📄 ইহ্সানে রাসূল
আল্লাহ তা'আলা প্রাণীকূল ও উদ্ভিদ জগতের জীবনকে পানির উপর ভরশীল করেছেন। এ পানির বৃদ্ধি ও ঘাটতি কেবল প্রাণীর স্বাস্থ্যের পরই প্রভাব ফেলে না বরং খাদ্য উৎপাদনের উপরও প্রভাব ফেলে। কোথাও পানি শূন্যতা অথবা পানির অভাব দেখা দিলে প্রাণীকূল ও উদ্ভিদ জগতের জীবন ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কুরআন মজীদে পানির অস্তিত্বকে প্রাণীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআন ঘোষণা করেছে, ‘وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَى’ অর্থাৎ আমি সকল কিছুর জীবন দান করি পানি দ্বারা।
কিছুক্ষণের জন্য বায়ু না থাকলে যেমন জীবিত থাকা অসম্ভব, তেমনিভাবে আর্দ্রতা ও উপযুক্ত পরিমাণ জলীয় বাষ্প না থাকলেও সব কিছু শুকিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। বায়ু ও সূর্যের কিরণ দূষিত বস্তুকে পরিষ্কার করতে এবং অপবিত্র ও দুর্গন্ধ জিনিসকে খতম করতে যথেষ্ট সহায়তা করে ঠিকই; কিন্তু এর ক্রিয়া অতি ধীরে ধীরে হয় এবং দীর্ঘ সময় লাগে। আর পানি তার প্রতিক্রিয়া ও কার্যকারিতা অতি দ্রুত দেখাতে পারে। কিছুক্ষণের মধ্যে পানি দূষিত ও অপবিত্র জিনিসকে পাক-পবিত্র করে দিতে পারে। কিন্তু বায়ু ও সূর্যের কিরণ তা সুদীর্ঘ সময়েও পারে না।
আগুন তো পানির চেয়েও পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করে দেয়, তবে তা জ্বালানো যায় এমন জিনিসকে পবিত্র করে। কিন্তু অন্য কিছু আগুনে দিলে আগুন তাকে নষ্ট করে দেয় অথবা দগ্ধীভূত করে ছাই করে দেয়। পৃথিবীতে পানির মতো পবিত্র পরিচ্ছন্নকারী সহজলভ্য, ক্ষতিহীন ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বস্তু আর নেই। সে নিজে পবিত্র এবং অন্য বস্তুসমূহকে পবিত্রকারী আল্লাহর সৃষ্ট একটি বড় নেয়ামত। পানি স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার জন্য যেমন অত্যাবশ্যক, তেমনি তা দুর্গন্ধযুক্ত ও অপরিচ্ছন্ন হলে ততই ক্ষতিকর হয়। সুতরাং স্বাস্থ্য অটুট রাখার সাথে পাক-পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করতে পানি পরিষ্কার ও জীবাণু মুক্ত হওয়া অতি জরুরি।
মোটকথা, পানির পরিচ্ছন্নতার উপর জনস্বাস্থ্য নির্ভরশীল। কুরআন মজিদে ২০ স্থানে পাক মধু, সুস্বাদু পানির নদী ও ঝর্ণার কথা সুমিষ্ট স্বরে বর্ণনা করা হয়েছে। তদ্রুপ দূষিত দুর্গন্ধ, নাপাক, বিস্বাদ, লবণাক্ত পানির অপকারিতা ও ক্ষতির কথা বর্ণনা করা হয়েছে। তবে কুরআনে ওই পানির সবচেয়ে বেশি প্রশংসা করা হয়েছে, যা বৃষ্টির আকারে সকল প্রকার ভেজাল ও সংমিশ্রণ থেকে মুক্ত করে আল্লাহ পাক আসমান থেকে বর্ষণ করেন। তারপর এ মৃত অনুর্বর জমিন, গ্রাম, শহর, উদ্ভিদ ইত্যাদির উপর পতিত হয়ে জীবন্ত করে তোলে।
স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য যেমন স্বাস্থ্যবিধি ও রীতি-নীতির সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি ইসলামে পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি সংক্রান্ত হেদায়েত ও বিধি-বিধানের সম্পর্কও পানির সাথে। এ জন্য ইসলামে পানির পাক-পবিত্রতার ব্যাপারে যদি বিস্তারিত জানা না যায়, তবে হেদায়েত ও বিধি-বিধানের জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম অনন্য ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।
পানির পবিত্রতা ও অপবিত্রতার বিস্তারিত বিবরণ হাদীস ও ফিকহের কিতাবপত্রে বিদ্যমান আছে। এখানে তা বর্ণনা করা দুরূহ। এখানে শুধু পানির অপবিত্রতা ও অনুপযুক্ততার বাহ্যিক লক্ষণগুলো প্রকাশ করে স্থান-কাল-পাত্রভেদে এর ব্যবহারকারীদের জ্ঞান ও বিবেকের উপর পাক ও নাপাক হওয়ার বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সাধারণ নিয়ম হলো পানিতে কোনো দূষিত পদার্থ পড়ে পানির রং, ঘ্রাণ ও স্বাদ পরিবর্তন করে দিলে সে পানি অপবিত্র হয়ে যায়।
ইসলামি ফিকাহ শাস্ত্র বিশেষ অনুগ্রহ করে বর্ণনা করেছে, কী পরিমাণ পানিতে কী পরিমাণ দূষিত বস্তু পড়লে পানি নাপাক হয়ে যায়। যেমন, দশ হাত দৈর্ঘ্য দশ হাত প্রস্থ ও দশ হাত গভীর জলাশয় অর্থাৎ এক হাজার বর্গ হাত পানিতে সাধারণ ময়লা বস্তু পড়লে রং, স্বাদ, গন্ধ পরিবর্তন না হলে তা অপবিত্র হবে না। এসব অধ্যায়ে ফিকহ শাস্ত্র ছোট ছোট তারতম্য ব্যাখ্যা করেছে। এর দ্বারা বুঝা যায়, ইসলামে পানির পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা কতই না গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবিক পানির মাসআলা হলো স্বাস্থ্য রক্ষার আসল ও অন্যতম মাসআলা।
স্বাস্থ্য রক্ষার ব্যাপারে আরও লক্ষ্য রাখতে হবে, দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে পানি কমবেশি যাই হোক, পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা মনের উপর প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু উন্নতশীল দেশের বিভিন্ন শহরে ও কেন্দ্রে যেখানে সকল প্রকার আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, সেখানে সাধারণত পানির সমস্যা সৃষ্টি হয় না।
দুনিয়ার ৭৫ ভাগ এলাকায় তারা জনবসতি স্থাপন করেছে। মরুভূমি, পুরাতন বিধ্বস্ত গ্রাম প্রভৃতি আবাদ করেছে। বসবাসের সকল সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। স্বাস্থ্য রক্ষার্থে পানির পরিমাণ ও পরিচ্ছন্নতার উপর সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। সাধারণত পান করার বিশুদ্ধ পানি ধুলো আবর্জনা থেকে রক্ষা করার জন্য উঁচু স্থানে ট্যাংক রাখা হয়। কিন্তু উন্নত দেশেও পানির স্বল্পতা দেখা দেয়। তথাপি খেয়াল রাখতে হবে, যেন প্রতিদিন প্রয়োজন মতো পানি ট্যাংকে উঠিয়ে পরিশোধিত করা হয় এবং পরিষ্কার, বিশুদ্ধ ও সুস্বাদু পানি রাখা হয় যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়।
স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য ইসলামে সুন্দর ফলপ্রসূ নীতিমালা রয়েছে। সবরকম মানুষের চাহিদা, সমস্যা, পানির স্বল্পতা, পর্যাপ্ততা ইত্যাদি সব কিছুর প্রতি আল্লাহ পাক দৃষ্টি রেখেছেন। তিনিই সুন্দর সমাধান দিয়ে দিয়েছেন। তিনি অদৃশ্য থেকে এমন ব্যবস্থা দিয়েছেন, যা মানুষের দৃষ্টিগোচর হয় না। এ ব্যবস্থা দ্বারা সব মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার চাহিদা পূরণ হয়।
পরিষ্কার বিশুদ্ধ পানি জীবন বাঁচানোর জন্য অপরিহার্য। এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে দিকনির্দেশনা ও বিধি-বিধান ইনশাআল্লাহ পরে উল্লেখ করা হবে। তবে এখানে পানি পবিত্র ও পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে একটি বিধান উল্লেখ করা হচ্ছে। তা হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কঠোরতার সাথে নিষেধ করেছেন— উন্মুক্ত আবদ্ধ পানিতে যেখানে গোসল করা হয়, আসবাবপত্র ধৌত করা হয়, পানি পান করার জন্য নেওয়া হয়, সেখানে ময়লা ও আবর্জনা ফেলবে না; পেশাব-পায়খানা করবে না। এমন কূপের পানি পান করতে এবং ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন, যা পুরাতন ঘর-বাড়ি বহু প্রাচীনকালে তৈরি হয়েছিল এবং জনমানবহীন শূন্য অবস্থায় পরিত্যক্ত পড়েছিল। এরূপ কূপ থেকে সাধারণত বিষাক্ত বাষ্প বা গ্যাস নির্গত হয়। এরূপ কূপের মধ্যে নামতেও নিষেধ করেছেন।
খাদ্য দ্রব্যের উপর ঢাকনা দিয়ে রাখা:
বহু হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদ্য-দ্রব্যকে ঢেকে রাখার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। চিন্তা করলে দেখা যায়, এটা স্বাস্থ্য রক্ষার বিধিমতে কতই না সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। কেননা জিনিসপত্র যদি ঢেকে রাখা না হয়, তবে নিম্নলিখিত সমস্যা ও অপকারিতা দেখা দিতে পারে—
(১) বিষাক্ত প্রাণী যেমন সাপ, বিচ্ছু, টিকটিকি ইত্যাদি উন্মুক্ত খাদ্যের মধ্যে বিষ ঢেলে দিতে পারে। এরূপ অসংখ্য ঘটনা ইতিহাসের বইপত্র ও সাধারণ জীবনে দেখা যায়।
(২) উন্মুক্ত বাসনপত্রে খাদ্যদ্রব্য থাকলে আর এতে কুকুর মুখ দিলে, তাতে মারাত্মক জীবাণু মিশে যেতে পারে।
(৩) আশেপাশে খোলা স্থানে উন্মুক্ত পরিবেশে অগণিত রোগজীবাণু থাকে। ফলে জিনিসপত্র খোলা থাকলে এতে জীবাণু প্রবেশ করে। এভাবে উক্ত খাদ্য শরীরের জন্য বিষে পরিণত হয়।
(৪) তদ্রুপ খাদ্যদ্রব্য খোলা থাকলে আর এতে কোনো লোকের বদ-নযর পড়লে তার নেতিবাচক প্রভাব এর মধ্যে পড়ে যায়। ফলে খাদ্য রোগজীবাণুতে পরিণত হয়।
📄 দ্বীনদার লোকদের রোগ-ব্যাধি
দীন হলো শান্তি, স্বাস্থ্য ও শৃঙ্খলার নাম। খাদ্য যেমন শরীরের শক্তি বৃদ্ধির জন্য অতি জরুরি, তেমনি অতিরিক্ত খাদ্য খেলে তা রোগ জীবাণুতে পরিণত হয়। তদ্রুপ যখন ধার্মিক ব্যক্তি নিজের অভ্যাসের চেয়ে বেশি আহার করে এবং পরিমিত কর্ম থেকে অধিক পরিমাণে কাজ করে, তখন সে বিভিন্ন প্রকার রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়।
• রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাযান মাস ব্যতীত একাধারে বেশি রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি সাধারণ নিয়ম ভঙ্গ করে অধিক রোযা রাখে, তা হলে অচিরেই সে দুর্বলতা, খিঁচুনী, মস্তিষ্কের দুর্বলতা, মাথার পর্দার শুষ্কতা ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হতে পারে। শরী'আতের হুকুম হলো খাদ্য কম খাও। আর কেউ যদি হঠাৎ খাদ্য খুব কমিয়ে দেয়, তবে রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে।
দীন-ইসলাম সর্বক্ষণ আল্লাহকে স্মরণ করার হুকুম দেয়। কিন্তু শরীরের শক্তির চেয়ে বেশি বেশি যদি যিকির করা হয়, তবে মস্তিষ্ক শুকিয়ে পাগল হয়ে যাবে। মোটকথা, ধর্ম হলো সতর্কতা ও মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নাম। ধর্মের মধ্যে অনেক সুযোগ-সুবিধা ও বিভিন্ন প্রকার শিথিলতাও আছে। সুতরাং ধর্ম যতটুকু অবকাশ দেয়, ততটুকু অবশ্যই গ্রহণ করা দরকার। তবে মনে রাখতে হবে, আমরা যেন এক শিথিলতার সুযোগ নিতে গিয়ে আরও অধিক শিথিলতা সৃষ্টি করে না ফেলি। কেননা তখন তা আর ধর্মের সীমার মধ্যে থাকবে না।
📄 ইবাদত বন্দেগী ও শারীরিক সুস্থতা
ইবাদত-বন্দেগীতে সম্ভবত সকল ধর্মে মুক্তি, নাজাত ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য জীবনের উপর বিভিন্ন প্রকার কষ্ট দেওয়া উদ্দেশ্য। অনেক ভারি ভারি বন্দেগী পছন্দ ও মনোনীত করা হয়। নির্জনতা ও সন্ন্যাসবাদের মধ্যেও পুণ্য আছে মনে করা হয়। অথচ এটাও শরীর-স্বাস্থ্যের উপর এক প্রকার কঠোরতা।
অনেক লোককে তো বন্দেগীর নামে শরীরের উপর কঠোরতা করতে দেখলে অবাক হতে হয়। কেউ প্রচণ্ড গরমে খোলা মাঠে অথবা লোহার বড় পাতের উপর ইবাদত-বন্দেগী করে। আমি নিজেও অনেক হিন্দু যোগী-সন্ন্যাসীকে কত সব উদ্ভট পূজা-পার্বন করতে দেখেছি। অনেকে দীর্ঘক্ষণ দণ্ডায়মান থাকে। অনেকে উল্টাভাবে ঝুলন্ত থাকে। আবার অনেকে মাত্র একটি লেংটি পরে লোহার রডের উপর বসে। এই লেংটি পরেই শয়ন করে এবং যাবতীয় কাজ করে।
তারা এভাবে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয়। জনৈক যোগী আমাদের শহরে এসেছিল। সে জুনের মাঝামাঝি প্রচণ্ড রৌদ্রে খোলা মাঠে উলঙ্গ হয়ে নামে মাত্র লেংটি পরে বিছানা বিছিয়ে বসে যেতো। একটি কাপড় ভিজিয়ে মুখে বাঁধত এবং নিজের চারিদিকে কয়েক মণ কাঠ জমা করে এতে আগুন জ্বালিয়ে বসে থাকত। এভাবে কয়েক ঘণ্টা আগুনের বৃত্তের মধ্যে থেকে নিজেকে উত্তপ্ত করত। সেখান থেকে তখন উঠত, যখন আগুন নিভে ঠাণ্ডা হয়ে যেত। কয়েক দিন পর্যন্ত সে ধারাবাহিকভাবে এরূপ করত। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক গিবন তার রোম সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস গ্রন্থে একটি ঘটনা লিখেছে—
ইসলামের মাঠের মধ্যে একটি বাঁশ গেঁড়ে নিজেকে বাঁশের মাথায় বেঁধে নিত এবং হাত দ্বারা নিজের বুকের উপর ক্রুশ চিহ্ন বানিয়ে না খেয়ে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঝুলে থাকত। শেষ পর্যন্ত এভাবে সে ধ্বংস হয়ে (মারা) যায়। তাই সমসাময়িক ঈসায়ী লোকেরা তাকে আল্লাহর ওলী মনে করত।
কিন্তু ইসলাম এ জাতীয় বন্দেগীকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।
প্রথমেই বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবী হিসেবে আবির্ভাবের পর তাঁকে সারা রাত ইবাদত করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং পরিমিত বিশ্রাম গ্রহণ করার প্রতি কঠোরভাবে তাকিদ করা হয়েছে। যখন ইসলামের প্রবর্তক ও প্রতিষ্ঠাতার প্রতি সরাসরি এমন নির্দেশ করা হয়েছে, সেখানে প্রত্যেক মুসলমানের অপরিহার্য কাজ হলো এ জাতীয় রিয়াযাত (সাধনা) থেকে বিরত থাকা এবং সর্বদা নিজেদের শরীর ও স্বাস্থ্য ঠিক রাখার ব্যাপারে সচেতন থাকা।
ইসলামী শিক্ষার দৃষ্টিতে উপরিউক্ত কোন প্রকার বন্দেগী, অর্চনা ইত্যাদি অনুমোদিত ও পছন্দনীয় নয়। আর এর বিনিময়ে বিন্দুমাত্র প্রতিদানও নেই। কুরআন মজীদে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, নিজে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত করো না। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এক স্ত্রীর ঘরে রশি ঝুলাতে দেখেন। জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কিসের রশি? উত্তর করলেন, ইবাদত করতে করতে যখন নিদ্রা এসে যায়, তখন এ রশি মাথার চুলের সঙ্গে বাঁধা হয়। ঘুমের ঘোরে যখন রশিতে টান পড়ে তখন ঝটকা (ধাক্কা) লাগতেই ঘুম ভেঙে যায়।
সব কিছু শ্রবণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ জাতীয় ইবাদত অবৈধ। আমল এমনভাবে করতে হবে, যতটুকু শরীরে সহ্য হয় এবং সহজে স্বাভাবিকভাবে আরামের সাথে করা যায়। কুরআন মজীদে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামায পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। কুরআনের সকল তাফসীরকারক ও ইসলামের মহান চিন্তাবিদগণ এ ব্যাপারে একমত যে, নিদ্রাও এক প্রকার নেশা। সুতরাং যখন ঘুম প্রাধান্য পাবে, তখন নামায না পড়া উচিত। ইসলাম শরীর, স্বাস্থ্য ও সুস্থতার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করে থাকে। যেমন, কেউ নামাযে দণ্ডায়মান হওয়ার পর তার পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন হলে সে নামায ত্যাগ করে উক্ত প্রয়োজন পূর্ণ করবে। তারপর নামায পড়বে। অন্যথায় নামায মাকরূহ হবে। কেননা পায়খানা চেপে রাখতে গিয়ে প্রথমেই তো ইবাদতের প্রতি মনোযোগ থাকবে না। দ্বিতীয়ত তার স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হতে পারে। কোন না কোন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিরক্তিকর দীর্ঘ কিরাতের নামায পড়াও নিষেধ। অদ্রুপ ইমামের জন্য অতি দীর্ঘ কিরাআতের নামায পড়ানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
সারকথা, ইসলাম ইবাদত-বন্দেগীতেও শরী'আতসম্মত ওজর যেমন অসুখ-বিসুখ, ক্লান্তি-শ্রান্তি ইত্যাদিতে সুযোগ দেয়। রোগ বা ক্লান্তিতে নামায দাঁড়িয়ে পড়তে না পারলে বসে, শুয়ে বা ইশারা করে পড়তে হয়। তদ্রুপ সফরে ও রোগে রোযা না রাখলেও চলে। মহিলারা শারীরিক ওজর-আপত্তি ও জটিলতায় যখন ওযু গোসল ইত্যাদি করতে পারে না, তখন তাদের জন্য অনেক ইবাদত মাফ হয়ে যায়। সুতরাং এমতাবস্থায় ইবাদতের নির্ধারিত তরীকার উপর বাড়াবাড়ি করা মানব শরীর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শরীর ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে এক সাধারণ নিয়ম অনুমোদন করে বলেছেন, ইবাদত-বন্দেগীর কাজে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে। আরও বলেছেন, এ (মধ্যমপন্থা) আল্লাহর নিকট খুবই প্রিয় ও পছন্দনীয়। সর্বদা এ পন্থা অবলম্বন করলে মানুষের শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক থাকে। নবীজী রৌদ্রে দাঁড়িয়ে থাকতে এবং নীরব থাকতেও নিষেধ করেছেন। (রিয়াযুস্ সালিহীন)
📄 পরিশিষ্ট
পরিশিষ্ট অংশে দাড়ি রাখার প্রয়োজনীয়তা, গাভীর গোশতের হালাল হওয়া সম্পর্কিত ব্যাখ্যা এবং নামায ও ক্ষুধার সামঞ্জস্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।