📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 আম্বর (Aumber)

📄 আম্বর (Aumber)


একটা আশ্চর্যজনক বিষয় হলো অনেক উদ্ভিদ অথবা উদ্ভিদ জাতীয় জিনিষ অনেক কাল পূর্ব থেকেই সাধারণভাবে মানুষের পরিচিত। কিন্তু তাদের সবগুলোর বিশুদ্ধতা ও ব্যবহার সংক্রান্ত বিস্তারিত জ্ঞান ছিল খুবই কম। আজকের এ উন্নত যুগেও অনেক কিছুই হেঁয়ালি রয়ে গেছে এবং এসবের বৈজ্ঞানিক পরিচয় সম্পর্কে আজও অধিকাংশ মানুষ অজ্ঞ। এ জাতীয় একটি জিনিষ হল আম্বর। আম্বর সম্পর্কে পুরাতন চিকিৎসা বিজ্ঞানের বইপত্রে পরস্পর বিরোধী বিভিন্ন রকমের বক্তব্য পাওয়া যায়।

কোন কোন বইতে আম্বরকে উদ্ভিদ গোত্রীয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে বলা হয়েছে এটি উদ্ভিদ নয়। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো ইতিহাস, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ধর্মীয় কিতাবের অনেক জায়গায় আম্বরের কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এর পরিচিতি সম্পর্কে আলোচনা খুবই কম আছে। আর যে আলোচনা করা হয়েছে তাতেও পারস্পরিক বৈপরীত্য রয়েছে। এ কারণেই বর্তমান যুগের ইংরেজি, আরবি, পার্সি ও উর্দু অভিধানে আম্বরের একাধিক অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।

আম্বর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার পূর্বে দ্বীনী কিতাবসমূহে এ বিষয়ে যে আলোচনা করা হয়েছে, সে সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা দরকার।

সুনানে নাসায়ীর এক হাদীসে হযরত সাদ ইবনে আলী হতে রেওয়ায়েত আছে যে, আমি হযরত আয়েশা রাযি.কে জিজ্ঞেস করেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি সুগন্ধি ব্যবহার করতেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। পুরুষালী সুগন্ধি 'মেশক এবং আম্বর'।

মুসলিম এবং বুখারী শরীফেও 'আম্বার' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু কিছু ওলামায়ে কেরাম এর অনুবাদও করেছেন আম্বর শব্দ দিয়ে। এ অনুবাদটি ঠিক নয়। যেমন কিতাবুস সিয়ামে হযরত হুমাইদ রাযি. হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, কোন রেশম হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতের তালু থেকে মসৃণ ছিল না এবং কোন মেশক আম্বরের খুশবু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুশবু থেকে বেশি ছিল না। বুখারী শরীফের কিতাবুল মাগাযী এবং কিতাবুষ যাবায়েহ-তে তিনটি হাদীসে (যেগুলি বারবার উল্লেখ হয়েছে) আম্বরকে মাছ নামে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কিতাবুল মাগযীর বাব নং ৫৩৩ (হাদীস নং ১৪৪৯) এ উল্লেখ করা হয়েছে, আমর ইবনে দীনার বর্ণনা করেন যে, আমি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি.-কে বলতে শুনেছি, নবীয়ে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন শত সাহাবার এক বাহিনী প্রেরণ করেন। আবু উবাইদা রাযি. ছিলেন আমাদের আমীর। কুরাইশের কাফেলাকে ধাওয়া করার জন্য আমরা রওয়ানা হয়েছিলাম। সমুদ্রের তীরে দীর্ঘ ছয় মাস অবস্থানের পর খাদ্য সামগ্রীর প্রচণ্ড অভাব দেখা দিলে লতা-পাতা খেয়ে আমাদেরকে দিনাতিপাত করতে হয়। এ কারণেই আমাদের এই বাহিনীকে বলা হয় 'যাতুর রিকাল" বা পত্র-পল্লব বিশিষ্ট ফৌজ। এরপর সমুদ্র থেকে 'আম্বর' নামীয় এক প্রকার মাছ উপকূলে উঠল। পরবর্তী পনের দিন যাবৎ আমরা তা খেয়ে জীবনধারণ করলাম। তার চর্বিও আমরা ব্যবহার করলাম। এতে করে আমরা শারীরিকভাবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে সক্ষম হয়েছি। হযরত আবু উবাইদা রাযি. মাছের পাঁজরের একটি হাড় দাঁড় করালেন। উটের উপর আরোহী ব্যক্তি অনায়াসেই সেই দাঁড় করানো হাড়ের পাশ দিয়ে আসা যাওয়া করতে পেরেছে।

উর্দু, পার্সি ও ইংরেজি প্রসিদ্ধ অভিধানগুলোতে আম্বরকে একটি সুগন্ধি জিনিস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরিচয় দেয়া হয়েছে বিভিন্নভাবে। কিন্তু আরবি ভাষার নির্ভরযোগ্য অভিধান 'আল মুনজিদ' এ আম্বর শব্দকে সুগন্ধি জিনিষ ছাড়াও এক ধরনের মাছ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। উপরোক্ত হাদীস ও অভিধানের আলোকে প্রথমে মাছ অর্থে 'আম্বর' এর একটি পর্যালোচনা পেশ করা ভালো হবে। এরপর সুগন্ধিযুক্ত জিনিষ হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে আলোকপাত করা হবে।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 আম্বর মাছ (Aumber Fish)

📄 আম্বর মাছ (Aumber Fish)


আম্বর মূলত এক প্রকার তিমি মাছ। এই মাছ গ্রীষ্ম অঞ্চলীয় সমুদ্রগুলোতে সাধারণত পাওয়া যায়। ইংরেজিতে তাকে (স্পার্ম হোয়েল) বলা হয়ে থাকে। বিভিন্ন সমুদ্রে ১২টিরও অধিক প্রজাতির তিমি পাওয়া যায়। ১৯০৩ খৃষ্টাব্দে আটলান্টিক মহাসাগরে একটা তিমি মাছ পাওয়া যায়। এটা দৈর্ঘ্যে ছিল ১১১ ফুট। এর ভর ছিল ৯০ টন। আরব সাগরের উপকূলে প্রাপ্ত তিমির দৈর্ঘ্য গড়পড়তায় ৭০ ফুট। তিমি জাতীয় মাছের মধ্যে শুধু আম্বর প্রজাতিরই খাদ্য নালী এত বেশি প্রশস্ত যে তা একজন মানুষকেও গলধঃকরণ করতে পারে। বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে এটি জানা গেছে। পবিত্র কুরআনের সূরা সাফফাতে (আয়াত: ১৩৯-১৪৬) যে মাছটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, খুব সম্ভবত এটাই সে মাছ। এই আয়াতে বলা হয়েছে, হযরত ইউনুস আ. যখন চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে নিজের সম্প্রদায়কে ছেড়ে ভ্রমণের জন্য নৌকায় আরোহণ করেন, তখন যাত্রীরা বৃহত্তর স্বার্থে তাঁকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলে একটি মাছ তাঁকে গলধঃকরণ করে। অতঃপর কোন এক উপকূলে গিয়ে তাঁকে উদ্‌গীরণ করে।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 আম্বর মাছের ভর (Wight of Amber Fish)

📄 আম্বর মাছের ভর (Wight of Amber Fish)


একটা মধ্যম আকৃতির আম্বর মাছের ভর হল ৬০ টন। তার অর্ধেক অর্থাৎ প্রায় ৩০ হাজার কিলোগ্রাম হল মাংসল অংশ। আর বাকিটা রক্ত, হাড় ইত্যাদি। অর্থাৎ মাংসল অংশ বিবেচনায় একটি আম্বর মাছ মাঝারি ধরনের তিন হাজার বকরির সমান। বুখারী শরীফের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু উবাইদা রাযি. এর তিনশত সহচর পনের দিন পর্যন্ত শুধু এই মাছের মাংসল অংশ আহার করেছিলেন। একজন লোকের সারা দিনের খাদ্যের পরিমাণ যদি সর্বোচ্চ ২ কেজি (চার পাউন্ড) হয়, তাহলে তিনশত লোকের পনের দিনের খাদ্য বাবদ ৯ হাজার কিলোগ্রাম গোস্তের প্রয়োজন। আর এ পরিমাণ গোস্ত একটি ছোট আকৃতির আম্বর মাছ থেকেই সংগৃহীত হতে পারে। আর আম্বর মাছটি বৃহদাকৃতির হলে তার অতিরিক্ত গোস্ত হয়ত থেকে যাবে।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

📄 বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ


প্রসঙ্গক্রমে তিমি মাছের আরেকটি বিশেষ আচরণের কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। বার্ধক্য উপনীত হওয়ায় অথবা দল থেকে ছুটে যাওয়ার ফলে কখনো কখনো এরা সমূদ্রের তীরে, মাটিতে উঠে পড়ে। কখনো কখনো বেশ কয়েকটি মাছ এক সাথে তীরে এসে প্রাণ ত্যাগ করে। তিমির এই স্বভাব বুখারী শরীফের হাদীসে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। কারণ মুসলিম সৈন্যদলের কোন রকম চেষ্টা তদবির ব্যতীতই সেই আম্বর তাদের হস্তগত হয়। নিঃসন্দেহে এটা প্রমাণ করে যে, মাছটি এ রকমই কোন কারণে সমুদ্রের তীরে এসেছিল। (তবে এটা আল্লাহ্ তা'আলার গায়েবী সাহায্য বৈ কিছু নয়)

হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী আম্বর মাছের পাঁজরের হাড় এতটুকু দীর্ঘ ছিল যে, খাড়াভাবে যে হাড় দাঁড় করানো হলে এবং হাড়ের পাশে একজন অশ্বারোহী দাঁড়ালে হাড়ই বেশি উঁচু হয়। ইউরোপের বিভিন্ন মিউজিয়ামগুলোতে যারা তিমি দেখেছেন, তারা সহজেই এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারবেন। ৬০ ফুট লম্বা পাঁজর ও ৮ টন (প্রায় ৯ হাজার কিলোগ্রাম) ওজন বিশিষ্ট মাছটি কত বড় হবে তা সহজেই অনুমেয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00