📄 এক অমুসলিমের ঘটনা
একজন মুসলিম ডাক্তার আমাকে একটি ঘটনা শোনালেন। এক অমুসলিম একবার তার পায়ের গোছায় প্রচণ্ড আঘাত পান। ক্ষতস্থান থেকে তখনো টপটপ রক্ত ঝরছে। চিকিৎসার জন্য সে আমার নিকট আসল। আমি তার ক্ষতস্থান ধৌত করার জন্য একটি পাত্রে করে কিছু পানি দিলাম। সে ব্যক্তি ডান হাত দ্বারা পানি নিয়ে ওই হাত দিয়েই ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে লাগল এবং বারবার ওই রক্তমাখা হাত পানিতে দেওয়ার কারণে পানিও নষ্ট হয়ে গেল। সেই পানি ফেলে দিয়ে আমি তাকে পরিষ্কার পানি দিয়ে বললাম, ডান হাত দিয়ে ক্ষতস্থানে পানি ঢালুন আর বাম হাত দিয়ে তা পরিষ্কার করুন। এতে করে ক্ষতস্থানও পরিষ্কার হয়ে যাবে আর পানিও নষ্ট হবে না। আমি তাকে আরও বললাম, ইসলামে ডান ও বাম হাতের কর্ম বণ্টনের মধ্যে এ হিকমতই লুকিয়ে রেখেছে।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন তোমরা গোসল কর বা কাপড় পরিধান কর বা ওযু কর, তখন ডান দিক থেকেই শুরু করবে। ইস্তেঞ্জার পবিত্রতা ইত্যাদি ব্যতীত প্রতিটি উত্তম কাজের জন্য ডান হাতকে কাজে লাগানোর নির্দেশ রয়েছে।
পায়খানা করার পর পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জনের পূর্বে যদি কোনো পরিষ্কার-পরিছন্ন কাপড়, কাগজ, ঢিলা পাথর ইত্যাদি দ্বারা সংশ্লিষ্ট অঙ্গটাকে মুছে ফেলা হয়, তাহলে খুবই উত্তম। শুধু পানি ব্যবহার করলেও কোনো ক্ষতি নেই। তবে উভয়টাই ব্যবহার করলে শরীর আরও উত্তমরূপে পবিত্র হবে। আর এটাই সর্বোত্তম পন্থা, যা রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব পছন্দ করেছেন। অবশ্য এক্ষেত্রে তিন টুকরা কাগজ, কাপড় বা বেজোড় ঢিলা বা পাথর ব্যবহার করলে যথেষ্ট হবে। তিন সংখ্যাটি অধিক পরিচ্ছন্নতার উদ্দেশ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর পানি দ্বারা শরীরের সংশ্লিষ্ট অঙ্গটা আবার ধুয়ে ফেললে খুবই উত্তমরূপে শরীর পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে।
ইসলামের পরিভাষায় একেই ইস্তেঞ্জা বলা হয়। এটাই হলো ইস্তেঞ্জা ও ঢিলার মাসআলা, যাকে নিয়ে কিছু অমুসলিম, এমনকি ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু মুসলমানও হাসি-ঠাট্টা ও বিদ্রুপ করে থাকে। স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ও পরিচ্ছন্নতার দৃষ্টিকোণ থেকে এটা কোনো দোষ বা সমালোচনার বিষয় নয়। এভাবে ইস্তেঞ্জা করার পর পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহৃত বাম হাতটি পরিষ্কার মাটিতে ঘষে বা অসুবিধার ক্ষেত্রে সাবান দ্বারা ধুয়ে ফেলতে হবে।
এক্ষেত্রে কিছু বাধ্য-বাধকতাও আছে। যা একেবারে সাধারণ ও নগণ্য বিষয় বলে মনে হলেও বস্তুত এটা প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- তোমরা প্রস্রাব-পায়খানার পরিচ্ছন্নতা হাড় বা গোবর দ্বারা করো না। কেননা এগুলি জীনের খাবার।
📄 অবজ্ঞা ও তার পরিণাম
আমার নিকট জনৈক ব্যক্তি একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, স্বাধীনচেতা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এক মুসলমান যুবক “হাড্ডি দ্বারা ইস্তেঞ্জা নিষেধ” শুনে খুবই অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করল। ঘটনাক্রমে সেই ব্যক্তি একদিন পায়খানা করার পর পরিচ্ছন্নতা অর্জনের জন্য হাড্ডি ব্যবহার করে বসল। এরপর তার সে স্থানে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেল এবং সাথে সাথে সে স্থান ফুলে গেল। আসলে কথা হলো, সেই হাড্ডিতে ছিল ছোট ছোট বিষাক্ত পিঁপড়া, যা সে দেখতে পায় নি। আর সেগুলিই তাকে কামড়ে বসেছে। যখন জ্বালা-যন্ত্রণা বেড়ে গেল, তখন সে আমার নিকট দৌড়ে এসে কুকর্মের জন্য ভুল স্বীকার করল ও লজ্জিত হলো এবং সাথে সাথে চিকিৎসার প্রার্থনা করল। আমি বললাম, যেই মহান দয়ালু নবীর সাথে তুমি পরিহাস করেছ, তাঁর উপর দরূদ শরীফ পাঠ কর এবং তওবা কর। আমার কথা মতো আমল করার পর অবশেষে তার জ্বালা-যন্ত্রণা দূরীভূত হলো।
হাড় ও গোবরের মধ্যে কয়েক প্রকার পোকামাকড় ও রোগজীবাণু থাকে। তাছাড়া যে নিজেই অপবিত্র, সে কিভাবে অন্যকে পবিত্র করবে। উন্নত দেশসমূহের গ্রামে-গঞ্জেও পবিত্রতা অর্জনের জন্য কাগজ ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়; মাটির ঢিলা ব্যবহার করা তাদের নিকট অবমাননাকর বিষয় মনে হয়। কিন্তু ইসলাম একটি বিশ্বজনীন ধর্ম। তার হুকুম আহকাম ধনী-দরিদ্র, কালো-ফর্সা, শহুরে-গ্রাম্য, শুষ্ক-আর্দ্র, শীত-গরম, সকল ব্যক্তি ও অঞ্চলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের পল্লী এলাকায় অনুন্নত ও দারিদ্র্য পীড়িত। যে সকল গরিব লোকদের দু'বেলা পেট ভরে আহার করার মতো খাদ্য জোটে না, তারা ইস্তেঞ্জার জন্য টয়লেট পেপার কিভাবে খরিদ করবে? তাদের তো বাহ্যকর্ম সম্পাদনের জন্য উন্মুক্ত জঙ্গল আর পরিচ্ছন্নতার জন্য আল্লাহর সৃষ্ট সাধারণ ও সহজ প্রাপ্য ফ্রি জিনিস মাটি ও পানিই যথেষ্ট।
বর্তমানে পবিত্রতা অর্জনের জন্য পাশ্চাত্য জাতিসমূহের মধ্যে কোথাও কোথাও পানি ব্যবহারের প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এতদিন তো শুধু কাপড় আর কাগজের দ্বারাই তাদের কাজ চলত। কিন্তু পানি দ্বারা ইস্তেঞ্জা না করলে তা একজন মুসলমানের অন্তরে কঠিন সঙ্কীর্ণতা সৃষ্টি করে। তাছাড়া এ ধরনের অসম্পূর্ণ পবিত্রতার পর গোসল করার জন্য চলে যাওয়া তার মেজাজের জন্য আরও বেশি কষ্টদায়ক হয়। এ ধরনের গোসল তার দৃষ্টিতে প্রকৃত গোসলই নয়।
আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যাবে, ইসলামও একজন মুসলমানের পবিত্রতার মানদণ্ড কত উন্নত। এ বিষয়টি অন্য একটি ব্যাপার দ্বারাও সুস্পষ্ট। অর্থাৎ প্রস্রাব করার পরও পবিত্রতা অর্জন করা অত্যাবশ্যক। প্রস্রাব করার পর প্রস্রাবের নালীতে পেশাবের ফোঁটা আটকে থাকে। যা দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত অদৃশ্যভাবে বের হয়ে পোশাক ও উরুতে লেগে তাকে দুর্গন্ধময় করে তোলে। এ কলুষতা থেকে পরিত্রাণের জন্য দু'ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথমত কোনো শোষণকারী জিনিস। যেমন, মাটির শুষ্ক ঢিলা, শোষণকারী কাগজ বা কাপড়ের টুকরা ইত্যাদি দ্বারা প্রস্রাবের ফোঁটাসমূহকে শুকিয়ে ফেলা। তারপর পানি দ্বারা আবার ধোয়া। পানির শীতলতা দ্বারা প্রস্রাবের নালী সঙ্কোচিত হয়ে ফোঁটাগুলি তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে আসে এবং সাথে সাথে পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জিত হয়ে যায়। অন্যান্য জাতি প্রস্রাবের ফোঁটা থেকে মোটেই সতর্কতা অবলম্বন করে না। প্রস্রাব করে সাথে সাথেই দাঁড়িয়ে প্যান্টের বোতাম বন্ধ করে দেয়, লুঙ্গি ছেড়ে দেয় বা পায়জামা পরে নেয় বা ধুতির সংশ্লিষ্ট অংশ দ্বারা শরীর ঢেকে নেয়। আর প্রস্রাবের ফোঁটা শরীর ও পোশাকে লেগে দুর্গন্ধময় ও কলুষিত করে তোলে। ফলে তা উরুতে চর্মরোগ সৃষ্টির কারণ হয়।
আমি স্বচক্ষে দেখেছি, হিন্দু সম্প্রদায় পায়খানায় পানির পাত্র তাকের উপর না রেখে নিচেই রেখে দেয়। ফলে ওই পানিতে প্রস্রাবের ছিঁটা পড়তে থাকে। সেই নাপাক পানিই তারা আবার ব্যবহার করে।
একজন নামাযী ব্যক্তির শরীর ময়লা-আবর্জনা ও যাবতীয় কলুষতা মুক্ত হয়। আবার কেউ তো এমন সতর্কতা অবলম্বন করে যে, যদি এক ফোঁটা প্রস্রাবও তার কাপড় বা শরীরে লেগে যায়, তবে তা পরিষ্কার না করা পর্যন্ত স্বস্তি বোধ করে না। এক কথায় এ ঘৃণ্য কাজ থেকে বেঁচে থাকা যেন একজন মুসলমানের স্বভাবে পরিণত হয়েছে।
এক হাদীসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক কবরের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় কাশফের মাধ্যমে জানতে পারলেন যে, তার কবরে আযাব হচ্ছে। কেননা সে তার জীবদ্দশায় পেশাবের ছিঁটা থেকে সাবধানতা অবলম্বন করত না। মানুষের শরীর থেকে নির্গত পেশাব পায়খানা কঠিন নাপাক। এটা কাপড়চোপড় খারাপ করা ছাড়াও স্বয়ং মানুষকেই বিবিধ রোগে আক্রান্ত করে দেয়। আখেরাতের শাস্তি ছাড়া দুনিয়াতেই এ নাপাক থেকে অসাবধানতার ফলে চুলকানি, এলার্জি ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়ে দুনিয়াতেই দোযখের শাস্তি ভোগ করতে হয়।
অনেকেই পেশাব-পায়খানা করার পর মানুষ চলাফেরা করে এমন জায়গায় ঢিলা-কুলুখ নিয়ে নির্লজ্জভাবে ঘোরাফেরা করে। আধুনিক শিক্ষিত লোকজন এ অবস্থা দেখে অনেক অশালীন উক্তি করে থাকে। আসলে সুন্দর নিয়ম হলো, ইস্তেঞ্জার পর এমন জায়গায় এমনভাবে হাঁটাহাঁটি করা, যেখানে সাধারণভাবে মানুষের নজর না পড়ে। এটাই হলো মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা ও আমল।
পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরয। আর পূর্ণ পবিত্রতা ছাড়া নামায পড়া যায় না। তাই বলা যায়, প্রতিটি মুসলমানের জন্য শরীর ও কাপড়চোপড় পবিত্র রাখা ফরয। পূর্বে বলা হয়েছে, পেশাব-পায়খানা সর্বাপেক্ষা নাপাক। প্রতিটি মুসলমানের শরীর ও কাপড়চোপড় এ নাপাক থেকে যত পবিত্র রাখা যাবে ততই ভালো। ইসলাম এ শিক্ষার উপরই বিশেষভাবে তাগিদ দিয়েছে।
শরীরের সুস্থতা ও পরিবেশের সৌন্দর্যের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, পেশাব-পায়খানার নিয়ম-পদ্ধতি ও ইস্তিঞ্জাখানা নির্মাণের গুরুত্বও অপরিসীম। পেশাব-পায়খানা করার সহজ পদ্ধতি তা-ই, যা আজ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে বিদ্যমান। তথাকথিত উন্নত দেশের লোকজন এ নিয়মের বিপরীত করে থাকে। আবার মুসলমানদের তাহজীব-তামাদ্দুন দেখে ঠাট্টা-বিদ্রুপও করে। কিন্তু চিন্তা করলে দেখা যায়, ডাক্তারী মতেও ইসলামী নিয়মই স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য উপকারী। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ বাড়িতে যখন পেশাব-পায়খানা করতে বসতেন, তখন তিনি দুটি ইটের উপর বসতেন।
এভাবে বসলে শরীরের উপরের অংশের পূর্ণচাপ নাড়ীভুঁড়ির উপর পড়ে। ফলে পেশাব-পায়খানা শরীর থেকে পূর্ণরূপে বের হয়ে যায়। সেই সাথে পাকস্থলীতে উভয় দিক থেকে উরুর চাপ পড়ে। পা অনাবৃত থাকায় পাকস্থলী ও দেহের প্রাকৃতিক চাপের কারণে পাকস্থলীর অন্ত্রের মুখ পূর্ণভাবে উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং দ্রুতি বৃদ্ধি পায়। যার কারণে পায়খানা দ্রুত ও সহজে বের হয়ে আসে।
অনুন্নত ও সাধারণ শিক্ষিত জাতির মধ্যে প্রয়োজনানুপাতে এবং নিজেদের পরিবেশ অনুযায়ী সেই প্রাকৃতিক পদ্ধতির উপরই আমল করা হয়। গ্রাম্য সাধারণ লোকজন পায়খানা করার জন্য জঙ্গলে চলে যায় এবং পায়খানা করার স্থানটি থেকে সরে গিয়ে অন্যত্র বসে পবিত্রতা অর্জন করে। আর শহরের লোকজন নিজেদের ঘরের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বাথরুম বানিয়ে নেয়, যার মধ্যে দু'একটি বাথরুম থাকে পায়খানা করার জন্য আর একটি থাকে পানি ব্যবহার করার জন্য। সেগুলো এত উঁচু থাকে যে, প্রস্রাব-পায়খানা বা পবিত্রতা অর্জনের সময় শরীর ও পোশাকে তার ছিঁটা পড়তে পারে না। আবার কখনো শহরে বাথরুম একটিই এমন পদ্ধতিতে বানানো হয়, যার ছিদ্র উত্তম ও পরিপূর্ণভাবে ঢালু থাকে। ফলে পায়খানা নিজে নিজেই প্রবাহিত হয়ে নিচের দুর্গন্ধ নালীতে গিয়ে পড়ে। তারপর যখন সেখানে বসে পানি ব্যবহার করা হয়, তখন এর ছিদ্র আরও অধিক পরিমাণে পরিষ্কার হয়ে যায়।
এ পদ্ধতি অবলম্বন করতে গিয়ে যদি সামান্যতম সতর্কতাও অবলম্বন করা হয়, তাহলে শরীরের সংশ্লিষ্ট অঙ্গও পূর্ণরূপে পবিত্র হয়ে যায়। পেশাব পায়খানা দ্বারা মানুষ প্রশান্তি পায় আর পবিত্রতা দ্বারা নিজেকে হালকা অনুভব করে।
এক্ষেত্রে ইসলাম অবশ্যই একটি বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করে দিয়েছে। তা হলো, প্রস্রাব-পায়খানার সময় লজ্জা-শরমের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রস্রাব-পায়খানার সময় যেন সে ব্যক্তি অন্যের সম্মুখে উলঙ্গ না হয়, তাই মাঠে-ঘাটে বা জঙ্গলে গিয়ে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে বসবে। আর বাথরুম হলে পর্দায় বসতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ পদ্ধতি অবলম্বন করতেন।
ইসলামি পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের কারণে বোধসম্পন্ন মানুষের প্রকৃতিগত অভ্যাসই এটা। পায়খানা করার সময় যদি জানতে পারে যে, আমাকে কেউ দেখে ফেলছে, তাহলে আর পূর্ণরূপে বাহ্যকর্ম সম্পন্ন হয় না। যা কখনো শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে পড়ে। অনেক মুসলমানকে জিজ্ঞেস করে জানা গেছে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে তাদেরও এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়।
একবার পাটনার এক কনফারেন্সে আমার অংশগ্রহণ করতে হয়েছিল। প্রতিনিধিগণের মধ্যে মাদ্রাজের কিছু হিন্দু ভদ্রলোকও উপস্থিত ছিল। সেখানে দেয়ালের পার্শ্বে অনেকগুলো বাথরুম বানানো ছিল। মাদ্রাজিরা পায়খানারত অবস্থায় কনফারেন্সে আলোচ্য বিষয়ের উপর আলোচনার ঝড় বইয়ে দিচ্ছে দেখে আমি হতবাক হলাম। অথচ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, বাথরুমে উলঙ্গ অবস্থায় আলাপকারীদের উপর আল্লাহ তা'আলা অসন্তুষ্ট হন।
প্রাচীন পদ্ধতির বাথরুমের পরিবর্তে অধুনা পাট, কমোড ও ফ্লাশের প্রচলন শুরু হয়ে গেছে। আফ্রিকা ও এশিয়াবাসীগণ নতুন পদ্ধতির প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। এগুলো গোসলখানার মধ্যে রাখা থাকে বা বানানো থাকে, যা দৃশ্যত খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মনে হয়।
কমোডের উপর মানুষ শরীরের নিম্ন অংশ বিছিয়ে এভাবে বসে, যেমনি বসে চেয়ারে। একজন রোগীর জন্য এ পদ্ধতি আরামদায়ক ও ফলপ্রদ হতে পারে। কিন্তু সুস্থ মানুষের শরীরে এ পন্থা নানা ধরনের অসুবিধা সৃষ্টি করে। এভাবে বসার দ্বারা শরীর পূর্ণ শান্তি অনুভব করে, যার সাথে সাথে অন্ত্রগুলোতেও বিরাম সৃষ্টি হয়, পাগুলো পূর্ণরূপে উন্মুক্ত হয় না। উরুদ্বয় বাহু যুগল ও দেহের উপরি অংশের চাপ নাড়ীর উপর পড়ে না। বিধায় নাড়ীর মুখ পূর্ণরূপে খোলে না। পায়খানাও বের হয় না।
পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার দৃষ্টিকোণ থেকে এ পদ্ধতি মোটেই পছন্দনীয় নয়। যারা নিজেদের দেহে বা পোশাকে বিন্দুমাত্র প্রস্রাব-পায়খানা লেগে থাকা পছন্দ করে না, তারা লাকড়ী বা ধাতুর একটি কাঠামোর উপর যার মধ্যে সর্বদা পায়খানা পড়তে থাকে এবং ওই উদ্দেশ্যেই তা বানানো হয়ে থাকে, তার উপর শরীর লাগিয়ে বসা কিভাবে সহ্য করতে পারে? চাই সেটা যতই ধোয়া-মোছা ও পরিচ্ছন্ন হোক না কেন।
কমোড কয়েক প্রকার হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠিত ও অপ্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্ঠিত কমোড সেখানেই কাজে লাগানো হয়, যেখানে নগরবাসী ময়লা নিষ্কাশনের বিশেষ ধরনের পাইপ স্থাপন করে থাকে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি সরবরাহ করতে পারে।
অপ্রতিষ্ঠিত কমোড ধাতুর পাইপ দ্বারা দেয়ালের উপরি অংশে লাগানো পানির হাউজের সাথে সম্পৃক্ত থাকে, যার মধ্যে একটি শিকল কমোডের উপর উপবেশনকারীর উপর ঝুলন্ত থাকে। কার্যশেষে যখন সে শিকল টান দেয়, তখন সেই হাউজ থেকে তীব্র বেগে পানি সেই পাইপ হয়ে কমোডের মধ্যে এসে পড়ে এবং সমস্ত আবর্জনা বয়ে নিয়ে যায় এবং নিচের ময়লার পাইপে নিয়ে ফেলে। হাউজটাও এমনভাবে বানানো হয় যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজে নিজেই ভরে যায়। তার মধ্যে আনুমানিক ১০/১২ সের পানি সার্বক্ষণিক থাকে। সেটা ভরে যাওয়ার পরই আবার সেখান থেকে পানি সরানো সম্ভব।
এ ধরনের কমোড ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন-প্রিয় মানুষের ক্ষেত্রে কয়েক মণ পানির প্রয়োজন পড়ে। শুষ্ক এলাকায় যেখানে মানুষের খাবারের পানি সংগ্রহ করা দুরূহ ব্যাপার, সেখানে এ ধরনের ব্যবস্থা কিভাবে করা সম্ভব? আর যদি কোনো বিত্তবান ব্যক্তি নিজের অর্থের বলে এ ব্যবস্থা করেও নেয়, তবুও তো মানব জীবনের এক অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনীয় জিনিসকে এভাবে অপচয় করা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার।
এ ধরনের কমোডে বসে পবিত্রতা অর্জন করা সকলের জন্য সম্ভব নয়। কেননা এর জন্য অধিক পরিমাণ পানির প্রয়োজন। শরীরের সংশ্লিষ্ট অঙ্গের পরিচ্ছন্নতার জন্য শুধু টয়লেট পেপারই ব্যবহার করতে হয়। কাপড়, তুলা ইত্যাদি ব্যবহার করা যায় না। কেননা তা কমোডের ভিতরে পড়লে তার নিচের পাইপ বন্ধ হয়ে যায়।
এ ধরনের কমোডে কয়েক প্রকারের অসুবিধা রয়েছে। এটা নির্মাণ করতে প্রয়োজন পড়ে হাজার হাজার টাকা। নিম্ন আয়ের লোকদের পক্ষে তা আদৌ সম্ভব নয়। তাছাড়া টয়লেট পেপারেরও ব্যবস্থা করতে হয়। সে জন্যও কিছু না কিছু ব্যয় হয়। তদুপরি কমোডের নিচের পাইপ বন্ধ হয়ে গেলে বিশেষ যন্ত্রপাতি ও কমোড পরিচ্ছন্ন বিশেষজ্ঞ এনে পরিষ্কার না করলে তা অকেজো হয়ে পড়ে। হাউজে কোনো প্রকার ত্রুটি দেখা দিলে বা পানি সরবরাহ কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে কমোড দুর্গন্ধে ভরে যায়। ছড়িয়ে পড়ে বাড়ি-ঘরেও।
দ্বিতীয় প্রকারের কমোড স্থানান্তরযোগ্য এবং তার পার্ট খুলে খুলে পরিষ্কার করা যায়। তা-ও তেমন উপকারী এবং স্বাস্থ্যসম্মত নয়। একবার ব্যবহারের পর পরিষ্কার না করে দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা যায় না। তাই হয়তো ঘরে উপযুক্ত ও যথেষ্ট পরিমাণ কমোড থাকা প্রয়োজন, নতুবা একবার ব্যবহারের পর সাথে সাথে তা পরিষ্কার করার ব্যবস্থা রাখা উচিত। এমন কমোডের সাথে প্রস্রাবের জন্য পৃথক পাত্রেরও ব্যবস্থা করতে হয়। যার জন্য যথেষ্ট অর্থের প্রয়োজন।
আফ্রিকা ও এশিয়ার কোনো কোনো দেশে এমন কমোডের প্রচলন শুরু হয়ে গেছে, যার উপর প্রাচীন পদ্ধতিতে পায়ের উপর ভর দিয়েই বসতে হয়। তার উপর ফ্লাশ করার হাউজ থাকে এবং তার উপর বসেই পানি ব্যবহার করার ব্যবস্থা রাখা হয়। তাই এটা প্রথম প্রকারের তুলনায় পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে কিছুটা উন্নত। কিন্তু এর ব্যবস্থা করতে যথেষ্ট খরচ পড়ে এবং পানির অপচয় হয়। আর হাউজ, নালা, নর্দমা এবং পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে পূর্বোক্ত অসুবিধাগুলোই সৃষ্টি হয়।
আমরা বলছি না যে, ইসলামে কমোড, ফ্লাশ বা পট ব্যবহার নিষিদ্ধ; বরং এত ব্যাপক আলোচনার উদ্দেশ্য শুধু ইসলামি নিয়ম-নীতি সম্পর্কে সচেতন করা। ইসলাম চায় এ কাজে এমন কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করা হোক, যার দ্বারা সর্বোৎকৃষ্টভাবে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা অর্জন করা যায় এবং যা কারও জন্য কষ্টসাধ্য না হয়।
পশ্চিম আফ্রিকার প্রসিদ্ধ ইংরেজি পত্রিকা "গিনী টাইমস” পত্রিকার বিশেষ প্রবন্ধকার পিন ফোর্ডের একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। সে প্রবন্ধে লেখক বলেন, ইসলামের সৌন্দর্য তার নিজ স্থানে স্বীকৃত ও প্রশংসনীয়, কিন্তু সেখানে এ কেমন পরিচ্ছন্ন ও ঘৃণিত পন্থা রাখা হয়েছে যে, টয়লেট পেপারের পরিবর্তে পানি দ্বারা শৌচকার্য করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মি. পিনফোর্ড নিজের পক্ষ থেকে ইসলামের উপর নগ্ন সমালোচনায় মেতে উঠে ওই সমস্ত এলাকায় তাদের সংস্কৃতির প্রাধান্য প্রকাশের চেষ্টা করেছেন।
আমাদের উপরিউক্ত প্রামাণ্য আলোচনার ভিত্তিতে এ সমালোচনার কোনোই গুরুত্ব নেই। তাছাড়া ইউরোপীয় সংস্কৃতির ও সভ্যতার অধঃপতনের সুস্পষ্ট প্রমাণাদি প্রকাশিত হওয়ার পরে ইসলামের উপর নির্লজ্জ আক্রমণ নিমজ্জিত ব্যক্তির তৃণলতার সাহায্য গ্রহণ বৈ কিছু নয়।
কিন্তু ওই এলাকারই লেপ্স শহরের সি, এ, এস, গ্রামার স্কুলের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল মি. কে, ই, আইওয়ানজ, বি এস, সি, (লন্ডন) স্বরচিত "ট্রপিক্যাল হাইজিন” গ্রন্থে লিখেছেন, “শৌচকার্যের সময় পেপারের পরিবর্তে পানি ব্যবহার অতি উত্তম। যে সমস্ত ইউরোপীয়ান প্রাচ্য দেশসমূহে গিয়ে বসবাস শুরু করছে, তারা ব্যাপক হারে পানি ব্যবহারের পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। যারা এ পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, তাদের এটা পরিত্যাগ করা উচিত নয়। শৌচকার্যের সময় কাগজ ব্যবহার করুক বা পানি ব্যবহার করুক, উভয় পদ্ধতিতেই শৌচকার্যের পর সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধৌত করে নেওয়া অত্যাবশ্যক।”
আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি, পেপার ব্যবহার করার পর পানি দ্বারা শৌচকার্য করা ব্যতীতই গোসলের জন্য চলে যাওয়া একজন নামাযী মুসলমানের জন্য খুবই অপছন্দনীয়। কেননা প্রস্রাব করার পরও পানি দ্বারা সংশ্লিষ্ট অঙ্গকে ধৌত করে তা পবিত্র করা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। আর একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পরিচ্ছন্নতা কাপড় দ্বারা করুক বা পেপার দ্বারা করুক, শরীরের ওই অঙ্গে কিছু না কিছু নাপাকীর অংশ অবশিষ্ট থেকেই যায়, যা একমাত্র পানি দ্বারাই পরিষ্কার হতে পারে। আর একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, দুনিয়ার কোনো জিনিসই পানির চেয়ে বেশি সহজলভ্য ও দ্রুত কার্যকরী নয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রস্রাব সংক্রান্ত আরও আকর্ষণীয় নীতিমালা প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, তোমাদের মধ্য হতে যদি কেউ প্রস্রাব করতে চায়, তা হলে সে যেন উপযুক্ত স্থান তালাশ করে নেয়। অর্থাৎ এমন জায়গা বেছে নেয়, যেখানে প্রস্রাবের ছিঁটা এসে কাপড় ও গায়ে না লাগে। জায়গাটা যেন পূর্ব থেকেই কলুষিত না হয়, যা হতে রোগ-জীবাণু এসে আক্রান্ত করতে পারে কিংবা যেখান থেকে প্রস্রাব প্রবাহিত হয়ে নিজের দিকেই চলে আসে। তিনি আরও বলেছেন, তোমরা কেউ দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করো না। দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার অনেকগুলো অসুবিধা রয়েছে। প্রথমত এটা ছেলেমী কাজ। দ্বিতীয়ত কাপড় ও শরীরে ছিঁটা এসে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তৃতীয়ত পবিত্রতা অর্জনে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। অথচ পবিত্রতা ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু প্রয়োজনবশত এমন স্থানে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা যেতে পারে, যেখান থেকে ছিঁটা এসে শরীরে লাগার সম্ভাবনা না থাকে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কোনো গর্তের মধ্যে প্রস্রাব করা উচিত নয়। এর কারণ স্পষ্ট। কখনো গর্তের মধ্যে কোনো বিষাক্ত প্রাণী থাকতে পারে। গর্তের ভিতরে পানি প্রবেশ করলে সেটি বাইরে বেরিয়ে এসে প্রস্রাবকারী ব্যক্তিকে দংশন করার সম্ভাবনা আছে। প্রস্রাব-পায়খানার পর পবিত্রতা অর্জনের প্রভাব স্বাস্থ্যের উপর পড়ে। অবিবাহিত যুবকরা সাধারণত স্বপ্নদোষের শিকার হয়ে থাকে। কেউ তো স্বপ্নদোষের আধিক্যের কারণে স্বাস্থ্য বিনষ্ট করে বসে। একবার জনৈক যুবক হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট স্বপ্নদোষের অভিযোগ করলে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “শোয়ার পূর্বে নিজের গুপ্তাঙ্গ ধৌত করে নিবে”।
গুপ্তাঙ্গ ধৌত করতে গেলে প্রস্রাবও এসে পড়বে। সুতরাং প্রস্রাব করা ও গুপ্তাঙ্গ ধোয়া এ দুটি কাজ স্বপ্নদোষ বন্ধের জন্য খুবই উপকারী। কেননা প্রস্রাব করা দ্বারা মূত্রথলী খালি হয়ে যায় আর ধমনীসমূহ পানি দ্বারা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। প্রস্রাব-পায়খানারত অবস্থায় কাউকে উক্ত কাজ থেকে বাধা প্রদান করা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। একবার এক গ্রাম্য ব্যক্তি মদীনায় এসে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেই প্রস্রাব করতে বসে গেল। সাহাবীগণ এ দৃশ্য অবলোকন করে চিৎকার শুরু করে দিলেন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে নিষেধ করে বললেন, আপাতত তাকে ফারেগ হতে দাও। পরে এক বালতি পানি এনে তার উপর ঢেলে দিলেন।