📄 রোযার দ্বারা রক্তের পরিচ্ছন্নতা
হাড়ের মজ্জার মধ্যে রক্ত তৈরি হয়। শরীরে যখন রক্তের প্রয়োজন পড়ে, তখন একপ্রকার স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি হাড়ের মজ্জাকে আন্দোলিত করে তোলে আর দুর্বল লোকদের জন্য এটা বিশেষভাবে অলস অবস্থায় কাজ করে। যার কারণে বিষণ্ণ ও ফ্যাকাশে চেহারার শোভা দিনে দিনে বর্ধিত হতে থাকে। রোযা রাখাকালীন সময়ে যখন রক্তের মধ্যে খাদ্যের পদার্থ সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছে যায়, তখন হাড়ের মজ্জা আন্দোলিত হতে থাকে। এভাবে একজন দুর্বল লোক রোযা রাখার দ্বারা সহজেই নিজের দেহে রক্ত বৃদ্ধি করে নিতে পারে।
মোটকথা, যে ব্যক্তি রক্ত দূষণজনিত মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত রয়েছে, তার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হতেই হবে, তবে রোযা রাখাকালীন সময়ে যেহেতু কিডনী স্বস্তি ও শান্তিতে থাকতে পারে, তাই তা হাড়ের মজ্জার জন্য প্রয়োজনীয় পদার্থ সরবরাহ করতে পারে। যার দ্বারা অতি সহজেই আরও অধিক পরিমাণে রক্ত সৃষ্টি হতে পারে। এভাবে রোযার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক প্রকারের প্রাণসমৃদ্ধ পদার্থের উসিলায় একজন শীর্ণকায় মানুষ নিজের ওজন বৃদ্ধি এবং মোটা মানুষ তার দেহের স্থুলতা হ্রাস করে নিতে পারে।
সম্মানিত পাঠক! এবার আসুন আমরা কুরআনুল কারীমের সূরা বাকারা ১৮৪নং আয়াতের শেষাংশটি পুনরায় স্মরণ করি এবং তার মুজেযা দ্বারা নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান করি যে, তোমাদের জন্য তোমরা রোযা রাখাই উত্তম।
📄 কোষের (CELL) উপর রোযার প্রভাব
রোযার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হল, শরীরে প্রবহমান পদার্থসমূহের মধ্যে ভারসাম্য ঠিক রাখা। যেহেতু রোযার দ্বারা বিভিন্ন প্রবহমান পদার্থের পরিমাণ হ্রাস পায়, তাই ওসবের কার্যক্রমে ব্যাপক প্রশান্তির সৃষ্টি হয়। মুখের লালাযুক্ত ঝিল্লির উপরের অংশ সম্পৃক্ত Cell সমূহ, যাকে প্রাপথেলীন সেল বলা হয় এবং যেগুলি দেহের আর্দ্রতাসমূহকে অনবরত বের করার দায়িত্বে নিয়োজিত, সেগুলিও রোযার দ্বারা অর্জন করে এক অনাবিল শান্তি এবং তাদের সুস্থতায় যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। জ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে একথা সহজেই বলা যায়, লালা তৈরিকারী মাংসগ্রন্থি, গর্দানের মাংসগ্রন্থি এবং Pancreas-এর মাংসগ্রন্থিসমূহ অধীর আগ্রহের সাথে মাহে রমাযানের অপেক্ষায় থাকে। যাতে রমাযানের বরকতে কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ পায় এবং অধিক কাজ করার ক্ষেত্রে নিজের অপারগতাসমূহ পেশ করতে পারে।
📄 স্নায়ুবিক প্রক্রিয়ার (Nervous System) উপর রোযার প্রভাব
রোযার কারণে কিছু লোকের মধ্যে চঞ্চলতা ও মনমরাভাব প্রকাশ পায়। কিন্তু এর দ্বারা স্নায়ুবিক প্রক্রিয়ার উপর কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় না। সে সমস্ত লোকদের মাঝে এ ধরনের পরিস্থিতি তাদের আত্মম্ভরিতা (Egotism) বা মেজাজের রুক্ষ্মতার কারণেই হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে রোযার কারণে স্নায়ুবিক প্রক্রিয়ায় আসে পূর্ণ শান্তি। ইবাদত বন্দেগী পালনের দ্বারা অর্জিত প্রশান্তি আমাদের মনের যাবতীয় পঙ্কিলতা ও ক্রোধ দূরীভূত করে দেয়। ইবাদতে অধিক খুশু-খুযু, বিনয়-নম্রতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির সম্মুখে মস্তক অবনত হয়ে যায়। রোযার কারণে আমাদের যাবতীয় পেরেশানী চিন্তা-ভাবনা দুরীভূত হয়ে যায়। রোযার কারণে যেহেতু আমাদের যৌন চাহিদা হ্রাস পায়, তাই এ কারণেও আমাদের স্নায়ুবিক প্রক্রিয়ার উপর কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় না।
রোযা ও ওযুর যৌথ প্রতিক্রিয়ার যে শক্তিশালী সমন্বয় সাধিত হয়, তার দ্বারা মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহের এক অতুলনীয় ভারসাম্য সৃষ্টি হয়, যা সুস্থ স্নায়ুবিক প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব বিস্তার করে।
আভ্যন্তরীণ মাংসগ্রন্থিতে যে আরাম ও শান্তি অর্জিত হয়, তা পূর্ণরূপে স্নায়ুবিক প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব বিস্তার করে। মানবজাতির উপর এটা আরও একটি অনুগ্রহ। মানুষের যে আবেগপ্রবণতা রমাযানের কারণে, ইবাদতের অনুগ্রহের বদৌলতে পরিচ্ছন্ন ও শান্তিকামী হয়ে থাকে, তা স্নায়ুবিক প্রক্রিয়ার সর্বপ্রকার অশান্তি দূরীকরণে সহায়ক হয়।
📄 রোযার সামাজিক প্রভাব
ইসলাম আমাদের দুখীজনের লালন-পালনের পদ্ধতি শিক্ষা প্রদান করে। উদরপূর্তি থাকলে অন্যের ক্ষুধা সম্পর্কে অনুভব করা যায় না। আর পানি দ্বারা জিহবা তরতাজা থাকলে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির পিপাসার জ্বালা অনুভব করা যায় না। রোযা মুসলমানদেরকে দয়া, করুণা ও গরীব-দুঃখীর প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন শিক্ষা দেয়। এ সবকিছুই ইসলামি সমাজ-সভ্যতার অন্যমত অংশ। ইউরোপে দুঃখীজনদের প্রতি সদয় হওয়ার জন্য অসংখ্য নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। কিন্তু সেখানে তারা সর্বাধিকভাবে বঞ্চিত।
মাওসেতুং ছিল চীনের মহান নেতা। চীনের সামাজিক পরিস্থিতি তাকে ভাবিয়ে তুলল। তিনি ভাষণ প্রদান কালে বলতেন- নিজের খাবারের মধ্যে প্রতিবেশী ও সামনে উপস্থিত ব্যক্তিকেও শামিল করে নাও। নিজে ক্ষুধার্ত থেকে অন্যের ক্ষুধার জ্বালা অনুভব কর। এ শিক্ষাগুলি বস্তুত মাওসেতুং এর নয় বরং বহু পূর্বেই ইসলাম আমাদেরকে এগুলি শিক্ষা দিয়েছে। ইসলাম গরীব-দুঃখীদের ধর্ম। ইসলাম বিত্তবানদের নিরাপত্তা প্রদান করে। ইসলাম ধন-দৌলত অর্জনের বিরোধিতা করে না বরং তা উপার্জন ও ব্যয়ের উৎকৃষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করে।