📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 মানবদেহের উপর মদের প্রভাব

📄 মানবদেহের উপর মদের প্রভাব


১। পরিপাক ক্রিয়ায় শরাবের প্রভাব: এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সর্বপ্রথম মুখ থেকেই প্রকাশ পায়। সাধারণত মানুষের মুখে লালা সদৃশ এক ধরনের ধাতু (Flora) থাকে। এ্যালকোহল পান করার কারণে মুখের লালা উৎপাদনের শক্তি ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। যদ্দরুন মাড়ীতে ক্ষত এবং ফোলা বা স্ফীতি দেখা দেয়। সুতরাং শরাবে অভ্যস্থ ব্যক্তিদের দাঁতগুলি খুবই দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। তারপর কণ্ঠ এবং খাদ্যনালিতে (Esophagus) তার প্রভাব দেখা দেয়। উভয় অঙ্গ পরস্পর একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত এবং উক্ত অঙ্গদ্বয় নেহায়েত কঠিন কাজ সম্পাদন করে।

উক্ত অঙ্গ দুটির উপর অনুভূতিশীল বিশেষ এক ধরনের (M) আবরণ থাকে। এ্যালকোহল পান করার কারণে উক্ত আবরণটির উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। ফলে অঙ্গদ্বয় ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে থাকে। অঙ্গদ্বয়ের মধ্যে ক্যান্সার সৃষ্টির মূল কারণ হিসেবে মদ বা এ্যালকোহল ব্যবহারকেই ধরে নেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যে সকল সংস্থা ক্যান্সারের মতো মারাত্মক ব্যাধিকে প্রতিরোধ করতে সচেষ্ট, তারা ১৯৮০ সালের পর থেকে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যথেষ্ট সতর্কতা ও দূরদর্শিতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে।

এ কথা সর্বজন বিদিত যে, এ্যালকোহল পান করার কারণে পাকস্থলিতে ধ্বংসাত্মক (Gastritis) ব্যাধির সৃষ্টি হয়। কারণ, রক্তে Lipid নামক এক বিশেষ ধরনের চর্বি থাকে, যা প্রতিরক্ষামূলক কাজ করে। এ্যালকোহল ব্যবহারের কারণে তা বিগলিত হয়ে যায়। অর্থাৎ Lipid এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক আবরণ সৃষ্টি করে, যার উপর হাইড্রোক্লোরিক এসিডের ক্ষতিকারক প্রভাব কার্যকরী হয় না।

সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মদ বা এ্যালকোহল যেমনিভাবে কণ্ঠনালী এবং খাদ্যনালিতে ক্যান্সার সৃষ্টির মূল উৎস হিসেবে কাজ করে, তেমনিভাবে পাকস্থলিতে ক্যান্সার সৃষ্টির ব্যাপারেও এ্যালকোহল উল্লিখিত ভূমিকা পালন করে থাকে। মদের সর্বাপেক্ষা ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে ডিওডেনাম এর ওপর। উক্ত স্থানটি খুবই স্পর্শকাতর এবং রাসায়নিক প্রভাবজনিত হয়ে থাকে। শরাব ডিওডেনিয়ামের উক্ত বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করে থাকে, যা বিশেষ ধরনের হজমকারী লালা উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে।

শরাব হজমশক্তিকে ধ্বংস করার পর কলিজা থেকে সৃষ্ট লালা নির্গত করার ব্যাপারেও বিঘ্ন সৃষ্টি করে। মদ্যপায়ীদের ডিওডেনিয়াম এবং পিত্তাবরণ সর্বদাই রোগাক্রান্ত থাকে অর্থাৎ উক্ত অঙ্গদ্বয়ের কার্যক্রম প্রায়ই যথাযথভাবে হয় না। পাকস্থলির উক্ত সমস্যা পরিপাক যন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলে। সুতরাং যে পরিপাক প্রক্রিয়া কম্পিউটারের মতো কর্ম সম্পাদন করে থাকে, তার কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

একজন সুস্থ ব্যক্তি তার প্রয়োজনীয় সব কিছু হজম করে থাকে। এটা তার পরিপাক ক্রিয়া বিশেষ কার্যক্রম চালু রাখার কারণেই সম্ভব হয়ে থাকে। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত শরাবপায়ীদের এ নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়ে যায়। তাদের পরিপাকক্রিয়াটি অতিসক্রিয় হয়ে মেদ বেড়ে যায়। কারণ, তাদের অপ্রত্যাশিত হজমক্রিয়ায় পরিপাকযন্ত্রের ফাঁকা স্থানে চর্বি জমতে শুরু করে। মূলত চর্বির আধিক্য হৃদযন্ত্রের উপর (Myocardial Tissue) ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে হৃদযন্ত্রের রোগসমূহ বিস্তার লাভ করে।

মদের সর্বাপেক্ষা ক্ষতিকর প্রভাব কিডনীর উপর পতিত হয়। মানুষের কিডনী ওই অনুভূতির গবেষণা কেন্দ্র, যা শরাবের প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দুকেও বিষের মতো অনুভূতিপ্রবণ করে তোলে। এ অবস্থা প্রত্যেক মদ্যপকেই গ্রাস করে। কিডনীর উপর দুইভাবে মদের প্রভাব পতিত হয়। (১) মদ্যপানের অবস্থায় কিডনীর এ্যালকোহল সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলে মদ্যপায়ীর স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। (২) কিডনীর সফল কার্যক্রম হলো, একটি বিষয় থেকে অন্য বিষয়ের অনুভূতি লাভ। আর উক্ত অনুভূতি মদের সার্বক্ষণিক প্রভাবে বিনষ্ট হয়ে যায়। অবশেষে কিডনীকে সর্বক্ষণ একই বিষয়ের অনুভূতির চর্চা করতে হয়। এভাবে সর্বক্ষণ অপ্রয়োজনে শ্রম ও কষ্টের ফলে কিডনীর দুর্বলতা দেখা দেয়।

শরাবের এ প্রভাব কিডনীর জন্য বিপদজনক পরিণাম ডেকে আনে। বিশেষত কিডনী সঙ্কুচিত হয়ে যায়। জীবদ্দশায়ই শরাব পানকারীর কিডনী সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যেতে দেখা যায়। আরও বড় আশঙ্কা হলো, শরাবের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কিডনীর সকল কার্যক্রম ধ্বংস করে দেয়।

ধ্বংসশীল কার্যাবলীর প্রথম হলো মদ্যপানের দ্বারা কলিজা এমন কতগুলি রক্তকণা সৃষ্টি করে, যা কলিজা নিজে নিজে সৃষ্টি করতে পারে না। ফলে কলিজার রক্ত তৈরির ক্ষমতাটি দুর্বল হয়ে যায়। সমস্ত মদ্যপায়ীরা অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল (Anaemic) হয়ে পড়ে। যদিও তাদের বাহ্যিক চেহারা টলটলে রক্তিম বর্ণ দেখা যায় এবং তাদেরকে হৃষ্টপুষ্ট মনে হয়। কলিজার রক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ফলে তাদের হাড্ডির মজ্জাও (Bone Marrow) নষ্ট হয়ে যায়।

তাছাড়া কলিজার ওই শক্তি যার দ্বারা দেহ-রক্ষাকারী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিভিন্ন প্রকার গ্লোবিন তৈরি হয়, বিশেষ করে Immuno Globulin তৈরি হয়, উহা মদ্যপায়ীদের দেহে ভয়াবহভাবে হ্রাস পায়। ফলে মদ্যপায়ীদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খর্ব হয়ে পড়ে। কখনও শরাব হৃদক্রিয়াকে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে মদ্যপায়ী অচেতন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। একে কলিজার দেউলিয়াপনা (Bankruptcy) বলা হয়। শরাব পানে কলিজা ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাই, এমন কোনো দৃষ্টান্ত কলিজার ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। এ বিষয়টিকে ব্যক্ত করার জন্য এর চেয়ে জোরালো আমার কোনো বক্তব্য নেই।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার উপর শরাবের বিরূপ প্রভাব

📄 রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার উপর শরাবের বিরূপ প্রভাব


রক্ত সঞ্চালনের উপর শরাবের প্রভাব দু'ভাবে পতিত হয়। প্রথমত হৃদযন্ত্রের উপর শরাবের প্রভাব কোনো মাধ্যম দ্বারা হয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত মাধ্যম ব্যতিরেকেই হৃদযন্ত্রে পেশীর (Myocardial Tissue) উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে থাকে। যে পেশী রসালো চর্বি জাতীয় খাদ্য উৎপন্ন করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে, তার মধ্যে দুর্বলতা সৃষ্টি করে। ফলে রক্তবাহী শিরাগুলি শক্ত হয়ে যায়, যাকে (Arteriosclerosis) বলা হয়। এর কারণে ব্লাড প্রেসার (Hypertension) দেখা দেয়। অন্যদিকে এ্যালকোহলের (মদের) তীব্রতায় হৃদযন্ত্র জ্বলে যাওয়ায় নিয়মতান্ত্রিক রক্তপ্রবাহের বিঘ্ন ঘটে। ফলে অন্তরের মধ্যে অবসন্নতা আসে। চর্বিকণিকা জমা হয়ে যায় আর শিরাতন্ত্রের বিরূপ প্রভাবের দ্বারা মানসিক ভারসাম্যতা নষ্ট হয়ে যায়।

বস্তুত শরাবে অভ্যস্ত ব্যক্তি হয়তো হৃদক্রিয়া বন্ধ (Cirrhosis) হয়ে নতুবা হার্টফেল করে নিজের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটায়। মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য এক ফোঁটা শরাব গ্রহণ যেন ওই উন্মাদ ব্যক্তির মতো কর্ম, যে নিজের প্রাণনাশের বা অঙ্গহানির কোনো পরোয়া করে না।

কতিপয় মদ্যপায়ীদের ধারণা হলো, স্বল্পমাত্রায় এবং সহনীয় পরিমাণ মদ পান করায় মনেপ্রাণে এবং শিরা-উপশিরায় এক প্রকার সতেজতা আসে। আর এটা শরাব পানেরই একটি উপকারিতা। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এ ধারণার কোনো মূল্য নেই। ডাক্তারী শাস্ত্রে এ ধরনের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায় না। তথাপি হতচ্ছড়া কিছু লোক পাওয়া যায়, যারা বিজ্ঞানেরও বিপরীত ধারণা রাখে।

মানুষের হৃদপিণ্ডকে রক্ত সঞ্চালনের শেষ কেন্দ্রবিন্দু ধরা হয়। মদ্যপানের ফলে উক্ত হৃদপিণ্ডের সর্বাপেক্ষা বেশি ক্ষতি হয়। কেননা হৃদপিণ্ড অনুভূতি-যন্ত্রের মিলিত (Balance) হওয়ার স্থানে ছাঁকনীর কাজ দেয়। কিন্তু শরাব বা এ্যালকোহল এ জটিল কাজটিকেও ব্যাহত করে। নিঃসন্দেহে যে-সকল শরাবে এ্যালকোহলের পরিমাণ কম থাকে, তা হৃদপিণ্ডের জন্য অধিক ক্ষতিকর। যেমন: অধিক মাত্রায় তিতো মদ (Beer) পান করায় হৃদপিণ্ড সিংহভাগ ধ্বংস হয়ে থাকে।

রসবাহী নল (Lymphatic) মানবীয় শরীর রক্ষায় অতি গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রণালীর রক্তবাহী শিরাগুলি শরাবের দ্বারা চিকিৎসার অযোগ্য হয়ে পড়ে। কেননা লিপিড (Lipid) প্রণালীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে, যা শরাব পানের ফলে সেটি বরবাদ হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা যদি নিজ অনুগ্রহে মানবীয় জিন্দেগীর হেদায়েত বিভিন্ন পন্থায় না করতেন, তা হলে শরাব আমাদের জন্য কত অধিক ক্ষতিকর তা আমাদের জন্যে পরিষ্কার হয়ে যেত।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 সমাজ জীবনের উপর মদের প্রভাব

📄 সমাজ জীবনের উপর মদের প্রভাব


এ সত্যটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে, মদ সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধনের উপর কতটা বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। নিম্নে বিশেষ কয়েকটি প্রভাবের কথা উল্লেখ করছি:

১. মদ্যপায়ীরা দ্রুত চিন্তিত অথবা দ্রুত ক্রোধান্বিত হওয়ার ফলে তারা সমাজে অসংখ্য ঝগড়া-ফাসাদে জড়িয়ে পড়ে。
২. অসংখ্য মদ্যপায়ীদের দ্বারা তালাকের দুর্ঘটনা সমাজের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। এভাবে অপরাধ প্রবণ লোকের সংখ্যা বাড়তে থাকায় পুরো সমাজব্যবস্থা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
৩. বিভিন্ন স্তরের শ্রমজীবী তথা কৃষক ও কারিগরদের উপর মদের কারণে উদাসীনতা ও অলসতা দেখা দেয়। ফলে তাদের কর্মজীবন এবং অভিজ্ঞতার উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। যার থেকে সমাজও রেহাই পায় না。
৪. মদ্যপানের ফলে মানুষের মাঝে সহানুভূতি লোপ পায়। ফলে একতা এবং নীতি বিবর্জিত সমাজের বিরুদ্ধে জেহাদী মনোভাব নিয়ে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা পরিপূর্ণরূপে খতম হয়ে যায়。

উপরাউক্ত চার প্রকার সমস্যা পশ্চিমা বিজ্ঞানীদেরকে এ পরিমাণ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে রেখেছে যে, তারা বারবার তাদের সরকারের দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট করতে সচেষ্ট হয়েছে। যদি মদের ব্যবহার এরূপ বাড়তেই থাকে, তাহলে এ দেশগুলোতে জাতীয় চিন্তা-চেতনা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

pবিত্র কুরআন এ সমস্যার মূলোৎপাটন করে দিয়েছে। কোনো দার্শনিকেরও হিম্মত হয় নি এ সমস্যা সহজে সমাধান করে যাওয়ার। এ মদ সেবন সমস্যা পশ্চিমাগোষ্ঠীর সামাজিক ভিত্তিকে ঘুণপোকার মতো ধীরে ধীরে খেয়ে নিঃশেষ করে দিয়েছে। অথচ আল্লাহ তা'আলা আমাদের সমাজকে শত শত বছর ধরে এ বিপদ থেকে হেফাযত করে আসছেন। (ড. হুলুক বাকীর গবেষণা থেকে)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00