📄 অধিক সন্তান গ্রহণ (Excess of Children)
হযরত মাকাল বিন ইয়াসার রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, এমন মহিলাকে বিবাহ কর যে ভালবাসবে এবং অধিক সন্তান প্রসব করবে। (মহিলা বিধবা হলে পূর্বের বিবাহ থেকে এটা আন্দাজ করা যেতে পারে আর কুমারী হলে তার স্বাস্থ্য এবং বংশের বিবাহিতা মহিলাদের দেখে এটা অনুমান করা যেতে পারে।) কারণ আমি তোমাদের আধিক্য দ্বারা উম্মতের উপর গর্ব করব (আমার উম্মতের সংখ্যা বেশি।) (আবু দাউদ, নাসায়ী, হায়াতুল মুসলিমীন)
ফ্রান্সে আমাদের সঙ্গে এক ব্যক্তি সফর করছিল। আমরা জার্মানি পৌছুলে সেও আমাদের সঙ্গে থেকে গেল। কারণ, সফরের খরচ ছিল বেশি। তার পকেট খরচ করার অনুমতি দিচ্ছে না এটা কিছুটা অনুমান করতে পেরে আমরা তাকে বললাম, আপনি ফ্রান্সে ফিরে যান। যেহেতু আপনার সাত সাতটি সন্তান ও স্ত্রী আছে, তাদের জীবন ধারণের ন্যূনতম উপকরণ সংস্থানের জন্য কিছু সম্পদ প্রয়োজন। সে ব্যক্তি তখন বলতে লাগলেনঃ এতে আমি মোটেও চিন্তিত নই। আমি সরকারি তহবিল থেকে সন্তানদের শিক্ষা, বইপত্র এবং অন্যান্য খরচের জন্য বিশেষ সাহায্য পাই এবং যার সন্তান বেশি, তার প্রাপ্য তহবিলও তত বাড়তে থাকে। (ফ্রান্স সে জার্মানী তক)
সন্তান কমানোর মিছিল কি শুধু মুসলমানদের জন্য (?), না কি শুধু এশিয়ার দেশগুলোর জন্য? ইউরোপ কম সন্তান গ্রহণের উপর বেশি জোর দিয়েছিল। পরিণতিতে তাদের বংশের ঘাটতি শুরু হলে হিটলার বলে—'সন্তান বাড়াও, ফৌজ বানাও, মিত্রবাহিনীকে হটাও।'
📄 শিশু পরিচর্যা
নবীয়ে কারীম বলেছেন, গোলাম-বাঁদী তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তোমাদের অধীন করেছেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা কাউকে তোমাদের কারো অধীন করে থাকলে, সে যেন নিজে যা ভক্ষণ করে, তাকেও তাই ভক্ষণ করায়; নিজে যা পরিধান করে, তাকেও তা পরিধান করায়। তাকে দেওয়া কাজ যেন তার সাধ্যাতীত না হয়। সে একা কোন কাজ করতে না পারলে নিজে যেন তাকে সাহায্য করে।"
📄 হযরত যায়েদ ইবনে হারেছা রাযি. এর ঘটনা
হযরত যায়েদ ইবনে হারেছা রাযি জাহেলি যুগে এক কাফেলায় যোগ দিয়ে মা'র সাথে নানার বাড়ি যাচ্ছিলেন। রাত্রি যাপনের জন্য কাফেলা কোন এক জায়গায় যাত্রা বিরতি করলে বনু কায়েস গোত্র তাদেরকে লুণ্ঠন করে এবং কিছু লোককে বন্দী করে পরে মক্কায় বিক্রি করে দেয়। তন্মধ্যে যায়েদ ইবনে হারেছা রাযি.ও ছিলেন। তিনি তখন ছোট বালক। হাকীম ইবনে হিজাম রাযি তাকে খরিদ করেন। তার ফুফু হযরত খাদীজা রাযি. মক্কার ধনাঢ্য ও সম্মানিতা মহিলা ছিলেন। তিনি বিধবা ও নিঃসন্তান ছিলেন। কোন এক সময় তিনি তাঁর ভাতিজা হাকীম ইবনে হিজাম রাযি. এর ঘরে গেলে যায়েদ রাযি. কে সেখানে দেখতে পান এবং ভাতিজার কাছে যায়েদকে নেওয়ার জন্য আবদার করেন। খাদীজা রাযি. বিবাহ সূত্রে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন সঙ্গীনি হলে যায়েদ রাযি ও তাঁর ঘরে চলে আসেন।
হযরত যায়েদ রাযি. এর পিতা ছেলে হারানোর ব্যথায় বিমর্ষ ছিলেন। সন্তানের ভালবাসা এমনই যে, তিনি অস্থির হয়ে নানা দেশ ঘুরে ফিরছিলেন। ঘটনাক্রমে যায়েদ এর গোত্রের কিছু লোক হজ্ব করতে মক্কা শরীফে আগমন করলে তারা হযরত যায়েদ রাযি.কে দেখে তার পিতার করুণ অবস্থার কথা তুলে ধরল। উত্তরে হযরত যায়েদ রাযি. তার পিতার কাছে বলে পাঠালেন : 'আমার জন্য কোন চিন্তা করবেন না। অত্যন্ত দয়াবান মানুষের কাছে আমি আছি।'
যায়েদ এর পিতা ছেলের সন্ধান পাওয়ার পর তার এক ভাই (যায়েদ এর চাচা) ও মুক্তি পণের জন্য কিছু মুদ্রা নিয়ে মক্কা শরীফে পৌঁছলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে পৌঁছলে তিনি তাদের আগমনের কারণ জিজ্ঞেস করেন। তারা তখন বললেন : 'যায়েদ রাযি. কে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছি। যত টাকা বিনিময় চান, আমরা তা পরিশোধ করব, তবুও আমাদের ছেলেকে আযাদ করে দিন।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন : 'যায়েদ যদি আপনাদের সাথে যেতে চায় তাহলে কোন বিনিময় ছাড়াই তাকে মুক্ত করে দিব। অন্যথায় জোরপূর্বক তাকে আপনাদের সাথে প্রেরণ করতে পারি না।' তারা তখন আরজ করলেন : 'নিশ্চয় আপনি আমাদের প্রতি আশাতীত দয়া প্রদর্শন করেছেন। আমরা সর্বান্তকরণে আপনার কথা মেনে নিলাম।'
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন 'তুমি কি তাদের চিন?' যায়েদ উত্তর দিলেন 'জী হ্যাঁ। ইনি আমার পিতা আর তিনি আমার চাচা।' নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'তারা তোমাকে তাদের সাথে নিয়ে যেতে চায়।'
এ কথা শুনে যায়েদ রাযি তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন, 'আপনাকে ছেড়ে আমি কিভাবে যাব (?), আপনিই তো আমার চাচা ও পিতার ন্যায়।' পিতা এবং চাচা তখন বললেন, 'তুমি কি পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন সকলকে পরিত্যাগ করে গোলামই থাকতে চাও?' যায়েদ রাযি উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ, আমি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেয়ে বেশি দয়াবান ও স্নেহশীল কাউকে আজ পর্যন্ত দেখি নি।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে যায়েদ রাযি.কে আদর করে বললেন, 'যায়েদ আমার ছেলে।' যায়েদ রাযি. এর পিতা ও চাচা এই দৃশ্য দেখে খুব মুগ্ধ হলেন এবং ছেলেকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে রেখে চলে গেলেন।
এ ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় নবীয়ে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদ রাযি.কে কত বেশি আদর-স্নেহ করতেন। এবং এটাও বুঝে আসে যে শিশুর সাথে মানুষের মেলামেশা কত দয়া ও স্নেহ মমতাপূর্ণ হওয়া উচিৎ।
হযরত আনাস রাযি শৈশবে দশ বছর পর্যন্ত নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে ছিলেন। তিনি নিজেই বলেন, 'এ দীর্ঘ দশ বছরে শাস্তি দেওয়া তো দূরের কথা, তিনি রুক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কখনো আমার দিকে তাকান নি।' শৈশবকালে স্বভাবগতভাবে শিশুরা এমন কর্মকাণ্ড করে থাকে যা পিতা-মাতাও অনেক সময় বরদাশত করতে পারেন না। কখনো তো শাসন করতে যেয়ে তাকে পিটুনি পর্যন্ত দেন। আর একটি শিশু দশ বছর কারো কাছে প্রতিপালিত হয় অথচ তার কোন ভুল হবে না, এটা প্রায় অসম্ভব। স্নেহ মমতা ও অনুকম্পায় শিশুদের দখল কতখানি তার চিরন্তন আদর্শ হলো এ দীর্ঘ সময়ে হযরত আনাস রাযি. এর প্রতি রাসূলুল্লাহ সা. এর স্নেহ-ভালবাসা। কাজেই শিশুদের প্রতি আমাদের নম্র, ভদ্র ও সৎস্বভাবী হওয়া প্রয়োজন।
শিশুদের প্রতি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দয়া ও স্নেহের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হল হযরত হাসান ও হুসাইন রাযি। তিনি সিজদায় গেলে আদরের এ দুই নাতি তাঁর পিঠে উঠে বসত। স্বেচ্ছায় অবতরণ না করা পর্যন্ত নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদা থেকে মাথা উঠাতেন না।
একবার গ্রামের এক অধিবাসী হযরত আকরা' ইবনে হারেস রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে উপস্থিত হয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলেন যে, তিনি তার দৌহিত্রদেরকে আদর করছেন। এই দৃশ্য দেখে বললেন 'আমার দশজন সন্তান রয়েছে। কোন দিন তাদেরকে এভাবে আমি আদর করি নি।' এ কথা শুনে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'তোমার হৃদয় থেকে দয়া ও মমতা লোপ পেলে আমি কি করব (?)।'
📄 নবজাতকের আগমনের পূর্বে ও পরে
সন্তান জন্মের পূর্বেই ইসলাম তার অধিকার সংরক্ষণ করেছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে মা নির্বাচনের সময় বাহ্যিক সৌন্দর্য, মান-মর্যাদা ও ধন-সম্পদের তুলনায় ধর্মকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। মা দ্বীনদার, পরহেজগার ও বিদূষী হলে সন্তানও মায়ের প্রভাবে সুশিক্ষিত ও সৎকর্মশীল হবে। সন্তান জন্মের পর ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামত দিতে হয়। প্রথম দিনই তাকে আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত করা হয়। সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে মাথা মুণ্ডন করে চুলের সমপরিমাণ ছদকা দিতে হয়। আকীকা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সুন্দর একটি নাম নির্বাচন করতে হয়। এ সময় যে নাম রাখা হয়, পরবর্তীতে মানুষ সেই নামেই ডাকে। অতএব ছোট থেকেই শিশুর জন্য ভাল নাম নির্বাচন করা চাই। আল্লাহর রাসূল বলেছেন, "কিয়ামতের দিন নিজ নিজ নামে সকলকে আহবান করা হবে। অতএব তোমাদের সুন্দর নাম রাখ।"