📄 নেশা জাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার
হিন্দু ধর্মে আফিম, ভাং, চরস ইত্যাদি সেবন ধর্মীয় ক্রিয়া কলাপের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়। বেদ গ্রন্থে মাদক বিশেষত ভাং এর প্রশংসা করা হয়েছে। খ্রিষ্ট দেশসমূহে তো ধর্মীয় যে-কোনো অনুষ্ঠানে মদ অধিক হারেই পরিবেশন করা হয়। মনে হয় যেন মদের ঝর্ণা বয়ে যাচ্ছে। "আশায়ে রাব্বানী" [হযরত ঈসা আ. হাওয়ারীদের সাথে শেষ যে খানা খেয়েছিলেন] এর পবিত্র আচার-অনুষ্ঠানে মদে ভিজানো রুটি ইবাদতকারী নারী-পুরুষ ও বাচ্চা-বৃদ্ধদের মাঝে বণ্টন করা হয়। খ্রিস্টধর্মে এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কেননা এ রুটির মসীহের গোস্তের সাথে এবং রুটিতে মিশানো মদের মসীহের রক্তের সাথে সামঞ্জস্য আছে বলে মনে করা হয়।
বর্তমান যুগে অমুসলিম সম্প্রদায় উন্নত হোক আর অনুন্নত হোক তারা নেশাযুক্ত দ্রব্যাদিকে নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী মনে করে। এমনকি অনেক যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রও তাদের সৈনিকদের জন্য মদের বিশেষ ব্যবস্থা রাখে। ইসলামে সকল মাদক যথা আফিম, ভাং, চরস, মদ ইত্যাদিকে হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। এগুলোর পরিমাণ বেশি হোক আর কমই হোক, হুকুমের দিক থেকে সবই সমান। এ বিষয়ে কুরআন পাকে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। সুরায়ে বাকারার ২৭নং রুকুতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, "মদ্যপান ও জুয়াবাজি খুবই ক্ষতিকর। যদিও এর কিছু উপকারিতা আছে। কিন্তু উপকারিতার চেয়ে অপকারিতা অনেক বেশি।"
সুরায়ে মাইদার ১২নং রুকুতে ইরশাদ করেন, "এ সকল নোংরা কাজ শয়তানের। সুতরাং তোমরা এসব পরিহার কর। সম্ভবত তোমাদের জীবন সুন্দরভাবে কাটবে।” শয়তানের অর্থ পূর্বেও বর্ণনা করা হয়েছে। এর অর্থ হল- বরবাদ হওয়া, ধ্বংস হওয়া। সুতরাং এ কাজগুলি ধ্বংস ও বরবাদ হওয়ারই নামান্তর। তারপর আল্লাহ বলেন, "মদ ও জুয়া দ্বারা শয়তান তোমাদের মাঝে মুনাফেকী (কপটতা) ও ফাসাদ সৃষ্টি করতে চায়।"
• রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: যা বেশি খেলে মাতলামী আসে, তা কম খাওয়াও হারাম।
যেমন: পূর্বেও বলা হয়েছে, মানুষের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার প্রতি লক্ষ্য করেই ইসলামে হালাল-হারামের প্রকারভেদ করা হয়েছে। মদ এবং অন্যান্য নেশাযুক্ত দ্রব্যাদি শরীরের উপর যে কি পরিমাণ কু-প্রভাব ফেলে, তা মদ্যপানে অভ্যস্থ এবং নেশাখোরদের অবস্থা দেখেই অনুমান করা যায়। কিছু লোক বর্তমানে মদের সাধারণ প্রচলন দেখে বলে, শক্তি লাভের জন্য এবং অতি ঠাণ্ডায় যদি অল্প অল্প মদ্যপান করে, যাতে মাতলামি না আসে এবং হুঁশ-জ্ঞান ঠিক থাকে, তাতে অসুবিধার কি আছে! অতিরিক্ত পরিমাণে পান করে বেহুঁশ ও মাতাল না হলেই তো হল। কিন্তু এরা মোটেও লক্ষ্য করে না যে, এটা এমন একটি জলাভূমি, যাতে একবার ফেঁসে গেলে বের হওয়া অসম্ভব। কেউ এতে ফেঁসে গেলে দিন দিন অবনতির পথে অগ্রসর হতে থাকে। যদি কোনো ক্ষতিকর জিনিসের স্বল্প পরিমাণ থেকে মানুষ বিরত থাকতে না পারে, তবে অধিক পরিমাণ থেকেও বিরত থাকতে পারে না। কোনো ছোট অপরাধ করলে সেখান থেকে বড় অপরাধ করার সাহস সৃষ্টি হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারাম জিনিসসমূহকে একটি সরকারি চারণভূমির সাথে তুলনা করেছেন। যার সীমানার কাছাকাছিও প্রাণী চরানো বিপদমুক্ত নয়। তিনি বলেছেন, এ সকল চারণভূমির কাছেও যেও না।
এ উদাহরণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের নফসে আম্মারাকে প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। যা মানুষকে অপকর্মের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। সরকারী চারণভূমির বাহির সামীনায় দাঁড়িয়েই তাতে মুখ দেওয়ার চেষ্টা করে। কিছু খেয়েও নেয়। এরপর এক পা ভিতরে রেখে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকে। এভাবে চারণভূমির মধ্যখানে পৌছার পর আর ফিরে আসতে চায় না যতক্ষণ না কেউ তাকে তাড়িয়ে বের করে।
কিন্তু মানুষ স্বাধীন হওয়া সত্ত্বেও যদি তার নফসকে বাধা না দেয়, তবে অন্য কেউ তার উপর জোর খাটাতে পারে না। কিন্তু ধর্মহীনতার কারণে তার এ স্বাধীনতা প্রাণীর চেয়েও অধিক বিপদ ডেকে আনে।
হিন্দুস্তানের মধ্য প্রদেশের রেটোল জেলায় কয়েকজন গ্রাম্য ব্যক্তি একটি মদ্যশালায় গিয়ে বাজি ধরে যে, সবচেয়ে কম সময়ে কে দশ বোতল মদ খেয়ে শেষ করতে পারবে। একজন বাজি জিতে নিল। কিন্তু তার মাথা চক্কর দিল এবং সে ওখানেই পড়ে মারা গেল। (এ.পি.পি. দিল্লী ১৯৬০ইং)
মানুষের অভিজ্ঞতাই সাক্ষী যে, খুব কম লোকই এমন আছে, যে একবার নেশা পান করে পরে তা থেকে বিরত রয়েছে কিংবা স্বল্প সেবন করে কখনো সীমাতিরিক্ত সেবন করে নি। বস্তুত তারা নিজেদের সুস্থতাকে স্বেচ্ছায় তিলে তিলে শেষ করে দিয়েছে।
মুসলমানগণ মদের কু-প্রভাবের প্রতি লক্ষ্য করে মদকে উম্মুল খাবায়েছ বা সকল অপকর্মের মূল বলে আখ্যা দিয়েছে। এ নামটি যথোপযুক্ত ঠিকই। তবে মদকে উম্মুল মুসকিরাত বা সকল নেশার মা বললেও অত্যুক্তি হবে না। কারণ, যে কোনো নেশা জাতীয় দ্রব্যের বৈশিষ্ট্য এর ভিতর বিদ্যমান রয়েছে। আফিম, ভাং ইত্যাদি যে অবনতি আনে, অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং রক্তের ভিতর যে তীব্রতা সৃষ্টি করে, তা পরিপূর্ণ রূপে মদেও বিদ্যমান রয়েছে। মদে মাতাল ব্যক্তি অনেক সময় উত্তেজিত হয়ে গালি-গালাজ করে এবং মারামারিতে লিপ্ত হয়ে যায়। কখনো আবেগপ্রবণ হয়ে কাঁদতে থাকে। আবার কখনো ভয়ে কাঁপতে থাকে।
মাতাল ব্যক্তি এরূপ অসমীচিন ও মানবতা বিরোধী অশালীন কাজও করে, যা একজন জ্ঞানী ব্যক্তি দেখতেও পছন্দ করে না। কিছুদিন ধরে জাপানী পুলিশ মদ্যপায়ীদের সঙ্গে একটি হাস্যকর ও নতুন ধরনের আচরণ শুরু করেছে। তা হল, মদ্যপায়ী যখন মাতাল হয়ে গালিগালাজ করতে আরম্ভ করে, তখন তারা এগুলো টেপে রেকর্ড করে নেয়। যখন হুঁশ ফিরে আসে, তখন ওই টেপ রেকর্ড ছেড়ে দিয়ে তার সকল কথাবার্তা তাকে শোনায়। এতে মদ্যপায়ী বেচারা খুবই লজ্জিত ও অপমানিত হয়ে যায়।
মদ্যপানের আরও একটি মজার ব্যাপার রয়েছে, তবে এটা অন্যদের জন্য খুবই মারাত্মক। তা হল একজন মাতাল তার সঙ্গীকেও মদ্যপানে বাধ্য করে যদিও সে মদ্যপায়ী না হয়। মদ পান করানোর ক্ষেত্রে সে নিজেকে বড়ই মঙ্গলকামী, উদারমনা, দানশীল এবং শাহী মেজাজের বলে প্রকাশ করে এবং অন্যদেরকেও এ কাজে শরীক করার জন্য নিজের সামর্থ্যের চেয়েও অধিক খরচ করার জন্য তৈরি থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, ঘটনাচক্রে যদি কোনো অমদ্যপায়ী মদ্যপায়ীদের সাথে যায়, তখন তারা নেশাগ্রস্ত হয়ে সেই অমদ্যপায়ীর মুখেও জবরদস্তি করে মদ ঢেলে দেয়। আমি বোম্বাইতে স্বচক্ষে দেখেছি, মিলশ্রমিক নারী-পুরুষরা কারখানা থেকে বেতন উঠিয়েই ছেলেমেয়ে নিয়ে সোজা তাড়ির দোকানে চলে যায়। নিজে তো তাড়ি পান করেই, ছোট ছোট বাচ্চাদেরকেও মেরে মেরে পান করায়। এ কারণেই ইসলাম এ জাতীয় আসরের ধারে কাছে যেতেও নিষেধ করেছে।
এক্ষেত্রে আমরা পাশ্চাত্যবাসীদের বুদ্ধিমত্তার উপর আশ্চর্য বোধ না করে পারি না। কারণ, তারা একদিকে কুইলিন, ভাং, চরস, আফিম এবং ঘুমের জন্য নেশা জাতীয় দ্রব্য বিভিন্ন রাজ্যে ব্যবহার ও তার আমদানী-রফতানীর উপর কড়া নজর রাখে এবং এ সকল অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান, যেমন- যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, অপরদিকে উন্মুল খাবায়েস বা সকল অপরাধের মূল মদকে তারা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস মনে করে। যা তাদের ভাষ্য মতেও ধ্বংসাত্মক অবস্থা সৃষ্টি করছে। এ ব্যাপারে তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই। এর বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন বা এর বিরুদ্ধে কোনো বাক্য উচ্চারণ করতেও সাহস পায় না।
ইউ, এন, ও, (জাতি সংঘ) এর কমিশন ১৯৫৮ সালে নেশা সম্পর্কীয় এক অধিবেশনে এ বিষয়ে সকলে একমত হয়েছেন যে, আফিম এবং এ জাতীয় নেশাযুক্ত ঘুমের ঔষধ ব্যবসায়ীদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে যথেষ্ট ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। আর এ বিষয়ে সে-সব দেশের প্রশংসা করা হয়েছে, যারা অপরাধীদেরকে কঠোরতর শাস্তি প্রদান করে। যেমন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড ইত্যাদি। তুর্কী এবং ইরানে এরূপ ব্যবসায়ীদেরকে ফাঁসীতে ঝুলানো হয়। ১৯৫৮ সালে আমেরিকায় এরূপ দুজন ব্যবসায়ীকে বিশ বৎসর করে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।
এ সংস্থার অর্থনীতি ও সমাজ বিভাগের কমিশন নেশা জাতীয় দ্রব্যাদির সেবন বন্ধ করার জন্য ১৯৬১ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত অধিবেশনে স্বীকার করেছে যে, তাদের এ শাস্তির বিধান বিভিন্ন দেশে এ সকল জিনিসের ব্যবসা এবং স্মাগলিং রোধে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয় নি। তাই এর চেয়েও কঠোরতর শাস্তি প্রদান করার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিকট আবেদন জানিয়েছে। (জেনেভা থেকে পি.পি.পি.এ ৫ জুন ১৯৬১ইং)
কিন্তু যে জাতিসংঘ এত মানব সেবার দাবি করে, তারা মদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে নারাজ। কারণ, ইউ.এন.ও এর বাগডোর যাদের হাতে রয়েছে, তারাই তো এরূপ পদক্ষেপ নিতে চায় না। তাদের মুখপাত্ররা জনসাধারণের চাহিদার বিপরীত কোনো কিছু করতে সাহস পায় না। অথচ উন্নত দেশ বিশেষত চরম উন্নত দেশ বৃটেন, আমেরিকা রাশিয়ার ধর্মীয় গুরুদের বক্তৃতা, পুলিশ, আদালত এবং শিশু অপরাধ দমন বিভাগের বার্ষিক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, উঠতি বয়সের যুবক-যুবতীদের মাঝে মদের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে তাদের মধ্যে অপরাধ-অপকর্ম, অবৈধ জন্ম, দূরারোগ্য ব্যাধি এবং মাতাল ড্রাইভারদের হাতে নিহতের সংখ্যা এত মারাত্মক হারে বেড়ে চলেছে যে, সর্বসাধারণের সকল দমনকৌশল এ ভয়াবহ অবস্থার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অকৃতকার্য প্রমাণিত হয়েছে।
মস্কো থেকে এ.এফ.পি-র ৫ জুলাই ১৯৬৮ সালের এক সংবাদসূত্রে জানা যায়, রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী খোরোশেফ লেনিন গ্রাদের ক্রোফ কারখানায় শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দানকালে বলেন: মদ আমাদের সার্বিক জীবনে এক ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলছে। মদ শ্রমিকদের সুস্থতার মূলে কুঠারাঘাত হানছে। পারিবারিক জীবনকে বিনাশ করে দিয়েছে। অপরাধের মাত্রা বাড়িয়ে অর্থনীতির অবকাঠামোকে চুরমার করে দিয়েছে। আমরা এখন থেকেই এর বিরুদ্ধে অক্লান্ত যুদ্ধে নেমে পড়তে চাই।
কিন্তু ১৫ই অক্টোবর ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মস্কো রেডিওর সংবাদে জানা যায়, এ অক্লান্ত যুদ্ধের ঘোষণাকারী মাত্র তিন মাস পরে তার পূর্বপুরুষদের গ্রাম ক্যালনোফকায় এক সম্মেলনে বক্তৃতাকালে বলেন, আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নে মদের নিষেধাজ্ঞার আইন জারি করতে চাই না। কারণ, মদপান আমাদের সামাজিক রীতিনীতির একটি অংশ। আমাদের সমাজে মদ্যপানে কেউ বাঁধা প্রদান করে না। তবুও মানুষকে নিজের মান-সম্মানের প্রতি অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। নূতন আইন অনুযায়ী প্রত্যেক মদ্যপানকারী ব্যক্তি মদ্যশালা থেকে এক পেয়ালার বেশি পাবে না। এর পাশাপাশি মিষ্টার খোরোশেফ সকলকে সাবধান করে বলেন,
"যদি কোনো মদ্যপানকারীর আরেক পেয়ালা পান করার প্রয়োজন হয়, তখন সে আরেক মদের দোকানে চলে যাবে; কিন্তু এক মদ্যশালা থেকে আরেক মদ্যশালায় গেলেই জেলখানার ভাত খেতে হবে।"
এ যুদ্ধ ঘোষণার এক বছর পরই ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে দৈনিক প্রোজা প্রত্রিকা একাধিক সন্তানের মায়েদের কয়েকটি চিঠি প্রকাশ করেছে। তাতে মহিলারা দাবি জানিয়েছে, মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তিদেরকে যেন জোরপূর্বক চিকিৎসালয়ে পাঠানো হয় এবং আংশিক ব্যয়ভার বহন করার ব্যাপারেও তারা আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তারা আরও বলেছেন, ভদকা (রাশিয়ান মদ) এর দাম বাড়ানো, মাতাল হলে চালান দেওয়া এবং মস্কো থেকে বের করে দেওয়া ইত্যাদি সরকারি পদক্ষেপ তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় নি। কারণ, কোনো মা অথবা স্ত্রী আপন ছেলে বা স্বামী চালান হয়ে যাওয়া অথবা শহর থেকে বহিষ্কৃত হওয়া পছন্দ করেন না। সে সকল মহিলারা দাবি জানিয়েছে, এরূপ মদখোরদের বেতন যেন সরাসরি তাদের (স্ত্রীদের) কাছে প্রেরণ করা হয়। কেননা তাদের অধিকাংশই নিজের সম্পূর্ণ উপার্জন দিয়ে এবং অনেক সময় ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র বিক্রি করে মদ্যপানে উড়িয়ে দেয়।
রাশিয়ান পত্রিকা আযোসিয়ার বরাত দিয়ে রয়টার সংবাদ প্রচার করেছে, মিষ্টার খোরশেফ 'ভোনিস' এর কৃষকদের উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দিয়েছেন। তাতে তিনি বলেছেন, আমেরিকার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রতিটি প্রদেশেই কঠোর আইন প্রণয়ন করা দরকার। আর সবচেয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মদ্যপায়ী, সুদখোর এবং জনগণের রক্তচোষণকারীদের বিরুদ্ধে জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
অন্যান্য গণপ্রজাতন্ত্র দেশগুলোতেও মদ্যপানের পরিস্থিতি এত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গও সকল নৈতিকতা এবং আইনের সীমানা পেরিয়ে নিজেদের জন্য অবৈধভাবে সর্বাধিক পরিমাণে মদ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে থাকে।
পোল্যাণ্ডের রাজধানী ওয়ারস থেকে সংবাদ সংস্থা পি. পি. পি. এ, এবং ডি. পি. এ. ১৫ই জুলাই ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে প্রচার করেছে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় মদ তৈরীর কারখানার এক মহাপরিচালকের বাড়িতে একবার প্রধামন্ত্রীর দাওয়াত ছিল। তিনি সেখানে শরীক হলেন। তার পিপাসা লাগায় ঠাণ্ডা পানি পান করার আগ্রহ হল। তিনি মহাপরিচালকের রান্নাঘরে গেলেন। সেখানে তিনি পানির পাত্রের মুখ খুলতেই সাদা পানির পরিবর্তে ভদকা মদ বেরিয়ে আসল। মহাপরিচালক অতি গোপনে কারখানা থেকে পাইপের সাহায্যে মদ নিয়ে আসতেন। অবশেষে তার উপর সরকারি সম্পদ চুরির অভিযোগে মামলা করা হয়।
ফ্রান্সে মদের বিরুদ্ধে আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়ে উঠার পরিস্থিতি দেখে মদের কারখানার মালিক সমিতির সভাপতি এবং মদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে দাবি জানালেন, পুনরায় যেন সরকারিভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়, মদ আমাদের জাতীয় পাণীয়। মদ্যপানে স্বাস্থ্যহানির হাজারো ঘটনা সকল দেশেই ঘটে থাকে। কিন্তু যে সব দেশ মদের কেন্দ্র, সে সব দেশের ঘটনাবলী আতঙ্কজনক।
ফ্রান্সের হোটেলগুলোতে খুবই সস্তা দামে মদ সরবরাহ হয়ে থাকে। সেখানে পান করার পানি অনেক মূল্যের বিনিময়েও পাওয়া মুশকিল।
১৯৫৬ সালের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, সে দেশে প্রতি বছর শুধু মদপানে দূরারোগ্য ব্যাধির শিকার হয়ে ১৫ হাজার মানুষ মৃত্যু মুখে পতিত হয়। এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি লোক মদ থেকে সৃষ্টি মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি বিড়ম্বিত জীবন যাপন করছে। অর্থাৎ সেখানে প্রতি পয়ত্রিশ মিনিট অন্তর মূল্যবান জীবন রক্তভোগ বেদীর উপর উৎসর্গিত হয়।
শাহ সাঈদ আল হেজাযকে দেশে মদ প্রতিরোধ এবং অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য নিষিদ্ধ করার অভিনন্দন জ্ঞাপনের পূর্বে আমেরিকার ইউ. এস. এর মদ প্রতিরোধ সংস্থার প্রধান বলেন, প্রতি বছর আমাদের দেশে মদপানের কারণে ৮৬ হাজার লোক মারা যায়।
এ পরিসংখ্যান থেকেই সারা পৃথিবীতে মদের কারণে মৃত্যুহার অনুমান করা যেতে পারে। ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে এবং সেগুলোর অধীন দেশগুলোত খ্রিস্টমাস (বড়দিন) এবং 'নিউ ইয়ার ডে' নববর্ষের দিন জনসাধারণ ছাড়াও তাদের বড় বড় ধর্মীয় গুরুরাও অবাধে মদ পান করেন এবং প্রবৃত্তি দমনের সকল সীমানা পেরিয়ে তারা নিজেদের যে অবস্থা সৃষ্টি করেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আর এ সকল অনুষ্ঠানে উঠতি বয়সের যুবক-যুবতীরা যে সকল অশ্লীল ও নির্লজ্জ কাজ করে থাকে, তার মোটামুটি চিত্র সব দেশের পত্র-পত্রিকাই তুলে ধরে।
গোষ্ঠীগত জীবনে মদপানের প্রভাব সম্পর্কে আমেরিকার এ্যরিগান প্রদেশের এ্যালকোহল এডুকেশন কমিটি এবং মদপান সংশোধন সমিতির ডাক্তার আইওয়ার্ড এম স্কট এর গবেষণাটি গভীরভাবে চিন্তা করার বিষয়। তার মতামতের সাথে সমমনা অন্যান্য গবেষক ডাক্তারও একমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, এ প্রদেশের মদখোর পুরুষদের ৫৬ শতাংশই স্ত্রীকে তালাক দিয়ে নিজেদের পারিবারিক জীবন ধ্বংস করে দেয়। আর মদখোর নারীদের হারও অনুরূপ।
খ্রিস্টধর্মের সবচেয়ে বড় সম্প্রদায় রোমান ক্যাথলিকদের ধর্মীয় প্রাণকেন্দ্র এবং ইউরোপের প্রসিদ্ধ শহর ভেটিকান সিটির বহুল পঠিত পত্রিকা 'আওযা রোয়েটো রোমানো' ২০শে নভেম্বর ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দ সংখ্যায় প্রকাশ করেছে, বিভিন্ন প্রকারের পাণীয় ও মশলা দ্বারা তৈরি ককটেল (মদের নাম) ও মদের বিরুদ্ধে জোরদার আওয়াজ উঠেছে। এসব মাঝে মাঝে পান করলে তেমন অসুবিধা নেই। কিন্তু প্রতিদিন সেবন করলে শারীরিক এবং চারিত্রিক অবনতির কারণ হয়ে যাবে। মদ সেবনকারী মূত্রথলি, হার্ট, ধমনী, চর্মরোগ, মস্তিষ্কে রক্তচাপ, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, অনিদ্রা ও কাঁপুনি রোগের শিকার হয়ে যায়। সেইসাথে দেখা দেয় শারীরিক ও চারিত্রিক অবনতি। পত্রিকা ককটেল সম্পর্কে মন্তব্য করেছে, "ককটেল” এর শাব্দিক অর্থ, "মোরগের লেজ”, যাকে বিচ্ছুর লেজ বললেও অত্যুক্তি হবে না। চারিত্রিক ক্ষতির চিকিৎসা করা কি সম্ভব?
খ্রিস্টধর্মে আশায়ে রব্বানী অনুষ্ঠানের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আর এ অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল মদ। সুতরাং তারা মদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার অর্থ কি?
মস্কোর টারউড পত্রিকা ১৯ শে জুলাই ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে সংবাদ দিয়েছে, একজন মাতাল ড্রাইভার তিনটি শিশুকে স্কুল থেকে বের হওয়া মাত্রই কারের চাকায় পিষ্ট করে দিয়েছে। নিম্ন আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। উচ্চ আদালতও এ দণ্ডাদেশ বহাল রেখেছেন। হায়! যদি এ সমস্ত দেশের মানুষ মদের বিষাক্ত ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন হত এবং তা বন্ধ করার কোনো জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করত!
• রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুবই গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, তোমরা মদ পান করো না। কারণ, এটা সকল পাপের মূল। অধিকন্তু তিনি এমন পাত্রসমূহও ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন, যেগুলো মদ পানের কাজে ব্যবহৃত হয়।
উপরিউক্ত নেশাযুক্ত দ্রব্য ছাড়াও আরও একটি জিনিস আছে, যাকে বর্তমান বিশ্ব নেশাজাতীয় মনে করে না; যদিও নেশার সকল খারাপ গুণাবলীই তার ভিতর বিদ্যমান আছে। আর তা কালো, সুন্দর, লাল, সাদা, সকল মানুষই সমানভাবে সেবন করছে। সকল দেশের নারী, পুরুষ, শিশু, যুবক এবং বৃদ্ধ সকলেই এর শিকার হয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধানগণও একে জীবন ধারণের ক্ষেত্রে একটি প্রয়োজনীয় জিনিস মনে করে থাকেন। নির্দ্বিধায় বলা যায়, যাকে বর্তমান বিশ্ব জীবনের অতি জরুরি দ্রব্য বলে মনে করে, তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পাঁচটি জিনিসের মধ্যে প্রথম। সেটা হল ধুমপান। উক্ত পাঁচটি জিনিস হল- তামাক, চা, আইসক্রীম, মদ এবং অন্যান্য নেশা জাতীয় দ্রব্য।