📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 ঘ. সহিহ ও হাসানের পর্যাপ্ততা

📄 ঘ. সহিহ ও হাসানের পর্যাপ্ততা


যদি কোনো বিশেষ বিষয়ে আমরা সহিহ ও হাসান পর্যায় থেকে গ্রহণ করি এবং একইভাবে যঈফ থেকেও, তাহলে পূর্বোক্তটিকে অন্বেষণ করাই মূল্যবান পন্থা হবে। আমাদের স্মৃতিকে যঈফ দিয়ে ভারি করার কোনো প্রয়োজন নেই। প্রকৃতপক্ষে সহিহ'র মুকাবেলায় এমনটা করা মানে এর প্রতি কারো কর্তব্যে হস্তক্ষেপ করা। সাহাবিগণের রা. কারো কাছ থেকে এসেছে: লোকেরা উদ্ভাবনের (বিদ'আত) ওপর কোনো প্রচেষ্টা চালায় না, কিন্তু তারা সুন্নাহ্ থেকে এর মতোই হারায়। ওটা এমন কিছু যা সত্যসত্যই ঘটে থাকে। বিদ'আত সুন্নাহর স্থান দখল করে, উদ্ভাবন ঐতিহ্যের স্থান গ্রহণ করে। আল-কিফায়া গ্রন্থে ইমাম ইবন মাহদী থেকে আল-খতিব বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন:
কারো নিজেকে দুর্বল [বর্ণনাকারীদের] হাদিস লিপিবদ্ধকরণে ব্যস্ত রাখা উচিত নয়। কারণ এর মধ্যে যা আছে তা হলো, ঐ সীমা পর্যন্ত যা সে লিখে, তা থেকে বিশ্বস্থতাসম্পন্ন [লোকদের] হাদিসসমূহ তার দ্বারা বাদ পড়ে যায়।
যদি স্মরণে রাখা, চিন্তাভাবনা, বোধশক্তি ও আত্মীকরণে মানবীয় সামর্থ্য সীমাবদ্ধ হয় এবং এ থেকে পলায়নের পথ না থাকে, তাহলে এই সামর্থ্য এবং ব্যক্তির প্রচেষ্টা ও সময়, যার ওপর ও অগ্রাধিকার রয়েছে : তা কাজে লাগানো শ্রেয়। এ ক্ষেত্রে অনৈক্য নেই যে, ঐ দুটির মধ্যে এই ক্ষেত্রে যঈফের ওপর সহিহ'র পূর্ব দৃষ্টান্ত রয়েছে।

যদি কোনো বিশেষ বিষয়ে আমরা সহিহ ও হাসান পর্যায় থেকে গ্রহণ করি এবং একইভাবে যঈফ থেকেও, তাহলে পূর্বোক্তটিকে অন্বেষণ করাই মূল্যবান পন্থা হবে। আমাদের স্মৃতিকে যঈফ দিয়ে ভারি করার কোনো প্রয়োজন নেই। প্রকৃতপক্ষে সহিহ'র মুকাবেলায় এমনটা করা মানে এর প্রতি কারো কর্তব্যে হস্তক্ষেপ করা। সাহাবিগণের রা. কারো কাছ থেকে এসেছে: লোকেরা উদ্ভাবনের (বিদ'আত) ওপর কোনো প্রচেষ্টা চালায় না, কিন্তু তারা সুন্নাহ্ থেকে এর মতোই হারায়। ওটা এমন কিছু যা সত্যসত্যই ঘটে থাকে। বিদ'আত সুন্নাহর স্থান দখল করে, উদ্ভাবন ঐতিহ্যের স্থান গ্রহণ করে। আল-কিফায়া গ্রন্থে ইমাম ইবন মাহদী থেকে আল-খতিব বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন:
কারো নিজেকে দুর্বল [বর্ণনাকারীদের] হাদিস লিপিবদ্ধকরণে ব্যস্ত রাখা উচিত নয়। কারণ এর মধ্যে যা আছে তা হলো, ঐ সীমা পর্যন্ত যা সে লিখে, তা থেকে বিশ্বস্থতাসম্পন্ন [লোকদের] হাদিসসমূহ তার দ্বারা বাদ পড়ে যায়।
যদি স্মরণে রাখা, চিন্তাভাবনা, বোধশক্তি ও আত্মীকরণে মানবীয় সামর্থ্য সীমাবদ্ধ হয় এবং এ থেকে পলায়নের পথ না থাকে, তাহলে এই সামর্থ্য এবং ব্যক্তির প্রচেষ্টা ও সময়, যার ওপর ও অগ্রাধিকার রয়েছে : তা কাজে লাগানো শ্রেয়। এ ক্ষেত্রে অনৈক্য নেই যে, ঐ দুটির মধ্যে এই ক্ষেত্রে যঈফের ওপর সহিহ'র পূর্ব দৃষ্টান্ত রয়েছে।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 ঙ. আমলের মধ্যে ভারসাম্যহীন আদেশের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি

📄 ঙ. আমলের মধ্যে ভারসাম্যহীন আদেশের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি


হৃদয় কোমলকরণ, তারগিব ও তারহিব সংক্রান্ত হাদিসসমূহে (এদের মূলপাঠে) সিদ্ধ বা নিষিদ্ধকরণ ছাড়া কিছু করণীয় নির্দেশনা নেই। এদতসত্ত্বেও আমরা দেখি, এগুলো এমনকিছু ধারণ করে যার নিজস্ব গুরুত্ব ও ফলাফল রয়েছে। আমাদের পূর্বসুরী ইমামগণ এতে সাড়া দেননি - এটা এমন যা (সময়ের স্রোতে) উদ্ভূত হয়েছে কর্তব্য ও কাজের সম্পর্কের মধ্যে বিশৃঙ্খলার মধ্য থেকে যা আইনের প্রজ্ঞার সাহায্যে সুরাহা করা হয়েছে। কারণ প্রতিটি কাজ আইন দ্বারা নির্দেশিত বা নিষিদ্ধ- এর মূল্য আইন দ্বারা অন্য কাজের নিরিখে আপেক্ষিকভাবে নির্ধারিত। হুকুম যা সীমানা হিসেবে নির্ধারণ করেছে, আমরা তা অমান্য করতে পারি না, যাতে একটা আমলের যে পর্যায় নির্ধারিত রয়েছে তা কমবেশি গুরুত্বপূর্ণ থাকে।
সবচেয়ে সাংঘাতিক বিষয় হচ্ছে : আমলের ওজন করা কিছু পুণ্যের কাজকে এর উপযুক্ততার চেয়ে বেশি মূল্য দেওয়া; কিংবা এর যোগ্যতার চেয়ে বেশি ব্যাপ্তি দেওয়া এর পুরস্কারে স্ফীতি ঘটিয়ে, যতক্ষণ না দ্বীনের দৃষ্টিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ কিছুকে এটা বিদূরিত না করে; অন্যদিকে কিছু নির্ধারিত কাজের অন্যায্য ওজন দেওয়া এবং এর মধ্যকার শাস্তির অতি বর্ণনা দ্বারা, এমন করা হয় যাতে ব্যক্তির মধ্যে অন্যান্য নির্ধারিত আমলের সম্বন্ধে ধারণা বিধ্বংস হয়। পুরস্কারের ওয়াদা কিংবা শাস্তির হুমকি সম্বন্ধে এই ধরনের অতিশয়োক্তি হিদায়াতের অন্বেষণকারী শিক্ষিত লোকদের মধ্যে দ্বীনের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। এসব অতিশয়োক্তি তারা যা শোনে বা পাঠ করে তা খোদ দ্বীনের সাথে যুক্ত, অথচ ইসলাম এর থেকে বিমুক্ত।
প্রায়ই এমন অতিশয়োক্তি বিশেষ করে তারহিবের দিকে চালিত করে যা মনোজাগতিক প্রত্যাগমন (reversion) বা উদ্বেগ (anxieties)। তারা লোকদের মাঝে বিরূপভাব ও ঘৃণার বীজ বপন করেছে এবং তাদের দ্বীন সম্পর্কে ভীত সন্ত্রস্ত করেছে এবং এর প্রশস্ততা থেকে দূরে রেখেছে। তাই আমরা দেখব এক পিতাকে, যিনি তার বারো বছর বয়সী কন্যার রাত্রে উৎকণ্ঠিত ও ভীত অবস্থায় জেগে ওঠার অভিযোগ করেন, কারণ সে ভীতিকর স্বপ্ন দেখে - যা তার হয় একজন বক্তা কর্তৃক কবরে প্রদত্ত শাস্তি সংক্রান্ত ক্যাসেটের বক্তৃতা শুনে, এমন ক্যাসেট যার মধ্যে এ ধরনের অনেক হাদিস রয়েছে।
মুসলিমদের কর্তব্য হচ্ছে অতিশয়োক্তির প্রভাবে পতিত না হয়ে আইনের ক্রম অনুযায়ী আমল করা। কারণ তা আমাদেরকে অতিরিক্তকরণ কিংবা চরম অবহেলার মধ্য নিয়ে যায়। যেমনটা আলী ইবনে আবি তালিব বলেন: তোমাদের ওপর বাধ্যতামূলক হচ্ছে [কিছু করার ক্ষেত্রে] মধ্যপন্থা, যা অতিদূর গমন থেকে ফিরায় [আর-গালী] এবং ব্যক্তিকে যথেষ্ট আমল করার কাজে ধরে রাখে (আল-তালী)।

হৃদয় কোমলকরণ, তারগিব ও তারহিব সংক্রান্ত হাদিসসমূহে (এদের মূলপাঠে) সিদ্ধ বা নিষিদ্ধকরণ ছাড়া কিছু করণীয় নির্দেশনা নেই। এদতসত্ত্বেও আমরা দেখি, এগুলো এমনকিছু ধারণ করে যার নিজস্ব গুরুত্ব ও ফলাফল রয়েছে। আমাদের পূর্বসুরী ইমামগণ এতে সাড়া দেননি - এটা এমন যা (সময়ের স্রোতে) উদ্ভূত হয়েছে কর্তব্য ও কাজের সম্পর্কের মধ্যে বিশৃঙ্খলার মধ্য থেকে যা আইনের প্রজ্ঞার সাহায্যে সুরাহা করা হয়েছে। কারণ প্রতিটি কাজ আইন দ্বারা নির্দেশিত বা নিষিদ্ধ- এর মূল্য আইন দ্বারা অন্য কাজের নিরিখে আপেক্ষিকভাবে নির্ধারিত। হুকুম যা সীমানা হিসেবে নির্ধারণ করেছে, আমরা তা অমান্য করতে পারি না, যাতে একটা আমলের যে পর্যায় নির্ধারিত রয়েছে তা কমবেশি গুরুত্বপূর্ণ থাকে।
সবচেয়ে সাংঘাতিক বিষয় হচ্ছে : আমলের ওজন করা কিছু পুণ্যের কাজকে এর উপযুক্ততার চেয়ে বেশি মূল্য দেওয়া; কিংবা এর যোগ্যতার চেয়ে বেশি ব্যাপ্তি দেওয়া এর পুরস্কারে স্ফীতি ঘটিয়ে, যতক্ষণ না দ্বীনের দৃষ্টিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ কিছুকে এটা বিদূরিত না করে; অন্যদিকে কিছু নির্ধারিত কাজের অন্যায্য ওজন দেওয়া এবং এর মধ্যকার শাস্তির অতি বর্ণনা দ্বারা, এমন করা হয় যাতে ব্যক্তির মধ্যে অন্যান্য নির্ধারিত আমলের সম্বন্ধে ধারণা বিধ্বংস হয়। পুরস্কারের ওয়াদা কিংবা শাস্তির হুমকি সম্বন্ধে এই ধরনের অতিশয়োক্তি হিদায়াতের অন্বেষণকারী শিক্ষিত লোকদের মধ্যে দ্বীনের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। এসব অতিশয়োক্তি তারা যা শোনে বা পাঠ করে তা খোদ দ্বীনের সাথে যুক্ত, অথচ ইসলাম এর থেকে বিমুক্ত।
প্রায়ই এমন অতিশয়োক্তি বিশেষ করে তারহিবের দিকে চালিত করে যা মনোজাগতিক প্রত্যাগমন (reversion) বা উদ্বেগ (anxieties)। তারা লোকদের মাঝে বিরূপভাব ও ঘৃণার বীজ বপন করেছে এবং তাদের দ্বীন সম্পর্কে ভীত সন্ত্রস্ত করেছে এবং এর প্রশস্ততা থেকে দূরে রেখেছে। তাই আমরা দেখব এক পিতাকে, যিনি তার বারো বছর বয়সী কন্যার রাত্রে উৎকণ্ঠিত ও ভীত অবস্থায় জেগে ওঠার অভিযোগ করেন, কারণ সে ভীতিকর স্বপ্ন দেখে - যা তার হয় একজন বক্তা কর্তৃক কবরে প্রদত্ত শাস্তি সংক্রান্ত ক্যাসেটের বক্তৃতা শুনে, এমন ক্যাসেট যার মধ্যে এ ধরনের অনেক হাদিস রয়েছে।
মুসলিমদের কর্তব্য হচ্ছে অতিশয়োক্তির প্রভাবে পতিত না হয়ে আইনের ক্রম অনুযায়ী আমল করা। কারণ তা আমাদেরকে অতিরিক্তকরণ কিংবা চরম অবহেলার মধ্য নিয়ে যায়। যেমনটা আলী ইবনে আবি তালিব বলেন: তোমাদের ওপর বাধ্যতামূলক হচ্ছে [কিছু করার ক্ষেত্রে] মধ্যপন্থা, যা অতিদূর গমন থেকে ফিরায় [আর-গালী] এবং ব্যক্তিকে যথেষ্ট আমল করার কাজে ধরে রাখে (আল-তালী)।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 চ. একটি যঈফ হাদিস এককভাবে কোনো হুকুম প্রতিষ্ঠা করতে পারে না

📄 চ. একটি যঈফ হাদিস এককভাবে কোনো হুকুম প্রতিষ্ঠা করতে পারে না


দ্বীনের আলেমগণ যঈফ হাদিস বর্ণনার অনুমতি দিয়েছেন এরূপ করার সাথে সম্পর্কিত শর্তে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক'র মতানুযায়ী: তারা যঈফ হাদিস বর্ণনায় এর ইসনাদ পরীক্ষায় শিথিল ছিলেন পুণ্যের কাজের প্রতি আবেদন তৈরির উদ্দেশ্যে, যার পুণ্যময়তা ইতিমধ্যে গ্রহণযোগ্য আইনী যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অথবা এমন খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে, যার খারাপী ইতোমধ্যেই গ্রহণযোগ্য আইনী যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তারা যঈফ হাদিস আমলের পুণ্য বা পাপ প্রমাণে ব্যবহার করতে চাননি। তবে, সাধারণ জনসমাজের অনেকেই, বাস্তবিকপক্ষে কিছু হাদিসবিশারদও, যঈফ হাদিস বর্ণনার অনুমোদনযোগ্যতা (শর্তসহ) এবং এর দ্বারা কোনো আমল প্রতিষ্ঠার মধ্যে পার্থক্য করেননি।
এ কারণেই আমরা দেখি উদাহরণস্বরূপ, অধিকাংশ মুসলিম দেশের লোকদেরকে মধ্য-শা'বানের রাত্রে অতিরিক্ত কিছু করতে। তারা এটিকে বিশেষ রাত বানায় এর মধ্যে জাগরণের দ্বারা এবং এর দিনে রোজা রাখে আলী থেকে বর্ণিত মারফু সূত্রের হাদিসের ভিত্তিতে : যখন মধ্য শা'বানের রাত্রি আসে, রাতে জাগরণ কর এবং দিনে রোজা রাখ। কারণ মহীয়ান ও গরীয়ান আল্লাহ তায়ালা সূর্যাস্তের পর এই রাত্রে নেমে আসেন পৃথিবীর আসমানে এবং তিনি বলতে থাকেন : এমন কে আছে, যে ক্ষমা চায় আমি তাকে ক্ষমা করবো...। ইবনে মাজাহ এটি বর্ণনা করেছেন। আল-মুনযিরী এর দুর্বলতা চিহ্নিত করেছেন; আল-বুসীরীও জাওয়াইদ ইবন মাজাহ'র মধ্যে এর দুর্বলতা নিশ্চিত করেছেন।২৬
আবার অধিকাংশ মুসলিম দেশে, আমরা দেখি, লোকেরা অনেকেই আশুরা দিবসে পশু কুরবানি করে এটাকে একটা ঈদ গণ্য করে অথবা এমন একটা দিন যা নিয়মিত বার্ষিক স্মরণানুষ্ঠানের দিন এবং এদিনে তারা উদার হস্তে আত্মীয় স্বজনকে দান করে। তারা এর সবকিছুই একটা যঈফ হাদিসের ভিত্তিতে করে, যা লোকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারিত : আশুরার দিনে যে ব্যক্তি মুক্ত হস্তে আত্মীয় স্বজনকে প্রদান করে, আল্লাহ তায়ালা তার অবশিষ্ট বছরসমূহের জন্য তার প্রতি দানশীল হবেন।২৭
ইবন তাইমিয়্যাহ এবং অন্যদের মতানুযায়ী এই হাদিসটি জাল। এর সম্পর্কে আল-মুনযিরী বলেন, আল-বাইহাকী ও অন্যরা এটি একদল সাহাবির সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আল-বাইহাকী বলেন, যদিও এই হাদিসের ইসনাদ দুর্বল, কিন্তু যখন সেগুলো একত্র করা হয়, একটি অন্যটির সাথে মিলে শক্তি অর্জন করে। আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। এটি এমন বর্ণনা যা সন্দেহ উদ্রেক করে। ইবন জাওযী, ইবন তাইমিইয়াহ এবং অন্যরা একেবারেই নিশ্চিত ছিলেন যে, এই হাদিসটি জাল। কিন্তু আল-ইরাকী এবং অন্যরা এটাকে হাসান লি-গাইরিহী (অর্থাৎ এটি নিজে হাসান নয়, কিন্তু এর সমর্থক সনদসমূহ দ্বারা এটি হাসান) প্রতিপন্ন করেন। পরবর্তী অনেক আলেম এটাকে জাল হাদিস বলে রায় দেওয়া কষ্টকর মনে করেছেন।
সাক্ষ্যের ভারসাম্যের ভিত্তিতে এসবকিছু এ ধারণাই দেয় যে, এ হাদিসটি এমনই কোনো কিছু যা সুন্নিদের কিছু জ্ঞানহীন ব্যক্তি শিয়াদের বাড়াবাড়ি প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে আবিষ্কার করেছে। তাদের কাছে আশুরার দিন হচ্ছে দুঃখ ও শোকের দিন, তাই এটাকে তারা গোসল করার ও ঝকঝকে পোশাক পরার এবং শিশুদেরকে উপহার দেওয়ার দিনে পরিণত করেছে!
মুসলিম জনগণের মধ্যে অনেক ভুল বুঝাবুঝি ও ব্যাপকভাবে প্রচলিত বিদআতই যঈফ হাদিসের সূত্রে এসেছে। এগুলো তাদের পশ্চাৎপদ প্রজন্মের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করেছে, তাদের মন ও আত্মাকে প্রভাবিত করেছে এবং বিতাড়িত করেছে সহিহকে। তথাপি মুসলিমদের জন্য সহিহ প্রয়োজন কুরআনের সীমার মধ্যে- তাদের বুঝাবুঝি ও পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য। আল-ই'তিসাম গ্রন্থে আল-শাতিবী এই কর্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিইয়াহ, আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি সদয় হোন, আলেমদের এই মানসিকতা সম্পর্কে একটি স্ফটিক-স্বচ্ছ আলোচনা করেছেন, যাতে তারা মনে করেন যে, মানুষ নির্ধারিত কিছু আমলের ফাজাইল বা তারগিব ও তারহিবের সুবিধার জন্য দুর্বল হাদিসের অনুশীলন করতে পারে।
যে বিষয়ের ওপর আলেমগণ রয়েছেন [অর্থাৎ তাদের বিবেচিত মত রয়েছে] তা হচ্ছে: ফাজাইলের ওপর যঈফ হাদিসের ভিত্তিতে আমল করা হাদিস দ্বারা অনুমোদিত, কোনো আমল প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, কারণ তা [নিজেই] যুক্তি হিসেবে উদ্ধৃত নয়। কারণ অনুমোদিত আমল নিশ্চয়ই এক ধরনের আইনী আদেশ এবং তা আইনী প্রমাণ ছাড়া প্রতিষ্ঠিত নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালা হতে বর্ণনা করে যে, তিনি আইনী প্রমাণ ব্যতিরেকেই নির্ধারিত কিছু আমলকে পছন্দ করেন তিনি নিশ্চয়ই দ্বীনে [কিছু] আইন হিসেবে নির্দেশিত করেছেন, যার জন্য আল্লাহ তায়ালা থেকে তার কোনো অনুমতি নেই। এটা ঠিক যেন এরকম, সে বাধ্যতামূলক অথবা নিষিদ্ধকৃত ধরনের আমল প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ কারনেই আলেমগণ অনুমোদিত [ধরন] বিষয়ে মতভেদ করেছেন। বাস্তবিক এটা হলো দ্বীনের মৌলিক নীতি যা আইনে সংজ্ঞায়িত রয়েছে।
ঐ বিষয়ে তাদের ইচ্ছা কেবল এই ছিল যে, আমল এমনকিছু হবে যা কুরআন বা সুন্নাহ্র মূলপাঠ অথবা ইজমা [ঐকমত্য] দ্বারা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত, আল্লাহ তায়ালা তা ভালোবাসেন অথবা অপছন্দ করেন-যেমন কুরআন তেলাওয়াত এবং আল্লাহর নামের তাসবিহ করা, দোয়া করা, দানখয়রাত, দাসমুক্ত করা, লোকদের সাথে দয়ার্দ্র ব্যবহার করা এবং ঘৃণা করেন মিথ্যাকথন বা প্রতারণা এবং এর মতোই অন্যকিছু...। সুতরাং যখন কিছু অনুমোদিত ফজিলত ও পুরস্কার সম্পর্কে এবং কিছু আমলের অপকারিতা ও শাস্তি সম্পর্কে হাদিস বর্ণনা করা হয় এবং এগুলোর পুরস্কার ও শাস্তি এবং এগুলোর প্রকরণ প্রতিষ্ঠিত ও স্থিরীকৃত এবং যদি বর্ণনাকৃত হাদিস ঐরকম একটি হয় যা জাল বলে আমরা জানি না, তাহলে এর বর্ণনা এবং এর ওপর আমল করা অনুমতিযোগ্য। অর্থ হচ্ছে, আত্মা-এর দ্বারা পুরস্কার আশা করতে অথবা শাস্তির ভয়ে ভীত হতে পারে। ঠিক যেমন একজন মানুষ জানে যে, বাণিজ্যে লাভ আছে, কিন্তু ঐ জ্ঞানের পরিপূরক হিসেবে সে জানল যে, এতে বিপুল লাভ, তা সত্য হলে তাকে লাভবান করবে, কিন্তু মিথ্যা হলে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
এর একটা উদাহরণ হচ্ছে ইসরাইলীদের বর্ণনা এবং স্বপ্ন-দৃশ্যের [বর্ণনার] ওপর সালাফ ও আলেমদের কথা এবং আলেমদের সাথে সংশ্লিষ্ট ঘটনা এবং ঐপ্রকার কিছুর ওপর [নির্ভরতায়] তারগিব ও তারহিব আইনী নির্দেশনা প্রতিষ্ঠার অনুমতি প্রদান করে না- না একটি সুপারিশকৃত আমলের বা অন্যকিছুর। যা হোক, তারগিব ও তারহিবের মধ্যে উল্লেখ এবং ভয় ও শ্রদ্ধার উদ্রেক অনুমতিযোগ্য এই শর্তে যে, এ সম্পর্কে যা আকর্ষণকারী বা নিবৃত্তিমূলক তা ইতোমধ্যেই আইনী যুক্তি দ্বারা জ্ঞাত। কারণ বাস্তবিকই তা উপকারী এবং ক্ষতিকর নয়। তা সত্য বা মিথ্যার বেলাতেও এটা একইরকম। কারণ যা মানুষ মিথ্যা ও জাল বলে জানে, তার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার অনুমতি নেই। কারণ যদি এটি মিথ্যা হয়, তাহলে কোনোকিছুর জন্যই ভালো নয় এবং যদি এটা প্রতিষ্ঠিত হয় যে এটি সহিহ, তাহলে এর দ্বারা অনুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলো। যখন উভয় বিষয়ই [এটা সত্য অথবা এটা মিথ্যা] প্রয়োগ করা হয়, এটা এর সত্য হওয়া এবং মিথ্যা হলে ক্ষতিকর না হওয়ার সম্ভাবনার ওপর বর্ণিত হবে। আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন: যখন তারগিব ও তারহিব সম্পর্কিত বর্ণনা আসে, তখন আমরা ইসনাদের জন্য [সাধারণ মান] বর্ণনা সনদসহ করি এবং আমরা এমন করি যদি ঐগুলো [গুণসম্পন্ন] বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত না-ও হয়, যাতে কেউ আইনী যুক্তি ঐগুলোর ওপর দাঁড় করাতে পারে। একইভাবে কেউ এমন কথা বলে: আমলের সুবিধা আছে এমন হাদিস অনুযায়ী আমল করো, এগুলোর মধ্যে এমনগুলো করা যাতে যথার্থতা রয়েছে, যেমন কুরআন তেলাওয়াত ও [আল্লাহ তায়ালার] জিকর করা এবং নিন্দনীয় ও অসৎ প্রকৃতির কাজ এড়িয়ে চলা।
কিন্তু যদি ফাজাইল সংক্রান্ত যঈফ হাদিস এমন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে যা আইন দ্বারা স্থিরীকৃত ও সীমাবদ্ধ নির্দিষ্টকৃত গুণ তা আপনার জন্য অনুমতিযোগ্য নয়। কারণ আইনী প্রমাণ দ্বারা এটি প্রতিষ্ঠিত নয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি বিশেষ সময়ে বিশেষ তেলাওয়াত বা বিশেষ প্রার্থনা করা। [এটা। এর মধ্যে যা বর্ণিত হয়েছে তা থেকে [তার মতোই কিছু] ভিন্ন: যে কেউ বাজারে ঢুকেছে এবং বলেছে নাই কোনো ইলাহ আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত... সে এই এবং এই পাবে। এখন বাজারে আল্লাহ তায়ালার স্মরণ অনুমোদিত এই কারণে যে, ভুলোমনাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার স্মরণের ক্ষেত্রে সুপরিচিত হাদিসে এসেছে: বিস্মৃতিশীলদের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার স্মরণ হচ্ছে শুকনো বৃক্ষসমূহের মধ্যে সবুজ বৃক্ষ।২৮
পুরস্কারের পরিমাপ ক্ষেত্রে [একটি যঈফ হাদিসে] বর্ণনার ব্যাপারে এর প্রতিষ্ঠিত হওয়া ক্ষতি করে না, এটার অ-বিদ্যমানতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
উপসংহার: কোনো ব্যক্তি এই ধরনের হাদিস এবং কোনো ব্যক্তি তারগিব ও তারহিবে প্রাপ্ত হাদিস অনুযায়ী আমল করে, কিন্তু অনুমোদিত আমলে থাকে না। এর বাইরে এর ফলাফল সম্বন্ধে দৃঢ় বিশ্বাস এবং [এটা] হচ্ছে [এর জন্য] পুরস্কার ও শাস্তির মাপকাঠি-যা আইনী প্রমাণের ওপর শর্তযুক্ত।২৯
এই সুস্পষ্ট উন্মোচন সত্ত্বেও যঈফ হাদিস অনুযায়ী অনেক লোককে হালাল ও হারামের অনুমোদন ও তিরস্কারযোগ্যতার সীমা, শর্ত ও পরিমাণ প্রতিষ্ঠা করতে দেখা যায়।

টিকাঃ
২৬. হাদিসটি ইবন মাজাহ হতে, নম্বর ১৩৮৮। এর সনদে রয়েছে আবু বকর ইবন 'আবদ আল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবী সিরাহ। আহমাদ ইবন হাম্বল ও ইবন হিব্বান এবং আল-হাকিম ও ইবন আদি তাকে হাদিস জাল করার জন্য অভিযুক্ত করেছেন। এমন আরো তাহযিব আল-তাহযিব-এর মধ্যে (যেখানে তার সম্বন্ধে একই মূল্যায়ন)।
২৭. তিনি ওটা ইঙ্গিত করেন, তার মতে, এই হাদিসটি বর্ণনায় বিভিন্ন সূত্র সত্ত্বেও যঈফ। কিন্তু আল-আলবানি একে হাসান বলেছেন ইবন তাইমিইয়াহর আল-কালিম আল- তাইয়্যিব গ্রন্থের উৎস-বিচারে।
২৮. হাদিসের একটি অংশ-আল-হিলয়া গ্রন্থে ইবন 'উমার হতে আবু নু'আইম এটা বর্ণনা করেছেন। আল-'ইরাকি একে যঈফ বলেছেন। যেমনটা উদ্ধৃত হয়েছে ফয়েয আল- কাদির-এর মধ্যে, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৫৯। এর ওপর ইবন তাইমিইয়াহর আলোচনা ইঙ্গিত দেয় যে, এটা সবল।
২৯. মাজমু'আ ফতোয়া শায়খ আল-ইসলাম (রিয়াদ), খণ্ড ১৮, পৃষ্ঠা ৬৫-৬৭।

দ্বীনের আলেমগণ যঈফ হাদিস বর্ণনার অনুমতি দিয়েছেন এরূপ করার সাথে সম্পর্কিত শর্তে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক'র মতানুযায়ী: তারা যঈফ হাদিস বর্ণনায় এর ইসনাদ পরীক্ষায় শিথিল ছিলেন পুণ্যের কাজের প্রতি আবেদন তৈরির উদ্দেশ্যে, যার পুণ্যময়তা ইতিমধ্যে গ্রহণযোগ্য আইনী যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অথবা এমন খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে, যার খারাপী ইতোমধ্যেই গ্রহণযোগ্য আইনী যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তারা যঈফ হাদিস আমলের পুণ্য বা পাপ প্রমাণে ব্যবহার করতে চাননি। তবে, সাধারণ জনসমাজের অনেকেই, বাস্তবিকপক্ষে কিছু হাদিসবিশারদও, যঈফ হাদিস বর্ণনার অনুমোদনযোগ্যতা (শর্তসহ) এবং এর দ্বারা কোনো আমল প্রতিষ্ঠার মধ্যে পার্থক্য করেননি।
এ কারণেই আমরা দেখি উদাহরণস্বরূপ, অধিকাংশ মুসলিম দেশের লোকদেরকে মধ্য-শা'বানের রাত্রে অতিরিক্ত কিছু করতে। তারা এটিকে বিশেষ রাত বানায় এর মধ্যে জাগরণের দ্বারা এবং এর দিনে রোজা রাখে আলী থেকে বর্ণিত মারফু সূত্রের হাদিসের ভিত্তিতে : যখন মধ্য শা'বানের রাত্রি আসে, রাতে জাগরণ কর এবং দিনে রোজা রাখ। কারণ মহীয়ান ও গরীয়ান আল্লাহ তায়ালা সূর্যাস্তের পর এই রাত্রে নেমে আসেন পৃথিবীর আসমানে এবং তিনি বলতে থাকেন : এমন কে আছে, যে ক্ষমা চায় আমি তাকে ক্ষমা করবো...। ইবনে মাজাহ এটি বর্ণনা করেছেন। আল-মুনযিরী এর দুর্বলতা চিহ্নিত করেছেন; আল-বুসীরীও জাওয়াইদ ইবন মাজাহ'র মধ্যে এর দুর্বলতা নিশ্চিত করেছেন।২৬
আবার অধিকাংশ মুসলিম দেশে, আমরা দেখি, লোকেরা অনেকেই আশুরা দিবসে পশু কুরবানি করে এটাকে একটা ঈদ গণ্য করে অথবা এমন একটা দিন যা নিয়মিত বার্ষিক স্মরণানুষ্ঠানের দিন এবং এদিনে তারা উদার হস্তে আত্মীয় স্বজনকে দান করে। তারা এর সবকিছুই একটা যঈফ হাদিসের ভিত্তিতে করে, যা লোকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারিত : আশুরার দিনে যে ব্যক্তি মুক্ত হস্তে আত্মীয় স্বজনকে প্রদান করে, আল্লাহ তায়ালা তার অবশিষ্ট বছরসমূহের জন্য তার প্রতি দানশীল হবেন।২৭
ইবন তাইমিয়্যাহ এবং অন্যদের মতানুযায়ী এই হাদিসটি জাল। এর সম্পর্কে আল-মুনযিরী বলেন, আল-বাইহাকী ও অন্যরা এটি একদল সাহাবির সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আল-বাইহাকী বলেন, যদিও এই হাদিসের ইসনাদ দুর্বল, কিন্তু যখন সেগুলো একত্র করা হয়, একটি অন্যটির সাথে মিলে শক্তি অর্জন করে। আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। এটি এমন বর্ণনা যা সন্দেহ উদ্রেক করে। ইবন জাওযী, ইবন তাইমিইয়াহ এবং অন্যরা একেবারেই নিশ্চিত ছিলেন যে, এই হাদিসটি জাল। কিন্তু আল-ইরাকী এবং অন্যরা এটাকে হাসান লি-গাইরিহী (অর্থাৎ এটি নিজে হাসান নয়, কিন্তু এর সমর্থক সনদসমূহ দ্বারা এটি হাসান) প্রতিপন্ন করেন। পরবর্তী অনেক আলেম এটাকে জাল হাদিস বলে রায় দেওয়া কষ্টকর মনে করেছেন।
সাক্ষ্যের ভারসাম্যের ভিত্তিতে এসবকিছু এ ধারণাই দেয় যে, এ হাদিসটি এমনই কোনো কিছু যা সুন্নিদের কিছু জ্ঞানহীন ব্যক্তি শিয়াদের বাড়াবাড়ি প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে আবিষ্কার করেছে। তাদের কাছে আশুরার দিন হচ্ছে দুঃখ ও শোকের দিন, তাই এটাকে তারা গোসল করার ও ঝকঝকে পোশাক পরার এবং শিশুদেরকে উপহার দেওয়ার দিনে পরিণত করেছে!
মুসলিম জনগণের মধ্যে অনেক ভুল বুঝাবুঝি ও ব্যাপকভাবে প্রচলিত বিদআতই যঈফ হাদিসের সূত্রে এসেছে। এগুলো তাদের পশ্চাৎপদ প্রজন্মের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করেছে, তাদের মন ও আত্মাকে প্রভাবিত করেছে এবং বিতাড়িত করেছে সহিহকে। তথাপি মুসলিমদের জন্য সহিহ প্রয়োজন কুরআনের সীমার মধ্যে- তাদের বুঝাবুঝি ও পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য। আল-ই'তিসাম গ্রন্থে আল-শাতিবী এই কর্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিইয়াহ, আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি সদয় হোন, আলেমদের এই মানসিকতা সম্পর্কে একটি স্ফটিক-স্বচ্ছ আলোচনা করেছেন, যাতে তারা মনে করেন যে, মানুষ নির্ধারিত কিছু আমলের ফাজাইল বা তারগিব ও তারহিবের সুবিধার জন্য দুর্বল হাদিসের অনুশীলন করতে পারে।
যে বিষয়ের ওপর আলেমগণ রয়েছেন [অর্থাৎ তাদের বিবেচিত মত রয়েছে] তা হচ্ছে: ফাজাইলের ওপর যঈফ হাদিসের ভিত্তিতে আমল করা হাদিস দ্বারা অনুমোদিত, কোনো আমল প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, কারণ তা [নিজেই] যুক্তি হিসেবে উদ্ধৃত নয়। কারণ অনুমোদিত আমল নিশ্চয়ই এক ধরনের আইনী আদেশ এবং তা আইনী প্রমাণ ছাড়া প্রতিষ্ঠিত নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালা হতে বর্ণনা করে যে, তিনি আইনী প্রমাণ ব্যতিরেকেই নির্ধারিত কিছু আমলকে পছন্দ করেন তিনি নিশ্চয়ই দ্বীনে [কিছু] আইন হিসেবে নির্দেশিত করেছেন, যার জন্য আল্লাহ তায়ালা থেকে তার কোনো অনুমতি নেই। এটা ঠিক যেন এরকম, সে বাধ্যতামূলক অথবা নিষিদ্ধকৃত ধরনের আমল প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ কারনেই আলেমগণ অনুমোদিত [ধরন] বিষয়ে মতভেদ করেছেন। বাস্তবিক এটা হলো দ্বীনের মৌলিক নীতি যা আইনে সংজ্ঞায়িত রয়েছে।
ঐ বিষয়ে তাদের ইচ্ছা কেবল এই ছিল যে, আমল এমনকিছু হবে যা কুরআন বা সুন্নাহ্র মূলপাঠ অথবা ইজমা [ঐকমত্য] দ্বারা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত, আল্লাহ তায়ালা তা ভালোবাসেন অথবা অপছন্দ করেন-যেমন কুরআন তেলাওয়াত এবং আল্লাহর নামের তাসবিহ করা, দোয়া করা, দানখয়রাত, দাসমুক্ত করা, লোকদের সাথে দয়ার্দ্র ব্যবহার করা এবং ঘৃণা করেন মিথ্যাকথন বা প্রতারণা এবং এর মতোই অন্যকিছু...। সুতরাং যখন কিছু অনুমোদিত ফজিলত ও পুরস্কার সম্পর্কে এবং কিছু আমলের অপকারিতা ও শাস্তি সম্পর্কে হাদিস বর্ণনা করা হয় এবং এগুলোর পুরস্কার ও শাস্তি এবং এগুলোর প্রকরণ প্রতিষ্ঠিত ও স্থিরীকৃত এবং যদি বর্ণনাকৃত হাদিস ঐরকম একটি হয় যা জাল বলে আমরা জানি না, তাহলে এর বর্ণনা এবং এর ওপর আমল করা অনুমতিযোগ্য। অর্থ হচ্ছে, আত্মা-এর দ্বারা পুরস্কার আশা করতে অথবা শাস্তির ভয়ে ভীত হতে পারে। ঠিক যেমন একজন মানুষ জানে যে, বাণিজ্যে লাভ আছে, কিন্তু ঐ জ্ঞানের পরিপূরক হিসেবে সে জানল যে, এতে বিপুল লাভ, তা সত্য হলে তাকে লাভবান করবে, কিন্তু মিথ্যা হলে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
এর একটা উদাহরণ হচ্ছে ইসরাইলীদের বর্ণনা এবং স্বপ্ন-দৃশ্যের [বর্ণনার] ওপর সালাফ ও আলেমদের কথা এবং আলেমদের সাথে সংশ্লিষ্ট ঘটনা এবং ঐপ্রকার কিছুর ওপর [নির্ভরতায়] তারগিব ও তারহিব আইনী নির্দেশনা প্রতিষ্ঠার অনুমতি প্রদান করে না- না একটি সুপারিশকৃত আমলের বা অন্যকিছুর। যা হোক, তারগিব ও তারহিবের মধ্যে উল্লেখ এবং ভয় ও শ্রদ্ধার উদ্রেক অনুমতিযোগ্য এই শর্তে যে, এ সম্পর্কে যা আকর্ষণকারী বা নিবৃত্তিমূলক তা ইতোমধ্যেই আইনী যুক্তি দ্বারা জ্ঞাত। কারণ বাস্তবিকই তা উপকারী এবং ক্ষতিকর নয়। তা সত্য বা মিথ্যার বেলাতেও এটা একইরকম। কারণ যা মানুষ মিথ্যা ও জাল বলে জানে, তার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার অনুমতি নেই। কারণ যদি এটি মিথ্যা হয়, তাহলে কোনোকিছুর জন্যই ভালো নয় এবং যদি এটা প্রতিষ্ঠিত হয় যে এটি সহিহ, তাহলে এর দ্বারা অনুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলো। যখন উভয় বিষয়ই [এটা সত্য অথবা এটা মিথ্যা] প্রয়োগ করা হয়, এটা এর সত্য হওয়া এবং মিথ্যা হলে ক্ষতিকর না হওয়ার সম্ভাবনার ওপর বর্ণিত হবে। আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন: যখন তারগিব ও তারহিব সম্পর্কিত বর্ণনা আসে, তখন আমরা ইসনাদের জন্য [সাধারণ মান] বর্ণনা সনদসহ করি এবং আমরা এমন করি যদি ঐগুলো [গুণসম্পন্ন] বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত না-ও হয়, যাতে কেউ আইনী যুক্তি ঐগুলোর ওপর দাঁড় করাতে পারে। একইভাবে কেউ এমন কথা বলে: আমলের সুবিধা আছে এমন হাদিস অনুযায়ী আমল করো, এগুলোর মধ্যে এমনগুলো করা যাতে যথার্থতা রয়েছে, যেমন কুরআন তেলাওয়াত ও [আল্লাহ তায়ালার] জিকর করা এবং নিন্দনীয় ও অসৎ প্রকৃতির কাজ এড়িয়ে চলা।
কিন্তু যদি ফাজাইল সংক্রান্ত যঈফ হাদিস এমন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে যা আইন দ্বারা স্থিরীকৃত ও সীমাবদ্ধ নির্দিষ্টকৃত গুণ তা আপনার জন্য অনুমতিযোগ্য নয়। কারণ আইনী প্রমাণ দ্বারা এটি প্রতিষ্ঠিত নয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি বিশেষ সময়ে বিশেষ তেলাওয়াত বা বিশেষ প্রার্থনা করা। [এটা। এর মধ্যে যা বর্ণিত হয়েছে তা থেকে [তার মতোই কিছু] ভিন্ন: যে কেউ বাজারে ঢুকেছে এবং বলেছে নাই কোনো ইলাহ আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত... সে এই এবং এই পাবে। এখন বাজারে আল্লাহ তায়ালার স্মরণ অনুমোদিত এই কারণে যে, ভুলোমনাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার স্মরণের ক্ষেত্রে সুপরিচিত হাদিসে এসেছে: বিস্মৃতিশীলদের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার স্মরণ হচ্ছে শুকনো বৃক্ষসমূহের মধ্যে সবুজ বৃক্ষ।২৮
পুরস্কারের পরিমাপ ক্ষেত্রে [একটি যঈফ হাদিসে] বর্ণনার ব্যাপারে এর প্রতিষ্ঠিত হওয়া ক্ষতি করে না, এটার অ-বিদ্যমানতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
উপসংহার: কোনো ব্যক্তি এই ধরনের হাদিস এবং কোনো ব্যক্তি তারগিব ও তারহিবে প্রাপ্ত হাদিস অনুযায়ী আমল করে, কিন্তু অনুমোদিত আমলে থাকে না। এর বাইরে এর ফলাফল সম্বন্ধে দৃঢ় বিশ্বাস এবং [এটা] হচ্ছে [এর জন্য] পুরস্কার ও শাস্তির মাপকাঠি-যা আইনী প্রমাণের ওপর শর্তযুক্ত।২৯
এই সুস্পষ্ট উন্মোচন সত্ত্বেও যঈফ হাদিস অনুযায়ী অনেক লোককে হালাল ও হারামের অনুমোদন ও তিরস্কারযোগ্যতার সীমা, শর্ত ও পরিমাণ প্রতিষ্ঠা করতে দেখা যায়।

টিকাঃ
২৬. হাদিসটি ইবন মাজাহ হতে, নম্বর ১৩৮৮। এর সনদে রয়েছে আবু বকর ইবন 'আবদ আল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবী সিরাহ। আহমাদ ইবন হাম্বল ও ইবন হিব্বান এবং আল-হাকিম ও ইবন আদি তাকে হাদিস জাল করার জন্য অভিযুক্ত করেছেন। এমন আরো তাহযিব আল-তাহযিব-এর মধ্যে (যেখানে তার সম্বন্ধে একই মূল্যায়ন)।
২৭. তিনি ওটা ইঙ্গিত করেন, তার মতে, এই হাদিসটি বর্ণনায় বিভিন্ন সূত্র সত্ত্বেও যঈফ। কিন্তু আল-আলবানি একে হাসান বলেছেন ইবন তাইমিইয়াহর আল-কালিম আল- তাইয়্যিব গ্রন্থের উৎস-বিচারে।
২৮. হাদিসের একটি অংশ-আল-হিলয়া গ্রন্থে ইবন 'উমার হতে আবু নু'আইম এটা বর্ণনা করেছেন। আল-'ইরাকি একে যঈফ বলেছেন। যেমনটা উদ্ধৃত হয়েছে ফয়েয আল- কাদির-এর মধ্যে, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৫৯। এর ওপর ইবন তাইমিইয়াহর আলোচনা ইঙ্গিত দেয় যে, এটা সবল।
২৯. মাজমু'আ ফতোয়া শায়খ আল-ইসলাম (রিয়াদ), খণ্ড ১৮, পৃষ্ঠা ৬৫-৬৭।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 ছ. যঈফ হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে দুটি সম্পূরক শর্ত

📄 ছ. যঈফ হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে দুটি সম্পূরক শর্ত


আমার মতে তারগিব ও তারহিবের ওপর যঈফ হাদিসের অনুমতিযোগ্যতা সম্পর্কে আমরা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের মতো গ্রহণ করি, তাহলে ইতোমধ্যে উল্লিখিত তিনটি শর্তকে সুরুচিসম্পন্ন করতে আরো দুটি পরিপূরক শর্ত রয়েছে। (ঐগুলো আমার বই ছাকাফাত আল-দা'ইয়াহর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে) ঐগুলো হচ্ছে:
১. হাদিস এমন অতিরিক্ত অতিশয়োক্তি ধারণ করবে না যা যুক্তি বা আইন বা ভাষার বিরোধী;
২. হাদিস এর চেয়ে সবল কোন আইনী প্রমাণের সাথে বিরোধ ঘটাবে না।

আমার মতে তারগিব ও তারহিবের ওপর যঈফ হাদিসের অনুমতিযোগ্যতা সম্পর্কে আমরা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের মতো গ্রহণ করি, তাহলে ইতোমধ্যে উল্লিখিত তিনটি শর্তকে সুরুচিসম্পন্ন করতে আরো দুটি পরিপূরক শর্ত রয়েছে। (ঐগুলো আমার বই ছাকাফাত আল-দা'ইয়াহর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে) ঐগুলো হচ্ছে:
১. হাদিস এমন অতিরিক্ত অতিশয়োক্তি ধারণ করবে না যা যুক্তি বা আইন বা ভাষার বিরোধী;
২. হাদিস এর চেয়ে সবল কোন আইনী প্রমাণের সাথে বিরোধ ঘটাবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00