📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 তারগিব ও তারহিবে যঈফ হাদিস বর্ণনা

📄 তারগিব ও তারহিবে যঈফ হাদিস বর্ণনা


আমার মতে খতিবদের অনেকের মধ্যে, স্মরণকারী ও সতর্ককারীদের মধ্যে অস্পষ্ট, প্রত্যাখ্যাত এবং এমনকি জাল হাদিসের ব্যাপক প্রচারের কারণ হচ্ছে অধিকাংশ আলেমের মতের অনুসরণ, যা এধরনের হাদিস বর্ণনার অনুমতি প্রদান করে। আমলের ফজিলত, হৃদয়কে কোমল করা, পরিহারকরণ এবং তারগিব ও তারহিব ও এমন প্রবণতাসম্পন্ন কাহিনীর উদ্দেশ্যে তারা দুর্বল হাদিসের অনুমতি দেন ঐ পর্যন্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত এই হাদিসগুলো আইনের নির্দেশনার সাথে জড়িত হয় না, পাঁচটি অনুশাসনের অন্তর্ভুক্ত হয় না, যেমন- হালাল, হারাম, নিন্দনীয়, বাধ্যতামূলক ও প্রশংসনীয়। আত-তারগিব ওয়াত তারহিব-এর মুখবন্ধে আল-মুনযিরী লিখেছেন: তারগিব ও তারহিবের দৃষ্টিতে হাদিসের প্রকরণে আলেমগণ শিথিলতা/অবকাশ অনুমোদন করেন ঐ পর্যন্ত, যাতে তাদের অনেকেই জাল হাদিস উদ্ধৃত করেন এবং এর অবস্থা স্পষ্ট না করেন!
আল-হাকিম তাঁর মুস্তাদরাক গ্রন্থে কিতাবুদ দোয়ার প্রারম্ভে যা বলেন, এটা তারই নিকটতর: এবং আমি, আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায়, এই বর্ণনাগুলোকে প্রবাহিত করব, যাতে দুই শায়খ (আল-বুখারি ও মুসলিম)-এর নীরব দোয়ার পুস্তকাদিতে-আবু সাঈদ আবদুর রাহমান ইবনে মাহদীহ এগুলো গ্রন্থনার মতবাদ অনুসরণ করেন। এরপর তিনি আবু সাঈদ আবদুর রাহমানের প্রতি তার সনদ বিন্যাস করেন এবং তার মত উদ্ধৃত করেন:
আমরা যদি হালাল-হারাম এবং হুকুম আহকাম বিষয়ে রসুল সা. এর সুত্রকে সম্পর্কিত করি, তাহলে আমরা সনদ সম্পর্কে কঠোর হই এবং আমরা রাবিদের সমালোচনা করে থাকি। যদি আমরা আমালের নেকি বর্ণনা করি এবং পরকালের পুরস্কার ও শাস্তি এবং প্রশংসনীয় আমল ও দোয়া বর্ণনা করি, তাহলে আমরা ইসনাদ সহজ করে দিই'১৮।
আহমদ ইবনে হাম্বল তাঁর সনদসহ আল-খাতিব আল-কিফায়া গ্রন্থে কাছাকাছি ভিন্ন শব্দে একই মতামত বর্ণনা করেন। তারপর বলেন : হৃদয় কোমল করার হাদিসগুলোর মধ্যে অনুশাসনের কোনো কিছু আসেনি ব্যক্তির প্রতি শৈথিল্য প্রদর্শন করে।১৯ একইভাবে, আবু যাকারিয়া আল-আনবারী বলেন : সংশ্লিষ্ট বর্ণনা যদি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল না করত এবং অনুশাসনকে বাধ্যতামূলক না করত এবং যদি তা তারগিব ও তারহিব-এর ওপর হতো, অথবা উপাদান বা ইবাদত পদ্ধতির নিবিড়করণ অথবা শিথিলকরণ হতো, তাহলে মানুষের এর প্রতি [সহিষ্ণুতার ক্ষেত্রে] চোখ বন্ধ রাখা বাধ্যতামূলক হতো-এর বর্ণনাকে সহজ করার জন্য'১৯।
কিন্তু এই চোখ বন্ধ করে থাকা এবং এর ইসনাদকে সহজ করা কতদূর পর্যন্ত?
এর দ্বারা কিছু লোক বুঝে যে, শর্ত ছাড়াই তারগিব ও তারহিবের ভিত্তিতে হাদিস গ্রহণ করা উচিত - এমনকি এর রাবি এর বর্ণনায় যদি একাকীও হন, অথবা তার ভুলে কেউ বেপরোয়া হয় অথবা কারো কাছে অসংখ্য প্রত্যাখ্যাত বর্ণনা জমা থাকে অথবা যদি কেউ মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত হয়। সুফিদের মধ্যে কিছু অর্বাচীন ব্যক্তি জাল হাদিস বর্ণনারও অনুমতি দিয়েছেন - যেগুলো মিথ্যা, উদ্ভাবিত এবং তৈরি করা-কেবল এই শর্তে যে, তা দিয়ে ভালো কাজে উৎসাহিত করা হয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখা হয়। তাদের কেউ কেউ (যেমন আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি) তাদের নিজেদেরকে ক্ষমা করতে ঐ মতলবসহ কুরআনের বিশেষ সুরার গুরুত্ব বিষয়ে কিংবা বিশেষ উত্তম কাজের সুবিধার জন্য হাদিস উদ্ভাবনে এতদূর এগিয়েছে। লোকেরা যখন সুপরিচিত মুতাওয়াতির হাদিসটি উদ্ধৃত করেছে- যে ব্যক্তি আমার বিরুদ্ধে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা বলে, সে যেন জাহান্নামে তার স্থান করে নেয়- তারা সমগ্র ধৃষ্টতাসহ বলে : আমরা কখনও তাঁর সা. বিরুদ্ধে মিথ্যা বলি না, তবে আমরা তাঁর জন্য মিথ্যা বলি। এটা এমন এক অজুহাত যা পাপের চেয়েও কুৎসিত। এটা এই রায় প্রকাশ করে যে, দ্বীন অসম্পূর্ণ এবং তারা তাঁর সা. জন্য তা পরিপূর্ণ করে।
অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেন : আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন সম্পূর্ণ করলাম (সুরা মায়িদাহ, ৫: ৩)।
সেজন্য আলেমগণ সত্য প্রতিষ্ঠায় জীবন কোরবানি করেছেন সনদ সমূহ বা ইসনাদের শর্ত শিথিল করার সীমা স্পষ্ট। আমরা এখানে কিছু সংখ্যকের সংক্ষিপ্ত উদাহরণ উল্লেখ করতে পারি।
ইবন রজব আল-হাম্বলী (তার শারহ ইলাল আল-তিরমিজি, তিরমিজির ওপর লিখিত গ্রন্থের ওপর বলতে গিয়ে বলেন যে, অসততা অথবা বিস্মৃত হওয়ার ব্যাপারে পরিচিত অথবা তার বর্ণনায় বহু ভুল হয়, এমন অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির কোনো হাদিস সংযুক্ত করেননি) বলেন :
তিরমিজি যা উল্লেখ করেছেন সে সম্বন্ধে তার অবস্থান এই যে, তিনি এমন হাদিস উদ্ধৃত করেননি যা আইনী নির্দেশনা ও আমলের সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু যদি বর্ণনাকারীগণ হৃদয় কোমল করার এবং তারগিব ও তারহিব-এর উদ্দেশ্যে ঐসব হাদিসের কিছু বর্ণনা করেন, তাহলে ইমামদের অনেকেই এসব হাদিসের বর্ণনা দুর্বল হতে অনুমতি দিয়েছেন; এদের [ঐসব ইমামদের] মধ্যে ছিলেন ইবন মাহদী ও ইবন হাম্বল।
রাওয়াদ ইবন আল-জাররাহ বলেন : আমি সুফিয়ান আল-সাওরীকে বলতে শুনেছি, প্রধানদের কাছ থেকে ব্যতীত হালাল ও হারাম বিষয়ে এই জ্ঞান গ্রহণ করো না, যারা তাদের জ্ঞানের জন্য বিখ্যাত, যারা সংযোজন ও বিয়োজন [একটি বর্ণনার গুণাগুণ বুঝতে যে সামঞ্জস্যবিধান প্রয়োজন] করতে জানেন এবং এর চেয়ে ভিন্নরূপ কি সে সম্বন্ধে কোনো প্রতিবাদ নেই [অর্থাৎ হালাল ও হারাম বিষয়ে] সম্মানিত জ্যেষ্ঠগণের [এমন লোক যারা দীনদারীর জন্য পরিচিত, কিন্তু হাদিসে বিশেষজ্ঞ নন] কাছ থেকে গ্রহণে।
ইবন আবী হাতিম বলেন:
আমার পিতা আবদাহ থেকে আমাদেরকে জানান, তিনি বলেন: ইবন আল-মুবারক যখন কোনো লোক থেকে হাদিস বর্ণনা করছিলেন তখন তাকে বলা হলো এই লোকটি দুর্বল! তখন [ইবন আল-মুবারক] বললেন: একজন দুর্বল রাবি থেকে বর্ণনা মেনে নেওয়া হয় এই [সীমা] পর্যন্ত অথবা ঐসব জিনিস পর্যন্ত। সুতরাং আমি আবদাহকে বললাম: কোন জিনিসগুলোর মতো এটা হতে পারে? তিনি বললেন: আদব কায়দা, উপদেশ, নিষেধকরণ বিষয়ে।
মুসা ইবন উবায়দা আল-রাবযী এমন এক ব্যক্তি যিনি তার দীনদারী [হাদিস বিশেষজ্ঞ নন] এবং বর্ণনায় দুর্বলতার জন্য পরিচিত। তার সম্বন্ধে ইবন মু'ঈন বলেন যে, আল-রাবযী তার হৃদয় কোমল করা হাদিস হতে লিখেছেন।
ইবন উয়ায়নাহ বলেন:
বাকিইয়‍্যা [অর্থাৎ বাকিইয়্যা ইবন ওয়ালীদ) থেকে শুনো না, যা সুন্নাহর মধ্যে রয়েছে, পরকালের) পুরস্কার এবং এছাড়া অন্যকিছু সম্পর্কে শুনবে।
আহমাদ ইবন হাম্বল ইবন ইসহাক [বিখ্যাত সিরাত গ্রন্থের লেখক মুহাম্মদ ইবন ইসহাক সম্বন্ধে বলেন: লোকেরা যুদ্ধ এবং এরূপ বিষয় সম্বন্ধে তার কাছ থেকে লেখেন।
যিয়াদ আল-বাকা'ই সম্বন্ধে ইবন মুসা বলেন:
যুদ্ধ সম্বন্ধে তার প্রতি কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু এ ছাড়া অন্য বিষয়ে: না।২০
ইবন হাজার বলেন:
প্রকৃতপক্ষে কেবল তারহিব ও তারগিব এবং তিরস্কার ও উত্তম আচরণ সম্পর্কে ঐসব লোকের হাদিস বর্ণনা করা হয় যারা বিস্মৃতিপরায়ণ হলেও মিথ্যাকথনের জন্য সন্দেহভাজন নন। সন্দেহভাজন লোকদের সম্পর্কে বলতে গেলে, মানুষ তাদের হাদিস পরিত্যাগ করে। এমনটাই বলেন ইবন আবী হাতীম এবং অন্যরা।
যে বক্তব্য এইমাত্র উদ্ধৃত করা হলো (এবং তাদের মত অন্যরা) এটা স্পষ্ট করে যে, হাদিসের ইমামগণের একজনও তারগিব ও তারহিব সংক্রান্ত বর্ণনা সবার কাছে থেকে সামগ্রিকভাবে ও পৃথকভাবে এলোমেলোভাবে গ্রহণ করেননি, যদি ঐগুলোর বর্ণনাকারীগণ মিথ্যাকথন থেকে মুক্ত ছিলেন না, যদি তারা তাদের বর্ণনাক্ষেত্রে অতিরিক্তভাবে প্রমাদ প্রবণ ছিলেন। তারা এমন কিছু বর্ণনাকারীর বর্ণনা অনুমোদন করেছেন যাদের মুখস্থ রাখার সামর্থ্যে কিছুটা নমনীয়তা বা দুর্বলতা ছিল এবং যদিও তারা জ্ঞানের বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন না (যেমন সুফিয়ান আল-সাওরী বলেন), তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সাধুতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ ছিল না। সন্দেহ ছিল কেবল তাদের মনে রাখার সামর্থ্য, তাদের সচেতনতা ও পূর্ণতা নিয়ে।
হৃদয় কোমল করা ও তারগিব সংক্রান্ত যঈফ হাদিসগুলোর গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে ইবন হাজার তিনটি শর্ত উল্লেখ করেছে। পরে আল-সুয়ূতী এগুলোকে তার তাদরিব আল-রাবি গ্রন্থে স্থান দেন।
প্রথম শর্ত: এই শর্তের ওপর ঐকমত্য হয়েছে। এটা এমন যে, বর্ণনাকারী বা বর্ণনা দুর্বল হতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত দুর্বল নয়। এক্ষেত্রে বর্ণনাকারী মাত্র একজন হলে বাদ যাবেন। পরিচিত মিথ্যুকদের মধ্যে হলে বা মিথ্যুক বলে অভিযুক্তদের একজন হলে এবং তার ভুলের ব্যাপারে নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ হলে তা পরিত্যাজ্য।
দ্বিতীয় শর্ত: হাদিসের একটা সাধারণ বিধি রয়েছে (অর্থাৎ এটা আহকাম ও দ্বীনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, বিরোধী হবে না)। এক্ষেত্রে এমন কিছু যা উদ্ভাবিত হয়েছে, যার পক্ষে কোনো প্রকার উৎসের খোঁজ পাওয়া যায় না, তা বাদ যাবে।
তৃতীয় শর্ত: এমন হাদিসের ওপর আমল করাকালে এটা এমন হয় যে, রসুল সা. থেকে তা প্রতিষ্ঠিত বলে বিশ্বাস করা যায় না। এভাবে যা রসুল সা. বলেননি, তা তাঁর প্রতি (অশুদ্ধভাবে) আরোপ করা যাবে না। এমন ধরনের হাদিস যদি আমল করা হয়ে থাকে, তাহলে এটাকে কেবল পূর্ব সতর্কতা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
আল-সুয়ূতী বলেন: শেষের দুটো শর্ত ইবন আবদুস সালাম ও তার ছাত্র ইবন দাকীক আল-ঈদ থেকে এবং প্রথমটির ব্যাপারে ঐকমত্য সম্পর্কে আল-'আলা'ই বর্ণনা দিয়েছেন২১।

টিকাঃ
১৭. আল-মুসতাদরাক, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৯০।
১৮. যদি আমরা আল্লাহর রসুল সা. হতে সম্পৃক্ত করি হালাল ও হারাম বিষয়ক সুন্নাহ্ ও বিধানাদি, তাহলে আমরা ইসনাদ সম্বন্ধে কঠোর এবং রাবিদের সমালোচনা করি। আর যদি আমরা রসুল সা., আমলের ফজিলত, পুরস্কার ও [পরকালে) শাস্তি, নির্দেশিত কার্যসমূহ এবং দোয়া সম্পর্কে আলোচনা করি, তাহলে সনদের ব্যাপারে নমনীয়তা দেখাই।
১৯. আল-খতিব, আল কিফায়া (আল-মাদিনাহ আল-মুনাওয়ারা; আল-মাকতাব আল- 'ইলমিয়্যাহ), পৃষ্ঠা ১৩৪।
২০. ইবন রজব, শারহ 'ইলাল-আল-তিরমিজি (সম্পাদনা: নূর আল-দীন আল-'ইত্র) ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা সংখ্যা-৭২-৭৪
২১. তাদরিব আল-রাবি'আলা তাকরীয আল-নাওয়াবি (সম্পাদনা: 'আবদ আল-ওয়াহহাব 'আবদ আল-লাতিফ; কায়রো দার আল-হাদিস), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯৭, ২৯৯।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 যুক্তি বা আইন বা ভাষার বিরোধী কী?

📄 যুক্তি বা আইন বা ভাষার বিরোধী কী?


হাদিস গবেষকগণ ঐকমত্যে উপনীত হয়েছেন যে, জাল হাদিস লক্ষণ দ্বারা পরিচিত যা বর্ণনাকারী বা বর্ণনার মধ্যেই থাকে। যা বর্ণনা করা হয়েছে তার প্রামাণ্য লক্ষণাদি হচ্ছে: (ক) জালিয়াতির সাধারণ সাক্ষ্য, তা এই যে, বর্ণনা যুক্তির বিপরীত, তাই এর ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা অনুভূতি ও ধারণার দ্বারা সহজেই বাতিলযোগ্য। অথবা (খ) বর্ণনাটি মুতাওয়াতির বা অকাট্য কিতাব ও সুন্নাহর সুনির্দিষ্ট প্রমাণের বিপরীত, অথবা সুনির্দিষ্ট ইজমার (ঐকমত্যের) এবং এ দুটির মধ্যে বিরাজমান বৈপরীত্য নিরসনের কোনো সম্ভাবনাও নেই। অথবা (গ) বর্ণনাটির বিশাল বিষয় নিয়ে কিছু করার রয়েছে, যে সম্পর্কে পৌছে দেওয়ার জন্য উপস্থিত একদল মানুষের গভীর প্রত্যাশাও রয়েছে অথচ মাত্র একজন তা পৌছিয়েছে। ঐসব প্রমাণিত লক্ষণের মধ্যে আরো রয়েছে : ছোটখাট বিষয়ে কঠিন হুমকির চূড়ান্ত অথবা সামান্য ব্যাপারে কঠিন প্রতিজ্ঞা; এমনটা কাহিনী-বর্ণনাকারীদের মধ্যে সাধারণভাবে বিদ্যমান।
এমনকি হাদিসবেত্তাগণের মধ্যেও এমন অনেকেই রয়েছেন যারা তারগিব ও তারহিব এবং এমন বিষয়াদি বর্ণনার ক্ষেত্রে এসব মূল উপাদান প্রয়োগ করেন না। সম্ভবত তাদের ক্ষেত্রে বয়সের আর বিবেচনার অবকাশ রয়েছে।

হাদিস গবেষকগণ ঐকমত্যে উপনীত হয়েছেন যে, জাল হাদিস লক্ষণ দ্বারা পরিচিত যা বর্ণনাকারী বা বর্ণনার মধ্যেই থাকে। যা বর্ণনা করা হয়েছে তার প্রামাণ্য লক্ষণাদি হচ্ছে: (ক) জালিয়াতির সাধারণ সাক্ষ্য, তা এই যে, বর্ণনা যুক্তির বিপরীত, তাই এর ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা অনুভূতি ও ধারণার দ্বারা সহজেই বাতিলযোগ্য। অথবা (খ) বর্ণনাটি মুতাওয়াতির বা অকাট্য কিতাব ও সুন্নাহর সুনির্দিষ্ট প্রমাণের বিপরীত, অথবা সুনির্দিষ্ট ইজমার (ঐকমত্যের) এবং এ দুটির মধ্যে বিরাজমান বৈপরীত্য নিরসনের কোনো সম্ভাবনাও নেই। অথবা (গ) বর্ণনাটির বিশাল বিষয় নিয়ে কিছু করার রয়েছে, যে সম্পর্কে পৌছে দেওয়ার জন্য উপস্থিত একদল মানুষের গভীর প্রত্যাশাও রয়েছে অথচ মাত্র একজন তা পৌছিয়েছে। ঐসব প্রমাণিত লক্ষণের মধ্যে আরো রয়েছে : ছোটখাট বিষয়ে কঠিন হুমকির চূড়ান্ত অথবা সামান্য ব্যাপারে কঠিন প্রতিজ্ঞা; এমনটা কাহিনী-বর্ণনাকারীদের মধ্যে সাধারণভাবে বিদ্যমান।
এমনকি হাদিসবেত্তাগণের মধ্যেও এমন অনেকেই রয়েছেন যারা তারগিব ও তারহিব এবং এমন বিষয়াদি বর্ণনার ক্ষেত্রে এসব মূল উপাদান প্রয়োগ করেন না। সম্ভবত তাদের ক্ষেত্রে বয়সের আর বিবেচনার অবকাশ রয়েছে।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 যা ভাষাকে বিচলিত করে সে সম্বন্ধে

📄 যা ভাষাকে বিচলিত করে সে সম্বন্ধে


এই শ্রেণিতে অনেক হাদিস রয়েছে যা গল্প কথকগণ বর্ণনা করেন। উদাহরণস্বরূপ, দারাজ আবু আল-সামাহ কুরআনের ভাষ্যে এমন শব্দ সংযোজন করেছেন যার ভাষাগত অর্থ মৌলিকভাবে স্পষ্ট, কিন্তু এর জন্য তিনি যে ব্যাখ্যাসমূহ বর্ণনা করেছেন তা এদের অভিনবত্ব আভিধানিক অর্থের দূরত্বের কারণে বিপথমুখী। আবু সাঈদ থেকে মারফু সূত্রে আবু হায়সাম থেকে বর্ণিত হাদিস এর উদাহরণ: ওয়ায়েল-এর অর্থ হচ্ছে জাহান্নামের গহ্বর অবিশ্বাসীরা এতে পতিত হতে থাকবে চল্লিশ বছর ধরে তলদেশে পৌঁছানো পর্যন্ত। ইবন হাম্বল এবং আল-তিরমিজি কিছুটা অভিন্ন বর্ণনা করেছেন তাদের এই শব্দগুচ্ছ সত্তর বছর ব্যতীত। কিন্তু ওয়ায়েল শব্দের অর্থ ধ্বংসের হুমকি যা ইসলামের পূর্বে ও পরে সুবিদিত।৩০ আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যায়, আল-তাবারানি ও আল-বাইহাকীর মতানুযায়ী ইবন মাসউদ থেকে, আল-গাইয়্যি বিষয়ে এই আয়াত সম্পর্কে তার ভাষ্য:
অতঃপর তাদের পর এলো অপদার্থ পরবর্তীরা, তারা সালাত হারাল, আর লালসার বশবর্তী হলো। তারা শীঘ্রই ধ্বংসের সম্মুখীন হবে (সুরা মারইয়াম, ১৯: ৫৯)।
ইবন মাসউদ বলেন: জাহান্নামের একটি গহ্বর এবং একটি ভিন্ন বর্ণনায়: জাহান্নামের আগুন। কিন্তু গাইয়্যি একটি সুপরিচিত শব্দ এবং এটি রুশদ (হিদায়াত) শব্দের বিপরীতার্থক, যেমনটা এই আয়াতে:
সত্য পথ (আল-রুশদ) স্পষ্টভাবে পৃথক হয়েছে ভ্রান্ত পথ হতে (আল-গাইয়্যি) (সুরা বাকারা, ২: ২৫৬)।
আনাস ইবন মালিক হতে আল-বাইহাকী ও অন্যরা এ আয়াতের ওপর একই রকম বলেছেন:
এবং আমি উভয় দলের মাঝে রেখে দেব এক ধ্বংস-গহ্বর (মাওবিক) (সুরা কাহাফ, ১৮: ৫২)।
মাওবিকের অর্থ সম্পর্কে আনাস বলেন: পুঁজ ও রক্তভর্তি গহ্বর। এমনকি শাফী ইবন মা-তি হতে ইবন আবিদ কর্তৃক দুনিয়া'র বর্ণনা আরো অভিনব, তা এই যে: জাহান্নামের মধ্যে আছাম নামে একটি গর্ত রয়েছে যার মধ্যে রয়েছে সাপ ও বিচ্ছু ...। তিনি এই আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করেন:
আর যে এগুলো করে, সে আছামা-এর সাক্ষাৎ লাভ করবে (শাস্তি দেখতে পাবে) (সুরা ফুরকান, ২৫: ৬৮)।
কিন্তু আছাম হচ্ছে ইছম (পাপ, অন্যায়) শব্দ হতে উদ্ভূত।
এটা বাস্তবিকপক্ষে দুঃখজনক যে, আল-মুনযিরী (রহ.) তাঁর আল-তারগিব ওয়াত তারহিব পুস্তকে এই হাদিসগুলো উদ্ধৃত করতে পারতেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রতি করুণা করুন। অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, খুতবা প্রস্তুতকারীরা তাঁর কাছে দৌড়ে যেত এবং তাঁর চেয়ে বেশি করত। এ কারণেই আমরা আমাদের গ্রন্থ আল-মুনতাকা মিনাল তারগিব ওয়াত তারহিব-এর মধ্যে এর বিরুদ্ধে যুক্তি পেশ করেছি।
একটি সবলতর আইনী যুক্তির সাথে এর বিরোধ থাকা উচিত নয়। আবদুর রহমান ইবন আওফ সম্পর্কে বর্ণনায় যঈফ হাদিসগুলোর উদাহরণ পাওয়া যায়। তা এই যে, তিনি তার ধন সম্পদের কারণে চারজনের মধ্যে সবার উপরে জান্নাতে প্রবেশ করেছেন। দাবি করা হয়েছে যে, এসব হাদিস সম্পদের বিষয়ে কঠিন পরীক্ষার বিরুদ্ধে সাধারণ সতর্কবাণীর সাথে এবং সম্পদশালীদের ক্রোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যাহোক আমরা অবশ্যই লক্ষ্য রাখব যে, আবদুর রহমান ইবন আউফ সেই দশজনের মধ্যে একজন যাদেরকে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
খুব বিস্তারিতভাবে প্রত্যায়িত ঘটনাবলী এবং অতিবিশ্বাসযোগ্য বর্ণনার কথা বলাই বাহুল্য এর সবগুলোই এটা প্রতিষ্ঠা করে যে, তিনি দশজন মহত্তর মুসলিমের একজন ছিলেন, নেক আমল ও আল্লাহ তায়ালা ভীতিতে মহান, তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ তায়ালার রাস্তায় অকাতরে সম্পদ ব্যয় করতেন এবং তিনি আল্লাহ তায়ালার সত্যিকার শোকরগুজার বান্দার আদর্শ। এ কারনেই আল্লাহর রসুল সা. তার প্রশংসা করেছেন এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। উমার রা. তাকে তার মজলিসে শুরার ছয় সদস্যের একজন নিযুক্ত করেছিলেন এবং যখন সকলের মত একরকম হতো তখন তার (আবদুর রহমান ইবনে আউফ) মতামতকে অন্যদের ওপর অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব দিতেন।
এ কারনেই আল-মুনজিরী এসব হাদিসকে তাদের অন্যায্যতার জন্য খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন : একদল সাহাবির একটি হাদিস মারফত রসুল সা. থেকে আমাদের কাছে সঠিক নয় এমন কিছু এসেছে যে, আবদুর রহমান ইবন আউফ তার বিশাল সম্পদের জন্য চারজনের সবার ওপরে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। ঐ হাদিসগুলোর সর্বোত্তমটি আপত্তি থেকে নিরাপদ নয় এবং হাসান পর্যায়ের কোনো কিছু কোনো একজন রাবি থেকেও কখনো আসেনি। ৩১ নিঃসন্দেহে তার সম্পদের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল যা রসুল সা. উল্লেখ করেছেন : একজন সৎকর্মশীল মানুষের সভাবে উপার্জিত সম্পদ কতই না উত্তম! সুতরাং পরকালে তাঁর অবস্থান কিভাবে হ্রাসপ্রাপ্ত হবে, বা অপর্যাপ্তভাবে তাঁর বিচার করা হবে, এই সম্প্রদায়ের অন্যান্য সম্পদশালী লোকদের বাদ দিয়ে? এবং এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় আবদুর রহমান ইবন আউফ ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এমন বর্ণনা আসেনি। এটা বলা কেবল সম্প্রদায়ের ধনীদের ওপর দরিদ্র লোকদের নিরঙ্কুশ অগ্রাধিকার বুঝানোর ক্ষেত্রেই সঠিক হতে পারে। আল্লাহ তায়ালাই উত্তম জানেন।
আল-গারানিক-এর হাদিসটি এ ধরনের আরেকটি উদাহরণ। নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাদের ইবনে হাজার-এর মানসম্পন্ন একজন হাদিস বিশেষজ্ঞ (হাফিয) রয়েছেন। আল-বুখারির ভাষ্য-লেখক এই হাদিস সম্বন্ধে এমন বর্ণনা দেন যে, যেহেতু এটি কতকগুলো সূত্র থেকে বর্ণিত হয়েছে, এর অবশ্যই একটি উৎস রয়েছে। কিন্তু এটি এমন হাদিস যা স্পষ্ট যুক্তি গ্রহণে অসম্মত এবং বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। শাইখ আল-আলবানি তার নাসবা আল-মাজানিক লি-নাসফ কিস্সাত আল-গারানিক গ্রন্থে এটি সংকলন করেছেন। মুহাম্মদ সাদিক আরজানও তার মূল্যবান গ্রন্থ রসুল সা.-এর মধ্যে এসব গল্পের ভিত্তিহীনতা মোটামুটি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন এবং এগুলোকে বাজে মিথ্যা বলে বর্ণনা করেছেন।

টিকাঃ
৩০. ইবন হাম্বল ও আল-হাকিম এটা বর্ণনা করেছেন এবং আল-যাহাবি এটাকে সহিহ বলে প্রত্যায়ন করেছেন।
৩১. দেখুন আল-মুনযিরি, আল-তারগিব (সম্পাদনা মুহাম্মাদ মুহঈ আল-দিন 'আবদ আল-হামিদ), হাদিস নম্বর ৪৫৭৬।

এই শ্রেণিতে অনেক হাদিস রয়েছে যা গল্প কথকগণ বর্ণনা করেন। উদাহরণস্বরূপ, দারাজ আবু আল-সামাহ কুরআনের ভাষ্যে এমন শব্দ সংযোজন করেছেন যার ভাষাগত অর্থ মৌলিকভাবে স্পষ্ট, কিন্তু এর জন্য তিনি যে ব্যাখ্যাসমূহ বর্ণনা করেছেন তা এদের অভিনবত্ব আভিধানিক অর্থের দূরত্বের কারণে বিপথমুখী। আবু সাঈদ থেকে মারফু সূত্রে আবু হায়সাম থেকে বর্ণিত হাদিস এর উদাহরণ: ওয়ায়েল-এর অর্থ হচ্ছে জাহান্নামের গহ্বর অবিশ্বাসীরা এতে পতিত হতে থাকবে চল্লিশ বছর ধরে তলদেশে পৌঁছানো পর্যন্ত। ইবন হাম্বল এবং আল-তিরমিজি কিছুটা অভিন্ন বর্ণনা করেছেন তাদের এই শব্দগুচ্ছ সত্তর বছর ব্যতীত। কিন্তু ওয়ায়েল শব্দের অর্থ ধ্বংসের হুমকি যা ইসলামের পূর্বে ও পরে সুবিদিত।৩০ আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যায়, আল-তাবারানি ও আল-বাইহাকীর মতানুযায়ী ইবন মাসউদ থেকে, আল-গাইয়্যি বিষয়ে এই আয়াত সম্পর্কে তার ভাষ্য:
অতঃপর তাদের পর এলো অপদার্থ পরবর্তীরা, তারা সালাত হারাল, আর লালসার বশবর্তী হলো। তারা শীঘ্রই ধ্বংসের সম্মুখীন হবে (সুরা মারইয়াম, ১৯: ৫৯)।
ইবন মাসউদ বলেন: জাহান্নামের একটি গহ্বর এবং একটি ভিন্ন বর্ণনায়: জাহান্নামের আগুন। কিন্তু গাইয়্যি একটি সুপরিচিত শব্দ এবং এটি রুশদ (হিদায়াত) শব্দের বিপরীতার্থক, যেমনটা এই আয়াতে:
সত্য পথ (আল-রুশদ) স্পষ্টভাবে পৃথক হয়েছে ভ্রান্ত পথ হতে (আল-গাইয়্যি) (সুরা বাকারা, ২: ২৫৬)।
আনাস ইবন মালিক হতে আল-বাইহাকী ও অন্যরা এ আয়াতের ওপর একই রকম বলেছেন:
এবং আমি উভয় দলের মাঝে রেখে দেব এক ধ্বংস-গহ্বর (মাওবিক) (সুরা কাহাফ, ১৮: ৫২)।
মাওবিকের অর্থ সম্পর্কে আনাস বলেন: পুঁজ ও রক্তভর্তি গহ্বর। এমনকি শাফী ইবন মা-তি হতে ইবন আবিদ কর্তৃক দুনিয়া'র বর্ণনা আরো অভিনব, তা এই যে: জাহান্নামের মধ্যে আছাম নামে একটি গর্ত রয়েছে যার মধ্যে রয়েছে সাপ ও বিচ্ছু ...। তিনি এই আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করেন:
আর যে এগুলো করে, সে আছামা-এর সাক্ষাৎ লাভ করবে (শাস্তি দেখতে পাবে) (সুরা ফুরকান, ২৫: ৬৮)।
কিন্তু আছাম হচ্ছে ইছম (পাপ, অন্যায়) শব্দ হতে উদ্ভূত।
এটা বাস্তবিকপক্ষে দুঃখজনক যে, আল-মুনযিরী (রহ.) তাঁর আল-তারগিব ওয়াত তারহিব পুস্তকে এই হাদিসগুলো উদ্ধৃত করতে পারতেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রতি করুণা করুন। অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, খুতবা প্রস্তুতকারীরা তাঁর কাছে দৌড়ে যেত এবং তাঁর চেয়ে বেশি করত। এ কারণেই আমরা আমাদের গ্রন্থ আল-মুনতাকা মিনাল তারগিব ওয়াত তারহিব-এর মধ্যে এর বিরুদ্ধে যুক্তি পেশ করেছি।
একটি সবলতর আইনী যুক্তির সাথে এর বিরোধ থাকা উচিত নয়। আবদুর রহমান ইবন আওফ সম্পর্কে বর্ণনায় যঈফ হাদিসগুলোর উদাহরণ পাওয়া যায়। তা এই যে, তিনি তার ধন সম্পদের কারণে চারজনের মধ্যে সবার উপরে জান্নাতে প্রবেশ করেছেন। দাবি করা হয়েছে যে, এসব হাদিস সম্পদের বিষয়ে কঠিন পরীক্ষার বিরুদ্ধে সাধারণ সতর্কবাণীর সাথে এবং সম্পদশালীদের ক্রোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যাহোক আমরা অবশ্যই লক্ষ্য রাখব যে, আবদুর রহমান ইবন আউফ সেই দশজনের মধ্যে একজন যাদেরকে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
খুব বিস্তারিতভাবে প্রত্যায়িত ঘটনাবলী এবং অতিবিশ্বাসযোগ্য বর্ণনার কথা বলাই বাহুল্য এর সবগুলোই এটা প্রতিষ্ঠা করে যে, তিনি দশজন মহত্তর মুসলিমের একজন ছিলেন, নেক আমল ও আল্লাহ তায়ালা ভীতিতে মহান, তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ তায়ালার রাস্তায় অকাতরে সম্পদ ব্যয় করতেন এবং তিনি আল্লাহ তায়ালার সত্যিকার শোকরগুজার বান্দার আদর্শ। এ কারনেই আল্লাহর রসুল সা. তার প্রশংসা করেছেন এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। উমার রা. তাকে তার মজলিসে শুরার ছয় সদস্যের একজন নিযুক্ত করেছিলেন এবং যখন সকলের মত একরকম হতো তখন তার (আবদুর রহমান ইবনে আউফ) মতামতকে অন্যদের ওপর অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব দিতেন।
এ কারনেই আল-মুনজিরী এসব হাদিসকে তাদের অন্যায্যতার জন্য খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন : একদল সাহাবির একটি হাদিস মারফত রসুল সা. থেকে আমাদের কাছে সঠিক নয় এমন কিছু এসেছে যে, আবদুর রহমান ইবন আউফ তার বিশাল সম্পদের জন্য চারজনের সবার ওপরে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। ঐ হাদিসগুলোর সর্বোত্তমটি আপত্তি থেকে নিরাপদ নয় এবং হাসান পর্যায়ের কোনো কিছু কোনো একজন রাবি থেকেও কখনো আসেনি। ৩১ নিঃসন্দেহে তার সম্পদের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল যা রসুল সা. উল্লেখ করেছেন : একজন সৎকর্মশীল মানুষের সভাবে উপার্জিত সম্পদ কতই না উত্তম! সুতরাং পরকালে তাঁর অবস্থান কিভাবে হ্রাসপ্রাপ্ত হবে, বা অপর্যাপ্তভাবে তাঁর বিচার করা হবে, এই সম্প্রদায়ের অন্যান্য সম্পদশালী লোকদের বাদ দিয়ে? এবং এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় আবদুর রহমান ইবন আউফ ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এমন বর্ণনা আসেনি। এটা বলা কেবল সম্প্রদায়ের ধনীদের ওপর দরিদ্র লোকদের নিরঙ্কুশ অগ্রাধিকার বুঝানোর ক্ষেত্রেই সঠিক হতে পারে। আল্লাহ তায়ালাই উত্তম জানেন।
আল-গারানিক-এর হাদিসটি এ ধরনের আরেকটি উদাহরণ। নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাদের ইবনে হাজার-এর মানসম্পন্ন একজন হাদিস বিশেষজ্ঞ (হাফিয) রয়েছেন। আল-বুখারির ভাষ্য-লেখক এই হাদিস সম্বন্ধে এমন বর্ণনা দেন যে, যেহেতু এটি কতকগুলো সূত্র থেকে বর্ণিত হয়েছে, এর অবশ্যই একটি উৎস রয়েছে। কিন্তু এটি এমন হাদিস যা স্পষ্ট যুক্তি গ্রহণে অসম্মত এবং বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। শাইখ আল-আলবানি তার নাসবা আল-মাজানিক লি-নাসফ কিস্সাত আল-গারানিক গ্রন্থে এটি সংকলন করেছেন। মুহাম্মদ সাদিক আরজানও তার মূল্যবান গ্রন্থ রসুল সা.-এর মধ্যে এসব গল্পের ভিত্তিহীনতা মোটামুটি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন এবং এগুলোকে বাজে মিথ্যা বলে বর্ণনা করেছেন।

টিকাঃ
৩০. ইবন হাম্বল ও আল-হাকিম এটা বর্ণনা করেছেন এবং আল-যাহাবি এটাকে সহিহ বলে প্রত্যায়ন করেছেন।
৩১. দেখুন আল-মুনযিরি, আল-তারগিব (সম্পাদনা মুহাম্মাদ মুহঈ আল-দিন 'আবদ আল-হামিদ), হাদিস নম্বর ৪৫৭৬।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 জ্ঞানী প্রচারক জনগনের নিকট অস্পষ্ট কিছু পৌঁছান না

📄 জ্ঞানী প্রচারক জনগনের নিকট অস্পষ্ট কিছু পৌঁছান না


একজন উজ্জীবিত প্রচারক হাদিস নামে পরিচিত সব কিছুই মানুষের কাছে পৌছান না, এমনকি সহিহ হলেও। ক্বাওয়াইদ আল-তাহদিস গ্রন্থে জামাল উদ্দীন আল-কাসিমী বলেন:
সব সহিহ হাদিসই সাধারণ লোকদের কাছে পৌছানো হয় না। এ ক্ষেত্রে প্রমাণ হচ্ছে, শায়খাঈন [আল-বুখারি ও মুসলিম] মু'আয থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন আমি রসুল সা.-এর পিছনে সওয়ারিতে উপবিষ্ট ছিলাম। এসময় তিনি সা. বললেন: মুয়ায! তুমি কি জানো বান্দাদের ওপর আল্লাহ তায়ালার অধিকার কী? আমি বললাম: আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুলই ভালো জানেন। তিনি সা. বললেন निश्चय বান্দার ওপর আল্লাহ তায়ালার অধিকার হচ্ছে যে, তারা তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছু শরিক করবে না এবং বান্দার অধিকার হচ্ছে, যারা তাঁর সাথে কোনো কিছু শরিক করে না তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন না। আমি বললাম হে আল্লাহর রসুল, আমি কি লোকদেরকে এই শুভ সংবাদ জানিয়ে দেবো? তিনি সা. বললেন: না, তাদেরকে এই শুভ সংবাদ জানিও না, কারণ তারা অলস হয়ে পড়বে!
অন্য একটি বর্ণনায় উভয়েই [আল-বুখারি ও মুসলিম] করেছেন, তাতে আনাস থেকে জানা যায় যে রসুল সা. মুয়ায কে বললেন, যিনি সরাসরি তাঁর সা. পেছনে বসে ছিলেন, এমন কোনো ব্যক্তি নেই যে সর্বান্তঃকরণে সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রসুল, সে জাহান্নামে যাবে, সেই বিষয় ছাড়া যে বিষয়ে আল্লাহই তাকে আগুন থেকে বাঁচাবার মালিক। তিনি (মুয়ায) বললেন: হে আল্লাহর রসুল! আমি কি লোকদের এই সংবাদ জানাব না যাতে তারা এই শুভ সংবাদে উল্লসিত হতে পারে? তিনি সা. বললেন তাহলে তারা আমল করা থেকে বিরত থাকবে।
মুয়ায রা. তার মৃত্যুকালে [কাউকে] এটা জানিয়ে গেছেন [জ্ঞান পৌছে দেওয়া এবং তা গোপন না করা সম্পর্কিত নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ। এর গুনাহ হতে বাঁচার জন্য। আল-বুখারি এটি বর্ণনা করেছেন একটি নোটে [অর্থাৎ কোনো সনদ সংযুক্ত না করে] আলী থেকে : লোকদের কাছে পৌছাবে যা তারা জানে [এবং যাতে অনুধাবন করতে পারে]; তোমরা কি চাও আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুলকে অস্বীকার করা হোক? ইবন মাসউদ-এর এরকমই একটি উক্তি রয়েছে- তুমি ঐ লোকদের কাছে হাদিস পৌছাওনি যাদের মন এটা অর্জন করতে পারে না তাছাড়া যা, তাদের জন্য একটা পরীক্ষা। মুসলিম এটা বর্ণনা করেছেন।
হাফিয ইবন হাজার বলেন: যারা কিছু হাদিস পৌঁছে দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন অথচ অন্যগুলো নয়, তাদের মধ্যে : আহমাদ ইবন হাম্বল ঐসব হাদিস সম্পর্কে যেগুলোর বাহ্যিক অর্থ শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বুঝায়; মালিক গুণাবলী সংক্রান্ত হাদিস; আবু ইউসূফ মোজেযা [বিষয়] এবং তাদের পূর্বে আবু হুরায়রা [উদাহরণস্বরূপ] দুই থালি৩২ বিষয়ে তার কাছে থেকে যা বর্ণিত হয়েছে; সেই অবস্থান [যা আবু হুরায়রা ইঙ্গিত করেছিলেন] হচ্ছে তাই, যা ঘটে মতভেদ বিবাদ বিসম্বাদের সময়। এর মতোই একটি বর্ণনা হুযায়ফা হতে বর্ণিত এবং হাসান (আল-বাসরি) থেকে : যে, তিনি আল-হাজ্জাজের কাছে আনাস কর্তৃক উরানিয়্যুন৩৩ সম্পর্কিত কাহিনী পৌঁছে দেওয়া অপছন্দ করেছেন। এই আশঙ্কায় যে, হাজ্জাজ তিনি তার এটাকে অবলম্বন করতে পারতেন একটা হাতিয়ার হিসেবে, তিনি অতিরিক্ত রক্তপাতকে গ্রহণযোগ্য করতে মনস্থ করেছিলেন।
এর নিয়ন্ত্রক নীতি হলো : হাদিসের বাহ্যিক অর্থ ধর্মীয় বিদআতকে শক্তিশালী করতে পারে এবং এর বাহ্যিক অর্থ প্রকৃত উৎসের উদ্দেশ্য নয়; সুতরাং যা চাওয়া হচ্ছে তা হয়ে, ঐ ব্যক্তি হতে ফিরিয়ে রাখা, যার সম্পর্কে ভয় আছে যে সে এর বাহ্যিক অর্থের অপব্যবহার করবে।
এভাবে সমগ্র হাদিস সামষ্টিকভাবে এবং পৃথকভাবে পৌঁছানো নিষিদ্ধকরণ জনস্বার্থের সাথে সম্পর্কিত এবং নিজেই নিষিদ্ধ নয়। মুয়ায মানুষকে জানিয়েছেন, কারণ তিনি করেছেন দ্বীনের জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশের ফলে।
কিছু আলেম বলেছেন যে, রসুল সা.-এর বক্তব্য তাদেরকে এই শুভ সংবাদ দিও না কিছু লোকের কাছে বিশেষায়িত, অর্থাৎ সর্বজনীন নয়। আল-বুখারি যুক্তির মধ্যে এটা উদ্ধৃত করেছেন যে, আলেমগণের দায়িত্ব এই জ্ঞান কিছু লোকের জন্য বিশেষায়িত করা, অন্যদের জন্য নয়। নিন্দনীয় হচ্ছে লোকদের বোধগম্যতা ঐ বিষয়ে যা তাদের কাছে পৌঁছানো হয়। তিনি এ অবস্থান গ্রহণের, সর্ব জনকে অনুমতি দেওয়া ঐগুজালিকদের মতো এই হাদিসসমূহ (আল-বাতালাহ আল- মুবাহিয়্যাহ)৩৫ দ্বীনী দায়িত্ব পরিত্যাগ করার এবং অনুশাসন ভুলে নেওয়ার জন্য ওজর পেশ করে এবং তা পরজগতে ধ্বংসের ওপরে এই জগতে ধ্বংসের প্রশস্ত পথ খুলে দেয়। কারণ কোথায় তারা, যারা তাদেরকে সুসংবাদ দিলে ইবাদতে বিরাট বিস্তার ঘটায়? রসুল সা. কে বলা হয়েছিল কেন আপনি সরাসরি [সালাতে] দণ্ডায়মান থাকেন যেখানে আল্লাহ তায়ালা আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন?৩৬ উত্তরে তিনি সা. বলেন: আমি কি শোকরকারী বান্দা হব না?
সুতরাং আমি ঐসব প্রচারকের মনোভাবে একেবারেই আশ্চর্য বোধ করি, যারা মাছির হাদিস (মাছিকে সম্পূর্ণভাবে মধ্যে খাবারের ডোবানোর কথা) উল্লেখ করতে বিরত হন না! অথবা ঐ হাদিস, যাতে মুসা আ. মালাকুল মউতকে চড় মেরেছিলেন! অথবা সেই হাদিস (জবাবে যাতে একজন প্রশ্ন করেছিল, আমার পিতা কোথায়?) প্রকৃত পক্ষে তোমার পিতা ও আমার পিতা জাহান্নামে। অথবা এমন হাদিসসমূহ যাতে সালাফ ও খালাফ (প্রাথমিক প্রজন্ম ও পরবর্তী প্রজন্ম) আল্লাহ তায়ালার গুণাবলী ব্যাখ্যায় মতভেদ করেছেন বিধেয় হিসেবে [তাঁর প্রয়োজনীয় বিদ্যমানতা প্রকাশে] - (উভয় ক্ষেত্রে যদি অসাবধানতাবশত প্রকাশ হয়) এই সম্ভাবনায় যে, অপব্যাখ্যার ফলে মানব দেহে (তিনি) অনুপ্রবিষ্ট হন। অথবা, ফিতনার সময়ের হাদিসসমূহ যার বাহ্যিক অর্থ এমন মনে করা হতে পারে যে, নিয়মশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কোনো আশাই নেই এবং কোনো রকম বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ হতে দূরে সরে থাকা। অথবা অন্য হাদিসসমূহ যার অর্থ সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকদের জন্যই উপলব্ধি করা অতি দুরূহ।
এই সব হাদিসের কোনো প্রয়োজন নেই। এগুলোর ভিত্তিতে কোনো হুকুম আসেনি। যদি লোকেরা এগুলো না শুনেই তাদের দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে দেয়, তাতে তাদের জন্য সরিষার দানা পরিমাণও কম করবে না। যদি কোনো বিশেষ কারণে এসব হাদিস হতে প্রচারক কিছু প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে তা সঠিক কাঠামোতে উপস্থাপন করা তার কর্তব্য হবে। এগুলোকে কিছু বিশদ ব্যাখ্যাসহ উপস্থাপন করবেন যাতে এর অর্থ স্পষ্ট হয় এবং এসবের ব্যাপারে সবরকম সন্দেহ ও সংশয় দূর হয়।
আমরা এর দৃষ্টান্ত হিসেবে একটি বিখ্যাত হাদিস গ্রহণ করেছি যা প্রায়ই মানুষকে ভুল বুঝতে প্ররোচিত করে এবং ঐ বুঝের কারণে তারা এর ভিত্তিতে ভয়ানক পরিণতি সম্পন্ন নির্দেশ প্রদান করে। এটা হচ্ছে নিম্নে বর্ণিত আনাস এর হাদিস:

একজন উজ্জীবিত প্রচারক হাদিস নামে পরিচিত সব কিছুই মানুষের কাছে পৌছান না, এমনকি সহিহ হলেও। ক্বাওয়াইদ আল-তাহদিস গ্রন্থে জামাল উদ্দীন আল-কাসিমী বলেন:
সব সহিহ হাদিসই সাধারণ লোকদের কাছে পৌছানো হয় না। এ ক্ষেত্রে প্রমাণ হচ্ছে, শায়খাঈন [আল-বুখারি ও মুসলিম] মু'আয থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন আমি রসুল সা.-এর পিছনে সওয়ারিতে উপবিষ্ট ছিলাম। এসময় তিনি সা. বললেন: মুয়ায! তুমি কি জানো বান্দাদের ওপর আল্লাহ তায়ালার অধিকার কী? আমি বললাম: আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুলই ভালো জানেন। তিনি সা. বললেন निश्चय বান্দার ওপর আল্লাহ তায়ালার অধিকার হচ্ছে যে, তারা তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছু শরিক করবে না এবং বান্দার অধিকার হচ্ছে, যারা তাঁর সাথে কোনো কিছু শরিক করে না তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন না। আমি বললাম হে আল্লাহর রসুল, আমি কি লোকদেরকে এই শুভ সংবাদ জানিয়ে দেবো? তিনি সা. বললেন: না, তাদেরকে এই শুভ সংবাদ জানিও না, কারণ তারা অলস হয়ে পড়বে!
অন্য একটি বর্ণনায় উভয়েই [আল-বুখারি ও মুসলিম] করেছেন, তাতে আনাস থেকে জানা যায় যে রসুল সা. মুয়ায কে বললেন, যিনি সরাসরি তাঁর সা. পেছনে বসে ছিলেন, এমন কোনো ব্যক্তি নেই যে সর্বান্তঃকরণে সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রসুল, সে জাহান্নামে যাবে, সেই বিষয় ছাড়া যে বিষয়ে আল্লাহই তাকে আগুন থেকে বাঁচাবার মালিক। তিনি (মুয়ায) বললেন: হে আল্লাহর রসুল! আমি কি লোকদের এই সংবাদ জানাব না যাতে তারা এই শুভ সংবাদে উল্লসিত হতে পারে? তিনি সা. বললেন তাহলে তারা আমল করা থেকে বিরত থাকবে।
মুয়ায রা. তার মৃত্যুকালে [কাউকে] এটা জানিয়ে গেছেন [জ্ঞান পৌছে দেওয়া এবং তা গোপন না করা সম্পর্কিত নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ। এর গুনাহ হতে বাঁচার জন্য। আল-বুখারি এটি বর্ণনা করেছেন একটি নোটে [অর্থাৎ কোনো সনদ সংযুক্ত না করে] আলী থেকে : লোকদের কাছে পৌছাবে যা তারা জানে [এবং যাতে অনুধাবন করতে পারে]; তোমরা কি চাও আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুলকে অস্বীকার করা হোক? ইবন মাসউদ-এর এরকমই একটি উক্তি রয়েছে- তুমি ঐ লোকদের কাছে হাদিস পৌছাওনি যাদের মন এটা অর্জন করতে পারে না তাছাড়া যা, তাদের জন্য একটা পরীক্ষা। মুসলিম এটা বর্ণনা করেছেন।
হাফিয ইবন হাজার বলেন: যারা কিছু হাদিস পৌঁছে দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন অথচ অন্যগুলো নয়, তাদের মধ্যে : আহমাদ ইবন হাম্বল ঐসব হাদিস সম্পর্কে যেগুলোর বাহ্যিক অর্থ শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বুঝায়; মালিক গুণাবলী সংক্রান্ত হাদিস; আবু ইউসূফ মোজেযা [বিষয়] এবং তাদের পূর্বে আবু হুরায়রা [উদাহরণস্বরূপ] দুই থালি৩২ বিষয়ে তার কাছে থেকে যা বর্ণিত হয়েছে; সেই অবস্থান [যা আবু হুরায়রা ইঙ্গিত করেছিলেন] হচ্ছে তাই, যা ঘটে মতভেদ বিবাদ বিসম্বাদের সময়। এর মতোই একটি বর্ণনা হুযায়ফা হতে বর্ণিত এবং হাসান (আল-বাসরি) থেকে : যে, তিনি আল-হাজ্জাজের কাছে আনাস কর্তৃক উরানিয়্যুন৩৩ সম্পর্কিত কাহিনী পৌঁছে দেওয়া অপছন্দ করেছেন। এই আশঙ্কায় যে, হাজ্জাজ তিনি তার এটাকে অবলম্বন করতে পারতেন একটা হাতিয়ার হিসেবে, তিনি অতিরিক্ত রক্তপাতকে গ্রহণযোগ্য করতে মনস্থ করেছিলেন।
এর নিয়ন্ত্রক নীতি হলো : হাদিসের বাহ্যিক অর্থ ধর্মীয় বিদআতকে শক্তিশালী করতে পারে এবং এর বাহ্যিক অর্থ প্রকৃত উৎসের উদ্দেশ্য নয়; সুতরাং যা চাওয়া হচ্ছে তা হয়ে, ঐ ব্যক্তি হতে ফিরিয়ে রাখা, যার সম্পর্কে ভয় আছে যে সে এর বাহ্যিক অর্থের অপব্যবহার করবে।
এভাবে সমগ্র হাদিস সামষ্টিকভাবে এবং পৃথকভাবে পৌঁছানো নিষিদ্ধকরণ জনস্বার্থের সাথে সম্পর্কিত এবং নিজেই নিষিদ্ধ নয়। মুয়ায মানুষকে জানিয়েছেন, কারণ তিনি করেছেন দ্বীনের জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশের ফলে।
কিছু আলেম বলেছেন যে, রসুল সা.-এর বক্তব্য তাদেরকে এই শুভ সংবাদ দিও না কিছু লোকের কাছে বিশেষায়িত, অর্থাৎ সর্বজনীন নয়। আল-বুখারি যুক্তির মধ্যে এটা উদ্ধৃত করেছেন যে, আলেমগণের দায়িত্ব এই জ্ঞান কিছু লোকের জন্য বিশেষায়িত করা, অন্যদের জন্য নয়। নিন্দনীয় হচ্ছে লোকদের বোধগম্যতা ঐ বিষয়ে যা তাদের কাছে পৌঁছানো হয়। তিনি এ অবস্থান গ্রহণের, সর্ব জনকে অনুমতি দেওয়া ঐগুজালিকদের মতো এই হাদিসসমূহ (আল-বাতালাহ আল- মুবাহিয়্যাহ)৩৫ দ্বীনী দায়িত্ব পরিত্যাগ করার এবং অনুশাসন ভুলে নেওয়ার জন্য ওজর পেশ করে এবং তা পরজগতে ধ্বংসের ওপরে এই জগতে ধ্বংসের প্রশস্ত পথ খুলে দেয়। কারণ কোথায় তারা, যারা তাদেরকে সুসংবাদ দিলে ইবাদতে বিরাট বিস্তার ঘটায়? রসুল সা. কে বলা হয়েছিল কেন আপনি সরাসরি [সালাতে] দণ্ডায়মান থাকেন যেখানে আল্লাহ তায়ালা আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন?৩৬ উত্তরে তিনি সা. বলেন: আমি কি শোকরকারী বান্দা হব না?
সুতরাং আমি ঐসব প্রচারকের মনোভাবে একেবারেই আশ্চর্য বোধ করি, যারা মাছির হাদিস (মাছিকে সম্পূর্ণভাবে মধ্যে খাবারের ডোবানোর কথা) উল্লেখ করতে বিরত হন না! অথবা ঐ হাদিস, যাতে মুসা আ. মালাকুল মউতকে চড় মেরেছিলেন! অথবা সেই হাদিস (জবাবে যাতে একজন প্রশ্ন করেছিল, আমার পিতা কোথায়?) প্রকৃত পক্ষে তোমার পিতা ও আমার পিতা জাহান্নামে। অথবা এমন হাদিসসমূহ যাতে সালাফ ও খালাফ (প্রাথমিক প্রজন্ম ও পরবর্তী প্রজন্ম) আল্লাহ তায়ালার গুণাবলী ব্যাখ্যায় মতভেদ করেছেন বিধেয় হিসেবে [তাঁর প্রয়োজনীয় বিদ্যমানতা প্রকাশে] - (উভয় ক্ষেত্রে যদি অসাবধানতাবশত প্রকাশ হয়) এই সম্ভাবনায় যে, অপব্যাখ্যার ফলে মানব দেহে (তিনি) অনুপ্রবিষ্ট হন। অথবা, ফিতনার সময়ের হাদিসসমূহ যার বাহ্যিক অর্থ এমন মনে করা হতে পারে যে, নিয়মশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কোনো আশাই নেই এবং কোনো রকম বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ হতে দূরে সরে থাকা। অথবা অন্য হাদিসসমূহ যার অর্থ সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকদের জন্যই উপলব্ধি করা অতি দুরূহ।
এই সব হাদিসের কোনো প্রয়োজন নেই। এগুলোর ভিত্তিতে কোনো হুকুম আসেনি। যদি লোকেরা এগুলো না শুনেই তাদের দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে দেয়, তাতে তাদের জন্য সরিষার দানা পরিমাণও কম করবে না। যদি কোনো বিশেষ কারণে এসব হাদিস হতে প্রচারক কিছু প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে তা সঠিক কাঠামোতে উপস্থাপন করা তার কর্তব্য হবে। এগুলোকে কিছু বিশদ ব্যাখ্যাসহ উপস্থাপন করবেন যাতে এর অর্থ স্পষ্ট হয় এবং এসবের ব্যাপারে সবরকম সন্দেহ ও সংশয় দূর হয়।
আমরা এর দৃষ্টান্ত হিসেবে একটি বিখ্যাত হাদিস গ্রহণ করেছি যা প্রায়ই মানুষকে ভুল বুঝতে প্ররোচিত করে এবং ঐ বুঝের কারণে তারা এর ভিত্তিতে ভয়ানক পরিণতি সম্পন্ন নির্দেশ প্রদান করে। এটা হচ্ছে নিম্নে বর্ণিত আনাস এর হাদিস:

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00