📄 জাগ্রত হওয়ার ব্যাপারে কিছু উপদেশ
মহান সত্তা নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য নাক সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু জাগ্রত অবস্থায় মানুষ অনেক সময় মুখ দ্বারাও নিঃশ্বাস নিয়ে থাকে। রাতে শয়ন কালে মুখবন্ধ থাকার কারণে নাক দ্বারা নিঃশ্বাস গ্রহণ করে এবং ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা অনেক গাঢ় পদার্থ থেকে কিছু হাতে (জমে) থেকে যায়। নিঃশ্বাস সঠিকভাবে বের হওয়া তথা স্বাস্থ্যগত সুস্থতার জন্য বিছানা হতে উঠার সাথে সাথে উক্ত জমাট পদার্থকে বের করা অপরিহার্য হয়ে যায়। এজন্যই ইসলাম ঘুম হতে উঠেই সর্বপ্রথম নাক পরিষ্কার করার শিক্ষা দিয়েছে। এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, ঘুম হতে উঠেই সর্বপ্রথম নাক পরিষ্কার কর। কেননা রাত ভর শয়তান তা দিয়ে আসা যাওয়া করেছে।
আরবি শব্দগত দিক দিয়ে 'শয়তান' শুধু মানুষকে পথভ্রষ্টকারীকেই বলা হয় না বরং প্রত্যেক কষ্টদায়ক বস্তু বা জন্তুকেও 'শয়তান' বলা হয়। যেমন: যাক্কুম বৃক্ষটি দূর থেকে ফনাধরা সর্পের মতো মনে হয়। কুরআনে কারীমে সেটাকে (রুউসুস শায়াত্বীন) তথা শয়তানের মাথার সাথে তুলনা করা হয়েছে।
সুতরাং হাদীসের মূল উদ্দেশ্য, শয়নকালে নাকের মধ্যে জমাট পদার্থ জমে গিয়ে থাকে। আর দিনের বেলায় মানুষ সাবধান থাকে। এজন্য নাক পরিষ্কার জন্য সদা সচেষ্ট থাকে। আর রাতে ঘুমিয়ে থাকার কারণে কিছুই করার থাকে না; ভিতরে অনেক কিছু জমে যায়।
অতএব জেগে উঠার সাথে সাথে তা পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত। তার সাথে হাতের তালু দ্বারা চক্ষুদয় মলে নেওয়াও একান্ত প্রয়োজন। যার ফলে চক্ষুদয় পুরোপুরি খুলে যায়। কাজ দুটির সুবাধে মানুষের ঘুমের কারণে যে অলসতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা খুব দ্রুত কেটে যায়। তারপর জুতা ঝেড়ে পরবে। কারণ, হতে পারে জুতার মধ্যে কোনো বিষাক্ত পোকা ঢুকে আছে। বিশেষ করে গরম প্রধান দেশে এমনটি ঘটার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
অনুরূপভাবে ঘুমানোর পোশাক এবং কাজের পোশাক পৃথক হলে তা ভালো করে ঝেড়ে পরিধান করা আবশ্যক। হতে পারে রাত্রে কোনো বিষাক্ত প্রাণী এর মধ্যে ঢুকে রয়েছে। ঘুম থেকে উঠে হাত ধৌত করা ব্যতীত কোনো পানির পাত্রে হাত প্রবেশ করাবে না। কেননা কে জানে রাত্রে তার হাত কোথায় লেগেছে? (বুখারি: ১ম, মেশকাত, তিরমিযী)
📄 সকাল সকাল দ্রুত কাজ শুরু করা
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ হতে সকাল সকাল দ্রুত কাজ শুরু করার নির্দেশ পাওয়া যায়। (উসওয়ায়ে রাসূল)
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ নসিহত কতই না মূল্যবান। এটা জাতির উন্নতির গোপন তত্ত্ব। যে জাতি এ গোপন তত্ত্বের সন্ধান পেয়েছে, সে জাতি সফল হাকিম হতে পেরেছে।
📄 ইউলিয়াম থেরাপ নামক অর্থনীতিবিদের অভিজ্ঞতা
ইউলিয়াম ছিলেন একজন অত্যন্ত বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ। তিনি নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, জাপান এবং জার্মানির উন্নতির চাবি-কাঠি হল পরিশ্রম, আন্তরিকতা এবং খুব সকাল সকাল দ্রুত কাজ শুরু করা এবং রাত্র পর্যন্ত একটানা কাজ করে যাওয়া।
আমি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, যে সব লোক সকাল হতেই কাজ শুরু করে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে সকাল সকাল পা বাড়ায়, তারা সারাদিন তরু-তাজা ও আনন্দিত থাকে। আর এ সকল লোক সময়ের দ্রুত গতিতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম হয়। যে সকল লোক এভাবে না চলে বিপরীতভাবে জীবন যাপন করে, তারা নিজে তো সফল হয়ই না, অন্যকেও সফলতার দ্বারে পৌঁছাতে দেয় না। এখন যদি আমরাও সফলতার উক্ত পন্থা অবলম্বন করি, তা হলে অন্যান্য জাতির পশ্চাতে কখনও পড়ে থাকব না।
রাত্রে আগে-ভাগে শয়ন করা এবং সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠার গুরুত্ব এবং ফায়েদা অস্বীকার করা যায় না। সকল চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এ বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। প্রসিদ্ধ একটি প্রবাদ আছে: Early to bed and early to rise make a man healthy wealthy, and wise, অর্থাৎ রাত্রে দ্রুত ঘুমিয়ে যাওয়া এবং প্রত্যুষে জেগে উঠা মানুষকে স্বাস্থ্যবান, সম্পদশালী ও জ্ঞানী করে।
ইসলাম ধর্মে সকল মুসলমানের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায সময়মতো আদায় করা ফরয। তন্মধ্যে ৩টি ওয়াক্ত তো দিবসের কাজের ব্যস্ততার মধ্যে এসে থাকে, একটি ঘুমানোর পূর্বে ও এক ওয়াক্ত সকাল হতেই আসে। রাত্রি এবং সকালের নামাযকে সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তৎসঙ্গে প্রত্যেক ওয়াক্তের শুরুতে নামায আদায় করারও আদেশ এসেছে। ইশা অথবা ঘুমানোর পূর্বের নামায সম্পর্কে নির্দেশ এসেছে, নামায আদায় করার পর পরই ঘুমিয়ে যাবে এবং অযথা সময় নষ্ট করবে না। আর সকাল হওয়া মাত্র ঘুমের বিছানা ছেড়ে উঠে যাওয়া উচিত। এ দুই নামাযের কত গুরুত্ব, নবীজীর কথা থেকেই অনুমান করা যায়।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষের মধ্যে দয়াশীল হওয়া সত্ত্বেও তিনি ফজর ও ইশার নামাযের ব্যাপারে বলতেন, হে লোকসকল! আমার মন চায়, তোমরা তো নামায পড় আর আমি জঙ্গলে গিয়ে শুকনা লাকড়ী এনে ওই সকল লোকদের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিই, যারা রাতে ইশার নামাযের জামাতে আসে না। আর সকালের (ফজরের) নামাযের সময় বিছানায় ঘুমিয়ে থাকে।
মুনাফিকদের নিকট এশা ও ফজরের নামায অত্যন্ত ভারি মনে হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এ নামাযের জন্য হামাগুড়ি দিয়ে মসজিদে আসতে হলেও আসো। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আরও সুস্পষ্ট ভাষ্য হল, সকাল সকাল (বিছানা হতে) উঠার অভ্যাস করো। কেননা এর বিরাট প্রতিদান রয়েছে।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যু শয্যায় নিজের বিশিষ্ট সাহাবী আবু হুরাইরাহ রাযি.-কে যে তিনটি বিশেষ নসিহত করেছিলেন, তার মধ্যে একটা ছিল, সারা রাত ইবাদাত-বন্দেগীর মধ্যে অতিবাহিত করলেও ঘুম থেকে জেগে সকালের নামায (ফজরের নামায) পড়ে নিও। আরও বলেছেন, ফজরের নামায এমন সময় পড়ে নিবে, যখন তারকারাজিতে তখনও আলো বাকি থাকে (অর্থাৎ একটু অন্ধকার থাকতে)।
উল্লেখ্য যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মহিলাগণ ফজরের নামায আদায়ান্তে বাড়ি ফিরে আসত, তবুও চেনা যেত না। কারণ, তখনও যথেষ্ট অন্ধকার বাকি থাকত। ইসলামের ভিত্তি স্থাপনকারী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক নামায নির্দিষ্ট সময়ের প্রারম্ভে আদায় করতে বলেছেন। তিনি ফজর ও এশার নামাযকে এ ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সমগ্র মানবজাতির জন্যে এটা এক বিরাট উপকার। আমরা সকাল-সকাল বিছানা থেকে জাগ্রত হয়ে স্বাস্থ্যগত দিক থেকে অনেক লাভবান হয়েছি।