📄 আম্বর মাছ (Aumber Fish)
আম্বর মূলত এক প্রকার তিমি মাছ। এই মাছ গ্রীষ্ম অঞ্চলীয় সমুদ্রগুলোতে সাধারণত পাওয়া যায়। ইংরেজিতে তাকে (স্পার্ম হোয়েল) বলা হয়ে থাকে। বিভিন্ন সমুদ্রে ১২টিরও অধিক প্রজাতির তিমি পাওয়া যায়। ১৯০৩ খৃষ্টাব্দে আটলান্টিক মহাসাগরে একটা তিমি মাছ পাওয়া যায়। এটা দৈর্ঘ্যে ছিল ১১১ ফুট। এর ভর ছিল ৯০ টন। আরব সাগরের উপকূলে প্রাপ্ত তিমির দৈর্ঘ্য গড়পড়তায় ৭০ ফুট। তিমি জাতীয় মাছের মধ্যে শুধু আম্বর প্রজাতিরই খাদ্য নালী এত বেশি প্রশস্ত যে তা একজন মানুষকেও গলধঃকরণ করতে পারে। বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে এটি জানা গেছে। পবিত্র কুরআনের সূরা সাফফাতে (আয়াত: ১৩৯-১৪৬) যে মাছটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, খুব সম্ভবত এটাই সে মাছ। এই আয়াতে বলা হয়েছে, হযরত ইউনুস আ. যখন চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে নিজের সম্প্রদায়কে ছেড়ে ভ্রমণের জন্য নৌকায় আরোহণ করেন, তখন যাত্রীরা বৃহত্তর স্বার্থে তাঁকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলে একটি মাছ তাঁকে গলধঃকরণ করে। অতঃপর কোন এক উপকূলে গিয়ে তাঁকে উদ্গীরণ করে।
📄 আম্বর মাছের ভর (Wight of Amber Fish)
একটা মধ্যম আকৃতির আম্বর মাছের ভর হল ৬০ টন। তার অর্ধেক অর্থাৎ প্রায় ৩০ হাজার কিলোগ্রাম হল মাংসল অংশ। আর বাকিটা রক্ত, হাড় ইত্যাদি। অর্থাৎ মাংসল অংশ বিবেচনায় একটি আম্বর মাছ মাঝারি ধরনের তিন হাজার বকরির সমান। বুখারী শরীফের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু উবাইদা রাযি. এর তিনশত সহচর পনের দিন পর্যন্ত শুধু এই মাছের মাংসল অংশ আহার করেছিলেন। একজন লোকের সারা দিনের খাদ্যের পরিমাণ যদি সর্বোচ্চ ২ কেজি (চার পাউন্ড) হয়, তাহলে তিনশত লোকের পনের দিনের খাদ্য বাবদ ৯ হাজার কিলোগ্রাম গোস্তের প্রয়োজন। আর এ পরিমাণ গোস্ত একটি ছোট আকৃতির আম্বর মাছ থেকেই সংগৃহীত হতে পারে। আর আম্বর মাছটি বৃহদাকৃতির হলে তার অতিরিক্ত গোস্ত হয়ত থেকে যাবে।
📄 বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
প্রসঙ্গক্রমে তিমি মাছের আরেকটি বিশেষ আচরণের কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। বার্ধক্য উপনীত হওয়ায় অথবা দল থেকে ছুটে যাওয়ার ফলে কখনো কখনো এরা সমূদ্রের তীরে, মাটিতে উঠে পড়ে। কখনো কখনো বেশ কয়েকটি মাছ এক সাথে তীরে এসে প্রাণ ত্যাগ করে। তিমির এই স্বভাব বুখারী শরীফের হাদীসে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। কারণ মুসলিম সৈন্যদলের কোন রকম চেষ্টা তদবির ব্যতীতই সেই আম্বর তাদের হস্তগত হয়। নিঃসন্দেহে এটা প্রমাণ করে যে, মাছটি এ রকমই কোন কারণে সমুদ্রের তীরে এসেছিল। (তবে এটা আল্লাহ্ তা'আলার গায়েবী সাহায্য বৈ কিছু নয়)
হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী আম্বর মাছের পাঁজরের হাড় এতটুকু দীর্ঘ ছিল যে, খাড়াভাবে যে হাড় দাঁড় করানো হলে এবং হাড়ের পাশে একজন অশ্বারোহী দাঁড়ালে হাড়ই বেশি উঁচু হয়। ইউরোপের বিভিন্ন মিউজিয়ামগুলোতে যারা তিমি দেখেছেন, তারা সহজেই এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারবেন। ৬০ ফুট লম্বা পাঁজর ও ৮ টন (প্রায় ৯ হাজার কিলোগ্রাম) ওজন বিশিষ্ট মাছটি কত বড় হবে তা সহজেই অনুমেয়।
📄 তিমি মাছের ঐতিহাসিক দলিল
তিমি সমুদ্রেই বাস করে। তাই একে মাছ বলা হয়ে থাকে। তবে মাছের সাথে তার প্রকৃতিগত কোন মিল নেই। মূলত তিমিকে স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে গণ্য করা যায়। প্রাণীবিদ্যার পরিভাষায় এগুলো ম্যামালিয়া (Mammalia) শ্রেণিভুক্ত। কয়েক লাখ বছর পূর্বে তিমির পক্ষে ভূপৃষ্ঠের চেয়ে সমুদ্রে বিচরণ করা সহজ হলে সমুদ্রকেই তারা বাসস্থান বানিয়ে নেয়। তবে ম্যামালিয়া হওয়ার কারণে তার শ্বাস নিতে হয়। এ জন্য বিশ থেকে পঞ্চাশ মিনিটের ব্যবধানে তিমি সমুদ্র পৃষ্ঠে ভেসে উঠে।
বহুল প্রচলিত এক ফার্সি অভিধানে "আম্বর" এর অর্থ করা হয়েছে 'কাহরিয়া' শব্দের মাধ্যমে। অর্থাৎ যা তৃণলতাকে নিজের দিকে টেনে আনে। আরবি অভিধানে মাছ ছাড়াও আম্বরের অর্থ 'সমুদ্রের উপকণ্ঠ' এবং মেছবাহুর রূম (রোমীয় প্রদীপ) বলা হয়েছে। আরবিতে এর অপর নাম 'আল কাতাবিষ্যুন'। আরবি, ফার্সি ও উর্দু অভিধানে আম্বরকে কালো রঙের এক খুশবু বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে ইংরেজি অভিধানে আম্বরকে সোনালী রঙের কঠিন মৌলিক পদার্থ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাইবেলের ইস্কাইল অধ্যায়ের তিনটি অনুচ্ছেদ দ্বারা শেষোক্ত অর্থটিই বোঝা যায়।