📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 শয়নের পূর্বে খাদ্যগ্রহণ

📄 শয়নের পূর্বে খাদ্যগ্রহণ


শয়ন করার পূর্ব মুহূর্তে খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিছানায় শয়ন করতে যাওয়ার পূর্বেই কিছু খাদ্য গ্রহণ করা অথবা রাতের খাদ্য বিলম্বে গ্রহণ করার ফলে, পাকস্থলী শয়ন অবস্থায়ও বিরামহীনভাবে কর্মরত থাকে। এ কারণে শয়নের সময় ভুক্ত খাদ্যদ্রব্য পূর্ণরূপে পরিপাক হয় না। আরামে নিদ্রা আসে না। অনিচ্ছায় স্বপ্ন দেখতে থাকে। সকালে চোখ খুলতেই শরীর সতেজ-সবল হওয়ার পরিবর্তে দুর্বল ও ক্লান্ত অনুভূত হয়। শয়নের পূর্বে সামান্য দুধ পান করলেও অনুরূপ দেখা দেয়।
প্রকৃত নিয়ম হল, শয়নের পূর্বে পাকস্থলীর কাজ বন্ধ থাকা। আমরা যখন বিশ্রাম গ্রহণ করি, তখন আমাদের পাকস্থলীরও পূর্ণ বিশ্রাম থাকা উচিত। তা না হলে পাকস্থলীর (অতিরিক্ত) কর্ম ব্যস্ততা মন-মস্তিস্ক ও সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কর্ম শক্তিতে বিঘ্ন ঘটাবে। ফলে ঘুমের স্বভাবগত চাহিদা ও উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে না। যেসব আরামপ্রিয় লোক বেশি পরিশ্রম করে না, তাদের রাতের খাদ্য বিলম্বে খাওয়া অথবা শয়নের পূর্বে খাওয়ার অভ্যাস করা অত্যন্ত ক্ষতিকর। এমন লোকেরা পরিপাকের ত্রুটি ও পাকস্থলীর দুর্বলতার কারণে বিভিন্ন প্রকার রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। ফলে তাদের সুস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়।
রাতে সমস্ত শরীরের সাথে পাকস্থলীর সমস্ত অঙ্গও বিশ্রাম গ্রহণ করতে চায়। এ আরামের সময় পুনরায় তাকে খাদ্যে বোঝাই করে দিলে এবং রাতে ৫/৬ ঘণ্টা পূর্ণ বিশ্রাম দিতে না পারলে তার ফলাফল খারাপই হবে। পাকস্থলী দুর্বল ও পরিপাকে বিঘ্ন ঘটা ছাড়া আর কিছুই হবে না। এজন্য প্রাচীন চিকিৎসাবিদগণ রাত্রে বিলম্বে খাদ্য গ্রহণ করা এবং আধুনিক যুগের প্রথায় ২/১ ঘণ্টা পর পর চা-নাশতা ইত্যাদি খাওয়া নিষেধ করেছেন। দৈহিক চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে চিকিৎসাবিদ ও পণ্ডিতগণের মতে সন্ধ্যার খাদ্য বিলম্বে গ্রহণ করা বা শয়নের পূর্বে খাওয়া বিষ পান করার ন্যায় এবং তা ধীরে ধীরে স্বাস্থ্য ও জীবনকে ধ্বংস করে দেয়।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 খাদ্যগ্রহণের মৌলিক নিয়মাবলী

📄 খাদ্যগ্রহণের মৌলিক নিয়মাবলী


অধিক খাদ্য ভক্ষণ করা ওই সকল লোকদের জন্য বিপদজনক, যারা স্বভাবগতভাবে কর্মবিমুখ এবং আরামপ্রিয়। এসব লোকদের দরকার কম খাওয়া এবং নিয়মিতভাবে কিছু ব্যায়াম করা। এমন অনেক লোক আছে, যারা আল্লাহর ইচ্ছায় যে স্বাস্থ্য ও যোগ্যতা নিয়ে আসে, সে হিসাবে যতটুকু পরিশ্রম করা দরকার, তার অর্ধেকও করে না।
এ প্রকৃতির লোকদের স্ব স্ব অবস্থা সমীক্ষা করলে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, তারা ক্ষুধাকে দমন করার শক্তি রাখে না। ফলে খাদ্যদ্রব্যে উদর বোঝাই হয়ে যায়। এরপর কাজ-কর্ম করার প্রতি অনীহা সৃষ্টি হয়ে যায়। ভরা পেটে কোন ব্যক্তি তার দক্ষতা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে পারে না।
সুতরাং সারা দিনের মধ্যে তিনবারের অধিক খাদ্য গ্রহণ করবে না। লঘুপাক ব্যতীত হরেক রকম গুরুপাক খাদ্য ভক্ষণ করবে না। ক্ষুধা যতটুকু ততটুকু খাবে। এর অধিক বিন্দুমাত্র খাবে না। প্রত্যহ কিছুক্ষণ ব্যায়াম করবে। তাহলে দেখতে পাবে দেহের দুর্বলতা, মন্দাভাব, ক্ষয়, পরিপাক এবং শারীরিক ও মানসিক সব রকমের জড়তা বিলীন হয়ে শরীরের তেজ ও শক্তি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
পক্ষান্তরে যেসব লোকেরা দৈনন্দিন কাজে রাত-দিন, সকাল-সন্ধ্যা কঠোর পরিশ্রম করে তাদের খাদ্যের ব্যাপারে ততটা সচেতন হওয়া বেশি জরুরি নয় বরং কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলেই তারা সুস্থ ও সবল থাকতে পারবে। সুতরাং শারীরিক চাহিদার বেশি খাবে না। খাদ্য গ্রহণের সময় ও নিয়মের প্রতি লক্ষ্য রাখলেই যথেষ্ট। এসব বিধান পুরোপুরি অনুসরণ করলে স্বাস্থ্য, শক্তি, উদ্যম ও সাহস বৃদ্ধি পাবে।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 পাকস্থলীর দুর্বলতা থেকে বাঁচার উপায়

📄 পাকস্থলীর দুর্বলতা থেকে বাঁচার উপায়


কঠোর পরিশ্রম অথবা ব্যায়াম করার পর তৎক্ষণাত খাদ্য গ্রহণ করলে দেহের ক্ষতি হবে। কেননা শরীরের উত্তাপ এবং ক্লান্তিময় অবস্থার মধ্যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, পরিপাকযন্ত্র, মস্তিষ্ক ইত্যাদির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে যায়। এমনিভাবে কঠোর পরিশ্রম, উত্তেজনা ও কর্মব্যস্ততার পরপরই খাদ্য গ্রহণ করলে পরিপাকের দুর্বলতা অপরিহার্য হয়ে যায়। কারণ, ওই মুহূর্তে শরীরের আকর্ষণ থাকে ভিন্ন দিকে এবং অস্থি ও জোড়াসমূহ ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে না। তদ্রুপ ক্ষতি হয় খাদ্যগ্রহণের পরপরই শরীর চর্চা করলে কিংবা কঠিনকাজে লেগে গেলে। কেননা শরীরের কর্মতৎপরতা ও শক্তিসমূহ তখন দুদিকে ব্যস্ত থাকে। পাকস্থলী পরিপাকের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারে না। অতএব খাদ্য গ্রহণ করার একটি স্বাস্থ্যসম্মত বিধান হল শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি ও স্থিরতা। বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী জালিউনুস বলেন, ধীরস্থিরভাবে ও প্রশান্তিতে খাদ্য গ্রহণ করলে তা পরিপাক ও দেহ গঠনে যথেষ্ট সহায়তা করে। পক্ষান্তরে ক্লান্তি-শ্রান্তি ও শোক তাপের মধ্যে খাদ্য ভক্ষণ করলে দেহের বৃদ্ধি সাধন হয় না।
ড. কিনান ইউরোপের একজন এক্সরে বিশেষজ্ঞ। এক্সরে মেশিনের সাহায্যে তিনি পাকস্থলী, যকৃৎ, নাড়িভুঁড়ি, ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিভিন্ন অবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। রিপোর্টে তিনি উল্লেখ করেন যে, রোগ ও শোক-দুঃখের সময় পাকস্থলী ও অবশিষ্ট যাবতীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপরে চাপ পড়ে। যার ফলে মানুষ অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে। সুতরাং বাস্তব ও স্বাস্থ্যসম্মত একটি পাকস্থলীতে ক্লান্তির সময় খাদ্য গ্রহণ করলে, তা জীবন নাশক বিষের মতো ক্রিয়া করবে। তাই খাদ্য গ্রহণ করার সময় হাসি-খুশি ও উৎফুল্ল থাকা উচিত।
তৈলবিহীন রুটি, পরটা, পুরি ইত্যাদি খাদ্য সহজে পরিপাক হয়। তরি-তরকারি ও শাক-সবজি সাদাসিধাভাবে রান্না না করে ঘি ও কড়া মসলা দ্বারা ভূনা করে কঠিন ও ভারী পাচ্য করে তোলা হয়। কড়া মিষ্টি, ময়দার তৈরি খাদ্যদ্রব্য, জর্দা, পোলাও, ঘিতে ভাজা যাবতীয় দ্রব্য, তৈল জাতীয় দ্রব্য সবই হজমশক্তিকে ক্ষীণ ও দুর্বল করে দেয়। তদ্রুপ কেক, পেষ্ট্রি, চকলেট ইত্যাদি ক্ষতিকারক।
খাদ্য গ্রহণ সমাপ্তির পরে অন্তত আধঘণ্টা কোনো চিন্তামূলক কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। কিন্তু অনেক লোকই খাদ্য গ্রহণের মধ্যে বা খাদ্য গ্রহণের পরপরই অধ্যয়ন শুরু করে দেয়। এতে তাদের মস্তিষ্ক ও হজম শক্তির উপর বিরাট প্রভাব পড়ে।
খাদ্য গ্রহণের মধ্যে পানি বা অন্য কোনো তরল দ্রব্য গ্রহণ করলে পরিপাকশক্তি ক্ষীণ হয় এবং পাকস্থলীতে অধিক সিক্ততার কারণে ভুক্ত খাদ্যদ্রব্য উত্তমরূপে পরিপাক হয় না। সুতরাং খাদ্য গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়ে পিপাসা না লাগলে এমন জিনিস ভক্ষণ না করা শ্রেয়। অধিক লবণ, মসলা, আচার, চাটনি, মোরব্বা ইত্যাদি পরিপাক ক্রিয়াকে সহায়তা করে না; দুর্বল করে দেয়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বসম্মত বিধান হল, আমরা যে জিনিসই খাই না কেন, তার তাপমাত্রা দেহের চাহিদা মোতাবেক হতে হবে। বেশি গরম বা বেশি ঠাণ্ডা হলে হবে না বরং মাঝামাঝি হতে হবে। বরফ, আইসক্রীম, মালাই, বরফের বোতল বা এ জাতীয় যে কোনো ঠাণ্ডা বস্তু দাঁত ও মাঁড়ীর জন্য ক্ষতিকারক। এছাড়া হিমায়িত পানি, বরফ এবং অধিক ঠাণ্ডা জাতীয় জিনিস পাকস্থলীর দুর্বলতার কারণ।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 পাকস্থলীর বিকৃতি ও মানসিক দুর্বলতার কারণ

📄 পাকস্থলীর বিকৃতি ও মানসিক দুর্বলতার কারণ


পাকস্থলীর বিকৃতি যেমন জ্বালাপোড়া, দাস্ত, মোচড়ানো, আমাশয় ইত্যাদির চিকিৎসার সঠিক কারণগুলো ব্যাখ্যার প্রয়োজন। সাধারণত এসব ব্যাধি খাদ্য স্বল্পতা, অতিভোজন ও সমতা না রেখে খাওয়ার কারণে হয়। তদ্রুপ নেশা ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহারে ক্লান্তি ও দুর্বলতা আসে। এসবের উপযুক্ত চিকিৎসা ও প্রতিকার হল, নিয়মিতভাবে শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস তৈরি করা এবং সতর্কতা অবলম্বন করা। উল্লেখ্য যে, শুধু ওই সব বাহ্যিক কারণে পাকাশয় নষ্ট হওয়া সর্বদা জরুরি নয় বরং অনেক সময় কোনো লোক হয়তো খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও পাকস্থলীর দুর্বলতা ও বিকৃতির শিকার হতে দেখা যায়।
এমতাবস্থায় যৌক্তিকভাবে এ জাতীয় রোগ-ব্যাধি সতর্কতাজনিত রোগ ব্যাধি থেকে অধিক হবে না। কিন্তু নেহায়েত কমও হবে না। পাকস্থলী নষ্ট হওয়ার যদি মৌলিক কারণ না-ই থাকে, তবে চিকিৎসককে মনে করতে হবে, এর পিছনে কিছু না কিছু মানসিক কারণ কাজ করছে। এমতাবস্থায় চিকিৎসা ও সাবধানতা অবলম্বন করার পরিবর্তে মানসিক তৎপরতা ও মস্তিষ্কের উত্তেজনাকে সমান্তরাল পর্যায়ে আনার চেষ্টা চালাতে হবে। তা না হলে সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় তেমন উপকার হবে না। যেসব মানসিক কারণে পাকস্থলীর রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি হয়, নিচে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ পেশ করা হল।
রবার্ট নামের একজন লোক ছিল, তার শরীর স্বাস্থ্য বেশ ভালো ছিল। একবার তার খুব ক্ষুধা পেল। সে পাঠ কক্ষ থেকে ঘরের ভিতরে চলে গেল। সেখানে ভালো ভালো খাদ্য রান্না করা ছিল। সেদিন তার দুজন সম্মানিত মেহমানও ছিল। এজন্য তাদের সাথে বসে একত্রে খাদ্য গ্রহণ করায় আরও আনন্দিত হল। সুতরাং ভালো স্বাস্থ্য, যথেষ্ট ক্ষুধা, উত্তম খাদ্য, অন্তরঙ্গ সহচর, মধুর আলাপ -এত কিছুর অপূর্ব সমন্বয়ের স্বাভাবিক চাহিদা ছিল তার পরিপাকের উপর ভালো প্রভাব ফেলা। কিন্তু তা হয় নি।
কারণ, খাওয়া শেষ করতে না করতেই একটি শোকপত্র পেল। পত্র পাঠ করতেই তার উচ্ছ্বাস বিলীন হল। মন ভেঙে গেল। কথা বলার শক্তিই যেন নিঃশেষ হয়ে গেল। চেহারায় দুঃখ ও শোকতাপ ছেয়ে গেল। এমতাবস্থায় রাতের খাওয়া হল না। তার ক্ষুধা লাগল না। আস্তে আস্তে তার পাকস্থলীর উত্তেজনা হ্রাস পেয়ে নিস্তেজ হয়ে গেল। সকালে নির্ধারিত সময়ে পায়খানা হল না। দুপুরের খাওয়া হল; কিন্তু অভ্যাসমত সহজ পন্থায় হল না বরং অতিকষ্টে কোনো রকম খাওয়া হল। অবশেষে তৃতীয় দিন আমাশয় হয়ে গেল।
উপরের ঘটনায় গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে দুই শ্রেণীর লোক পাওয়া যায়। একশেণীর লোক হবে কঠোর মনের অধিকারী। তারা ছোট ছোট বালা মসিবত ও দূর্ঘটনায় দুঃখিত ও শোকাভিভূত হবে না। স্বাচ্ছন্দ্যে প্রশান্তির মধ্যে জীবনযাপন করবে। দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক হচ্ছে, যারা স্বভাব ও প্রকৃতির সামান্য ব্যতিক্রম ঘটলে অস্থির ও পেরেশান হয়ে যায়। এভাবে অতি সামান্য ব্যাপারে তাদের দেহাভ্যন্তরে শিহরণ ও কম্পন সৃষ্টি হয়।
এখন বলুন! এমন শ্রেণীর লোক কি শূন্য কক্ষে বসে পড়াশোনা করবে? যদি সেখানে রক্ষিত চেরাগদানীর উপর কয়েকটি চড়ুই পাখি বসে কিচির মিচির করে বা চেয়ারে বসে, তা হলে বাস্তবিক সে এসব অবস্থা থেকে সঙ্কীর্ণতা অনুভব করবে। সুতরাং এমন স্বভাবপ্রবণ লোকেরা যদি ২/৪ দিন ওই অবস্থায় থাকে, তবে তাদের আবেগ-অনুভূতিতে আঘাত আসবে এবং একসময় রোগাক্রান্ত হয়ে পড়বে। তাহলে এ দাবি করা অত্যুক্তি হবে না যে, এত কিছুর চাপ তার পাকস্থলীর উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। আর পাকস্থলী অসুস্থ হলে তো সমস্ত শরীরই অকেজো হয়ে যায়।
নিউইয়র্কের ডা. জি. বি. রাইস তার এক গ্রন্থে একজন রোগিনীর সমালোচনা করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, তার রোগ হল, তার পাকস্থলীতে সর্বদা একটা না একটা অসুবিধা থাকে। তাই তিনি অত্যাধুনিক এক্সরে এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি দ্বারা তাকে পরীক্ষা করলেন। কিন্তু কোনো রোগ বা কারণ নির্ণয় করতে পারলেন না। রোগিনী খাদ্য বন্ধ করে দিল। তাতেও কাজ হল না। সর্বদা বমি করতে লাগল এবং দুর্বল হতে থাকল। রোগের কোনো উপশম হল না। তবে সৌভাগ্যক্রমে ডা. সাহেব শুধু চিকিৎসকই ছিলেন না; তিনি একজন মনোবিজ্ঞানীও ছিলেন। সুতরাং রোগিনীর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে কয়েক মিনিট প্রশ্ন করে তিনি রোগের প্রকৃত কারণ আবিষ্কার করে ফেললেন।
তার স্বামী ছিল একজন পেশাদার জল্লাদ। সে মারাত্মক অপরাধীদের জবাই করে হত্যা করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। এসব তার একটুও পছন্দ হত না। এভাবে লোকদের যবাই করার কারণে মহিলার মনের মধ্যে আঘাত লাগত। ইতোমধ্যে সে তার স্বামীকে কয়েকজন নির্দোষ ব্যক্তিকে হত্যা করতে দেখে অন্তরে আরও বেশি আঘাত পেল। এতে তার মন আরও খারাপ হল। অবশেষে সমস্ত মানসিক চাপ তার পাকস্থলীর উপর পড়ল। ফলে সে পাকস্থলীর দুর্বলতা জনিত রোগে ভুগতে থাকল।
ডা. সাহেব লিখেন, দুনিয়ার কোনো ঔষধ তার উপকার আসছিল না। কারণ, সে ছিল মানসিক রোগে আক্রান্ত। ফলে তার স্বাস্থ্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে ডা. সাহেবের পরামর্শে যখন তার স্বামীকে জল্লাদির কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল, তখন সে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠল।
এখন চিন্তা করে দেখা যাক, মানুষের মনের মধ্যে কেন এমন প্রভাব পড়ে। দেহ বিশেষজ্ঞ বলেন, খাদ্য পাকস্থলীতে জমা হওয়ার সাথে সাথে এর পরিপাক কর্মে সহায়তা করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ রক্ত সেখানে জমা হয়। রক্ত সেখানে একপ্রকার আর্দ্রতা সৃষ্টি করে। সে আর্দ্রতাই খাদ্য থেকে নির্যাস সংগ্রহ করে রক্ত তৈরি করার উপযোগী করে দেয় এবং অপ্রয়োজীয় দ্রব্য নাড়ীভুঁড়ির দিকে ঠেলে দেয়।
পাকস্থলীতে খাদ্য জমা হওয়ার পর যখন পর্যাপ্ত রক্ত জমা হওয়ার কথা তখন যদি কোনো মানুষ বিষণ্ণ-ব্যথিত হয়, দুঃখ-কষ্ট ও আঘাত পায়, তখন রক্তের স্বাভাবিক গতি পাকস্থলীর দিকে ধাবিত হয় না বরং মস্তিষ্কের দিকে ধাবিত হয়। কারণ, উক্ত অবস্থানগুলো মস্তিষ্কের কাজ এবং তা সংগঠিত হওয়ার জন্য মস্তিষ্কের মধ্যে রক্তের প্রয়োজন হয়। এমন দোটানা অবস্থার কুফলে পাকস্থলী পরিপাকের কাজ সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে না। কারণ, সেখানে পর্যাপ্ত রক্ত আসে না। সামান্য আসলেও আর্দ্রতা পয়দা হয় না। হলেও পর্যাপ্ত হয় না। ফলে খাদ্য হজম করতে সক্ষম হয় না।
আমরা জানি, চিকিৎসকগণ কখনও খাওয়ার পর গোসল করার অনুমতি দান করেন না। কারণ, গোসলের সময় রক্ত চামড়ার দিকে যায়। তদ্রূপ খাদ্যের পর অধ্যয়ন বা অন্য কোনো চিন্তামূলক কাজ করা থেকে নিষেধ করা হয়। কারণ, রক্ত তখন পাকস্থলীতে যাওয়ার পরিবর্তে মস্তিকে যায়। অনুরূপ খাদ্যের পর ব্যায়াম করাকেও ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করা হয়। কারণ, এ ক্ষেত্রেও রক্ত মূল কাজ বাদ দিয়ে অন্য দিকে ধাবিত হয়। সাধারণত খাদ্য খাওয়ার আগে পরে বা মধ্যে দৈহিক ও মানসিক স্থিরতা অতীব জরুরি মনে করা হয়। পাকস্থলী যেন উত্তম পন্থায় স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে তার কাজ সুচারুরূপে সম্পাদন করতে পারে। দৈহিক ও বাহ্যিক কারণে যেমন পাকস্থলী নষ্ট হয়, ঠিক তেমনি মানসিক বিড়ম্বনা এবং জটিলতাও এর উপর তীব্র প্রভাব বিস্তার থাকে।
প্রকাশ থাকে যে, মানবজীবনে রোগ-ব্যাধি আসা স্বাভাবিক। তবে তা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে আসতে পারে। কখনো ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামার কারণে ধাক্কা আসে। কখনো বিবি-বাচ্চাদের রোগশোক মস্তিষ্ককে প্রশান্তি থেকে ক্লান্তিতে নিক্ষেপ করে। কখনো বেকার বা উপার্জন বিহীন জীবনের আতংক আমাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। আবার কখনো বা সাংসারিক জীবনের দুঃখ-দুর্দশা মনের প্রশান্তিকে বিলীন করে দেয়। মোটকথা, কোনো না কোনো দুঃখ-নৈরাশ্য আমাদের মস্তিষ্কে ও মানসিক শান্তিতে আঘাত হানে। এমন নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের পাকস্থলী যদি স্বাভাবিকভাবে ভালো থাকে, তবে আশ্চর্যের কিছু নেই বরং তা হবে বিরাট এক হতাশাব্যঞ্জক জীবনের উপর আল্লাহ পাকের খাস রহমত। এর অর্থ এই নয় যে, আমরা জটিল মানসিক অবস্থা সমূহকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম নই।
মনোবিজ্ঞানীরা এমন কিছু পন্থা বের করেছেন, যা মেনে চললে পাকস্থলীর সব সমস্যা থেকে অনেকটা নিরাপদ থাকা যায়। তন্মধ্যে সুন্নতে রাসূল-১+২ ফর্মা-৮ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হল, অহেতুক মনের মধ্যে ভয়-ভীতি চাপিয়ে না দেওয়া, যথাসম্ভব সমস্যাগুলোর ব্যাপারে পূর্বেই প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
অভিজ্ঞতা বলে রোগ আস্তে আস্তে বড় হয়। দ্বিতীয় পন্থা হল, দুঃখ বেদনা ও অস্থিরতা ভুলে যাওয়ার জন্য ভালো পরিবেশ খোঁজ করা। যেমন : ভ্রমণ, অনুষ্ঠান, বন্ধুদের সঙ্গ, অধ্যয়ন ইত্যাদি। অর্থাৎ দেহ ও মনকে সর্বদা উৎসাহব্যঞ্জক কাজে লিপ্ত রাখা। এসব পন্থা অবলম্বন করলেই মানসিক দুশ্চিন্তা দূর হবে। মোটকথা, যথাসম্ভব নিঃসঙ্গ ও নিরানন্দ হতে বিরত থেকে হাসি-খুশি থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে।
তাছাড়া পাকস্থলীকে মানসিক বিপর্যয়ের প্রভাব থেকে নিরাপদ রাখার জন্য অতি জরুরি হল, খাদ্য গ্রহণের নিয়ম-কানুন পরিপূর্ণরূপে পালন করা এবং শোক-তাপ ও ক্রোধ অবস্থায় খাদ্য গ্রহণ না করা। খাওয়ার সময় অনর্থক তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হবে না। কাউকে লজ্জা বা তিরষ্কার করবে না। মর্মান্তিক ও বিব্রতকর ঘটনা থেকে বিরত থাকবে। খাওয়ার সময় প্রথমত কথা খুব কম বলবে। যদি বলতেই হয় তবে এভাবে বলবে, যেন তা সকলের সন্তুষ্টিমূলক হয়।
মনে রাখবেন, মানসিক রোগের চিকিৎসা মানসিকভাবে করতে হয়। যারা এসব রোগের চিকিৎসা ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে করে, তারা যেন কখনও উপকারের প্রত্যাশা না করে। এমনটি করলে অবস্থা আরও জটিল ও কঠিন আকার ধারণ করবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00