📄 বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞগণের মতে মা যখন তার শিশুকে দুধ পান করান, তখন (দুধের) সাথে অনুভূতিহীন তরঙ্গ ও স্পন্দন তার (শিশুর) মধ্যে চলে যেতে থাকে। ফলে এই স্পন্দন ও তরঙ্গই শিশু ও মায়ের মধ্যে ভালবাসা, স্নেহ-মমতা, আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধাবোধের কারণ হয়। চিন্তা করুন, যে মা শিশুকে তার বুকের দুধ পান করান না রবং কৃত্রিম ডিব্বার দুধ (সাদা বিষ) পান করান এবং সেবিকা ও আয়া দিয়ে লালন-পালন করান, এবং এভাবেই একদিন সে বড় ও যুবক হয়ে যায়, তারা মায়ের মিষ্টি দুধ পান না করার দরুন তার মায়া-মমতা লাভ করে না, তার কোলের উষ্ণতা পায় না। এমন সন্তানের কাছ থেকে মাতা-পিতার প্রতি শ্রদ্ধা ও মর্যাদাবোধের আশা কিভাবে করা যায়?
ইউরোপের ছেলেরা বস্তা ঝুলিয়ে বাজার থেকে বার্গার এনে খায়। তারপর স্কুলে দৌড়ায়। বর্তমানে আমাদের দেশের অভিজাত পরিবারের বাচ্চাদেরও ওই একই অবস্থা। এতে মায়ের স্বহস্তে নাস্তা তৈরি করে বাচ্চাকে খাওয়ানোর সৌভাগ্য হয় না। (মা ছেলে-মেয়েদের নাস্তা তৈরি করে খাওয়ালে এর মাধ্যমে মায়া-মমতা, আবেগ, উদ্দীপনা, স্নেহশীলতা ইত্যাদির স্পন্দন ও শিহরণ ছেলে-মেয়েদের মধ্যে স্থানান্তরিত হত। তথাপি এসব না করেই উক্ত মা তার ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে কিভাবে সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সেবা ও উপকার আশা করতে পারেন?
যাই হোক, মায়ের দুধ বাচ্চাদের সুস্থতা জন্য বড় নেয়ামত। বর্তমানে তো রেডিও, টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা ইত্যাদিও চিৎকার করে শুক দুধের অপকারিতা বর্ণনা করছে। কিন্তু মনে রাখবেন, সুস্থ ও সামর্থ্যবতী মায়েরাই শুধু দুধ পান করাতে পারেন। হাজার হাজার মা এমন আছেন, যার দুধ হয় না বা কম হয়।
দুই একজনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলেও বাস্তবে সে সকল মাকে চিকিৎসা করলে সব কিছু ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু তবুও অনেক মা বাচ্চাকে দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেন। বস্তুত এটাও একটি মারাত্মক ভুল। আবার অনেক সুশ্রী, রূপসী নারী নিজের সৌন্দর্য ও রূপ-লাবণ্য চলে যাওয়ার ভয়ে শিশুদেরকে দুধ দেয় না। এমন নিষ্ঠুরতাকে ও প্রতারণার পরিণামে আল্লাহর কুদরত তাদের সীনার মধ্যে ক্যান্সার ঢুকিয়ে দেন।
📄 মায়ের দুধ এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
প্রকৃতপক্ষে দুগ্ধপোষ্য শিশুর সুস্থতা, অসুস্থতা, দুর্বলতা, রোগ-ব্যাধি ইত্যাদির ভিত্তি মায়ের উদর। শিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তার বিশুদ্ধ খাবার। এতে অলসতা বা উদাসীনতা দেখালে সারা জীবন শিশুর উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। বাস্তবে জন্মের সময় মাটির কীট-পতঙ্গ ও আরও কয়েক প্রজাতির প্রাণী ব্যতীত মানব শিশু সবেচেয়ে বেশি দুর্বল হয়। দুই এক প্রজাতির প্রাণী ব্যতীত শিশুদের এই দুর্বলতা এত দীর্ঘ হয় যে, অন্য কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে এমনটি দেখা যায় না। সুতরাং উক্ত সময় শিশুর এমন বিশুদ্ধ খাদ্য প্রয়োজন, যা কুদরতীভাবেই তার দুর্বলতার জন্য উপযুক্ত ও পরিমিত হবে; তা গ্রহণের ব্যবস্থাও হবে সুন্দর, মনোরম ও সহজতর বরং সীমাহীন দুর্বলতার সময় বিশুদ্ধ খাদ্য কুদরতী ব্যস্থাপনায় বর্তমান থাকতে হবে।
দুনিয়ায় যত প্রকার খাদ্য আছে, তন্মধ্যে আল্লাহ পাক দুধকে সবচেয়ে উপকারী, শক্তিবর্ধক, স্বাস্থ্যসম্মত ও সহজপাচ্য হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। দুগ্ধ দানকারী সকল প্রাণীর দুধের মধ্যে তাদের বাচ্চার দৈহিক বৃদ্ধি ও গঠনের জন্য যাবতীয় প্রয়োজনীয় উপাদান ও উপকরণ পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। এ বিষয়ে কারও বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। দুগ্ধ পানকালে মায়ের দুধ ব্যতীত শিশুর জন্য আর কোনো উৎকৃষ্ট, উপযোগী ও বিশুদ্ধ খাদ্য নেই। হয়ও না।
ভেরা ও বকরির বাচ্চার জন্য গাভী ও মহিষের দুধ ততটা উপযোগী নয়, যতটা উপযোগী স্ব স্ব শ্রেণীর মায়ের দুধ। অনুরূপ মানুষের বাচ্চার জন্য মায়ের দুধে শক্তি, উপকরণ, পরিমাণ ইত্যাদি ঠিকমত থাকে। অন্য কোন দুধ এমনকি অন্য কোনো মহিলার স্তনের দুধেও তদানুরূপ থাকে না। প্রাণীর দুধে পানি, ঔষধ ইত্যাদি মিশিয়ে দুগ্ধ আমিষ থেকে যে কৃত্রিম দুধ তৈরি করা হয়, তা মায়ের দুধের মতো হতে পারে কিছুতেই মানা যায় না।
হাজার চেষ্টা গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যতই করা হোক না কেন, কৃত্রিম দুধ মায়ের কুদরতী দুধের মতো হয় না, হতে পারেই না। তা যদি সম্ভব হত, তবে আল্লাহ তা'আলা মায়ের স্তনের মধ্যে দুধ সৃষ্টি করতেন না বরং ডিম পারা পাখির মত মায়ের শরীরের পরিবর্তে পৃথকভাবে কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক কোনো খাদ্যের দিকে বাচ্চাকে মুখাপেক্ষী করে দিতেন। মায়ের শরীরের সাথে শিশুর খাদ্যের সম্পর্ক করে দেওয়ায় স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, এর চেয়ে উৎকৃষ্ট, মূল্যবান ও উপযোগী কোনো খাদ্য দুনিয়াতে বাচ্চাদের জন্য নেই। শিশু তার মায়ের শরীরের গোশত ও রক্ত থেকে গঠিত হয়।
এতে প্রমাণিত হয় যে, বাস্তবে শিশু যেহেতু মায়ের রক্তের কুদরতী রাসায়নিক পরিবর্তন ও সংযোগে প্রথমে ভ্রূণ ও পরে পূর্ণ আকৃতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, তখন প্রাথমিক দুর্বলতার সময় চিকিৎসার দৃষ্টিতে মায়ের দুধই শিশুর জন্য উপকারী ও সুবিধাজনক। অন্য মহিলার দুধ থেকে ও তা অতি উত্তম। যাবতীয় খাদ্যের মধ্যে দুধ যেমন উপকারী ও উপযোগী তেমনি নরম, সহজপাচ্য ও তাৎক্ষণিকভাবে সক্রিয়। সুঘ্রাণ জাতীয় খাদ্য এর সাথে রাখলে তা সঙ্গে সঙ্গে ফলপ্রসূ হয়।
স্বাস্থ্য রক্ষায় পারদর্শী ব্যক্তিরা বলেন, স্তন থেকে দুধ বের হওয়ার সাথে সাথে বাইরের পরিবেশ দ্বারা প্রতিক্রিয়াশীল হতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর মাত্র এক বর্গ ইঞ্চির মধ্যে ছয় লক্ষ জীবাণু সৃষ্টি হয়। আগুনে জ্বালালে উক্ত জীবাণু নষ্ট হয় বটে কিন্তু ঠাণ্ডা হলে আবার জীবাণু জন্মাতে শুরু করে। বোম্বে শহরে এক বাজারের দুধ একবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছিল। এতে অনেক রোগ জীবাণু পাওয়া যায়। প্রত্যেক বড় শহরে-বাজারগুলোর দুধের একই অবস্থা। কুরআন মজীদে দুধের কোমলতা, সুস্বাদ ও উৎকৃষ্টতা সম্পর্কে কয়েকটি আয়াত আছে।
ইসলামী শরী'আতের কাণ্ডারী হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও দুধের কোমলতা এবং বাইরের পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত ছিলেন। একবার তিনি বলেন, দুধ গরম করে দাও, যদিও তা এক টুকরা কাঠ জ্বালিয়েই হয়। স্তন থেকে বের হলেই দুধের উপর প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব আরম্ভ হয়ে যায়। স্তনের ভিতরের দুধ ও স্তনদ্বয় হতে সদ্য নির্গত দুধের মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে। এমনকি উভয়ের স্বাদ, গন্ধ, কার্যকারিতা, সতেজতা সব মিলেয়ে লাখও প্রকার পার্থক্য থাকে। তাই স্বাস্থ্য রক্ষা বিধি মতে প্রাণীর দুধ যদি স্তন বা বোটায় মুখ দিয়ে পান করানো হয়, তবে তা অতিউত্তম পন্থা। সরাসরি পানকৃত দুধ সংরক্ষিত নিরাপদ ও সতেজ হওয়ার কারণে খুব উপকারী হয়।
পাঞ্জাব ও কোনো কোনো অঞ্চলে এরূপ সঠিক পন্থায় গাভী, মহিষ ইত্যাদির দুধ পান করানোর প্রথা আছে। এভাবে পানকৃত বাচ্চা বেশ স্বাস্থ্যবান, সুস্থ ও শক্তিশালী হয়। কোনো কোনো গ্রাম্য অভিজ্ঞ লোক সাধারণত শারীরিক দুর্বলতা ও কতিপয় রোগের চিকিৎসায় উক্ত পন্থায় দুধ পান করাতে বলেন। ক্ষয়-জ্বরের চিকিৎসায় বলা হয় যে, মহিষের দুধ তার বোটা থেকে মুখ দ্বারা পান করবে। তদ্রূপ মানব শিশুর জন্য মায়ের স্তন থেকে মুখ দিয়ে দুধ পান করা অন্যান্য প্রাণীর নির্গত দুধ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত দুধ থেকে অতি উত্তম এবং অধিক শক্তি যোগায়।
মানুষের দুধের সঙ্গে মিশ্রিত অন্য দুধ চিকিৎসা গবেষণায় যে অবগত, তার দৃষ্টিতে তা গাধার দুধ সমতুল্য। এছাড়া যখন আল্লাহ তা'আলার কুদরত বাচ্চাদের কাছেই সর্বোৎকৃষ্ট ও সুবিধামত দুধের ঝর্ণা প্রবাহিত করে দিয়েছেন, তখন কোনো কারণ ও প্রয়োজন ব্যতীত অন্য কোনো কৃত্রিম খাদ্য-বস্তু অনুসন্ধান করা মূলত কুদরতী নেয়ামতকে প্রত্যাখ্যান করা। এর বিরোধিতা করা বাচ্চার স্বাস্থ্যের প্রতি অবিচার করারই নামান্তর।
ইদানীং দুধ ভরা ডিব্বা হাকডাকের সাথে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এসব ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে করা হয়। তারা প্রচার করে, হাত না লাগিয়ে, স্বাস্থ্য রক্ষা বিধি মেনে চলে বিশেষ সতর্কতা সাথে দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাদের উপযোগী ও নিরাপদ করে তৈরি করা হয়েছে। যাই হোক না কেন, আমরা পঞ্চইন্দ্রিয় ও কুদরতী এ অবস্থা কিভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন ও প্রত্যাখান করতে পারি?
তদ্রুপ টিনজাত মাছ, তরি তরকারি, ফল-ফলাদি ইত্যাদির খুব প্রশংসা করা হয়, ঢাকঢোল পিটানো হয়। অথচ আমাদের দেশে এসব কিছু টাটকা পাওয়া যায়। যার ফলে সাধারণভাবে এসব পছন্দ করা হয় না। এ জাতীয় মাছ গোশত ইত্যাদি দস্তরখানে পরিবেশিত হলে, গন্ধে আমাদের অনেকের জীবন বের হয়ে যেতে চায়, অনেকে বমিও করে। মূলত এ থেকে একপ্রকার দুর্গন্ধ বের হয়। আমরা তা সহ্য করতে পারি না। কিন্তু তারপরও আমাদের অনুভূতি আসে না। ডেনমার্ক ও হল্যাণ্ডের টিনজাত পনীর যখন কাটা হয়, তখন কখনো কখনো কীট পাওয়া যায়। কিন্তু তারপরও অনেকে খায়।
পক্ষান্তরে যেসব ডাক্তার ও চিকিৎসক ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন না, তারা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বলেন, এ জাতীয় টিনজাত খাদ্য, দুধ, মাছ, গোশত, ফল ইত্যাদির স্থলে টাটকা জিনিসপত্র সর্বাধিক উপকারী ও স্বাস্থ্যসম্মত। তারা আরও বলেন, টিনজাত দ্রব্য অনেক সময় রোগ-ব্যাধি বিশেষ করে ক্যান্সার সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কুদরতী খাদ্য পরিহার করলে বাচ্চার শক্তি বৃদ্ধি ও গঠনে কু-প্রতিক্রিয়া পড়ে।
মোটকথা, আমরা বলতে পারি, মায়ের দুধ পানকারী শিশু ভালোভাবে লালিত-পালিত হলে সে অন্য দুধ পানকারী বাচ্চার তুলনায় ক্ষয় জ্বর ইত্যাদি মারাত্মক রোগে খুব কম আক্রান্ত হবে এবং এসব মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুর মধ্যে বিভিন্ন প্রকার রোগ-ব্যাধি প্রতিহিত করার শক্তি মজুদ থাকে। কতিপয় অভিজাত মায়েরা বলেন, মায়ের দুধ না খাওয়ালে বাচ্চর স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়া ব্যতীত আরও একটি ঘাটতি ও শূন্যতা সৃষ্টি হয়। তা হল মায়ের সাথে সংযোগ ও সম্পৃক্ততা অনেক কম হয় এবং মাতা পিতার স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য স্বল্পই পায়। মায়ের দুধ না খাওয়ানোর অপর একটি বড় মারাত্মক ক্ষতি হল, এ বাচ্চার স্বাস্থ্য হুমকীর সম্মুখীন হয়। এমতাবস্থায় দরিদ্র ও মধ্যবৃত্ত শ্রেণীর পরিবারের উচিত দুগ্ধপোষ্য বাচ্চার জন্য সর্বদা বিশুদ্ধ ও ভালো দুধ সরবরাহ করা। গ্রীষ্ম ও শীত প্রধান দেশে যেখানে দুধ ২/১ ঘণ্টাও নিরাপদ থাকে না, সেখানে বিষয়টি আরও জটিল ও সমস্যাবহুল।
আল্লাহ তা'আলা মায়ের শারীরিক গঠনকে এমনভাবে তৈরি করেছেন যে, সে নিজে যে-কোনো খাদ্য পরিবারের প্রথা ও সামর্থ্য মতো খেলেও এর এক ভাগ তার শারীরিক শক্তি বজায় রাখার কাজে এবং আরেক ভাগ বাচ্চার জন্য উপযোগী দুধ তৈরি করার কাজে ব্যয় হয়। সুতরাং কি দরকার আছে ঘরের খরচের খাত বৃদ্ধি করার? বাচ্চার প্রাপ্য দুধ মায়ের বুকে আটকে রাখার কি দরকার? তাছাড়া কুদরতীভাবে প্রস্তুত প্রক্রিয়া থেকে উপকার না নিয়ে লাভ কি?
সুতরাং মা ডাল, ভাত, শুষ্ক রুটি ইত্যাদি যাই ভক্ষণ করুক না কেন দুধ দিতে থাকলে তাতে বাচ্চা কখনও অভুক্ত থাকবে না। পক্ষান্তরে বিকল্প দুধ কখনও না পাওয়া গেলে, নষ্ট দুধ পাওয়া গেলে বা দুধ নষ্ট হয়ে গেলে ইত্যাদি কারণে বাচ্চা মারা যেতে পারে অথবা রোগাক্রান্ত হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, গরমে দুধ নষ্ট হয়ে গিয়েছে আর মা অজান্তে তা বাচ্চাকে পান করাচ্ছে। ফলে বাচ্চা কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়। শীত প্রধান দেশসমূহে প্রতিবার দুধ পান করানোর সময় গরম করে পান করানো প্রয়োজন।
গ্রীষ্ম প্রধান অঞ্চলে কোনো কোনো বিজ্ঞ চিকিৎসক ও আধুনিক শিক্ষিতরা রেফ্রিজারেটরের পরামর্শ দেন। কিন্তু এতে মূলত দুনিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতি লক্ষ্য করে হয় না। ধনী লোকেরা তো এর ব্যবস্থা করতে পারবে কিন্তু যারা ভাত-রুটিই খেতে পায় না, তারা হাজার হাজার টাকার রেফ্রিজারেটার ক্রয় করবে কিভাবে? এখানেই শেষ নয়। ফ্রিজের মধ্যে গরম দুধ রাখলেও তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। তবে তা ঠাণ্ডা করে বরফ দিয়ে রাখলে কাজে আসে। মাতৃদুগ্ধ পান না করলে দাঁতও দুর্বল হয়ে যায়। পরবর্তী সময় এসব লোক দাঁতের বিভিন্ন প্রকার জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়। এভাবে দাঁতের রোগ থেকে আরও রোগের উৎপত্তি হয় এবং কষ্ট ও দুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়। যখন মাতৃজঠরে (রেহেমে) নুতফা (বীর্য) স্থিতিশীল হয়ে যায়, তখন থেকে নাড়ীর মাধ্যমে বাচ্চার খাদ্য শুরু হয়ে যায়। ধীরে ধীরে ভিতরে ভিতের নয় মাস পর্যন্ত সে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সময় বাচ্চা যে-খাদ্য খায়, তা মায়ের শরীরের একটি অংশ থেকে হয়। সুতরাং বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হতেই তাকে বিকল্প খাদ্য দিলে নিশ্চয়ই স্বাস্থ্যের উপর মন্দ প্রতিক্রিয়া পড়বে।
এ সময় বাচ্চা তো খুবই পাতলা ও দুর্বল হয়। একজন সুস্থ যুবককেও তো তার অভ্যস্থ খাদ্য সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে দিলে সেও অসুস্থ ও রোগাক্রান্ত হয়ে যাবে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। তখন এখানকার লোকেরা চির অভ্যস্থ ভাতের পরিবর্তে বাধ্য হয়ে সকাল সন্ধ্যা রুটিই খেয়েছে। পরিণামে, আমাশয় এবং অন্যান্য মারাত্মক রোগ মহামারী আকার ধারণ করে। এতে বহু লোকও মারা যায়।
বর্তমান কালে তো, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপকারের জন্য একটি দেশ অপর দেশের প্রতি মুখাপেক্ষী ও নির্ভরশীল। এক দেশ তার তরকারি শাক-সব্জি, ফল-ফলাদি ইত্যাদি উৎপাদন করে নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করে অতিরিক্ত জিনিস বিদেশে রপ্তানি করে। আবার অন্য দেশ গোশত, কলকব্জা ইত্যাদির জন্য আরেক দেশের নিকট হাত পাতে। বর্তমান বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রাপ্ত পর্যন্ত উন্নত ও সহজতর যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্যসামগ্রী ও যাবতীয় জীবনোপকরণ অতি দ্রুত আমদানি-রফতানী করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ইউরোপের ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশ হল্যান্ড, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে দুধ, গোশত ইত্যাদি আমদানী করত। কারণ, তারা বিত্তশালী জার্মান অবরোধের কঠিন সমস্যায় ফেসে গিয়েছিল। হাজারও অসহায় মা ক্ষুধায় কাতর হয়ে যেত। দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাদেরকে কোলে করে প্লেট হাতে নিয়ে কঠিন ঠাণ্ডা বা তুষারপাতের মধ্যে সারিবদ্ধ হয়ে দুধের কৌটার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত দৈনিকই। সে করুন অবস্থা সহ্য করা যেত না। কিন্তু এ সমস্যা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে, যখন পরিবহন সমিতি তথা রেল, বাস সার্ভিস, নৌ জাহাজ ইত্যাদির শ্রমিকরা ব্যাপকভাবে হরতালের ডাক দেয়। একে তো শত্রুদের অবরোধে বিদেশী আমদানী ও সাহায্য বন্ধ হয়েছে। তদুপরি দেশের আভ্যন্তরীণ হরতালের কারণে এখন কেবল উৎপাদনই বন্ধ হয় নি বরং দেশীয় পণ্যসামগ্রী একস্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছানোও সম্ভব ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত ছোট বড় সকল দেশ অনুরূপ হরতালের কবলে পড়ে মাঝে মধ্যেই। লণ্ডন, নিউইয়র্কেও এমতাবস্থায় দুধের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ শিশু ক্ষুধার যাতনায় কাতরাতে থাকে। অথচ দুধ এমন নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী যা অগ্রগণ্য এবং সব বিষয়ে প্রাধান্য রাখে।
বর্তমানে ধ্বংসাত্মক অস্ত্রশস্ত্র আবিষ্কার হয়েছে এবং দিনের পর দিন বিশ্ব এক্ষেত্রে উন্নতির চরম স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে। গত বিশ্ব যুদ্ধে ডেনমার্ক ও হল্যাণ্ডের মতো ছোট ছোট দেশ মাত্র কয়েক ঘণ্টায় জয়ী হয়। কিন্তু বর্তমানে রাশিয়া ও আমেরিকার মতো বিরাট পরাশক্তি সম্পন্ন দেশের অস্তিত্ব এক ঝাপটায় শেষ হয়ে যাবে। তাদের রাষ্ট্রীয় শান্তি শৃঙ্খলা ধ্বংস হয়ে যাবে। না খাদ্য-সামগ্রী থাকবে, না জীবন উপকরণ। দুধের কৌটা ও কৌটার মালিক উৎপাদকরা থাকবে জীবিত। মায়েরা তার কলিজার টুকরা দুগ্ধপোষ্য শিশুদেরকে ক্ষুধার কষ্টে কাতরাতে দেখে একেবারে বেহুঁশ হয়ে যাবে এবং শিশুর জন্য কুদরতের সৃষ্টি করা মিষ্টি ঝর্ণা (দুধের উৎস) বন্ধ করে দেওয়ার কষ্টদায়ক শাস্তি ভোগ করবে।
ইউরোপীয় সভ্যতার ভক্ত এশিয়া ও আফ্রিকার লোকেরাও পাশ্চাত্যের ব্যবসায়ীদের ব্যাপক প্রপাগাণ্ডায় প্রভাবিত হয়ে কুদরতী খাদ্য (দুধ) ত্যাগ করে আমদানীকৃত ডিব্বার দুধ শিশুদের পান করানো আরম্ভ করে দিয়েছে। মাথায় তুলে নিয়েছে অহেতুক কষ্ট, ভোগান্তি ও সমস্যা। নিঃসন্দেহে প্রাচীনকালে সামর্থবান লোকেরা শিশুকে কিছু দিন মাতৃদুগ্ধ পান করানোর পর তাকে অন্য মায়ের দুধ পান করিয়ে বাঁচিয়ে রাখত।
পক্ষান্তরে দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরা সর্বদা মায়ের দুধই পান করাত। শিশুর মা মারা গেলে বা অসুস্থ হলে অন্য মহিলার দুধ পান করানোর পরিবর্তে কোনো গাভী বা বকরির দুধ পান করাত। অবশ্য তখন মায়ের দুধ পান করানোর পরিবর্তে সর্বক্ষণ অন্য মহিলার দুধ পান করানোকে প্রাধান্য দেওয়া হত। কিন্তু আজকের বিশ্বে প্রথম দিন থেকেই কোনো কারণ ও প্রয়োজন ব্যতীত টিনজাত কৌটার দুধ পান করানো শুরু করে দেওয়া হয়।
অনেকে আবার দাবি করেন, শিশুকে দুধ পান করালে মায়ের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। আল্লাহ তা'আলার কুদরত কি এ বিষয়ে অবগত ছিল না? তিনি তবে শরীরে অহেতুক এ ব্যবস্থা কেন করে দিলেন? লক্ষণীয় যে, মানুষের শরীরের কোনো অঙ্গ, কোনো বিন্যাস, কোনো গঠন ইত্যাদি বিনা কারণে সৃষ্টি করা হয় নি। কোনো অঙ্গ অকেজো হলে তার প্রভাব অন্য অঙ্গের উপর পড়ে। যেমন: কিছু হিন্দু সন্ন্যাসী নিজের বাহুকে খাঁড়া রেখে শুষ্ক করে পূর্ণ রূপে বেকার ও অকেজো করে দিত। ফলে এর প্রভাব শরীরের সাধারণ স্বাস্থ্য ও শক্তির উপর পড়ত। তদ্রুপ কুদরতের প্রবাহকৃত দুধের স্রোতধারা বন্ধ করে দিলে স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব না পড়ে পারে না। কোনো রমণী এ নেয়ামতকে প্রত্যাখ্যান করে যদি স্বপ্নবিলাসী হয়ে থাকতে চায়, তবে তা কেবল ৩/৪ বৎসর। এরপর তার স্তন ঢিলেঢালা হতে শুরু করে। যার সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় না (নিঃসন্তান হয়), সেও একদিন তার তারুণ্য হারাতে বসে।
অনুরূপ কৃত্রিম উপায়ে বন্ধ্যাত্ব গ্রহণকারিণী মহিলা বার্ধক্যে যৌবনের মোহনীয় রূপ-লাবণ্য ও স্বাস্থ্য হারায়। উল্লিখিত সাধারণ অবস্থাসমূহ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মধ্যমপন্থায় জীবন যাপনকারী এবং শিশুকে দুধ দানকারিণী মায়েদের জীবন দীর্ঘস্থায়ী ও স্বাস্থ্যসম্মত হয়। প্রকৃতির সৃষ্টিকর্তার বিশ্বনিয়ন্তা আল্লাহর জ্ঞানে সমস্ত যুগে মানুষের মধ্যে যেসব সমস্যা, বিপদাপদ ও জটিলতা আসবে, তার সবই ভালোভাবেই আছে। তিনি তার সুদৃঢ় কিতাব আল-কুরআনের মধ্যে ইরশাদ করেন, “যে সন্তানকে কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করে কষ্টে প্রসব করে, কষ্টে প্রতিপালন করে, এবং দুধ পানের সময়কাল ত্রিশ মাস।"
অর্থাৎ যে সময়কাল শিশু মায়ের গোশত ও রক্ত দ্বারা প্রতিপালিত হয়। এর মেয়াদ ৩০ মাস বা আড়াই বৎসর। গর্ভধারণের সময় ৮/৯ মাস এবং অন্য সময় সব মিলিয়ে আনুমানিক ২ বৎসর হয়। যেমন: অন্য আয়াতে ইরশাদ করেছেন, মায়েরা স্বীয় শিশুদের দুই বৎসর পর্যন্ত দুধ পান করাবে। উক্ত সময়কালের মধ্যে বা পরে শিশু অন্যান্য খাদ্য খাওয়া শুরু করে দেয়। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে কুরআনিক শিক্ষার উপর আমল করলে অনেক পারিবারিক বিষয় যেমন অর্থনীতি ও অন্যান্য সমস্যা সমাধান হয়। শিশুটিও কুদরতী খাদ্য খেয়ে প্রতিপালিত হয়ে স্বাস্থ্যসম্মত জীবন-যাপন করে। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বিকল্প দুধের পরিবর্তে যদি মায়ের দুধ পান করানো হয়, তবে মায়ের স্বাস্থ্যের উপর সুপ্রভাব পড়ে। পক্ষান্তরে শিশুও প্রাকৃতিক বা বাইরের দুধের বিষাক্ত প্রভাব থেকে নিরাপদ থাকে। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে সকল বিশেষজ্ঞগণ টিনজাত দুধকে 'সাদা বিষ' নামে অভিহিত করে থাকেন।