশত বৎসর পূর্বের ঐ মতবাদ, যে মতবাদে বলা হয়েছিল মন এবং শরীরের চিকিৎসা পৃথকভাবে হওয়া চাই, তা মিথ্যা প্রতিপন্ন হচ্ছে। এখন এ সিদ্ধান্তই গ্রহণ করা হয়েছে যে, এদের একটি অপরটিকে নিজের কার্যক্রমে যুক্ত করে। এরপরও এটা স্পষ্ট নয় যে, চিকিৎসা ক্ষেত্রে এ আবিষ্কারের স্বতন্ত্র কি প্রভাব পড়বে? কিছু বিশেষজ্ঞের মতামত হল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নিজের ইচ্ছামাফিক ব্যবহার করে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে যে কোন রোগের চিকিৎসা শুধু মানসিক শক্তি দ্বারা করা সম্ভব, এমনকি শরীরের সূক্ষ্ম স্নায়ুগুলোর কার্যকারিতাও আবেগের সাহায্যে বাড়ানো যাবে。

নতুন পরীক্ষায় এ কথা প্রমাণিত হয় যে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট কণিকাগুলোর নড়া-চড়া স্নায়ু ও পেপটাইড এর নিয়ন্ত্রণাধীন এবং নিউরো পেপটাইড আবেগের উঠা-নামা দ্বারা প্রভাবিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে এই পেপটাইড যে কোন রোগ প্রতিরোধ করার জন্য উপকারী। প্রেট বলেন, এমন এক সময় আসবে যখন লোক যেকোন রোগের চিকিৎসা নিজের সাথে রেখেই চলাফেরা করবে। কেননা, স্নায়ু সম্পূর্ণ শরীরের উপর রাজত্ব করে এবং শরীরকে রুগ্ন অথবা সুস্থ করতে এর ভূমিকাই বড়। বাস্তবে শরীর অন্তরের প্রকৃত অবস্থার কর্মগত রূপ বা বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00