📄 প্রথম ঘটনা
আমার পিতার এক বন্ধু সম্পর্কে প্রসিদ্ধ ছিল, সে মায়ের মৃত্যুকালে মায়ের সাথে বেয়াদবী করেছিল। তার মা বেচারী একাকিনী পড়ে থেকে অবশেষে মারা গিয়েছেন। আর আমিও অনুসন্ধানে ছিলাম, যে ব্যক্তি মা-বাবার সাথে দুর্ব্যবহার করে তার মৃত্যু কিভাবে হয়? ধীরে ধীরে সময় গড়িয়ে যেতে লাগল। এ ঘটনার ত্রিশ বছর পর যে ব্যক্তি মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার করেছিল, সে অসুস্থ হয়ে পড়ল এবং ডায়রিয়ার কারণে একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ল।
আমার পিতা আমাকে তার চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেলেন। আমি দেখলাম, সে ব্যক্তি একেবারে দুর্বল হয়ে বিছানায় পড়ে আছে এবং কান্নাকাটি করছে। আমি তাকে তার খাদ্যের ব্যাপারে পরামর্শ দিলে সে আরও জোরে কাঁদতে লাগল এবং বলল, আমার তিনটি ছেলে। কিন্তু কেউ আমার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না, কয়েকদিন যাবৎ অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছি। একটিবারও কেউ দেখতে আসল না। এভাবেই তার মৃত্যু এসে গেল। রাত্রিবেলায় সে একাকী মরে পড়ে ছিল। সকালে মহল্লাবাসী যখন সংবাদ পেল, তখন তার শরীর পিঁপড়ায় খাচ্ছিল। বাস্তবিকই মায়ের সাথে দুর্ব্যবহারকারীরা এ দুনিয়ায়ই শাস্তি পেয়ে যায়।
📄 দ্বিতীয় ঘটনা
আমার ওয়ার্ডে এক যুবকের মূত্রথলির কার্য বন্ধ হয়ে তিন দিন পর্যন্ত আধমরা হয়ে পড়েছিল। বিগত চল্লিশ বছরেও এমন নির্মম মৃত্যু আমার নজরে পড়ে নি। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তার মুখ নীলবর্ণ ধারণ করত। চক্ষু বের হয়ে আসতে চাইত এবং মুখ থেকে ভয়াবহ আওয়াজ বের হত। মনে হত যেন কেউ তার গলা টিপে ধরেছে। মৃত্যুর একদিন পূর্বে তার এ অবস্থা খুবই মারাত্মক আকার ধারণ করল। চিৎকার আরও বেড়ে গেল। ওয়ার্ড হতে অন্যান্য রোগীরা পালাতে আরম্ভ করল। তাই তাকে ওয়ার্ড হতে অনেক দূরে একটি আলাদা কামরায় স্থানান্তর করা হলো। কিন্তু তারপরও তার অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। অবশেষে তার বাবা এসে আমাকে বললেন, একে একটি বিষাক্ত টিকা দিয়ে দিন। যেন সে মরে যায়। অবস্থা আর সহ্য হয় না। আমি তার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, সে এমনকি মারাত্মক অন্যায় করেছে, যার কারণে তার এ করুণ অবস্থা। তার পিতা সঙ্গে সঙ্গে বলে ফেললেন- এ ব্যক্তি তার স্ত্রীকে খুশী করার জন্য মাকে মারধর করত। আমি তাকে বাধা দিতাম। সে শুনত না। এ যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু সেই পাপেরই প্রায়শ্চিত্ত।
📄 তৃতীয় ঘটনা
আমার এক বন্ধু গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। সেখানকার একটি ঘটনা। এক কৃষকের ঘরে সর্বদা তার মা ও স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া হত। কয়েকবার তার স্ত্রী অসন্তুষ্ট হয়ে বাপের বাড়ি চলে যায়। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। তার স্ত্রী শেষবার এ শর্ত প্রদান করল যে, তুমি যদি তোমার মাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দাও, তা হলে আমি তোমার ঘরে আসব।
কৃষক প্রতিদিনের ঝগড়ায় বিরক্ত হয়ে অবশেষে তার মাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেওয়ার ফন্দি আটল। সে প্রতিদিন ক্ষেত হতে আখ কেটে নিয়ে বাজারে বিক্রি করত। একদিন সে তার মাকে ছল করে ক্ষেতে নিয়ে গেল। যেন তিনি তার মাথায় আখের বোঝা তুলে দেন। সুতরাং সে তার মাকে পাশে দাঁড় করিয়ে আখ কাটতে আরম্ভ করল এবং হঠাৎ সে কাস্তে দ্বারা তার মাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে বসল। তখন জমিন তার পা আটকে ফেলল। দূরে ছিটকে পড়ল কাস্তে। এমতাবস্থায় তার মা চিৎকার করতে করতে গ্রামের দিকে দৌড়ে পালাল।
এরই মধ্যে জমিন ধীরে ধীরে কৃষককে গিলতে আরম্ভ করল। তখন কৃষক চিৎকার করতে লাগল। উচ্চৈঃস্বরে ডাকতে শুরু করল মাকে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগল। কিন্তু ক্ষেত থেকে গ্রাম দূরে হওয়ার কারণে মানুষ তার আওয়াজ শুনল অনেক দেরীতে। মানুষ সেখানে পৌঁছার আগেই জমিন তাকে বুক পর্যন্ত গিলে ফেলল তার শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। লোকেরা তাকে উদ্ধারের জন্য অনেক চেষ্টাই করল। কিন্তু জমিন তাকে ছাড়ল না। এভাবেই সে ধীরে ধীরে মাটির অধরে ধ্বসে গেল।
📄 ইউরোপের শিক্ষণীয় একটি ঘটনা
ইংল্যাণ্ডের একটি চিকিৎসা সাময়িকীতে একটি শিক্ষণীয় ঘটনা ছেপেছিল। মেরী নামের একটি মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত হলে তার মা তাকে খুব ভালো পাত্রের কাছে বিবাহ দিল। স্বামী অত্যন্ত প্রতাপশালী ও সামাজিক ছিল। তার ঘরে একটি কন্যা সন্তানও জন্ম নিল। মায়ের আর কোনো সন্তান না থাকায় সে মেয়ের সাথেই থাকত এবং নাতনিকে লালন-পালনে সহযোগিতা করত। নাতনী যখন একটু বড় হয়ে গেল এবং নিজের পোশাক-পরিচ্ছদ নিজেই পালটাতে সক্ষম হলো, তখন মেরী ভাবল, মায়ের জন্য ঘরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। এজন্য বৃদ্ধাকে এখান থেকে সরাতে হবে। মা বৃদ্ধা-ভাতা পেতেন। সুতরাং মেরী তার মাকে একটি বৃদ্ধাশ্রমে 'ওল্ড হাউজে' (Old house) দিয়ে এল।
মা মেয়েকে বুঝানোর অনেক চেষ্টা-তদবীর করল। ঘরে তার প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মরণ করিয়ে দিল। কিন্তু মেরী মাকে বলল, আমার চার কামরার ফ্লাট এখন আমাদের জন্য সঙ্কীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এখন আপনি এখান থেকে চলে গেলেই ভালো হয়। মেরীর কন্যা এলিজাবেথের তার নানীর সঙ্গে খুব ভাব জমে গিয়েছিল। তার আবেদনও নাকচ হয়ে গেল। অবশ্য মায়ের সাথে ওয়াদা হলো, প্রতি রবিবার তার সাথে সাক্ষাৎ করবে এবং তাকে বাসায় আনবে।
মাকে ওল্ড হাউজে পৌঁছানোর পর ধীরে ধীরে সাক্ষাতে দেরি হতে লাগল। সপ্তাহে রবিবার ছুটির দিন হওয়ার কারণে ঘরে মেহমান আসা-যাওয়া করে। তাদের উপস্থিতিতে ঘরে একজন দুর্বল বৃদ্ধার আগমন ভালো দেখায় না। বিধায় ওল্ড হাউজেই মায়ের বসবাস সুনির্ধারিত হয়ে গেল। এদিকে মা কিন্তু অক্ষম ও দুর্বল বৃদ্ধাদের মাঝে থেকেও তাদেরকে স্মরণ করত। ভালবাসা ও মমতাপূর্ণ বড় বড় চিঠি প্রেরণ করত। নাতনী এলিজাবেথের কাছে স্নেহ-মায়া ও ভালবাসা পাঠাত। কিন্তু সে চিঠির উত্তরের অপেক্ষাতেই থাকত। কন্যা তার মাকে চিঠিতে লিখল, বড়দিনের উৎসবে অবশ্যই মাকে ঘরে আনতে যাবে।
মা বেচারী পকেট খরচ থেকে এক পয়সা করে বাঁচিয়ে উল ক্রয় করল এবং দিবারাত্র খেটে-খুটে প্রিয় নাতনীর জন্য টুপি, মাফলার এবং সোয়েটার তৈরি করতে লাগল। বড়দিন আসতে আর মাত্র অল্প ক'দিন বাকি। এদিকে বুনন কাজ কিছু বাকি রয়ে গেছে। তাই ২৪ শে ডিসেম্বর কঠিন বরফপাত হওয়া সত্ত্বেও বিল্ডিংয়ের বেলকনিতে চেয়ার পেতে বসে কলিজার টুকরা প্রিয় নাতনীর উপহারে কাজ সম্পন্ন করতে লাগল। কঠিন শীতে বেলকনিতে বসার আরেক কারণ ছিল, যখন তাকে নেওয়ার জন্য ট্যাক্সি আসবে, তখন তাদেরকে যেন অপেক্ষা করতে না হয়।
ওল্ড হাউজের ন্যান্সী নামের এক সেবিকা তাঁর সেবায় অত্যন্ত যত্নবান ছিল। সে বৃদ্ধাকে হিটার রুমে নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করল। কিন্তু মা পরিবারের লোকজনদের দেখার জন্য অধীর হয়ে ছিল। তাই কোনো ক্রমেই সেখান থেকে অন্যত্র যেতে রাজী হলেন না। ন্যান্সী একটি কম্বল এনে তার গায়ে জড়িয়ে দিল। বারবার ঘরে যাওয়ার অনুরোধ জানানোর সাথে সাথে চা-ও দিতে লাগল। এভাবে সকাল হয়ে গেল, কিন্তু তাকে নেওয়ার জন্য কেউই আসল না। দুর্বলতা, রাত্রি জাগরণ এবং প্রচণ্ড হিমেল হাওয়ায় সারারাত বসে থাকার কারণে তার নিউমোনিয়া দেখা দিল।
মেয়ে নিজে আসার সুযোগ পেল না। এমনকি সে একবার ফোন করেও মায়ের খবর নিতে পারল না। ইতোমধ্যে মা মারা গেল। মেরী সংবাদ পেয়ে মায়ের কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করল। কিছুদিন পর মেরী মায়ের সামানপত্র আনার জন্য ওল্ড হাউজে গেল, তখন সে সেখানকার সেবিকা ন্যান্সীর কৃতজ্ঞতা আদায় করল। কারণ, সে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মায়ের সেবা করেছে। এরপর মনে মনে ভাবল, ন্যান্সী বাস্তবিকই একজন সেবিকা মেয়ে। তাকে বাসায় কাজের জন্য নিয়ে গেলে মন্দ হয় না। তাই সে ভালো বেতনের লোভ দেখিয়ে ন্যান্সীকে তার সাথে বাড়িতে যাওয়ার জন্য প্রস্তাব করল। ন্যান্সী হেসে হেসে বলল, আমি আপনার বাড়িতে অবশ্যই যাব। তবে তার আগে আল্লাহ তা'আলার ইনসাফ দেখে নিব। যেদিন আপনার মেয়ে এলিজাবেথ আপনাকে ওল্ড হাউজে রেখে যাবে, সেদিন আমি তার সাথে সেবার জন্য চলে যাব। এটি নিছক একটি ঘটনাই নয় বরং এটা বাস্তব সত্য। বর্তমানে মডার্ন পরিবারগুলোতে মাতা-পিতা একটি ফালতু বস্তুতে পরিণত হয়েছে। তাদের সেবা তো দূরের কথা বরং নতুন প্রজন্ম তাদের চেহারা দেখতেও রাজী নয়।
হযরত ওয়ায়েস করনী রহ. ইসলামের পয়গাম শুনে ইসলাম পছন্দ করলেন এবং মক্কায় গিয়ে বাই'আত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তাঁর মা তখনো জীবিত ছিলেন। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উপস্থিতি ছাড়াই তাঁর ইসলাম গ্রহণ কবুল করলেন। তাঁকে নসীহত করলেন, তিনি যেন মায়ের খেদমত করতে থাকেন। কেননা জান্নাত মায়ের পদতলে। এরপর তিনি সংবাদ পেলেন, উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাঁত মুবারক শহীদ হয়ে গেছে। নবী-প্রেমে পাগলপারা এবার পাথর দ্বারা নিজের দাতগুলিও ভেঙে ফেললেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হওয়ার ভাগ্য হয় নি। তাঁর মা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পরও জীবিত ছিলেন। তাই তিনি তার যিয়ারত থেকে মাহরূম ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীর মর্যাদা লাভের জন্য জরুরি হলো বালেগ অবস্থায় তার দর্শন লাভ করা এবং মৃত্যু পর্যন্ত ইসলামের উপর অটল থাকা। হযরত ওয়ায়েস করনী রহ.-এর হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাতও হয় নি এবং তিনি তাঁর পবিত্র হাতে ইসলামও গ্রহণ করেন নি। তাঁকে মায়ের খেদমতের প্রয়োজনীয়তার কারণে এগুলি থেকে বাদ রাখা হয়েছে। সরাসরি উপস্থিত না হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে সাহাবিয়াতের মর্যাদা দান করা হয়েছে (অবশ্য এতে কারও কারও মতভেদও আছে)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মজলিসে ওয়ায়েস করণী রহ.-এর কথা উল্লেখ করেছেন এবং প্রতিবারই তাঁকে আপন বন্ধুর মর্যাদা দান করেছেন।