📄 কর্মপদ্ধতি ও মাধ্যম
উক্ত গ্রুপে (একজন গর্ভবতী মহিলা ব্যতীত) তিনজন যথাক্রমে ১৭, ২৭ ও ৪০ বছর বয়স্কা মহিলাও ছিল। গ্রুপের পুরুষদের বয়সকাল ২২ থেকে ২৯ বছর পর্যন্ত ছিল (গড়ে ৩৩)। তাদের দৈনন্দিন সাধারণ খাবারের পরিমাণ আড়াই থেকে তিন হাজার ক্যালরী নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কোনো প্রকার দৈহিক অসুস্থতা বা সংক্রামক ব্যাধি ছিল না। রমাযানের এক সপ্তাহ পূর্বে সকলেরই ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নেওয়া হয়েছিল। যেন পরবর্তী অবস্থার মোকাবেলা করা যেতে পারে। তখন পরীক্ষার উদ্দেশ্যে প্রস্রাব ও রক্তের পর্যবেক্ষণের জন্য নাস্তার পূর্বে খালি পেটে কিছু পদার্থ গ্রহণ করা হয়েছিল। তেমনিভাবে রোযার সময়ও সেই পদার্থগুলি গ্রহণ করা হয়েছিল ইফতারের সময় শুধু এক ঢোক পানি দ্বারা ইফতার করার পর।
📄 ফলাফল
ওযনের সংক্ষিপ্ত হিসাব ছিল নিম্নরূপ। তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রোযা রাখে নি তার ওজনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসে নি। কেননা সাধারণ অবস্থাতেও দেহের ওজন সাধারণত কমবেশি হয়েই থাকে। এখানে আমরা ওই ব্যক্তির পরিবর্তন “না” দ্বারা স্পষ্ট করে দিচ্ছি।
ওজন পাউণ্ড:
- বে-রোযাদার: রমাযানের পূর্বে ১৪২, ১লা রমাযান ১৪০, ১০ই রমাযান ১৪০, শেষ রমাযান ১৪২, ৪ সপ্তাহ পর ১৪২।
- রোযা পালনকারীদের গড়: রমাযানের পূর্বে ১২২, ১লা রমাযান ১২২, ১০ই রমাযান ১২১, শেষ রমাযান ১১৯, ৪ সপ্তাহ পর ১২১।
- গর্ভবতী মহিলা: রমাযানের পূর্বে ১০৬, ১লা রমাযান ১০৬, ১০ই রমাযান ১০৮, শেষ রমাযান ১১০, ৪ সপ্তাহ পর ১১৭।
(উল্লেখ্য যে, গর্ভাবস্থায় স্বভাবতই ওজন বৃদ্ধি পায়।) উপরে রোযাদারের ওজনের গড় বর্ণনা করা হল। কিন্তু এখানে ২ জনের ওজন ৭ পাউণ্ড কম হয়ে যায়। একজনের ওজনে কোনো পরিবর্তন হয় নি। আর গর্ভবতী মহিলার ওজন রমাযানের মধ্যে চার পাউণ্ড বৃদ্ধি পাওয়া যায়। ৭ ব্যক্তির ওজন ৪ সপ্তাহ পর পূর্বের মতোই থেকে যায়।
ধমনী এবং তাপমাত্রায় রোযার কোনো প্রভাব পড়ে নি। আর রক্তের মধ্যে হিমোগ্লোবিন এর পরিমাণ রমাযানের মধ্যে পূর্বের অবস্থায় বহাল থাকে। তেমনিভাবে সমষ্টিগতভাবে রক্তের চাপে কোনো পরিবর্তন সাধিত হয় নি। রমাযানের মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় নি। গর্ভবতী মহিলার মধ্যে একটু বেশি পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে। তার কারণ ছিল গর্ভধারণ।
ওজন পাউণ্ড তালিকা:
না (বে-রোযাদার): রমাযানের পূর্বে ৯২, ১লা রমাযান ৮৭, ১০ই রমাযান ৯০, শেষ রমাযান ৮৮, রমাযানে পর ৯৩।
রোযাদার গ্রুপ: রমাযানের পূর্বে ৮৪, ১লা রমাযান ৮০, ১০ই রমাযান ৮০, শেষ রমাযান ৭৪, রমাযানে পর ৭৬।
গর্ভবতী মহিলা: রমাযানের পূর্বে ৮৮, ১লা রমাযান ৮৪, ১০ই রমাযান ৭২, শেষ রমাযান ৬৯, রমাযানে পর ৮১।
খাদ্যের সুগার কোনো ব্যক্তির সর্বনিম্ন সাধারণ পরিমাণের (৭০ মি. গ্রা.) চেয়ে নিচে নামে নি। তাছাড়া রক্তের রাসায়নিক উপাদান পূর্ণ রমাযানে স্বাভাবিকই ছিল। তন্মধ্যে কোনো প্রকার পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় নি।
📄 দেহের আর্দ্রতা ও প্রস্রাব নির্গত হওয়া
উক্ত গ্রুপের লোকেরা সাধারণত রোযা অবস্থায় ২৪ ঘণ্টায় পানি অন্য সময়ের মতোই ব্যবহার করেছে। আর প্রস্রাবের পরিমাণ কয়েকজনের মধ্যে কম ছিল এবং বাকীদের মধ্যে সমষ্টিগতভাবে স্বাভাবিক ছিল। উল্লেখ্য যে, বে-রোযাদারদের মধ্যেও কখনো কখনো প্রস্রাব পরিমাণে কম হতে দেখা যায়। তাই হয়তো প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিক কারণেই কমে গিয়েছে।
প্রস্রাবের ঘনত্বের (Specific Gravity) মধ্যে কোনো প্রকার পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় নি। এ অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝা যায়, রোযা রাখার কারণে শরীরে যদি কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, তবে তা কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। রমাযানে মূত্রথলীর কার্যাবলী স্বাভাবিকই ছিল। যেমনটি পূর্বেও বলা হয়েছে। তবে এক সমীক্ষায় দেখা যায়, কয়েকটা রোযা রাখার পর কিছু লোকের ওজন হ্রাস পেয়েছিল এবং ব্লাডে সুগারের পরিমাণও কমে গিয়েছিল। তবে এ পরিবর্তন স্বাভাবিক সীমানার চাইতে নিচে যায় নি। ব্লাডে সুগারের পরিমাণ বিশেষত তখনি হ্রাস পায়, যখন দিনের বড় অংশ অতিবাহিত হয়ে যায়।
প্রকাশ থাকে যে, এ সমীক্ষা চালানো হয়েছিল এমন লোকদের উপর, যারা শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন। কাজেই কিডনীসহ অন্যান্য ব্যাধিগ্রস্থ লোকদের ব্যাপারেও একই রিপোর্ট পাওয়া যাবে - এরূপ মনে করা ঠিক নয়।
দিনের কিছু অংশ অতিবাহিত হয়ে গেলে কাজ-কর্মে তেমন একটা উৎসাহ অনুভূত হয় না। অনেকে মন্তব্য করেছেন, সম্ভবত এর কারণ ব্লাডে সুগারের পরিমাণ হ্রাস পাওয়া। কেননা ইফতার করার পর এ অবস্থা অল্পক্ষণের মধ্যেই দূর হয়ে যায়।
📄 রোযা সুস্বাস্থ্যের এক নযিরবিহীন পদ্ধতি
আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি প্রাণীর শরীরের জন্য বিশেষ এক নিয়ম-নীতি দান করেছেন। সুতরাং যখন সে নিয়মিত খাদ্য ও পানীয় পরিমাণ মতো না পায়, তখন তার জীবিত থাকা মুশকিল হয়ে যায়। যে দিক থেকে তার খাদ্যে অনিয়ম দেখা দিবে, সে দিক থেকেই তার স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব পড়বে। অন্যান্য প্রাণী নিজের খাদ্য নিজেদের অনুভূতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু মানবজাতি আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা ও জ্ঞান সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য প্রাণীর বিপরীতে প্রায়ই সাধারণ নিয়মের সীমা অতিক্রম করে যায় এবং নিজের শারীরিক শৃঙ্খলা নষ্ট করে দিয়ে নিজেই বিভিন্ন রোগ সৃষ্টির কারণ হয়। তাই অন্যান্য প্রাণীর রোগ-ব্যাধির সাথে মানুষের রোগ-ব্যাধির কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু তার খোদা প্রদত্ত জ্ঞান দ্বারা বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে অথবা ঔষধ সেবনের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা করে থাকে বরং বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের উপায় হিসেবে এ পর্যন্ত যা তারা নির্ধারণ করেছে, তা হল, কখনো কখনো কিছু সময়ের জন্য পানাহার বন্ধ রেখে পাকস্থলী খালি রাখতে হবে। আর পাকস্থলীর উপরই শারীরিক সুস্থতা নির্ভর করে।
দুনিয়ার প্রায় সকল ধর্ম ও শরী'অত তার অনুসারীদের জন্য এ পদ্ধতিই নির্ধারণ করছে। একে ধর্মীয় পরিভাষায় রোযা বলে। হিন্দুরাও ২৪ ঘণ্টার ব্রত বা রোযা পালন করে। তারা ব্রতকালে শস্য অথবা আগুনে রান্না করা কোনো জিনিস খায় না। অবশ্য কাঁচা দুগ্ধ, পানি, হুক্কা ইত্যাদি পান করায় তাদের রোযার কোনো ক্ষতি হয় না। বর্তমান যুগের খ্রিস্টানগণ তো শুধু মাছ-গোশত অথবা আরো দু'একটা জিনিস পরিহার করে বাকি সব জিনিস পানাহার করেও একে রোযা বলে সাব্যস্ত করে। এমনিভাবে ইহুদিদের রোযায়ও কয়েকটি জিনিস আছে, যেগুলি রোযার মধ্যে খাওয়া নিষিদ্ধ নয়।
ইসলামি শরী'আতের বিধান অনুযায়ী একাধারে পূর্ণ এক চন্দ্রমাস রোযা রাখতে হয়। চন্দ্রমাস ও সৌরমাসে বছরে দশ দিনের পার্থক্য হয়। তাই ছত্রিশ বছরে শীত ও গরম উভয় মৌসুমেই রোযা এসে যায়। এমনিভাবে প্রায় পঞ্চাশ বা তদূর্ধ্ব বয়সী মুসলমান উভয় মৌসুমে রোযা রাখার অভিজ্ঞতা অর্জন করে।
রমাযানের রোযা প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্ক সাবালক ব্যক্তির উপর ফরয। এছাড়া অন্যান্য রোযাও মনে চাইলে রাখতে পারে। এ রোযাকে নফল রোযা বলে। ইসলামি রোযার সময় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এবং এ সময়ে সর্বপ্রকার পানাহার, স্ত্রীসহবাস তথা সহবাসের ভূমিকা স্বরূপ কাজগুলোও নিষিদ্ধ। পান, বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা এবং নস্যি ইত্যাদি হতে বিরত থাকা জরুরি। এ জাতীয় কোনো জিনিস ব্যবহার করলে রোযা ভেঙে যায়।
রোযাই নিজেকে কন্ট্রোল করার এক নজির বিহীন দৃষ্টান্ত ও মাধ্যম। উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা যখন প্রথম গরমের মৌসুমে রোযা রাখে, তখন তাদের জন্য পিপাসা সহ্য করাও বিরাট সাহসিকতার পরিচয়। ওযু করার সময় যখন কুলি করে, তখন এক ফোটা পানিও গলা থেকে নিচে নামতে দেয় না। বিশেষত গোসল খানায় যখন তাকে কেউ দেখতে পায় না, তখনও পানি পান থেকে বিরত থাকা একটি আশ্চর্যজনক বিষয়।
আত্মিক ও চারিত্রিক উপকারিতা ছাড়াও ইসলামি রোযা ভাইরাস রোগ ও শরীরের দূষিত পদার্থের জন্য সাবানের কাজ করে। নিজের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করার শক্তি সঞ্চার করে। আর ইফতারের সময় একজন রোযাদার যেরূপ খাওয়া দাওয়ার আনন্দ উপভোগ করে, তা বলে শেষ করা যাবে না।
বর্তমান যুগের ডাক্তার ও চিকিৎসকগণ ইসলামি পদ্ধতির রোযার মাধ্যমে সুস্বাস্থ্য এবং এ রোযার উপকারিতার কথা স্বীকার করেছেন বরং কোনো কোনো রোগের জন্য ঔষধ হিসেবেও ইসলামি পদ্ধতির রোযা রাখার সুপরামর্শ দান করেছেন।
এ ব্যাপারে আরও স্মরণে রাখতে হবে, ইসলাম কারও উপর তার ক্ষমতার বেশি বোঝা চাপানোর পক্ষপাতি নয়। সুস্থ থাকা অবস্থায় কোনও গর্ভবতী ও স্তন্যদায়িনী নারীর উপর রোযা ফরয নয়। কেননা এ অবস্থায় সুস্থতা বিনষ্ট হয়। অবশ্য এ থেকে সে সকল রোগ বাদ থাকবে, যেগুলির মধ্যে চিকিৎসক রোযাকেই ঔষধ হিসেবে নির্ধারণ করেন। এমনিভাবে একাধারে প্রতিদিন সারা বছর রোযা রাখাও নিষিদ্ধ। কারণ, এতে স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়।