📄 অভিজ্ঞতার আলোকে মানবদেহে রোযার প্রভাব
মৌসুম ও ভৌগোলিক অবস্থানের বিভিন্নতার কারণে রোযার সময়কাল ১২ থেকে ১৯ ঘণ্টা পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং রাত্রের দীর্ঘতা অনুপাতে সাধারণত এক থেকে দুইবার (ইফতারের পর সাহরীর পূর্বে) খাবার খাওয়া হয়ে থাকে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে একথা পূর্ণ আস্থার সাথে বলা সম্ভব নয় যে, দেহের উপর রোযার কি প্রভাব পড়ে এবং কিভাবে পড়ে ? কিছু সংখ্যক লোকের ধারণা মতে রোযায় দৈহিক কর্মক্ষমতা হ্রাস ও শারীরিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে না। কেননা রোযা রাখার দ্বারা কেবল দুই খাবারের মধ্যবর্তী সময়কাল সাধারণ সময়ের তুলনায় একটু বেশি হয়ে যায়। বস্তুত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমষ্টিগতভাবে এ পরিমাণ তাপ বা আহার্য এবং পানীয় শরীরে অর্জিত হয়, যা রমাযান ব্যতীত অন্য মাসে অর্জিত হয় না। তদুপরি সুস্পষ্টত, রমাযান মাসে মানুষেরা প্রোটিন জাতীয় খাদ্য এবং উত্তেজক দ্রব্য সাধারণ দিনের তুলনায় বেশিই ব্যবহার করে থাকে। এ অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, সমষ্টিগত আহার্য অন্য সময়ের তুলনায় রোযার মাসে দেহে অধিক পরিমাণে অর্জিত হয়।
স্বকীয়ভাবে এসব ভিন্ন মতাদর্শের সত্যতা ও অসত্যতা প্রমাণ করা বা তাদের সম্পর্কে কোন সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ব্যাপারে রোযাদারদের দেহের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এতৎসংক্রান্ত ১৩ জন সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়েছিল। তন্মধ্যে একজন গর্ভবতী (৬ মাসের) মহিলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আবার ২৭ বছর বয়স্ক একজন বে-রোযাদার পুরুষও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এভাবে ১৪ জনের উপর সমীক্ষা চালানো হল। পর্যবেক্ষণকালীন সময়ে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলিকে বিস্তারিতভাবে রেকর্ড করা হয়েছে:
(১) ওজন বা পরিমাণ, (২) দৈহিক উচ্চতা (৩) শিরা ও ধমনী, (৪) রক্তচাপ, (৫) বি.এম.পি (৬) দৈহিক প্রবহমান তরল পদার্থ, (৭) রক্ত ও প্রস্রাবের রাসায়নিক বিশ্লেষণ।
📄 কর্মপদ্ধতি ও মাধ্যম
উক্ত গ্রুপে (একজন গর্ভবতী মহিলা ব্যতীত) তিনজন যথাক্রমে ১৭, ২৭ ও ৪০ বছর বয়স্কা মহিলাও ছিল। গ্রুপের পুরুষদের বয়সকাল ২২ থেকে ২৯ বছর পর্যন্ত ছিল (গড়ে ৩৩)। তাদের দৈনন্দিন সাধারণ খাবারের পরিমাণ আড়াই থেকে তিন হাজার ক্যালরী নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কোনো প্রকার দৈহিক অসুস্থতা বা সংক্রামক ব্যাধি ছিল না। রমাযানের এক সপ্তাহ পূর্বে সকলেরই ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নেওয়া হয়েছিল। যেন পরবর্তী অবস্থার মোকাবেলা করা যেতে পারে। তখন পরীক্ষার উদ্দেশ্যে প্রস্রাব ও রক্তের পর্যবেক্ষণের জন্য নাস্তার পূর্বে খালি পেটে কিছু পদার্থ গ্রহণ করা হয়েছিল। তেমনিভাবে রোযার সময়ও সেই পদার্থগুলি গ্রহণ করা হয়েছিল ইফতারের সময় শুধু এক ঢোক পানি দ্বারা ইফতার করার পর।
📄 ফলাফল
ওযনের সংক্ষিপ্ত হিসাব ছিল নিম্নরূপ। তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রোযা রাখে নি তার ওজনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসে নি। কেননা সাধারণ অবস্থাতেও দেহের ওজন সাধারণত কমবেশি হয়েই থাকে। এখানে আমরা ওই ব্যক্তির পরিবর্তন “না” দ্বারা স্পষ্ট করে দিচ্ছি।
ওজন পাউণ্ড:
- বে-রোযাদার: রমাযানের পূর্বে ১৪২, ১লা রমাযান ১৪০, ১০ই রমাযান ১৪০, শেষ রমাযান ১৪২, ৪ সপ্তাহ পর ১৪২।
- রোযা পালনকারীদের গড়: রমাযানের পূর্বে ১২২, ১লা রমাযান ১২২, ১০ই রমাযান ১২১, শেষ রমাযান ১১৯, ৪ সপ্তাহ পর ১২১।
- গর্ভবতী মহিলা: রমাযানের পূর্বে ১০৬, ১লা রমাযান ১০৬, ১০ই রমাযান ১০৮, শেষ রমাযান ১১০, ৪ সপ্তাহ পর ১১৭।
(উল্লেখ্য যে, গর্ভাবস্থায় স্বভাবতই ওজন বৃদ্ধি পায়।) উপরে রোযাদারের ওজনের গড় বর্ণনা করা হল। কিন্তু এখানে ২ জনের ওজন ৭ পাউণ্ড কম হয়ে যায়। একজনের ওজনে কোনো পরিবর্তন হয় নি। আর গর্ভবতী মহিলার ওজন রমাযানের মধ্যে চার পাউণ্ড বৃদ্ধি পাওয়া যায়। ৭ ব্যক্তির ওজন ৪ সপ্তাহ পর পূর্বের মতোই থেকে যায়।
ধমনী এবং তাপমাত্রায় রোযার কোনো প্রভাব পড়ে নি। আর রক্তের মধ্যে হিমোগ্লোবিন এর পরিমাণ রমাযানের মধ্যে পূর্বের অবস্থায় বহাল থাকে। তেমনিভাবে সমষ্টিগতভাবে রক্তের চাপে কোনো পরিবর্তন সাধিত হয় নি। রমাযানের মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় নি। গর্ভবতী মহিলার মধ্যে একটু বেশি পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে। তার কারণ ছিল গর্ভধারণ।
ওজন পাউণ্ড তালিকা:
না (বে-রোযাদার): রমাযানের পূর্বে ৯২, ১লা রমাযান ৮৭, ১০ই রমাযান ৯০, শেষ রমাযান ৮৮, রমাযানে পর ৯৩।
রোযাদার গ্রুপ: রমাযানের পূর্বে ৮৪, ১লা রমাযান ৮০, ১০ই রমাযান ৮০, শেষ রমাযান ৭৪, রমাযানে পর ৭৬।
গর্ভবতী মহিলা: রমাযানের পূর্বে ৮৮, ১লা রমাযান ৮৪, ১০ই রমাযান ৭২, শেষ রমাযান ৬৯, রমাযানে পর ৮১।
খাদ্যের সুগার কোনো ব্যক্তির সর্বনিম্ন সাধারণ পরিমাণের (৭০ মি. গ্রা.) চেয়ে নিচে নামে নি। তাছাড়া রক্তের রাসায়নিক উপাদান পূর্ণ রমাযানে স্বাভাবিকই ছিল। তন্মধ্যে কোনো প্রকার পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় নি।
📄 দেহের আর্দ্রতা ও প্রস্রাব নির্গত হওয়া
উক্ত গ্রুপের লোকেরা সাধারণত রোযা অবস্থায় ২৪ ঘণ্টায় পানি অন্য সময়ের মতোই ব্যবহার করেছে। আর প্রস্রাবের পরিমাণ কয়েকজনের মধ্যে কম ছিল এবং বাকীদের মধ্যে সমষ্টিগতভাবে স্বাভাবিক ছিল। উল্লেখ্য যে, বে-রোযাদারদের মধ্যেও কখনো কখনো প্রস্রাব পরিমাণে কম হতে দেখা যায়। তাই হয়তো প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিক কারণেই কমে গিয়েছে।
প্রস্রাবের ঘনত্বের (Specific Gravity) মধ্যে কোনো প্রকার পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় নি। এ অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝা যায়, রোযা রাখার কারণে শরীরে যদি কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, তবে তা কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। রমাযানে মূত্রথলীর কার্যাবলী স্বাভাবিকই ছিল। যেমনটি পূর্বেও বলা হয়েছে। তবে এক সমীক্ষায় দেখা যায়, কয়েকটা রোযা রাখার পর কিছু লোকের ওজন হ্রাস পেয়েছিল এবং ব্লাডে সুগারের পরিমাণও কমে গিয়েছিল। তবে এ পরিবর্তন স্বাভাবিক সীমানার চাইতে নিচে যায় নি। ব্লাডে সুগারের পরিমাণ বিশেষত তখনি হ্রাস পায়, যখন দিনের বড় অংশ অতিবাহিত হয়ে যায়।
প্রকাশ থাকে যে, এ সমীক্ষা চালানো হয়েছিল এমন লোকদের উপর, যারা শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন। কাজেই কিডনীসহ অন্যান্য ব্যাধিগ্রস্থ লোকদের ব্যাপারেও একই রিপোর্ট পাওয়া যাবে - এরূপ মনে করা ঠিক নয়।
দিনের কিছু অংশ অতিবাহিত হয়ে গেলে কাজ-কর্মে তেমন একটা উৎসাহ অনুভূত হয় না। অনেকে মন্তব্য করেছেন, সম্ভবত এর কারণ ব্লাডে সুগারের পরিমাণ হ্রাস পাওয়া। কেননা ইফতার করার পর এ অবস্থা অল্পক্ষণের মধ্যেই দূর হয়ে যায়।