📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 শিশু এবং পরিবেশ (Children and Environment)

📄 শিশু এবং পরিবেশ (Children and Environment)


শিশুর মন ও মস্তিষ্ক হচ্ছে পরিষ্কার বোর্ডের মত। সামাজিক এবং ঘরোয়া পরিবেশের চিত্র তাতে অংকিত হয়। শিশুর পরবর্তী জীবনে এ চিত্র এক বিরাট ভূমিকা পালন করে। শারীরিক ও চারিত্রিক অবক্ষয় মুক্ত পরিবেশে প্রতিপালিত হওয়া শিশুর জন্মগত অধিকার। তাকে সুষ্ঠুভাবে লালন-পালন করা পিতা-মাতা ও সমাজের দায়িত্ব। এ ব্যাপারে সামান্যতম অনীহা, ত্রুটি-বিচ্যুতি সমাজ ও বংশের ভবিষ্যতকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।

সাম্প্রতিক কালের এক মহামারী হল শিশুকে ভোগ-বিলাস ও আরামের যাবতীয় উপকরণ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু পিতা মাতা সন্তানদেরকে সঙ্গ দেওয়ার মত সময় পান না। একটি শিশুর মৌলিক অধিকার হল—'মাতা-পিতা শিশুকে সঙ্গ দিবে এবং শিশুর সমস্যাগুলো বুঝতে চেষ্টা করবে, যেন শিশুর নবচেতনায় এই অনুভূতি স্থান না পায় যে, তাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে কিংবা তাকে কোন রকম গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।' তার আত্মসম্মান বোধ বজায় রাখা, কোন বিষয় বুঝাতে হলে বিনম্রভাবে বুঝানো, অনর্থক তাকে ধমক না দেয়া, অন্যের সম্মুখে তার মানহানী না করা এসব বিষয়ের প্রতি নজর রাখা প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

প্রতিটি সন্তানের সাথে একই রকম আচরণ করা উচিত। ইসলাম তো শিশুদের চুম্বনের বেলায়ও সমতা বজায় রাখার শিক্ষা দিয়েছে। একজনকে অন্যদের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিলে বাকী সন্তানদের মধ্যে 'তাদেরকে যেন বঞ্চিত করা হচ্ছে' এ রকম অনুভূতির সৃষ্টি হবে এবং তার ও অন্যান্য শিশুর মাঝে ঘৃণা ও বিচ্ছেদের সূত্রপাত হবে।

বড়দের কর্তব্য হল ছোটদের সামনে কোন অশালীন কথা না বলা বা কাজ না করা। তাদেরকে সত্য কথা বলার জন্য উপদেশ দিতে হবে। নিজেদেরকে সত্যের নমুনা হিসেবে পেশ করতে হবে। পিতা-মাতা হল সন্তানের জন্য আদর্শ ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। শিশুরা তাদেরকেই অনুসরণ করে। পিতা-মাতার কথা ও কাজে মিল না দেখলে সন্তানও এমনটি করা শিখবে। সন্তান ভাল কাজ করলে তাকে উৎসাহ দেওয়া এবং অভিনন্দন জানানো উচিত। এতে করে সে ভবিষ্যতে ভাল কাজ করতে এবং আপনি তার থেকে যেমনটি আশা করেন তেমনটি করতে সচেষ্ট হবে। সন্তান কোন ভুল করলে মারপিট না করে তার বুদ্ধিগত ও মানসিক অবস্থা বিবেচনায় এনে তাকে সংশোধন করবে। অন্যথায় তাদের অবাধ্যতা ও দুষ্টমি আরও বাড়বে। সন্তান কোন বিষয়ে দুর্বল হলে সে বিষয়টিকে তার সামনে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করবে। কঠোরতা অবলম্বন করলে সে তো তা অর্জন করবেই না; বরং চিরদিনের জন্য ঐ বিষয়কে ঘৃণা করে এড়িয়ে যাবে। সন্তানকে আতঙ্ক ও অন্যমনস্কতার মধ্যে ফেলে দেওয়া অমানবিক কাজ। ইচ্ছে করলেই তাকে নম্রতা, ভদ্রতা দ্বারা সূচারু রূপে গড়ে তোলা যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: 'যার মধ্যে বিনয় নেই সে যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।'

ঘরোয়া পরিবেশে ধর্মের পরশ না থাকলে সন্তানও ধর্মহীনতার দিকে মন দিবে। কারণ তার শূন্য মস্তিষ্ক পারিপার্শ্বিক অবস্থা দ্বারা সবেচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। ভিডিও গেমস খেলা এবং অশ্লীল ফিল্ম দেখা থেকে সন্তানকে ফিরিয়ে রাখতে হবে। জীবনে তারাই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে, যাদের চরিত্র হয় সবচেয়ে বেশি উন্নত। ইদানিং ব্যাপকভাবে এই অভিযোগ উঠছে যে সন্তানেরা দিন দিন দুষ্টু ও অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। মূলত শিশুরা বড়দেরকে এমন কাজ করতে দেখে যেগুলো বড়দের মানানসই নয়। ফলে তাদের মন থেকে বড়দের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা উঠে যায়। সন্তানকে সর্বপ্রথম কালিমায়ে শাহাদাত শিক্ষা দেয়া, সাত বছর বয়সী হলে নামাযের কথা বলা এবং দশ বছরে পৌঁছলে নামাযের জন্য সামান্য কঠোরতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। তবে এজন্য পিতা-মাতাকে নমুনা হয়ে উপস্থিত হতে হবে। সন্তানের বয়স দশ বছর হলে তার বিছানা পৃথক করে দিতে হবে।

আমাদের এখানে যুগের তালে চলতে গিয়ে বিভিন্ন মিলনায়তন, সেমিনার ইত্যাদিতে অসহায় শিশুদের নিয়ে অনেক কিছু বলা হয়। কিন্তু কার্যকরভাবে কিছুই করা হয় না। কোটি কোটি টাকা শুধু পরিকল্পনা বিজ্ঞাপন আর বিবৃতির জন্য খরচ হয়। কিন্তু ঐ সমস্ত নিষ্পাপ শিশুদের নির্দোষ মুখের দিকে কেহ ফিরে তাকায় না। যখন এসব সুবিধা বঞ্চিত শিশুরা 'তাদের সমবয়সীদের'কে বিলাসী পোশাকে, বিলাস বহুল গাড়ীতে বসে থাকতে দেখে, তখন তাদেরকে মনে হয়—তারা যেন দুঃখ ও হতাশার ছায়া।

এক শ্রেণীর শিশুরা আরাম-আয়েশে প্রতিপালিত হচ্ছে, উন্নত মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুযোগ্য শিক্ষকমন্ডলীর তত্ত্বাবধানে জ্ঞানার্জন করছে। অথচ আরেক শ্রেণীর শিশুরা মাটিতে বসে অর্ধ-শিক্ষিত শিক্ষকের কাছে মানবেতর পরিবেশে অসহনীয় শারীরিক ও মানসিক প্রতিকূলতা জয় করে লেখা-পড়া চালিয়ে যাচ্ছে। কর্মজীবনে যোগ্যতার পাল্লায় এ দুশ্রেণীর শিশুকে সমান সমান বিবেচনা করে তাদের থেকে একই মানের যোগ্যতা আশা করা বিরাট সাজা বৈ কিছু নয়। অতএব যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা বিলুপ্ত করতে হবে। অন্যথায় দরবারে ইলাহীতে আমাদেরকে জবাবদিহীতার সম্মুখিন হতে হবে।

ইয়াতিম ও সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য আমাদের এখানে এ রকম কোন ব্যবস্থাপনা নেই বললেই চলে যেখানে সর্বস্তরের শিশুরা সমানভাবে শিক্ষালাভ করতে পারে। কুরআনুল কারীমে এমন নেককার লোককেও ধ্বংসের বাণী শুনানো হয়েছে যে ইয়াতিমকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দেয় এবং সহায় সম্বলহীন মানুষের কদর করে না।

আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, বৈষম্যমূলক সমাজে প্রতিপালিত সন্তানেরা আমাদের কোন সুফল বয়ে আনবে না। এর বাস্তবতা আমাদের সমাজেই দেখতে পাচ্ছি। স্বাবলম্বী রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন তখনই বাস্তবায়িত হতে পারে যখন সামাজিক সমতা ও ন্যায়নীতিমূলক বিশুদ্ধ পরিবেশে সব নাগরিককে যোগ্য করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

জাপান থেকে আয়তনে পাঁচ গুণ ছোট কিন্তু জনসংখ্যায় বেশি এমন দেশের জনগণকে সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করলে 'গ্রেট সেভেন' বা 'অধিক শক্তিসম্পন্ন সাতটি দেশ'র পর্যায়ে নেওয়া যেতে পারে। পাকিস্তানকে আল্লাহ্ তা'আলা অনেক নেয়ামত, সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। একনিষ্ঠতার সাথে কাজ করে গেলে পাকিস্তান উন্নতির শীর্ষে স্থান পেতে পারে।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 ইয়াতিম ও পিতৃপরিচয়হীন শিশুদের মর্ডান হোম

📄 ইয়াতিম ও পিতৃপরিচয়হীন শিশুদের মর্ডান হোম


এসব বাসস্থানকে SOS Villages নামে ডাকা হয়। SOS মূলত একটি ইংরেজী শব্দ সংক্ষেপ। এর পূর্ণরূপ হল 'Save Our Souls'। সংকেতটি চরম অসহায় মুহূর্তে সাহায্য চাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়।

ইয়াতিম ও পিতৃ-পরিচয়হীন শিশুদের জন্য আলাদা আবাসনের ব্যবস্থা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর থেকে শুরু হয়। কারণ ঐ সময় ব্যাপকভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল। মেডিক্যাল সাইন্সের এক ছাত্র 'হারমান মেইন' এ সময় পিতৃহারা হয়েছিলেন। ইয়াতিম ও পিতৃ-পরিচয়হীন শিশুদের জন্য তার উৎকণ্ঠার কোন সীমা ছিল না। পরিশেষে তিনি সমগ্র জীবনকে ঐ সমস্ত শিশুদের জন্য বিলিয়ে দিয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে সর্বপ্রথম ১৯৪৯ সালে তিনি SOS Village প্রতিষ্ঠিত করেন।

বর্তমানে SOS চিল্ড্রেন এসোসিয়েশন এর অধীনে সমগ্র ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপান, রাশিয়াসহ প্রায় ১২৫ টি রাষ্ট্রে ১৩৪৯ এরও বেশি এস.ও.এস ভিলেজ, ইউথ ভিলেজ, স্কুল এবং আরো অন্যান্য প্রকল্প কাজ করে যাচ্ছে। দিন যতই যাচ্ছে এর কর্মপরিধির ততই বিস্তৃতি ঘটছে। এসব প্রকল্পের মৌলিক কিছু উদ্দেশ্য এখানে উল্লেখ করা হল:

মা : এই আবাসিক নিকেতনগুলো সাধারণ ইয়াতিম খানা থেকে ব্যতিক্রমধর্মী। এখানে পিতৃ-পরিচয়হীন ইয়াতিম শিশুদের স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিশ্চিত করার জন্য মাতৃসুলভ পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়।

ভাই-বোন: এসব প্রকল্পের এক একটি হল পূর্ণ পরিবার। ১০ থেকে ১২ জন শিশু সেখানে ভাই-বোনের মত বসবাস করে।

ঘর: প্রতিটি পরিবারকে একটি করে ঘরের সংস্থান করে দেয়া হয়। মায়ের জন্য থাকে আলাদা কামরা এবং তার সংলগ্ন প্রতিটি কামরায় থাকে চার থেকে পাঁচ জন শিশু। প্রতিটি আবাসিক নিকেতনে ১০ থেকে ১৫ টি ঘর থাকে এবং এটা সাধারণত কোন বড় শহর বা গ্রামের মনোরম পরিবেশে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

শিক্ষা: এই সমস্ত আবাসিক নিকেতনের প্রধান উদ্দেশ্য হল শিক্ষা দান। প্রতিটি সেক্টরে একটি করে স্কুল থাকে। এছাড়াও শিশুদেরকে হাতের কাজ বা বৃত্তিমূলক কাজ শিখানোর জন্য অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করা হয়। ধর্মীয় শিক্ষার জন্য প্রতিটি নিকেতনে একটি করে মসজিদ থাকে। এছাড়া স্টেডিয়াম, বাগান, ডাক্তারখানা, দোকান ইত্যাদি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সুবিধাও সেখানে বিদ্যমান।

ইয়াতিম, পিতৃ-পরিচয়হীন শিশুদের পুনর্বাসনে আমাদের দেশ অনেক পিছিয়ে আছে। আমাদের জাতীয়, ধর্মীয় ও চারিত্রিক দাবী হল তাদের প্রতি সুদৃষ্টি দেওয়া এবং সুন্দরভাবে তাদের প্রতিপালন করা। এতে আমাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল হবে। কুরআনে কারীমে এ কাজের জন্য অনেক সওয়াবের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। সাথে সাথে আল্লাহ্ তা'আলা সতর্ক বানীও উচ্চারণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, "তুমি চিন্তা করো নি ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে, যে দীনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে? মূলত সেই ইয়াতিমকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দেয়।"

অতএব আমাদের উচিত হবে প্রতিবেশী ইয়াতিম ও পিতৃ-পরিচয়হীন শিশুর প্রতি সুনজর দেয়া এবং সমস্ত প্রতিষ্ঠানে তাদের ভর্তির সুযোগ করে দেয়া, যাতে তাদের জীবনের এ গঠনমূলক মুহূর্তগুলো সুন্দরভাবে ব্যয়িত হয়। আমাদের একান্ত কর্তব্য দেশের আনাচে-কানাচে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ করতে অধিক পরিমাণে সহযোগিতা করা।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 মা :

📄 মা :


এই আবাসিক নিকেতনগুলো সাধারণ ইয়াতিম খানা থেকে ব্যতিক্রমধর্মী। এখানে পিতৃ-পরিচয়হীন ইয়াতিম শিশুদের স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিশ্চিত করার জন্য মাতৃসুলভ পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 ভাই-বোন :

📄 ভাই-বোন :


এসব প্রকল্পের এক একটি হল পূর্ণ পরিবার। ১০ থেকে ১২ জন শিশু সেখানে ভাই-বোনের মত বসবাস করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00