📄 একটি শিক্ষণীয় ঘটনা
লাহোরে বড় একজন রঙ ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তার ব্যবসা লাখের কোঠা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সম্পদ বেড়ে যাওয়ায় তার অহঙ্কার বেড়ে গিয়েছিল। মানুষকে মানুষ মনে করত না। একদিন তার মা তাকে কাছে বসিয়ে কিছু উপদেশ দিতে চাইলেন। যেন মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে এবং অন্যদেরকেও মানুষ মনে করে। মায়ের উপদেশগুলো তার কাছে ভীষণ খারাপ লাগল। তাই মাকেই সে গালিগালাজ আরম্ভ করল। তাঁকে একটি থাপ্পড়ও মারল। এ ঘটনার এক বছরের ভিতরই তার ব্যবসায় ধস নামল। শেষ পর্যন্ত দোকানও বিক্রি করতে হলো। অবশেষে তাকে দু'বেলা খাবারের জন্য মাজারের বাইরে বসে থাকতে হতো।
এ ধরনের লোকেরা দীর্ঘদিন জীবিত থাকে। এদেরকে অন্যদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য দীর্ঘদিন জীবিত রাখা হয়। কুরআনে মাজিদে মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহারের ব্যাপারে বিভিন্ন স্থানে বেশ জোর দিয়েছে এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহারের উপায় ও পন্থা বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহারের প্রতি জোর দিয়ে বলেছেন- আমি মানবজাতিকে আদেশ করেছি, তারা যেন আপন পালনকর্তা ও মাতা-পিতার কৃতজ্ঞতা আদায় করে।” আমাদের জন্য যেরূপ আপন পালনকর্তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন জরুরি, তেমনিভাবে মাতা-পিতার কৃতজ্ঞতা আদায়ও অত্যাবশ্যক।
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে মায়ের দুর্ব্যবহারের নালিশ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি তোমার মায়ের অনুগ্রহের প্রতিদান পূর্ণ করেছ? সে জবাব দিল, আমি তাকে কাঁধে করে হজ্ব করিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি কি তার খেদমতের সবকিছুই ফেরত দিতে পেরেছ? যখন তাকে বার বার মায়ের অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলো, তখন তার টনক নড়ল যে, আম্মা-আব্বা যদি বাড়াবাড়িও করেন, তবু তা সহ্য করা আমার কর্তব্য। কুরআন মজীদের একটি আয়াত থেকে তা-ই সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। “যদি তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমাদের জীবদ্দশায় বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে কখনো 'উহ্' শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে কখনো ভৎর্সনা করো না।” উহ্ বলার পরিস্থিতি তখনই সৃষ্টি হয়, যখন কেউ কোনো কষ্ট পায়। অর্থাৎ তারা যদি তোমাকে কোনো প্রকার কষ্ট দেন, তখন তোমার করণীয় হলো, তুমি তার প্রতিটি কাজকে হাসিমুখে এবং সৎগুণে বরণ করে নিবে। তাদের দুর্ব্যবহারের জবাবে ভর্ৎসনা করা কুরআনে মাজিদে নিষেধ করা হয়েছে।
আর কুরআন মাজীদ যে কাজ থেকে বারণ করে, সেটি করা হারাম হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন: ওই ব্যক্তি লাঞ্ছিত হোক, লাঞ্ছিত হোক, লাঞ্ছিত হোক! লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! কোন ব্যক্তি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “যে ব্যক্তি আপন মাতা-পিতাকে বৃদ্ধাবস্থায় পেয়েছে। অথচ তাদের খেদমত করে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে নি।” মাতা-পিতার খেদমত ওই অনুগ্রহের প্রতিদান, যা মাতা-পিতা তার লালন-পালনের সময় করেছিলেন। ইহসানকে ইহসান মনে করা এবং ইহসানকারীর প্রতিদান দেওয়ার অভ্যাস ঘর থেকেই শুরু করতে হয়।
যখন কেউ এ কথা অনুভব করতে পারে, তখন সে অন্যের প্রতিও কৃতজ্ঞ হতে শিখে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি মানুষের শুকরিয়া আদায় করে না, সে আল্লাহ তা'আলারও শুকরিয়া আদায় করে না। অন্যের ইহসানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার সুযোগ প্রতিটি মুসলমানের জীবনে বার বার আসে। আম্মা-আব্বার গোনাহ মাফের জন্য দু'আ করাও একজন মুসলমানের জন্য একটি বিশেষ সওয়াবের কাজ। আর আল্লাহ তা'আলা নিজেই দু'আ করার পদ্ধতি এভাবে শিক্ষা দিয়েছেন, “হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমার আব্বা-আম্মার প্রতি রহম করুন! যেমনি তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।”
হযরত আবু হুরাইরাহ রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার সদ্ব্যবহারের সর্বাপেক্ষা হকদার কে? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার আম্মা। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর কে? হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার আম্মা। তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর কে? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার আম্মা। তিনি আবারও জিজ্ঞাসা করলেন, এরপর কে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার আব্বা। সুতরাং আম্মা-আব্বার সম্মান করা, তাদের সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখা, তাদের ইহসানের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা এমন একটি শিক্ষা, যা একজন মানুষের উত্তম চরিত্রের শামিল। তাই সর্বদা আম্মা-আব্বার খেদমত করা এবং তাদের জন্য সর্বদা দু'আ করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য একান্ত জরুরি।
📄 প্রথম খণ্ড সমাপ্ত
প্রথম খণ্ড সমাপ্ত
📄 সুন্নতে রাসূল-১+২-ফর্মা-২
সুন্নতে রাসূল-১+২-ফর্মা-২