📄 দ্বীনদার লোকদের রোগ-ব্যাধি
দীন হলো শান্তি, স্বাস্থ্য ও শৃঙ্খলার নাম। খাদ্য যেমন শরীরের শক্তি বৃদ্ধির জন্য অতি জরুরি, তেমনি অতিরিক্ত খাদ্য খেলে তা রোগ জীবাণুতে পরিণত হয়। তদ্রুপ যখন ধার্মিক ব্যক্তি নিজের অভ্যাসের চেয়ে বেশি আহার করে এবং পরিমিত কর্ম থেকে অধিক পরিমাণে কাজ করে, তখন সে বিভিন্ন প্রকার রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়।
• রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাযান মাস ব্যতীত একাধারে বেশি রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি সাধারণ নিয়ম ভঙ্গ করে অধিক রোযা রাখে, তা হলে অচিরেই সে দুর্বলতা, খিঁচুনী, মস্তিষ্কের দুর্বলতা, মাথার পর্দার শুষ্কতা ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হতে পারে। শরী'আতের হুকুম হলো খাদ্য কম খাও। আর কেউ যদি হঠাৎ খাদ্য খুব কমিয়ে দেয়, তবে রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে।
দীন-ইসলাম সর্বক্ষণ আল্লাহকে স্মরণ করার হুকুম দেয়। কিন্তু শরীরের শক্তির চেয়ে বেশি বেশি যদি যিকির করা হয়, তবে মস্তিষ্ক শুকিয়ে পাগল হয়ে যাবে। মোটকথা, ধর্ম হলো সতর্কতা ও মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নাম। ধর্মের মধ্যে অনেক সুযোগ-সুবিধা ও বিভিন্ন প্রকার শিথিলতাও আছে। সুতরাং ধর্ম যতটুকু অবকাশ দেয়, ততটুকু অবশ্যই গ্রহণ করা দরকার। তবে মনে রাখতে হবে, আমরা যেন এক শিথিলতার সুযোগ নিতে গিয়ে আরও অধিক শিথিলতা সৃষ্টি করে না ফেলি। কেননা তখন তা আর ধর্মের সীমার মধ্যে থাকবে না।
📄 ইবাদত বন্দেগী ও শারীরিক সুস্থতা
ইবাদত-বন্দেগীতে সম্ভবত সকল ধর্মে মুক্তি, নাজাত ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য জীবনের উপর বিভিন্ন প্রকার কষ্ট দেওয়া উদ্দেশ্য। অনেক ভারি ভারি বন্দেগী পছন্দ ও মনোনীত করা হয়। নির্জনতা ও সন্ন্যাসবাদের মধ্যেও পুণ্য আছে মনে করা হয়। অথচ এটাও শরীর-স্বাস্থ্যের উপর এক প্রকার কঠোরতা।
অনেক লোককে তো বন্দেগীর নামে শরীরের উপর কঠোরতা করতে দেখলে অবাক হতে হয়। কেউ প্রচণ্ড গরমে খোলা মাঠে অথবা লোহার বড় পাতের উপর ইবাদত-বন্দেগী করে। আমি নিজেও অনেক হিন্দু যোগী-সন্ন্যাসীকে কত সব উদ্ভট পূজা-পার্বন করতে দেখেছি। অনেকে দীর্ঘক্ষণ দণ্ডায়মান থাকে। অনেকে উল্টাভাবে ঝুলন্ত থাকে। আবার অনেকে মাত্র একটি লেংটি পরে লোহার রডের উপর বসে। এই লেংটি পরেই শয়ন করে এবং যাবতীয় কাজ করে।
তারা এভাবে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয়। জনৈক যোগী আমাদের শহরে এসেছিল। সে জুনের মাঝামাঝি প্রচণ্ড রৌদ্রে খোলা মাঠে উলঙ্গ হয়ে নামে মাত্র লেংটি পরে বিছানা বিছিয়ে বসে যেতো। একটি কাপড় ভিজিয়ে মুখে বাঁধত এবং নিজের চারিদিকে কয়েক মণ কাঠ জমা করে এতে আগুন জ্বালিয়ে বসে থাকত। এভাবে কয়েক ঘণ্টা আগুনের বৃত্তের মধ্যে থেকে নিজেকে উত্তপ্ত করত। সেখান থেকে তখন উঠত, যখন আগুন নিভে ঠাণ্ডা হয়ে যেত। কয়েক দিন পর্যন্ত সে ধারাবাহিকভাবে এরূপ করত। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক গিবন তার রোম সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস গ্রন্থে একটি ঘটনা লিখেছে—
ইসলামের মাঠের মধ্যে একটি বাঁশ গেঁড়ে নিজেকে বাঁশের মাথায় বেঁধে নিত এবং হাত দ্বারা নিজের বুকের উপর ক্রুশ চিহ্ন বানিয়ে না খেয়ে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঝুলে থাকত। শেষ পর্যন্ত এভাবে সে ধ্বংস হয়ে (মারা) যায়। তাই সমসাময়িক ঈসায়ী লোকেরা তাকে আল্লাহর ওলী মনে করত।
কিন্তু ইসলাম এ জাতীয় বন্দেগীকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।
প্রথমেই বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবী হিসেবে আবির্ভাবের পর তাঁকে সারা রাত ইবাদত করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং পরিমিত বিশ্রাম গ্রহণ করার প্রতি কঠোরভাবে তাকিদ করা হয়েছে। যখন ইসলামের প্রবর্তক ও প্রতিষ্ঠাতার প্রতি সরাসরি এমন নির্দেশ করা হয়েছে, সেখানে প্রত্যেক মুসলমানের অপরিহার্য কাজ হলো এ জাতীয় রিয়াযাত (সাধনা) থেকে বিরত থাকা এবং সর্বদা নিজেদের শরীর ও স্বাস্থ্য ঠিক রাখার ব্যাপারে সচেতন থাকা।
ইসলামী শিক্ষার দৃষ্টিতে উপরিউক্ত কোন প্রকার বন্দেগী, অর্চনা ইত্যাদি অনুমোদিত ও পছন্দনীয় নয়। আর এর বিনিময়ে বিন্দুমাত্র প্রতিদানও নেই। কুরআন মজীদে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, নিজে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত করো না। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এক স্ত্রীর ঘরে রশি ঝুলাতে দেখেন। জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কিসের রশি? উত্তর করলেন, ইবাদত করতে করতে যখন নিদ্রা এসে যায়, তখন এ রশি মাথার চুলের সঙ্গে বাঁধা হয়। ঘুমের ঘোরে যখন রশিতে টান পড়ে তখন ঝটকা (ধাক্কা) লাগতেই ঘুম ভেঙে যায়।
সব কিছু শ্রবণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ জাতীয় ইবাদত অবৈধ। আমল এমনভাবে করতে হবে, যতটুকু শরীরে সহ্য হয় এবং সহজে স্বাভাবিকভাবে আরামের সাথে করা যায়। কুরআন মজীদে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামায পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। কুরআনের সকল তাফসীরকারক ও ইসলামের মহান চিন্তাবিদগণ এ ব্যাপারে একমত যে, নিদ্রাও এক প্রকার নেশা। সুতরাং যখন ঘুম প্রাধান্য পাবে, তখন নামায না পড়া উচিত। ইসলাম শরীর, স্বাস্থ্য ও সুস্থতার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করে থাকে। যেমন, কেউ নামাযে দণ্ডায়মান হওয়ার পর তার পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন হলে সে নামায ত্যাগ করে উক্ত প্রয়োজন পূর্ণ করবে। তারপর নামায পড়বে। অন্যথায় নামায মাকরূহ হবে। কেননা পায়খানা চেপে রাখতে গিয়ে প্রথমেই তো ইবাদতের প্রতি মনোযোগ থাকবে না। দ্বিতীয়ত তার স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হতে পারে। কোন না কোন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিরক্তিকর দীর্ঘ কিরাতের নামায পড়াও নিষেধ। অদ্রুপ ইমামের জন্য অতি দীর্ঘ কিরাআতের নামায পড়ানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
সারকথা, ইসলাম ইবাদত-বন্দেগীতেও শরী'আতসম্মত ওজর যেমন অসুখ-বিসুখ, ক্লান্তি-শ্রান্তি ইত্যাদিতে সুযোগ দেয়। রোগ বা ক্লান্তিতে নামায দাঁড়িয়ে পড়তে না পারলে বসে, শুয়ে বা ইশারা করে পড়তে হয়। তদ্রুপ সফরে ও রোগে রোযা না রাখলেও চলে। মহিলারা শারীরিক ওজর-আপত্তি ও জটিলতায় যখন ওযু গোসল ইত্যাদি করতে পারে না, তখন তাদের জন্য অনেক ইবাদত মাফ হয়ে যায়। সুতরাং এমতাবস্থায় ইবাদতের নির্ধারিত তরীকার উপর বাড়াবাড়ি করা মানব শরীর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শরীর ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে এক সাধারণ নিয়ম অনুমোদন করে বলেছেন, ইবাদত-বন্দেগীর কাজে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে। আরও বলেছেন, এ (মধ্যমপন্থা) আল্লাহর নিকট খুবই প্রিয় ও পছন্দনীয়। সর্বদা এ পন্থা অবলম্বন করলে মানুষের শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক থাকে। নবীজী রৌদ্রে দাঁড়িয়ে থাকতে এবং নীরব থাকতেও নিষেধ করেছেন। (রিয়াযুস্ সালিহীন)
📄 পরিশিষ্ট
পরিশিষ্ট অংশে দাড়ি রাখার প্রয়োজনীয়তা, গাভীর গোশতের হালাল হওয়া সম্পর্কিত ব্যাখ্যা এবং নামায ও ক্ষুধার সামঞ্জস্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
📄 দাড়ির অপরিহার্যতা
আমি ইতোপূর্বে দাড়ি রাখাকে সুন্নাত লিখেছিলাম। এটা মূলত সাধারণ ও স্বাভাবিক নিয়মের ভিত্তিতে লেখা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে শরী'আতের দৃষ্টিতে নির্ভরযোগ্য কথামতে দাড়ি রাখা ওয়াজিব।