📄 খাবারের সঠিক পদ্ধতি
খাদ্য মানবদেহের এমন এক অত্যাবশ্যকীয় বস্তু, যা ব্যতীত মানুষ জীবিত থাকতে পারে না কিন্তু আমরা যা কিছু পানাহার করি তা নিজে নিজেই হজম হয়ে যায় না বরং তাকে হজম করে শরীরের উপযোগী বানাতে এবং গোশত ও চামড়ার আকৃতিতে রূপান্তরিত করতে যথেষ্ট দৈহিক পরিশ্রম করতে হয়। তাই খাদ্য দেহের বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনের বেশি গ্রহণ করলে বা খাদ্য নির্বাচনে এবং বিন্যাসে দেহের প্রয়োজনীয়তার প্রতি দৃষ্টি না দিলে সেই খাদ্যই দেহকে দুর্বল করে দিয়ে দেহের শত্রুতে পরিণত হয়ে যায়। মানুষ যত রোগেই আক্রান্ত হয় তন্মধ্যে অধিকাংশই খাবারের আধিক্য, বিশৃঙ্খলা, বার বার খাওয়া এবং হজম হওয়ার পূর্বেই পুনরায় খাওয়া -এ সবের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রতিক্রিয়া মাত্র।
📄 খাবার কখন খাওয়া উচিত
সুস্বাস্থ্যের জন্য খাদ্য গ্রহণ করার সময়সূচি অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। সুতরাং দৈনন্দিন খাদ্য গ্রহণের একটি নির্ধারিত সময়সূচি থাকা বাঞ্ছনীয়। নির্ধারিত সময়ে খাদ্য গ্রহণ করার পর দুনিয়ার যত বড় নেয়ামত সামনে আসুক না কেন তা খাওয়া উচিত নয়।
অধিকাংশ লোক খাদ্য গ্রহণের বেলায় সময়সূচির প্রতি লক্ষ্য রাখে না। তারা দুইবার খাদ্য গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়ে কিছু না কিছু খেতে থাকে।
তবে খাদ্য গ্রহণের ব্যাপারে বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখতে হবে যে, খাদ্যদ্রব্য যতই ভালো, বলবর্ধক ও শক্তিশালী হোক, যদি পরিমাণ ও সময়-সীমার প্রতি লক্ষ্য না করা যায়, তবে শরীরের উপকার তো দূরের কথা বরং উল্টো ক্ষতি হতে পারে। হজমশক্তি ক্লান্ত নিষ্ক্রিয় হয়ে স্বাস্থ্যহানি ঘটতে পারে এবং বিভিন্ন প্রকার মারাত্মক রোগ-ব্যাধি পয়দা হয়ে দেহকে বরবাদ করে দিতে পারে এভাবে খাদ্য গ্রহণ স্বাস্থ্যের উন্নতির মাধ্যম হওয়ার পরিবর্তে তা বিষ স্বরূপ হতে পারে। অতএব স্বাস্থ্য টিকিয়ে রাখার জন্য খাদ্যের পরিমাণ ও সময়সূচির প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখা একান্ত প্রয়োজন।
জনৈক আরবদেশীয় চিকিৎসক বলেছিলেন, “যখন ক্ষুধা লাগে তখন খাদ্য খাও”। অপর চিকিৎসক বলেছিলেন, “কোনো কোনো সময় অনিয়মিত খাদ্য গ্রহণ এমন ক্ষতিকারক হয় যেমন বিষ ক্ষতিকারক।” সুতরাং যতক্ষণ ক্ষুধা লাগবে না, ততক্ষণ বিন্দু মাত্র খাদ্য গ্রহণ করবে না। অল্প ক্ষুধা থাকলে খাদ্য গ্রহণ করা ত্যাগ করবে।
মানুষের উচিত অসময়ে, অনিয়মিত ও অনির্ধারিত খাদ্য গ্রহণের কু-অভ্যাস পরিত্যাগ করা। এভাবে খাদ্য গ্রহণ করলে তা পুরোপুরি পরিপাক ও শরীর গঠনে সহায়ক হয় না। পক্ষান্তরে প্রকৃত ক্ষুধা থেকে এমন শক্তি আসে, যদ্বারা ভুক্ত খাদ্যদ্রব্য সুন্দররূপে পরিপাক হয়ে যায়। ফলে শরীরের ক্ষয় পূরণ হয় এবং রক্ত ও গোস্তের বৃদ্ধি সাধন করে সুন্দর স্বাস্থ্য গঠিত করে। তাই খাদ্য গ্রহণের সময়সূচি থাকা একান্ত প্রয়োজন। সময়-অসময় খাদ্য গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
📄 শয়নের পূর্বে খাদ্যগ্রহণ
শয়ন করার পূর্ব মুহূর্তে খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিছানায় শয়ন করতে যাওয়ার পূর্বেই কিছু খাদ্য গ্রহণ করা অথবা রাতের খাদ্য বিলম্বে গ্রহণ করার ফলে, পাকস্থলী শয়ন অবস্থায়ও বিরামহীনভাবে কর্মরত থাকে। এ কারণে শয়নের সময় ভুক্ত খাদ্যদ্রব্য পূর্ণরূপে পরিপাক হয় না। আরামে নিদ্রা আসে না। অনিচ্ছায় স্বপ্ন দেখতে থাকে। সকালে চোখ খুলতেই শরীর সতেজ-সবল হওয়ার পরিবর্তে দুর্বল ও ক্লান্ত অনুভূত হয়। শয়নের পূর্বে সামান্য দুধ পান করলেও অনুরূপ দেখা দেয়।
প্রকৃত নিয়ম হল, শয়নের পূর্বে পাকস্থলীর কাজ বন্ধ থাকা। আমরা যখন বিশ্রাম গ্রহণ করি, তখন আমাদের পাকস্থলীরও পূর্ণ বিশ্রাম থাকা উচিত। তা না হলে পাকস্থলীর (অতিরিক্ত) কর্ম ব্যস্ততা মন-মস্তিস্ক ও সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কর্ম শক্তিতে বিঘ্ন ঘটাবে। ফলে ঘুমের স্বভাবগত চাহিদা ও উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে না। যেসব আরামপ্রিয় লোক বেশি পরিশ্রম করে না, তাদের রাতের খাদ্য বিলম্বে খাওয়া অথবা শয়নের পূর্বে খাওয়ার অভ্যাস করা অত্যন্ত ক্ষতিকর। এমন লোকেরা পরিপাকের ত্রুটি ও পাকস্থলীর দুর্বলতার কারণে বিভিন্ন প্রকার রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। ফলে তাদের সুস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়।
রাতে সমস্ত শরীরের সাথে পাকস্থলীর সমস্ত অঙ্গও বিশ্রাম গ্রহণ করতে চায়। এ আরামের সময় পুনরায় তাকে খাদ্যে বোঝাই করে দিলে এবং রাতে ৫/৬ ঘণ্টা পূর্ণ বিশ্রাম দিতে না পারলে তার ফলাফল খারাপই হবে। পাকস্থলী দুর্বল ও পরিপাকে বিঘ্ন ঘটা ছাড়া আর কিছুই হবে না। এজন্য প্রাচীন চিকিৎসাবিদগণ রাত্রে বিলম্বে খাদ্য গ্রহণ করা এবং আধুনিক যুগের প্রথায় ২/১ ঘণ্টা পর পর চা-নাশতা ইত্যাদি খাওয়া নিষেধ করেছেন। দৈহিক চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে চিকিৎসাবিদ ও পণ্ডিতগণের মতে সন্ধ্যার খাদ্য বিলম্বে গ্রহণ করা বা শয়নের পূর্বে খাওয়া বিষ পান করার ন্যায় এবং তা ধীরে ধীরে স্বাস্থ্য ও জীবনকে ধ্বংস করে দেয়।
📄 খাদ্যগ্রহণের মৌলিক নিয়মাবলী
অধিক খাদ্য ভক্ষণ করা ওই সকল লোকদের জন্য বিপদজনক, যারা স্বভাবগতভাবে কর্মবিমুখ এবং আরামপ্রিয়। এসব লোকদের দরকার কম খাওয়া এবং নিয়মিতভাবে কিছু ব্যায়াম করা। এমন অনেক লোক আছে, যারা আল্লাহর ইচ্ছায় যে স্বাস্থ্য ও যোগ্যতা নিয়ে আসে, সে হিসাবে যতটুকু পরিশ্রম করা দরকার, তার অর্ধেকও করে না।
এ প্রকৃতির লোকদের স্ব স্ব অবস্থা সমীক্ষা করলে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, তারা ক্ষুধাকে দমন করার শক্তি রাখে না। ফলে খাদ্যদ্রব্যে উদর বোঝাই হয়ে যায়। এরপর কাজ-কর্ম করার প্রতি অনীহা সৃষ্টি হয়ে যায়। ভরা পেটে কোন ব্যক্তি তার দক্ষতা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে পারে না।
সুতরাং সারা দিনের মধ্যে তিনবারের অধিক খাদ্য গ্রহণ করবে না। লঘুপাক ব্যতীত হরেক রকম গুরুপাক খাদ্য ভক্ষণ করবে না। ক্ষুধা যতটুকু ততটুকু খাবে। এর অধিক বিন্দুমাত্র খাবে না। প্রত্যহ কিছুক্ষণ ব্যায়াম করবে। তাহলে দেখতে পাবে দেহের দুর্বলতা, মন্দাভাব, ক্ষয়, পরিপাক এবং শারীরিক ও মানসিক সব রকমের জড়তা বিলীন হয়ে শরীরের তেজ ও শক্তি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
পক্ষান্তরে যেসব লোকেরা দৈনন্দিন কাজে রাত-দিন, সকাল-সন্ধ্যা কঠোর পরিশ্রম করে তাদের খাদ্যের ব্যাপারে ততটা সচেতন হওয়া বেশি জরুরি নয় বরং কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলেই তারা সুস্থ ও সবল থাকতে পারবে। সুতরাং শারীরিক চাহিদার বেশি খাবে না। খাদ্য গ্রহণের সময় ও নিয়মের প্রতি লক্ষ্য রাখলেই যথেষ্ট। এসব বিধান পুরোপুরি অনুসরণ করলে স্বাস্থ্য, শক্তি, উদ্যম ও সাহস বৃদ্ধি পাবে।