📄 হাদীসে রাসূল
• হযরত আমর ও হযরত আবু উসায়েদ রাযি. হতে বর্ণিত। রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যইতুনের তেল খাও এবং মালিশের কাজে ব্যবহার করো। কারণ, তা বরকতময় বৃক্ষ থেকে তৈরি হয়। (শামায়েলে তিরমিযী)
• হযরত আলকামা বিন আমির বর্ণনা করেন, নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমাদের জন্য যয়তুনের তেল আছে, তা খাও এবং শরীরে মালিশ করো। তা হলে অর্শ্ব রোগ প্রতিরোধে খুব ফল পাবে। (আবু নাঈম)
• যয়তুনের তেল দ্বারা চিকিৎসা করো, তা খাও এবং শরীরে লাগাও। কেননা তা (যয়তুন) এক বরকতময় বৃক্ষ। (কানযুল উম্মাল)
• যয়তুনের তেল খাও এবং শরীরে লাগাও কারণ এর মধ্যে সত্তরটি রোগের শেফা আছে। তন্মধ্যে একটি হল কুষ্ঠরোগ। (ইবনে মাজা, হাকেম)
মানব জাতির ইতিহাস যত পুরাতন, মালিশ বা ম্যাসেজের ইতিহাসও তত পুরানো। সহস্র বৎসর পূর্বে চীনের বাদশাহ ফু এর লেখাতে এর আলোচনা পাওয়া যায়। প্রাচীন গ্রিসেও চিকিৎসা হিসেবে ম্যাসেজ ব্যবহৃত হত। পরবর্তীকালে হল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা প্রভৃতি দেশে নিয়মিত ম্যাসেজ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে আমেরিকান হেলথ একাডেমী ম্যাসেজের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি ফুটিয়ে তুলেছে।
আজকের যুগেও ম্যাসেজ মালিশের মতো উত্তম কোনো পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয় নি। কয়েক মাস পূর্বে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ফিজিওথেরাপিস্টের সাথে আমার দেখা হয়। তিনি বললেন, আমাদের দলটি নিয়মিত ম্যাসেজ করে। এ দ্বারা প্রতীয়মান হয়, কেবল কুস্তিগিরই নয়, পুরো আধুনিক খেলোওয়াড়রাও মালিশের উপর নির্ভরশীল।
অনেক সময় এমন রোগী আসে, যাদের চিকিৎসা কেবল ম্যাসেজ বা মালিশ দ্বারাই সম্ভব হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ কারও হাই ব্লাড প্রেসার হলে, চোট লেগে ব্যাথা পেলে বা এধরনের কোনো সমস্যা দেখা দিলে, তাকে গরম ঔষধপত্র দেওয়া যায় না। এর পরিপূরক একমাত্র মালিশ। তবে মালিশ সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিকে দিয়ে করানো উচিত। মালিশকারীর হাত সাবান দ্বারা ধৌত করাতে হবে এবং নরম হতে হবে। হালকাভাবে মালিশ করবে। সমস্ত শরীর মালিশ করবে। বিশেষ করে কোমর, হাত, গর্দান, পিঠ ইত্যাদির উপর মালিশ করা জরুরি।
*জনৈক ব্যক্তি মুমূর্ষ প্রায় ছিল। তিনি ছিলেন নেককার ও দীনদার মানুষ। সংবাদ পেয়ে আমি তার নিকট গেলাম। তিনি খুব দুর্বল এবং মৃত্যু পথযাত্রী ছিলেন। তখন আমি মালিশ করতে বললাম এবং নিয়মকানুন শিখিয়ে দিলাম। তারা এক মাস যাবৎ মালিশ করল। তিনি এমনভাবে সুস্থ হলেন যে, সবাই অবাক হয়ে গেল।
আমার কাছে, অস্থিগত দুর্বলতা, খিঁচুনী, মস্তিষ্কের অবসন্নতা, মানসিক অস্থিরতার শিকার যে-সব রোগী আসে, তাদের যাকেই মালিশ করতে বলি আর ঠিক মতো মালিশ করে, তার অনেক উপকার হয়। খেলোয়াড়দের জন্য এর উপকারিতা পরীক্ষিত। মুষ্ঠিযোদ্ধাদের খাদ্য কম হতে হবে এবং যয়তুন তেলের মালিশ তাদের জন্যে বেশি উপকারী।
এক ব্যক্তির ঘোড়া দৌড়ের শখ ছিল। তার অভ্যাস ছিল প্রথমে ঘোড়াকে হালকা যয়তুন তেল লাগিয়ে খুব মালিশ করত। তারপর শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে ফেলত। ফলে তার ঘোড়ার স্বাস্থ্য ঈর্ষণীয় হত। মানুষ আশ্চর্য হয়ে ভাবত, কি ঔষধ খাওয়ায়ে সে ঘোড়াকে এত মোটা তাজা করেছে। অথচ এ সুস্বাস্থ্যের রহস্য ছিল একমাত্র মালিশ। আপনি যদি মালিশের গোপন রহস্য পেয়ে যান, তবে বিশ্বের সব রকম চিকিৎসা ভুলে গিয়ে একমাত্র মালিশকেই বেছে নিবেন।
এক ব্যক্তি বলছিল, আমার অস্থির দুর্বলতা এত মারাত্মক ও কষ্টকর যে, চার হাজার টাকা খরচ করে একটি টীকা নিয়েছিলাম। কিন্তু একমাত্র মালিশ আমাকে পূর্ণ মাত্রায় উপশম করেছে।
• রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তেল ব্যবহার কর এমন ব্যথায়, যা ঔষধে দূর হয় না। বিশেষ করে আঘাতের ব্যথায় যয়তুনের তেল অধিক উপকারী। ফিজিওথেরাপিস্টরা পক্ষাঘাত, পোলিও, খিচুনী ইত্যাদি রোগীদেরকে যয়তুন তেলের মালিশ করতে দেন।
📄 মালিশ ও বিশেষজ্ঞগণ
"শরীর মালিশ করলে শক্তি বৃদ্ধি পায়"-এ একটি সর্বজন স্বীকৃত বিষয়। গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা এ বিষয়ে অবগত আছে। মুষ্ঠিযোদ্ধাদেরও শরীরে তেল মালিশ করা এবং ঘরের বয়োবৃদ্ধাদের বিশেষত কচি বাচ্চাদের শরীরে ঘি অথবা শুধু তেল মালিশ করা এ কথাই প্রমাণ করে যে, আজ সাধারণ মানুষও মালিশের উপকারিতা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। শিশুর দুর্বল বুকের উপর মালিশ করলে বক্ষ দ্রুত শক্তিশালী হয়। দুর্বল বাচ্চাদের জন্য মালিশ একটি নিয়ামত। যেসব শিশুর বুক দুর্বল দৈনিক তাদের বুক মালিশ করতে হবে। পরিষ্কার হাতের তালু দিয়ে আস্তে আস্তে মালিশ করতে হবে। বুকের উপর বেশি চাপ দিবে না। দুর্বল বাচ্চাদের জন্য মাছের তেল বা যয়তুনের তেল বেশি উপকারী। মালিশ করলে রুক্ষতা দূর হয়। শরীর স্বাস্থ্যবান ও সুদর্শন হয়। মাথায় তেল মালিশ করলে চুল বৃদ্ধি পায়, চোখ ও মস্তিষ্কের শক্তি বৃদ্ধি পায়। পা ও হাতের তালুতে মালিশ করলে দৃষ্টিশক্তি প্রখর হয়। মালিশের জন্য গাভীর ঘি, বাদাম, যয়তুন ও সরিষার তৈল বিশেষ করে ঘানীর তেল অধিক উপকারী।
মালিশে ঠাণ্ডা, গরম, শ্লেষ্মা ইত্যাদির উপশম হয় এবং ক্লান্তি-শ্রান্তি ও অবসন্নতা দূর হয়। শরীর সুশ্রী ও শক্তিশালী হয়। মাথায় তেল মালিশ করলে মস্তিষ্ক ও চোখে সতেজতা আসে। সুনিদ্রা হয়। হাত ও তালুতে মালিশ করলে স্বপ্নদোষ হয় না।
সারা শরীরে মালিশ করা উচিত। বিশেষ করে মাথা, নাভী, হাত-পায়ের তালুতে মালিশ করা খুব উপকারী। নাক ও কানের মধ্যে তেল ঢেলে দেওয়া সীমাহীন উপকারী। অবশ্য জ্বর, কাশি, এলার্জি, বমি ইত্যাদি রোগীকে মালিশ করা নিষেধ। মনে রাখতে হবে, মালিশের পরপরই গোসল করা যাবে না। কমপক্ষে এক ঘণ্টা বিরতি দিতে হবে。
📄 ডাক্তার পেকসারের মতবাদ
ডাক্তার লেকসার মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লাস্টিক সার্জারী বিভাগের দায়িত্বে আছেন। তিনি একবার বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানের বক্তব্যে বলেছিলেন, “দুনিয়ায় কুশ্রী লোকদের জীবিত থাকার অধিকার নেই। যখনই সৃষ্টিগত ঘাটতি সৃষ্টি হয়, তখনই সে ঘাটতিকে পূর্ণ করা বিজ্ঞানের কাজ।” প্লাস্টিক সার্জারীর মাধ্যমে মানুষের শারীরিক ত্রুটি-বিচ্যুতি, ঘাটতি ইত্যাদি দূর করা যায়। আর মালিশ দ্বারা সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করা যায়। সুতরাং বলা যায়, সার্জারী হল মালিশের প্রকৃত বোন। ডাক্তার লেক্সার প্লাষ্টিক সার্জারীর মাধ্যমে অভিজাত রমণী, অভিনেত্রী ও কদাকার লোকদেরকে সুশ্রী ও সুদর্শন করে দিয়েছেন। তিনি মালিশ সম্পর্কে নিজের বিশাল অভিজ্ঞতা ও গবেষণা বর্ণনা করে বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদেরকে হতবাক করে দিয়েছেন。
📄 ডা. স্যার ওলিয়াম এর অভিজ্ঞতা
বিশ্ব মেডিকেল কনফারেন্সের সভাপতি অনানারেবল ডা. স্যার ওলিয়াম ওলসার তার বক্তব্যে মালিশ সম্পর্কে বলেন, "মালিশ বিজ্ঞান জগতের একটি পৃথক শাখা। এটা চিকিৎসা ও ব্যক্তির মূল নির্দেশনা মোতাবেক বাস্তবোপযোগী। অন্যান্য চিকিৎসার মতো এতে কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবন্ধকতা নেই। সেজন্য এর ক্ষতির আশঙ্কা নেই। মালিশে অবশ্যই সুস্থ মানুষ সৌন্দর্য ও যৌবন লাভ করে আর অসুস্থ মানুষ লাভ করে সুস্থতা।