📄 হারাম বস্তুর বৈজ্ঞানিক অবস্থান
স্বাভাবিক নিয়মে মৃত প্রাণীর গোশত খেতে আল-কুরআন নিষেধ করেছে। বাস্তবিকই রোগগ্রস্ত হয়ে কোনো প্রাণী মারা গেলে তার গোশত যারা ভক্ষণ করবে, তাদের রোগাক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। প্রাণীদের অধিকাংশ রোগ-ব্যাধি জীবাণু বা ভাইরাস জনিত জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে হয়। প্রথমত মৃত প্রাণীর গোশত থেকে জীবাণুগুলো গোশত ভক্ষণকারীর শরীরে চলে যায়। ফলে সে রোগাক্রান্ত হয়। এ রোগ ভয়ানক হওয়ার প্রমাণ হল রোগ বহনকারী প্রাণীটির মৃত্যু। প্রাণীদের কিছু কিছু রোগের জীবাণু মানুষের জন্য ততটা বিপদজনক নয়। কিন্তু এর গোস্তে এত অসহনীয় দুর্গন্ধ থাকে, যা সুস্থ ব্যক্তিকে রোগাক্রান্ত করে দেয়।
পোস্টমর্টেম করে প্রাণীর মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা হয়। এরপর পরীক্ষা করা হয়, এটা রোগীরা খেলে ক্রিয়াশীল হয় কি না? যেমন, মুরগী। আপনার মুরগী মারা গেলে তাকে আপনি পশু চিকিৎসকের নিকট পোস্টমর্টেম করতে নিয়ে যান। তারপর তার শরীরের কিছু অংশের পরীক্ষা স্বচক্ষে দেখবেন। এ সময় সজাগ দৃষ্টি রাখলে সহজেই বোঝা যাবে, কোনো প্রাণী রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তার গোশত খাওয়া কতটুকু নিরাপদ! মৃত প্রাণীর গোশতের আরেকটি সমস্যা হল রক্ত। জীবিত প্রাণী যবাই করলে তার শরীরের প্রবহমান সমস্ত রক্ত বের হয়ে যায়। কিন্তু মৃত প্রাণীর রক্ত বের হয় না বরং গোস্তের মধ্যে আটকে থাকে। সে জন্য গোশত দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বিষাক্ত জীবাণু সৃষ্টি হয়। তাই মৃত প্রাণীর গোশত সুস্থ সবল মানুষের স্বাস্থ্যের পরিপন্থী।
📄 রক্ত
কুরআনে কারীম রক্তকে হারাম ঘোষণা করেছে। এক স্থানে স্পষ্ট বলেছে, রক্ত দ্বারা উদ্দেশ্য প্রবাহিত রক্ত। কোনো জীবিত প্রাণীর দেহ থেকে নির্গত হওয়ার পরই রক্ত জমাট হয়ে যায়। জমাট হওয়ার পর যে উফর্ম (লোথড়া) প্রস্তুত হয়, তা হজম করার শক্তি সকল মানুষের পাকস্থলীর থাকে না। বিড়াল, কুকুর, বাঘ, সিংহ, চিতাবাঘ ইত্যাদি রক্ত পিপাসু প্রাণীর শরীরেও সে শক্তি থাকে না। সেজন্য কোনো মানুষ রক্ত পান করলে তা তার পাকস্থলীর হজমশক্তিকে অকেজো করে দেয়। তা ছাড়া রক্ত কেবল নিজেই হজম অযোগ্য নয় বরং তার পরে ভুক্ত খাদ্যকেও হজমের অযোগ্য করে দেয়। এভাবে তা পরিপাতক্রিয়াকে নষ্ট ও বিকল করার পর অবশেষে শরীর থেকে রক্তকে বের করে দেয়। ফলে শূলবেদনা সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞগণ মাত্র ক'দিন আগেই স্পষ্ট অবগত হয়েছেন যে, মানব শরীরে রক্ত পরিপাক করার মতো শক্তি নেই। কিন্তু হাজার বছর পূর্বে আল-কুরআন ঘোষণা দিয়েছে, রক্ত পান করা হারাম। এতে চিকিৎসা ও রাসায়নিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রমাণিত হল যে, প্রাণীর রক্ত শরীরে আটকা পড়লে দেহের গোশত দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। কেননা মাত্র এক দিনে রক্তে হাজার হাজার জীবাণু সৃষ্টি হয়। যখন রোগজীবাণুর সংখ্যা অধিক বৃদ্ধি পায়, তখন তা সনাক্ত করা সহজ নয় বরং খুব কঠিন হয়ে যায়। ফলে বিভিন্ন প্রকার ঔষধ দিয়ে দেখতে হয়, উক্ত জীবাণু কিসে কিভাবে বিনাশ হয়। গবেষণার পরই কেবল জানা যায়, রক্তের জীবাণু কোথায়, কিভাবে, কেমন আছে? কাজেই রক্ত ব্যবহার করা বহুবিধ বিপদের কারণ হতে পারে।
📄 শুকরের গোশত
আল-কুরআন স্পষ্টভাবে পাঁচ স্থানে শূকরের গোশত হারাম বলে ঘোষণা করেছে। হিন্দুরা গাভী এবং শিখেরা ময়ূরের গোশত না খেলেও বরকতময় মনে করে। অপবিত্র হওয়ার কারণে ইসলাম শূকরের গোশতকে হারাম ও নিষিদ্ধ করেছে। যেহেতু ইসলামের কোনো কাজ প্রজ্ঞাশূন্য নয়, তাই ঈমান ও একীনের দাবি অনুযায়ী এটা নির্ধিধায় পরিত্যাজ্য হওয়াই উচিত। কিন্তু যারা কারণ জানতে ইচ্ছুক বা যারা ইসলাম মানে না (অমুসলিম) তারা অবাক হয়ে বলেন, ডাক্তার তো গোশত পরীক্ষা করেই খাওয়ার অনুমতি দেন। তা ক্ষতিকর হয় কিভাবে? সাধারণত মানুষ যেসব রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, শূকরও সেসব রোগে আক্রান্ত হয়। যেমন: তার রক্তনালী দিয়ে চর্বি বের হয়। হৃৎপিণ্ডে কম্পন পড়ে। ব্লাডপ্রেসার (রক্তচাপ) হয়। যে-ঘরে শূকর বসবাস করে বা যে গোশত খায় তার অস্তিত্ব হুমকীর সম্মুখীন হয়। কেননা এগুলো চলাফেরা করার সময় বাইর থেকে বিভিন্ন প্রকার রোগজীবাণু বয়ে নিয়ে আসে।
এ সব রোগ-জীবাণুই পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে গাভী, মহিষ, বকরি, কবুতর, মুরগী ইত্যাদির মধ্যে কমবেশি যাই হোক, এদের রোগ-ব্যাধি মানুষের মধ্যে ততটা ক্ষতিকর প্রভাব ছড়ায় না। যেমন: আমার মুরগীগুলো 'রাণীখেত' সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। কিন্তু এর কারণে আমার পরিবারের লোকদের মধ্যে তেমন ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে নি। পক্ষান্তরে এ জাতীয় কোনো রোগ শূকরের মধ্যে ছড়িয়ে গেলে তার পালন-পোষণকারী এবং ভক্ষণকারী কেউই নিরাপদ থাকতে পারে না। শূকরের কলেরা রোগ হয়। বসন্ত হয়। দ্রুত রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। এর অস্ত্রে পরজীবী রোগ-ব্যাধি পালিত হয়। এর তিন মাস্তির মাধ্যমে আশপাশের লোকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
খাদ্যের দিক দিয়ে শূকর সর্বভূক অর্থাৎ সব কিছু খায়। পরগাছা ক্রিমি শূকর ব্যতীত গাভীর দেহেও হতে দেখা যায়। এ পরগাছা খাদ্য দ্রব্যের সঙ্গে মানুষের শরীরে অধিক প্রবেশ করে। তবে যেহেতু গাভীর গোশত সিদ্ধ-ভূনা করে খাওয়া হয়, তাই খাদ্যের সাথে শরীরে প্রবেশ করার সম্ভাবনা খুব একটা থাকে না। রাহবারে কামিল রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত ক্ষতি ও সমস্যাসমূহ অনুভব করেছিলেন। তাই গাভীর দুধ ও মাখন পছন্দ করা সত্ত্বেও এর গোশতকে রোগের কারণ বলে আখ্যা দিয়েছেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাযি. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমাদের জন্য গাভীর দুধ ভাল। কেননা এর দুধ ও মাখন খুব উপাকারী ঔষধও বটে। অবশ্য এর গোশতে রোগ জীবাণু আছে। সুতরাং এ থেকে বাঁচ।
সম্ভবত এ কথাই মুহাম্মদ আহম্মাদ জায়বী হযরত মুহাযের রাযি. হতে বর্ণনা করেছেন। যেমন: হযরত মূল্যয়কা বিনতে আমরা রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন : গাভীর দুধের মধ্যে শেফা (উপশম) আছে। এর মাখনও একটি উত্তম ঔষধ (প্রতিষেধক)। তবে এর গোশত রোগ-ব্যাধির কারণ। উল্লেখ্য যে, এখানে গাভীর গোশতকে হারাম বলা হয় নি বরং পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, এটা খেতে পার নিশ্চয়। তবে তাতে তোমরা রোগাক্রান্ত হয়ে যেতে পার। গাভীর গোশত সম্পর্কে হাদীস বিশারদগণ কয়েকটি ক্ষতিকর অবস্থার কথা বলেছেন।
এর বিস্তারিত বিবরণ গোস্তের উপকারিতা অধ্যায়ে উল্লেখ করা হবে। তবে অবশ্য আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহ. একে রোগের কারণ বলে সনাক্ত করেছেন। যেমন, শরীরের কোনো কোনো অঙ্গ ফুলে যাওয়া। এ ফোলা কতিপয় পরগাছা ক্রিমির কারণে হয়। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ হল Wucheria Banerofti Guinea। আফ্রিকা ও মিসরে একটি ক্ষতিকর পোকা (ক্রিমি) গাভীর গোস্টে পাওয়া যায়। শম্পর একটি পরগাছা ক্রিমি অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় শূকরের গোস্তে বেশি হতে দেখা যায়। অনুরূপ নাড়ীভুঁড়ি ও যকৃতে প্রতিপালিত হয়, এমন একটি ভয়ঙ্কর পোকা হল Fasciolopsis Buski। এটা শূকর ও কুকুরের শরীরে বেশি পাওয়া যায়। এর বিষক্রিয়ায় দাস্ত, পেট ব্যথা এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। কুকুর ও শূকরের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের মধ্যে এ রোগ ছড়ালে সারা জীবন সীমাহীন কষ্ট ও ভোগান্তির কারণ হতে পারে। ইউরোপে প্রাণীর প্রতিপালন ও উৎপাদন কম হওয়ায় প্রতি বৎসর তাদের খাদ্য ঘাটতি দেখা দিত। এজন্য তারা অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, চিলি, আর্জেন্টিনা, কেনিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে খাদ্য আমদানি করে সেই ঘাটতি পূরণ করত। বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে আর্জেন্টিনা থেকে শূকরের গোশত জার্মানীতে আমদানি করা হত।
যখন দেখা গেল ওখানকার শূকরের গোশতের কারণে জার্মানীদের মধ্যে অস্থি-সন্ধির রোগ-ব্যাধি দেখা দিচ্ছে। তখন জার্মান সরকার গোস্তের টুকরা পাঠানোর পূর্বে প্রত্যক্ষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করে। যদিও এটা কষ্টকর কাজ ছিল; কিন্তু উক্ত মারাত্মক রোগ থেকে বাঁচার জন্য এই একটি মাত্র ব্যবস্থাই ছিল। যার ফলে জার্মানীতে আমদানিকৃত গোশতের মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সরবরাহ ও আমদানির ক্ষেত্রে সার্টিফিকেট সংযুক্ত করে সাক্ষাৎকার দেয় যে, এতে পরজীবী পোকা নেই। কিন্তু কিছুদিন পরে দেখা গেল, এত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করা সত্ত্বেও পোকা বাহিত রোগ-ব্যাধি পূর্বের মতোই বহাল আছে। তাই আজ অধিকাংশ দেশে শূকরের গোশত খুব গবেষণা ও পরীক্ষা-নীরিক্ষার পরই বাজারজাত করা হয়।
যদিও উক্ত পন্থা অবলম্বনের মধ্যে আনন্দিত হওয়ার তেমন কিছু নেই, তথাপি ধরুন স্বীকার করে নিলাম, এ জাতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা ও গবেষণার পর এতে আর রোগ-জীবাণু থাকে না। কিন্তু তারপরও দেখা যাবে, গোশতের সঙ্গে জড়িত চর্বির কোষের মধ্যে মিশ্রিত জীবাণু পাকস্থলীতে প্রবেশ করছে এবং খাদ্যকে অনুপযুক্ত ও ক্ষতিকর করে দিচ্ছে। দুর্বল শূকরের গোশত থেকেও তাপ উৎপাদিত হয়। তবে বকরির গোশতে উক্ত তাপ মাত্রা ২৪৫। অবশ্য বেশ কিছু পন্থায় উক্ত গোশতের ক্ষতিকর ক্রিয়া কিছুটা হ্রাস করা যায়। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন হতে পারে, যখন উক্ত গোশত সাধারণ অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায় না, তখন এমন কী আর বিশেষ ব্যবস্থা আর উপযুক্ত করা যাবে? সবচেয়ে বড় কথা হল, ভক্ষণকারী সর্বদা নির্লজ্জ হয়ে থাকে। এজন্য সমগ্র ইউরোপ লজ্জাশীলতা থেকে বঞ্চিত।
📄 গলা টিপে মারা প্রাণী
যে প্রাণী গলায় চাপা খেয়ে মারা যায়, তার শরীরের সমস্ত রক্ত দেহের মধ্যে থেকে যায়। এ কারণে তার গোশত দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। গোস্তের রং গাঢ় লাল হয়ে যায়। ফলে তা কুশ্রী ও বিস্বাদ হয়ে যায়। শ্বাস আসা-যাওয়া বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ হওয়ার কারণে রক্তে রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। যদ্দরুন গোস্তের মধ্যে এমন পরিবর্তন আসে, যার পরে তা খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য বিরাট ক্ষতিকর। আঘাত যে প্রকারের হোক না কেন, এতে হিস্টামিনের উৎপত্তি হয়। এর দুর্গন্ধ গোস্তে মিশে যায়। হিস্টামিনের প্রভাব ও তার ক্ষতি পৃথক শিরোনামে বর্ণনা করা হয়েছে。