📄 রোযা সুস্বাস্থ্যের এক নযিরবিহীন পদ্ধতি
আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি প্রাণীর শরীরের জন্য বিশেষ এক নিয়ম-নীতি দান করেছেন। সুতরাং যখন সে নিয়মিত খাদ্য ও পানীয় পরিমাণ মতো না পায়, তখন তার জীবিত থাকা মুশকিল হয়ে যায়। যে দিক থেকে তার খাদ্যে অনিয়ম দেখা দিবে, সে দিক থেকেই তার স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব পড়বে। অন্যান্য প্রাণী নিজের খাদ্য নিজেদের অনুভূতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু মানবজাতি আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা ও জ্ঞান সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য প্রাণীর বিপরীতে প্রায়ই সাধারণ নিয়মের সীমা অতিক্রম করে যায় এবং নিজের শারীরিক শৃঙ্খলা নষ্ট করে দিয়ে নিজেই বিভিন্ন রোগ সৃষ্টির কারণ হয়। তাই অন্যান্য প্রাণীর রোগ-ব্যাধির সাথে মানুষের রোগ-ব্যাধির কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু তার খোদা প্রদত্ত জ্ঞান দ্বারা বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে অথবা ঔষধ সেবনের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা করে থাকে বরং বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের উপায় হিসেবে এ পর্যন্ত যা তারা নির্ধারণ করেছে, তা হল, কখনো কখনো কিছু সময়ের জন্য পানাহার বন্ধ রেখে পাকস্থলী খালি রাখতে হবে। আর পাকস্থলীর উপরই শারীরিক সুস্থতা নির্ভর করে।
দুনিয়ার প্রায় সকল ধর্ম ও শরী'অত তার অনুসারীদের জন্য এ পদ্ধতিই নির্ধারণ করছে। একে ধর্মীয় পরিভাষায় রোযা বলে। হিন্দুরাও ২৪ ঘণ্টার ব্রত বা রোযা পালন করে। তারা ব্রতকালে শস্য অথবা আগুনে রান্না করা কোনো জিনিস খায় না। অবশ্য কাঁচা দুগ্ধ, পানি, হুক্কা ইত্যাদি পান করায় তাদের রোযার কোনো ক্ষতি হয় না। বর্তমান যুগের খ্রিস্টানগণ তো শুধু মাছ-গোশত অথবা আরো দু'একটা জিনিস পরিহার করে বাকি সব জিনিস পানাহার করেও একে রোযা বলে সাব্যস্ত করে। এমনিভাবে ইহুদিদের রোযায়ও কয়েকটি জিনিস আছে, যেগুলি রোযার মধ্যে খাওয়া নিষিদ্ধ নয়।
ইসলামি শরী'আতের বিধান অনুযায়ী একাধারে পূর্ণ এক চন্দ্রমাস রোযা রাখতে হয়। চন্দ্রমাস ও সৌরমাসে বছরে দশ দিনের পার্থক্য হয়। তাই ছত্রিশ বছরে শীত ও গরম উভয় মৌসুমেই রোযা এসে যায়। এমনিভাবে প্রায় পঞ্চাশ বা তদূর্ধ্ব বয়সী মুসলমান উভয় মৌসুমে রোযা রাখার অভিজ্ঞতা অর্জন করে।
রমাযানের রোযা প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্ক সাবালক ব্যক্তির উপর ফরয। এছাড়া অন্যান্য রোযাও মনে চাইলে রাখতে পারে। এ রোযাকে নফল রোযা বলে। ইসলামি রোযার সময় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এবং এ সময়ে সর্বপ্রকার পানাহার, স্ত্রীসহবাস তথা সহবাসের ভূমিকা স্বরূপ কাজগুলোও নিষিদ্ধ। পান, বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা এবং নস্যি ইত্যাদি হতে বিরত থাকা জরুরি। এ জাতীয় কোনো জিনিস ব্যবহার করলে রোযা ভেঙে যায়।
রোযাই নিজেকে কন্ট্রোল করার এক নজির বিহীন দৃষ্টান্ত ও মাধ্যম। উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা যখন প্রথম গরমের মৌসুমে রোযা রাখে, তখন তাদের জন্য পিপাসা সহ্য করাও বিরাট সাহসিকতার পরিচয়। ওযু করার সময় যখন কুলি করে, তখন এক ফোটা পানিও গলা থেকে নিচে নামতে দেয় না। বিশেষত গোসল খানায় যখন তাকে কেউ দেখতে পায় না, তখনও পানি পান থেকে বিরত থাকা একটি আশ্চর্যজনক বিষয়।
আত্মিক ও চারিত্রিক উপকারিতা ছাড়াও ইসলামি রোযা ভাইরাস রোগ ও শরীরের দূষিত পদার্থের জন্য সাবানের কাজ করে। নিজের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করার শক্তি সঞ্চার করে। আর ইফতারের সময় একজন রোযাদার যেরূপ খাওয়া দাওয়ার আনন্দ উপভোগ করে, তা বলে শেষ করা যাবে না।
বর্তমান যুগের ডাক্তার ও চিকিৎসকগণ ইসলামি পদ্ধতির রোযার মাধ্যমে সুস্বাস্থ্য এবং এ রোযার উপকারিতার কথা স্বীকার করেছেন বরং কোনো কোনো রোগের জন্য ঔষধ হিসেবেও ইসলামি পদ্ধতির রোযা রাখার সুপরামর্শ দান করেছেন।
এ ব্যাপারে আরও স্মরণে রাখতে হবে, ইসলাম কারও উপর তার ক্ষমতার বেশি বোঝা চাপানোর পক্ষপাতি নয়। সুস্থ থাকা অবস্থায় কোনও গর্ভবতী ও স্তন্যদায়িনী নারীর উপর রোযা ফরয নয়। কেননা এ অবস্থায় সুস্থতা বিনষ্ট হয়। অবশ্য এ থেকে সে সকল রোগ বাদ থাকবে, যেগুলির মধ্যে চিকিৎসক রোযাকেই ঔষধ হিসেবে নির্ধারণ করেন। এমনিভাবে একাধারে প্রতিদিন সারা বছর রোযা রাখাও নিষিদ্ধ। কারণ, এতে স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়।
📄 একটি প্রশ্ন
এক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতগণ একটি প্রশ্ন করে থাকেন। সেটি হল, উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু যেখানে দিন হয় ছয় মাসে এবং রাত হয় ছয় মাসে অর্থাৎ তাদের একদিন আমাদের এক বছরের সমান হয়। সেখানে তো কুরআনে বর্ণিত সময় অনুযায়ী অর্থাৎ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযা রাখা একজন মানুষের শক্তির বাইরে এবং অসম্ভব কাজ নয় কি? এ প্রশ্নের জবাব হল, আমরা প্রথমেই বলেছি, ইসলাম কারও উপর তার সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপানোর পক্ষপাতি নয়। দ্বিতীয়ত সেখানকার বাসিন্দাগণ যেভাবে কাজকর্ম, শোয়া, খাওয়ার জন্য সময় নির্ধারণ করে থাকে, তেমনিভাবে নামায পড়া ও রোযা রাখার সময়ও নির্ধারণ করতে পারে।
যেমন একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ইয়াজুজ-মাজুজের সময় একদিন এক বছরের সমান হবে। তখন সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেন, তখন কি আমাদের একদিনের নামাযই যথেষ্ট হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- না, সময়ের অনুমান করে নিরে।