📄 তিনটি মারাত্মক উত্তেজনা সৃষ্টিকারক জিনিস
স্কুল কলেজগুলোতে যদি কিছুটা হলেও নিয়ম-কানুন থাকে, যা স্বাধীন ক্রিয়াকলাপে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু একটি যুবক যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে অপ্রতিরোধ্য উত্তেজনা, বিকৃত মন-মেজাজ ও কু-অভ্যাস নিয়ে উন্মুক্ত জীবনে পদার্পণ করে, তখন তার কার্যকলাপ সফল বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যায়। তখন তার যৌবনের অগ্নিকে প্রজ্জ্বলিত করার জন্য অগ্নিকুণ্ড প্রস্তুত থাকে এবং তার উন্মুক্ত পাশবিকতাকে শান্ত করার জন্য সকল প্রকারের উপকরণ জুটিয়ে নেওয়া ইচ্ছার ব্যাপার মাত্র।
একটি আমেরিকান বইতে চরিত্রহীনতা অসাধারণভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণসমূহ তুলে ধরে লিখা হয়েছে, তিনটি শয়তানী শক্তির ত্রিমুখী আক্রমণ আমাদের সমাজকে অধঃপতনের গহবরে পৌছে দিয়েছে এবং এ তিনটি শক্তি একটি জাহান্নাম তৈরির কাজে লিপ্ত রয়েছে। (১) অশ্লীল পত্র-পত্রিকার অধিক প্রকাশনা। (২) অশ্লীল চলচ্চিত্র, যা শুধু অবৈধ প্রেমের আকর্ষণকেই বাড়ায় না বরং তার বাস্তব জ্ঞানও দান করে। (৩) নারীদের অধঃপতিত চারিত্রিক অবস্থা, যা তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, উলঙ্গপনা, ধুমপান এবং পুরুষদের সঙ্গে অনভিপ্রেত মেলামেশার দ্বারা প্রকাশ পায়। এ তিনটি জিনিস আমাদের সমাজে মারাত্মক হারে বেড়ে চলেছে। যার কুফলে আজ 'মসীহী সভ্যতা' ও সংস্কৃতি বিদায় হতে হতে অবশেষে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যদি এগুলোকে প্রতিরোধ না করা হয়, তবে আমাদের ইতিহাসও রোম এবং অন্যান্য জাতির মতো হয়ে যাবে, যাদেরকে প্রবৃত্তি পুঁজা, পাশবিকতা, মদ্যপান, নারীভোগ এবং নাচ গানের কারণে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
এ তিনটি কারণ সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সমাজের সকল স্তরে পৌছে গেছে। যার শরীরে বিন্দুমাত্র রক্ত আছে, এরূপ প্রতিটি নারী-পুরুষের মাঝে সার্বক্ষণিক যৌন অস্থিরতা সৃষ্টি করে দিয়েছে। আর অশ্লীলতার সয়লাবে অস্থিরতাই অনিবার্য ফল।
📄 অশ্লীলতার সয়লাব
আমেরিকায় যে সমস্ত মহিলারা দেহব্যবসাকে তাদের মূল পেশা বানিয়ে নিয়েছে, তাদের সংখ্যাও আনুমানিক চার থেকে পাঁচ লক্ষ হবে। কিন্তু তাই বলে আমেরিকার দেহব্যবসাকে হিন্দুস্তানের দেহব্যবসার উপর অনুমান করা যাবে না। কারণ, আমেরিকানদের ব্যবসা বংশানুক্রমিক ব্যবসা নয় বরং একজন মহিলা যে হয়তো গতকাল পর্যন্তও ভালো পেশায় জড়িত ছিল, তারপর খারাপ সংশ্রবের ফলে চরিত্রহীনা হয়ে পড়েছে এবং পতিতালয়ে এসে ঢুকেছে। কয়েক বৎসর পতিতালয়ে কাটাবে, তারপর এ কাজ ছেড়ে কোনো অফিস অথবা কারখানায় কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত হয়ে যাবে। বিভিন্ন তদন্ত রিপোর্টে জানা যায়, আমেরিকার ৫০ শতাংশ বেশ্যা গৃহ পরিচারিকার (Domestic servant) কাজ ছেড়ে বেশ্যাবৃত্তিতে যোগ দেয় এবং অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ হাসপাতাল, অফিস এবং দোকানের চাকরি ছেড়ে আসে। সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বৎসর বয়সে তাদের এ ঘৃণ্য পেশা শুরু হয় এবং ২৫ থেকে ৩০ বৎসর বয়সে উপনীত হওয়ার পর দেহব্যবসা ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো সম্ভ্রান্ত পেশায় যোগ দেয়। এ থেকেই অনুমান করা যায়, আমেরিকায় চার পাঁচ লক্ষ বেশ্যার উপস্থিতির কারণ কি?
পূর্বেও বলা হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলোতে দেহব্যবসায় একটি সুসংহত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। আমেরিকায় নিউইয়র্ক এবং বুয়েন্স আয়ারস এ ব্যবসার সর্ববৃহৎ কেন্দ্র। নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় দুটি দেহব্যবসা কেন্দ্রের প্রত্যেকটির এক একটি করে পরিচালনা পরিষদ আছে, যার সভাপতি ও সেক্রেটারী নির্বাচিত হয়। প্রত্যেকের আলাদাভাবে আইনবিদ নিযুক্ত করা আছে। যেন কোনো মামলায় ফেঁসে গেলে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
যুবতীদের লোভ দেখিয়ে এবং তাদেরকে অপহরণ করে আনার জন্য হাজারো দালাল নিযুক্ত রয়েছে, যারা প্রতিটি স্থানে এদের তালাশে ঘুরতে থাকে। এ শিকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের ক্ষমতার অনুমান এ রিপোর্ট থেকেও করা যেতে পারে যে, শিকাগোতে আগমনকারী অভিবেশন সমিতির সভাপতি একবার ১৫ মাসের একটি রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন। তাতে উল্লেখ ছিল ১৫ মাস সময়ের ভিতর লীগের অফিসে ৭,২০০ মেয়ের চিঠি এসে পৌছেছে। চিঠিগুলোতে লেখা ছিল, তারা শিকাগোর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র ১,৭০০ মেয়েই তার গন্তব্যস্থলে গিয়ে পৌছতে সক্ষম হয়েছিল। অন্যদের কোনো সন্ধান মিলে নি, তারা কোথায় গিয়েছে।
পতিতালয় ছাড়াও অভিসার কক্ষ Assignation Houses ও Call Houses রয়েছে। (যেগুলিকে শুধু ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের যুবক-যুবতীদের অভিসার পূরণের জন্যেই সুসজ্জিত রাখা হয়।) এগুলোর খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, এক শহরে এরূপ ৭৮ টি বাড়ি আছে এবং আরেকটি শহরে ৪৩টি, অন্য এক শহরে ৩৩টি বাড়ি রয়েছে। এ বাড়িগুলোতে শুধু অবিবাহিতা নারীরাই যেত না বরং বিবাহিতা নারীরাও যাতায়াত করত। একজন প্রসিদ্ধ রিপোর্টার লিখেন,
নিউইয়র্কের বিবাহিত জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের অবস্থা এরূপ, যারা তার চরিত্র ও শারীরিক দিক থেকে পারিবারিক জীবনের দায়-দায়িত্বের ব্যাপারে বিশ্বস্ত নয় এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের অবস্থা এর থেকে খুব একটা ভিন্ন নয়।
আমেরিকায় Committee of Fourteen নামে চরিত্র সংশোধনকারী একটি গ্রুপ আছে। এ গ্রুপের পক্ষ থেকে চরিত্রহীনতার মূল কারণ অনুসন্ধান, দেশের চারিত্রিক পরিস্থিতির খোঁজ-খবর নেওয়া ও চরিত্র সংশোধনের বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের কাজ খুবই দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে করা হয়ে থাকে। তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, আমেরিকায় যত নৃত্য প্রতিষ্ঠান, নাইট ক্লাব, রূপচর্চা প্রতিষ্ঠান (Beanuty Salloons); ম্যাসেজ রুম (Massage Rooms) এবং কেশ পরিচর্যার দোকান (Hair Dressings) রয়েছে, সবগুলোই এখন পতিতালয়ের মতো হয়ে গেছে বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। কারণ, ওই সব স্থানে অবর্ণনীয় অনেক ঘৃণ্য কাজও হয়ে থাকে।
📄 ঘৃণ্য রোগ-ব্যাধি
অধিক পরিমাণ অশ্লীলতার অপরিহার্য ফলাফল হল ঘৃণ্য রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়া। অনুমান করা হয় যে, আমেরিকার প্রায় ৯০ শতাংশ বসতিই ঘৃণ্য রোগসমূহে প্রভাবিত। এনসাইক্লোপেডিয়া বিট্রানিকা (৩৩/৪৫পৃঃ) থেকে জানা যায়, সেখানকার সরকারী হাসপাতালসমূহে প্রতি বছর দুই লক্ষ মেহ-প্রমেহ রোগীর এবং এক লক্ষ ষাট হাজার গণোরিয়া, সিফিলিস রোগীর চিকিৎসা করা হয় এবং ৬৫ টি হাসপাতালে শুধু এ রোগগুলিরই চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু সরকারী চিকিৎসা কেন্দ্রগুলির চেয়ে প্রাইভেট ডাক্তারদের নিকট এসব রোগীরা বেশি ভিড় জমায়। তাদের নিকট ৬১ শতাংশই আসে মেহ-প্রমেহ রোগী এবং ৮৯ শতাংশ গণোরিয়া বা সিফিলিস রোগী।
বছরে প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ হাজার শিশু বংশানুক্রমিক মেহ প্রমেহ রোগে মারা যায়। ক্ষয়জুর ব্যতীত অন্যান্য রোগের কারণে যে পরিমাণ মৃত্যু ঘটে, তন্মধ্যে বেশির ভাগ মৃত্যুর কারণই মেহ-প্রমেহ। সিফিলিস স্পেশালিস্টদের ধারণা মতে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ যুবকই এ রোগে আক্রান্ত। যাদের মধ্যে বিবাহিত-অবিবাহিত সকলেই শামিল। স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞদের বর্ণনা মতে নারীদের যে পরিমাণ যৌনাঙ্গ অপারেশন হয়, তার মধ্যে ৭৫ শতাংশ রোগীর মধ্যেই গণোরিয়া, সিফিলিসের চিহ্ন পাওয়া যায়।
📄 তালাক ও বিচ্ছেদ
এরূপ পরিস্থিতিতে পারিবারিক শৃঙ্খলা ও বৈবাহিক জীবনের পবিত্র সম্পর্ক কিভাবে টিকে থাকতে পারে? স্বাধীনভাবে অর্থ উপার্জনকারী সে সকল নারীরা বিবাহকে নিষ্প্রয়োজন মনে করে। তারা নিজেদের মানবীয় চাহিদা ছাড়া জীবনের কোনো স্তরেই পুরুষদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না এবং বিবাহ-শাদী ছাড়া সহজেই পুরুষ পাওয়া যায়। আধুনিক বিজ্ঞান এবং জড়-জগতের পূজার তাদের অন্তর থেকে এ অনুভূতিও দূর করে দিয়েছে যে, বিবাহ-শাদী ব্যতীত কোনো পুরুষের সহিত দৈহিক সম্পর্ক রাখা একটি জঘন্য অপরাধ। এ ঘৃণ্য পরিবেশের কারণে আজকের নিষ্প্রাণ সমাজ এরূপ মহিলাকে ঘৃণা বা তিরস্কারের পাত্র বলেও মনে করে না।
জজ লিওসে আমেরিকার সাধারণ মেয়েদের ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে লিখেন: "আমি বিবাহ কেন করব? গত দুই বছরে আমার সাথীদের মধ্যে যারা বিয়ে করেছে, তাদের প্রতি দশ জনের মধ্যে পাঁচ জনেরই বিয়ের পর বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। আমি মনে করি, এ যুগের প্রতিটি মেয়ের ভালবাসার ক্ষেত্রে মুক্তভাবে যে কোনো কাজ করার মানবিক অধিকার রয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আমাদের অনেক কৌশল জানা আছে। সুতরাং এর দ্বারা আকস্মিক কোনো হারামী বাচ্চা জন্ম নেওয়ার ভয় থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। “পাল্টে দেওয়া দরকার।” এ ধ্যান-ধারণার নির্লজ্জ নারীদেরকে বিয়ের ব্যাপারে কোনো জিনিস যদি উদ্বুদ্ধ করে, তবে তা হল ভালবাসার তাগিদ। কিন্তু এ ভালবাসাও হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে না বরং এটি একটি সাময়িক আকর্ষণ হয় মাত্র। তার জৈবিক চাহিদা মিটে যাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালবাসার লেশ মাত্র বাকি থাকে না। মানসিকতা ও ধ্যান-ধারণার সামান্যতম অমিল তাদের মাঝে ঘৃণা ও দূরত্বের সৃষ্টি করে দেয়। অবশেষে কোর্টে গিয়ে তালাক অথবা বিচ্ছেদের মামলা দায়ের হয়ে যায়।
লিওসে লিখেন, ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে ডেনভারের প্রতিটি বিয়ের সঙ্গে একটি করে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতি দুটি বিয়ের একটিতে তালাকের মামলা দায়ের হয়েছে। এ পরিস্থিতি শুধু ডেনভারেই নয় বরং আমেরিকার সবগুলো শহরের অবস্থা প্রায় এরকমই। তারপর তিনি লিখেন, তালাক এবং বিচ্ছেদের ঘটনা বেড়েই চলেছে। যদি এ অবস্থা চলতে থাকে, যেমন আশঙ্কাও করা হচ্ছে, তাহলে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলেই যতগুলি বিয়ের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, ততগুলি তালাকের মামলা দায়ের হবে।
অধিক হারে তালাক এবং বিচ্ছেদ প্রতিরোধের চিকিৎসা হিসেবে (Compassinate Marriage) পরীক্ষামূলক বিয়ের প্রথা চালু করা হয়েছে। কিন্তু এ চিকিৎসা মূল রোগের চেয়েও মারাত্মক এবং ঘৃণ্য। পরীক্ষামূলক বিবাহের অর্থ হল, নারী-পুরুষ পুরাতন সিস্টেমে বিয়ে না করে কিছু দিন পরস্পর ঘর বেঁধে থাকবে। যদি এ ঘর বাঁধায় পরস্পরের মনের মিল হয়ে যায়, তা হলে বিবাহ করবে। অন্যথায় দুজন আলাদা হয়ে আবার ভাগ্য পরীক্ষায় নেমে পড়বে। এ পরীক্ষামূলক বিয়ে অবস্থায় সন্তান জন্ম দেওয়া থেকে উভয়কেই বেঁচে থাকতে হবে। অন্যথায় সন্তানের জন্ম হয়ে গেলে অবশ্যই তাদেরকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। বস্তুত এ পদ্ধতি এবং রাশিয়ার Free Love বা মুক্ত ভালবাসা একই জিনিস।