📄 অতীত ধর্মগুলোতে খাতনা (Circumcision in Pre-past religions)
বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, "হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ আ. আশি বৎসর বয়সে কুড়াল দিয়ে নিজের খাতনা করেছেন।" আল্লামা ইবনে কায়্যিম রহ. বলেন—প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, সর্বপ্রথম খাতনা করেন হযরত ইব্রাহীম আ.। তারপর খাতনার ধারাবাহিকতা নবী রাসূলগণের মাঝে প্রচলিত ছিল। এমনকি হযরত ঈসা আ. এরও খাতনা হয়েছে। খৃষ্টানরা একথা অস্বীকার করে না। বরং তারা শুকরকে যতটা দৃঢ়তার সাথে হারাম মনে করে, ঠিক ততটা গুরুত্বের সাথেই ঈসা আ. এর খাতনা করাকে স্বীকার করে।
ইহুদীরা খাতনাকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সফরে তাকভীনে আছে "স্মরণ রাখবে আমার এবং তোমাদের ও তোমাদের পরবর্তী বংশধরদের মাঝে এ অঙ্গীকার রইল যে, প্রতিটি ছেলের যেন খাতনা করা হয়।"
গোড়ার দিকে খৃষ্ট সমাজেও খাতনা প্রচলন ছিল। কিন্তু খৃষ্টানরা তাদের পয়গম্বরের মূল শিক্ষাকে বিকৃত করে সে শিক্ষার প্রতি চরম অবাধ্যতা প্রদর্শন করছে। ইঞ্জিল বার্নাবাসেও খাতনার উল্লেখ করা হয়েছে। ইসু জবাব দিয়েছেন, আমি সত্য বলছি—"খাতনাহীন ব্যক্তির চেয়ে কুকুর অনেক উত্তম।"
📄 ইসলামে খাতনা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে খাতনা সম্পর্কে অগণিত হাদীস বর্ণিত হয়েছে। বুখারী এবং মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা রাযি থেকে বর্ণিত আছে, "পাঁচটি জিনিষ ফিতরাতের (অভ্যাসগত জিনিষের) অর্ন্তভুক্ত। খাতনা করা, নাভীর নীচের পশম কাটা, গোঁফ ছোট রাখা, নখ কাটা এবং বগলের পশম পরিষ্কার করা।" ইমাম আহমদ রহ. শাদ্দাদ ইবনে আউস থেকে মারফু রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন যে, "খাতনা পুরুষের জন্য সুন্নত।"
📄 আমেরিকান বিশেষজ্ঞজ্ঞদের অভিমত
ওয়াশিংটনের সামরিক হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের প্রধান প্রফেসর ভয়েস ভেইল আমেরিকান ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান (American Family Physician) পত্রিকার মার্চ ১৯৯০ সংখ্যায় লিখেন “১৯৭৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত আমিও খাতনার বিপক্ষে ছিলাম। খাতনার প্রচলন রোধ করার জন্য তখন যে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, তাতেও অংশগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু আশির দশকের প্রথম দিকে পরিচালিত জরিপে দেখা গেল যে, খাতনা বিহীন শিশুদের মধ্যে প্রস্রাবের নালীতে প্রদাহ রোগ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। এরপরও খাতনা জীবনের স্বাভাবিক করণীয় কাজের অন্তর্ভুক্ত—আমি এটা মেনে নেওয়ার পক্ষে ছিলাম না। তবে প্রয়োজনের সময় এটা কার্যকর করার পরামর্শ অবশ্যই দিতাম। কিন্তু এ বিষয়ে আরো গভীর অনুসন্ধান এবং দূরদর্শিতার সাথে পর্যবেক্ষণের পর প্রাপ্ত ফলাফল আমার অভিমতের সম্পূর্ণ উল্টো ছিল। খাতনাকে জীবনের স্বভাবসম্মত করণীয় কাজ বলে গণ্য করতে বাধ্য হলাম। শুধু এতটুকুই নয়; বরং আমেরিকান একাডেমি ১৯৮৯ সালে শিশু চিকিৎসা বিষয়ক যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তা ১৯৭০ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত রিপোর্টের সম্পূর্ণ বিপরীত। খাতনা অনুৎসাহিত করার প্রচারণা বন্ধ করা হল। শিশুদের খাতনা করার কল্যাণকর দিকসমূহ ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হল। সাম্প্রতিক কালের চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভিজ্ঞতার পর এ বিষয়ে মানুষের মাঝে পূর্বোক্ত মতের পরিবর্তন দেখা দিল। মানুষ নিজেদের মত পরিবর্তন করল। মানুষের কর্ম-কৌশল পাল্টে গেল। যারা খাতনার যত বিরোধী ছিল, তারা ততটাই খাতনার পক্ষে প্রচারকারীতে পরিণত হল। পুনরায় প্রমাণিত হল, কালের পরিবর্তন মানুষের ফিতরাতকে পরিবর্তন করতে অক্ষম।
'আল্লাহর তৈরি অভ্যাসকে মজবুতভাবে ধর, যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।'
এই প্রফেসর তার রচনার শেষে লিখেন, ৮ই মার্চ ১৯৮৮ খৃষ্টাব্দে ক্যালিফোর্নিয়ার চিকিৎসক সমিতির সদস্যরা এ সিদ্ধান্তে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, খাতনা শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তারপর আমি খাতনার বিপক্ষীয় অবস্থান থেকে ফিরে এলাম এবং ক্যালিফোর্নিয়ার চিকিৎসক সমিতির সিদ্ধান্তকে সানন্দ চিত্তে মেনে নিলাম।
📄 খাতনা ও যৌনাঙ্গের পরিচ্ছন্নতা
১৯৯০ খৃষ্টাব্দের ম্যাগাজিন 'নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন (New England Journal of Medicine)'-এ ডাক্তার শেভান লিখেন, 'নিঃসন্দেহে শিশু বেলার খাতনা আজীবন যৌনাঙ্গের পরিচ্ছন্নতা অর্জনকে সহজসাধ্য করে। এতে করে শৈশবে লিঙ্গের অগ্রভাগের বর্ধিত চামড়ার নীচে কোন রোগের জীবাণু আশ্রয় নিতে পারে না।' এ বিশেষজ্ঞকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও অভিজ্ঞ শিশু রোগ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একজন বলে গণ্য করা হয়। তিনি গুপ্তাঙ্গের ক্যান্সার থেকে রক্ষা পেতে গুপ্তাঙ্গের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেন 'পূর্ণরূপে গুপ্তাঙ্গের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন সত্যই অসম্ভব এবং কষ্টসাধ্য। আর এ কষ্টসাধ্য ব্যাপারটি শুধু তৃতীয় বিশ্বের লোকদের নয়; বরং আমেরিকার মত বড় এবং ছোট ছোট উন্নত দেশগুলোতেও সন্তুষ্টজনক নয়।
ব্রিটেনের খাতনাহীন স্কুলগামী শিশুদের উপর অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গিয়েছে, তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশের যৌনাঙ্গের পরিচ্ছন্নতার মান ছিল অত্যন্ত নীচু। ডেনমার্কে পরিচালিত আরেকটি অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, ছয় বৎসরের খাতনাহীন শিশুদের ৬৩ শতাংশের লিঙ্গের অগ্রভাগে চামড়ার বর্ধিত অংশে ময়লা জমে আটকে গিয়েছে। এ তথ্য তুলে ধরেছেন খাতনার গূঢ় রহস্য ও তাৎপর্যে অনুসন্ধানকারী বড় একটি কমিটির প্রধান। কিন্তু বাস্তব সত্য হল, ইসলাম এ রোগের চিকিৎসা প্রথম দিনেই প্রকাশ করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমেই এ বিষয়ে আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন—'আপনি একাগ্রচিত্তে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকুন। আল্লাহর তৈরি ফিতরাতকে অবশ্য কর্তব্য মনে করুন যার উপর আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।' (রোম: ৩০)