📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 প্রমাণ হিসেবে কোনো হাদিসকে পেশ করার পূর্ব প্রস্তুতি

📄 প্রমাণ হিসেবে কোনো হাদিসকে পেশ করার পূর্ব প্রস্তুতি


দাওয়াতদাতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তিনি সাক্ষ্য হিসেবে যেসব হাদিস পেশ করবেন সেগুলো তালাশ করা অর্থ বের করা, মূল্য ও এর অবস্থান নির্ণয় করা। প্রকৃতপক্ষে, সর্বজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিগণের দায়িত্ব হচ্ছে প্রত্যায়িত উৎসের ওপর নির্ভর করা এবং মিথ্যা, বাতিল ও জাল হাদিস এবং উৎসহীন হাদিস থেকে নিজেকে মুক্ত করা। এমনটা সেইসব হাদিসের ক্ষেত্রেই ঘটতে হবে, যেগুলো দিয়ে মুসলিমদের ধর্মীয় শিক্ষার বইপুস্তককে ঠেসে ভর্তি করা হয়েছে, অতঃপর সহিহ ও হাসান-এর সাথে প্রকারভেদের পার্থক্য না করেই মিশ্রিত করা হয়েছে গ্রহণীয় ও বর্জনীয়কে। সাধারণ্যে সুপরিচিত হাদিস দ্বারা প্রতারিত করা হয়েছে। এটা বইপুস্তকে বা কথাবার্তার মধ্যে প্রচারিত হয়েছে এবং লোকদের স্মরণে থাকার ফলেই তা প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট এবং অনুমোদন প্রাপ্ত হয়েছে চারদিকে আরো ছড়াতে ও গ্রহণ করার ক্ষেত্রে। কিন্তু অতি সতর্ক আলেমদের কাছে এটা অতি সুবিদিত যে, হাদিস মুখে মুখে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে, এমনকি বিদ্বানদের বইপুস্তকেও এবং একজন থেকে অন্যরা নকল করেছে, অতিশয় যঈফ হওয়া সত্ত্বেও, উৎস না থাকার পরেও, এমনকি প্রক্ষিপ্ত হলেও।
এ অবস্থার জন্যই একদল হাদিস বিশেষজ্ঞ উৎসাহিত হয়েছেন মুখে মুখে প্রচারিত প্রসিদ্ধ হাদিসগুলোর হিসাব গ্রহণে। এসবের মধ্যে রয়েছে: আল-যারকাশি (মৃত্যু: ৭৯৪ হি.) প্রণীত আত্-তাযকিরাহ বি আল-আহাদিস আল-মুশতাহিরাহ; ইবন দীবা'কৃত তামাঈয় আত্-তাইয়্যিব মিনাল খাতিব ফি মা ইয়াদুরু আল-আলসিনাত আন-নাস মিনাল হাদিস; ইবনে হাজারের (মৃত্যু: ৮৫২ হি) গ্রন্থ আল-লা'লি আল-মানসুরাহ ফি আল-আহাদিস আল-মাশূরাহ; আল-সুয়ূতীর (মৃত্যু: ৯১১ হি.) আদ্‌-দারার আল-মুনতাশিরাহ ফিল হাদিস আল-মুশতাহিরাহ; আল-সাখাভীর (মৃত্যু: ৯০২ হি.) আল-মাকাসিদুল হাসানাহ ফি মা ইশতাহরা মিনাল হাদিস আলাল আলসিনাহ [এটি সংক্ষেপকরণ করেন আল-যুরকানী (মৃত্যু: ১১২২ হি.)] এবং আল-আজলানী (মৃত্যু: ১১৬২ হি.) প্রণীত কাশফুল খাফা ওয়া-মুযিলুল আলবাস 'আম্মা ইশতারাহ মিনাল হাদিস আলা আলাসিনাতিন নাস। এছাড়া এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য পুস্তক লিখেছেন ইবনুল জাওযী, আল-সুয়ূতী, আল-কারী, আল- শওকানী, ইবন ইরাক, আল-আলবানি এবং অন্যরা যাতে জাল হাদিসগুলো যাচাই বাছাই করা হয়েছে।
তাসাউফের বইগুলোতে গ্রন্থকারগণ হৃদয় কোমল করা সম্পর্কিত এই ধরনের অনেক হাদিস (যঈফ, অস্পষ্ট/দুর্বোধ্য, জাল) উল্লেখ করেছেন। তাই, তাফসিরের বইগুলোতেও, বিশেষ করে বিভিন্ন সুরার ফজিলত, নবি রসুলগণের আ. ও পূণ্যবানদের কাহিনী সম্বন্ধে এবং ওহি নাজিলের (পরিপ্রেক্ষিত বর্ণনায়) ব্যাপারে একই ধরনের হাদিস আমরা দেখতে পাই। এর মধ্যে খুব কমসংখ্যকই সহিহ বলে প্রত্যায়িত।
সম্প্রতি এক কনফারেন্সে উপস্থিত আলেমদের একজন সালাবা ইবনে হাতীবি'র কাহিনী উপস্থাপন করেন, যেটাকে কুরআনের ভাষ্যকারগণ এই আয়াত নাজিলের পরিপ্রেক্ষিত বলে উল্লেখ করেন:
এবং তাদের মধ্যে যেসব লোক আল্লাহ তায়ালার সাথে ওয়াদা করেছিল যদি তিনি আমাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে দান করেন, তবে আমরা অবশ্যই দান করব, আর অবশ্যই সৎ লোকদের মধ্যে শামিল থাকব। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা যখন তাদেরকে স্বীয় করুণার দানে ধন্য করলেন, তখন তারা দান করার ব্যাপারে কার্পণ্য করল, আর বেপরোয়াভাবে মুখ ফিরিয়ে নিল। পরিণামে তিনি আল্লাহ তায়ালার সাথে কৃত তাদের ওয়াদা ভঙ্গের এবং মিথ্যাচারে লিপ্ত থাকার কারণে তাদের অন্তরে মুনাফিকী বদ্ধমূল করে দিলেন; ঐ দিন পর্যন্ত যেদিন তারা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে (সুরা তাওবা, ৯: ৭৫-৭৭)।
কিন্তু এই কাহিনীর সনদ-যা ইবনে হাজার তার উৎসবিচারি আশ-কাশাফ গ্রন্থের পূর্বে বর্ণিত এই হাদিসকে যঈফ বলেছেন'।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 অনেক সতর্ককারীর ত্রুট বিচ্যুতি

📄 অনেক সতর্ককারীর ত্রুট বিচ্যুতি


সতর্ককারী ও প্রচারকদের মসজিদে প্রদত্ত বক্তৃতায় অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রে সাধারণ যে ব্যর্থতা তা হচ্ছে তারা অন্ধকারে জ্বালানিকাঠ সংগ্রহ করেন। তারা ঐসব হাদিস উচ্চারণ করে থাকেন যা লোকদেরকে সরিয়ে দেয়, যেক্ষেত্রে ঐসব হাদিসের কোনোটাাই চোখে পড়ে না, উৎস বিচারে যেগুলো সহিহ বা হাসান বলে প্রত্যায়িত। আমি এমন কোনো শুক্রবারের খুতবা, সতর্ককারী পাঠের সাক্ষী। কিন্তু প্রায় সর্বদাই এমন একগুচ্ছ হাদিস শুনেছি যা যঈফ, মারাত্মকভাবে যঈফ এবং একই সাথে জালও। একদেশে আমি নবি সা.-এর জন্মদিন উদ্যাপন উপলক্ষে একটি বক্তৃতা শুনেছিলাম, যার মূল বিষয় ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর জীবনের বিশুদ্ধতা, আচরণের মাধুর্য এবং চরিত্রের মহত্ব। এটা এমন বিষয়বস্তু যা বিপুলধনে বিভূষিত, কুরআন থেকে নিঃসৃত সত্যের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং সহিহ সূত্রে বর্ণিত সুন্নাহ্ দ্বারা সজ্জিত।
কিন্তু বক্তা মাত্র দুই বা তিনটি হাদিস বর্ণনা করলেন সহিহ বা হাসান পর্যায়ের। তিনি তার গুদাম খালি করে ফেললেন ঐসব হাদিস দিয়ে যেগুলো উদ্ভট, প্রত্যাখ্যাত বা প্রক্ষিপ্ত অথবা যেগুলোর উৎস অজ্ঞাত। আলেমগণ এমন বিষয় সম্বন্ধে বলেছেন: এর কোনো নাক-বালা বা লাগাম নেই অর্থাৎ এর কোনো নিয়ন্ত্রণ, বাধা বা শৃঙ্খল নেই। এখানে এর কিছু উদাহরণ পেশ করা যায়:
আল্লাহ তায়ালা প্রথম [অস্তিত্ব] যা সৃষ্টি করেন তা হচ্ছে তাঁর নবির নূর।
আল্লাহ তায়ালা তার পিতামাতাকে জীবন দান করলেন এবং তারা তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করল।
যাকেই মুহাম্মাদ বলে ডাকা হবে তার জন্যই খাতনা ফরজ। (তাঁর জন্ম ইত্যাদি সম্পর্কে অতি প্রাকৃত বিভিন্ন প্রকার ঘটনা বলা হয়ে থাকে)।
নবি সা.-এর উম্মাহর মর্যাদা সম্বন্ধে যেসব অদ্ভুত জিনিস আমি শুনেছি তার মধ্যে এই হাদিসটি রয়েছে: আমার উম্মাতের বিদ্বানগণ বানি ইসরাঈলের নবিদের মতো। বক্তা একটি গল্প বলে এই হাদিসটির বিশুদ্ধতার সাফাই গাইলেন। এর সারসংক্ষেপ এমন: স্বপ্নে কিংবা আত্মার জগতে আবু হামীদ আল-গাজ্জালী মুসা আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। মুসা (যাকে আল্লাহ তায়ালা সরাসরি ডেকেছেন) তাকে বললেন: তোমার নাম কি? তিনি বললেন: মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল- গাজ্জালী আল-তুসী... ইত্যাদি। মুসা আ. বললেন: আমি তোমার নাম জিজ্ঞেস করেছি, তোমার বংশবৃত্তান্ত জানতে চাইনি। তিনি বললেন: যখন আল্লাহ তায়ালা জানতে চেয়েছিলেন আপনার ডান হাতে কী রয়েছে, তখন আপনি তাঁকে বলেননি আমার লাঠি এবং চুপচাপ থাকলেন। বরং, আপনি বলেছেন: এটা আমার লাঠি। আমি এর ওপর ভর দিই এবং এর দ্বারা আমার মেষপালকে পাতা পেড়ে দিই এবং আরো বিভিন্নভাবে ব্যবহার করি। বক্তা মন্তব্য করলেন সুতরাং আল-গাজ্জালী মুসার আ. সাথে বিতর্ক করলেন। এইভাবে বক্তা একটি মিথ্যা হাদিসের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করলেন (আমার উম্মাতের বিদ্বানগণ বাণি ইসরাঈলের নবিদের মতো)।
ঐভাবে মূল্যহীন পণ্য বাজারে আনা হয়েছে যা তৈরি অদ্ভুত দ্রব্য দিয়ে, ইসরাঈলী ঐতিহ্যের গল্প ও স্বপ্ন দ্বারা এভাবে তা ছড়াচ্ছে ও বিস্তারলাভ করছে, ভালো পণ্যের অনুপস্থিতিতে অর্থাৎ সহিহ ও হাসান নামে প্রতিষ্ঠিত হাদিসের স্থলে। তারপর, যেমনটা অর্থনীতিবিদগণ বলে থাকেন, খারাপ মুদ্রা দূরীভূত করে ভালো মুদ্রাকে!
ব্যর্থতা পরিচিত বিষয়। এটা এমনকি এমন কিছু আলেমকে স্পর্শ করেছে যারা জ্ঞানবান ও যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি এবং হাদিস বর্ণনায় খুবই কঠোর, কিন্তু তারা কদাচ, সতর্ককরার ওপর প্রবন্ধ রচনা করেননি, শৈথিল্যের চূড়ান্ত করেছেন। এটার মতোই আমরা দেখেছি, আবু ফারাজ ইবনুল জাওযী (মৃত্যু: ৫৯৭ হি.)-এর সতর্ককরা সম্বন্ধীয় পুস্তক। উদাহরণস্বরূপ, দাম আল-হাওয়া; যেখানে একই আল-জাওযী কঠোরতা দেখিয়েছেন আল-মাওযুআত এবং আল-ইলাল আল-মুতানাহিয়া ফিল হাদিস আল ওয়াহিয়‍্যা এবং এমন বইপুস্তকে। আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে আল-নাককাদ শামসুদ্দীন আল-দাহাবী (মৃত্যু: ৭৩৮ হি.), যিনি প্রায়শই শিথিল ছিলেন আল-কাবায়ির'র মধ্যে, কারণ এই বইটির মধ্যে সতর্ক করার বৈচিত্রর রয়েছে।
একইভাবে, আল-হাফিয আল-মুনযিরী তার বিস্তারিত গ্রন্থ আত তারগিব ওয়াত্ তারহিব এর মধ্যে করেছেন। তিনি এতে যথেষ্ট সংখ্যায় দুর্বল, প্রত্যাখ্যাত, এমনকি জাল হাদিসও উদ্ধৃত করেছেন। তার এগুলোর প্রয়োজন ছিল না। তার মুখবন্ধে তিনি পাঠকদের তথ্য প্রদান করেছেন, তার উদ্ধৃত নির্দেশকসমূহ ও পরিভাষাগত শ্রেণিবিভাগের বিষয়ে। সুতরাং তিনি ঐভাবে তার কর্তব্য পালন করেছেন, আল্লাহ তায়ালা তার ওপর মেহেরবান। তবে তার পাঠকগণ, বিশেষ করে আমাদের সময়ের, ঐ বিষয়ে মনোযোগী নয়। এটাই সেই কারণ যাতে আমাকে প্রস্তুত করতে হয়েছে আল-মুনযিরীর গ্রন্থ থেকে একটি দুই অংশের গ্রন্থ, আল-মুনতাকা, এর মধ্যকার সহিহ ও হাসান হাদিসের উৎস-বিচারসহ।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 ইবন হাজার আল-হায়সামির ফতোয়া

📄 ইবন হাজার আল-হায়সামির ফতোয়া


সুবিখ্যাত শাফেয়ী আইনশাস্ত্রবিদ ইবনে হাজার আল-হায়সামি অবশ্যই একটি অপূর্ব কাজ করেছেন, যখন তিনি তার সময়ের শাসকদেরকে সোজাসুজি অনুরোধ করেছিলেন এমন প্রত্যেক প্রচারককে প্রচার থেকে বিরত রাখতে, যারা তাদের উদ্ধৃত হাদিসের উৎস স্পষ্ট করেন না এবং যারা সত্য ও প্রত্যায়িত বর্ণনার সাথে অকার্যকর ও মিথ্যা বর্ণনা মিশ্রিত করেন।
ইবনে হাজার আল-হায়সামির কাছে একজন খতিব সম্পর্কে একজন প্রশ্নকারী এলেন, যিনি প্রতি শুক্রবার মিম্বারে আরোহণ করেন এবং অনেক হাদিস বর্ণনা করেন। কিন্তু উদ্ধৃত হাদিসের উৎস বা বর্ণনাকারীদের অবস্থান বর্ণনা করেন না (উদাহরণ দিতে গিয়ে প্রশ্নকর্তা একটি বিশেষ হাদিস উল্লেখ করলেন) এবং প্রশ্ন করলেন: এ অবস্থায় তার ব্যাপারে কি করা কর্তব্য? তার জবাব তার ভাষায়:
তার খুতবায় বর্ণনাকারীদেরকে বা সেগুলো কে বলেছে তা স্পষ্ট না করে যে হাদিসগুলো তিনি উল্লেখ করেছেন, এই শর্তে অনুমোদনযোগ্য যে তিনি [নিজেই] হাদিসে জ্ঞানীদের একজন, অথবা তিনি এমন গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করছেন যা [হাদিসের জ্ঞানসম্পন্ন]। ঐরকম একজনের দ্বারা লিখিত। কিন্তু হাদিসের লোকদের অন্তর্ভুক্ত নয় যা খুতবায় আস্থা রাখা যায়, এমন লেখকদের বইতে চোখ বুলিয়ে [এর ভিত্তিতে। হাদিসের বর্ণনার ওপর নির্ভর করা বা খুতবায় আস্থা রাখা বৈধ নয়। যে এমন করবে, তাকেই তীব্রভাবে ভৎর্সনা করতে হবে। এটাই হচ্ছে অনেক খুতবাদাতার অবস্থা। কারণ তারা বাস্তবিকই হাদিসসহ একটা খুতবা পড়ে, মুখস্ত করে ঐ হাদিসগুলো এবং রর সাহায্যে তাদের নিজের খুতবায় প্রচার করে, ঐ হাদিসগুলোর সত্যিকার উৎস আছে কিনা তা না জেনেই। তাই সব দেশের শাসকদের কর্তব্য হচ্ছে তারা তাদের খতিবদের নিবৃত্ত করবেন এমন করা থেকে, যদি তারা এক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে।
এটা এই খতিবের জন্য বাধ্যতামূলক যে, তিনি তার বর্ণনায় সনদ স্পষ্ট করবেন। এখন যদি তার সনদ সঠিক হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি নেই। অন্যথায় কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য এটা অনুমোদিত যে, তিনি তাকে খুতবা প্রদানের অধিকার থেকে সরিয়ে দেবেন, তাকে এমন সাহসী হওয়া থেকে টেনে ধরবেন যেমনটা তিনি [খতিব]। বিনা অধিকারে এই সুন্দর মর্যাদা ধারণ করেছেন।১৬
যদি আমাদের সময়ে খুতবা প্রদানকারীদের ওপর এমনটা প্রযোজ্য করা যেত, তাহলে নিশ্চয়ই তাদের অনেকে - তাদের হাদিস সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং গ্রহণীয় ও বর্জনীয় হাদিস সর্ম্পকে তাদের সন্দেহের কারণে বিতাড়িত হতেন।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 তারগিব ও তারহিবে যঈফ হাদিস বর্ণনা

📄 তারগিব ও তারহিবে যঈফ হাদিস বর্ণনা


আমার মতে খতিবদের অনেকের মধ্যে, স্মরণকারী ও সতর্ককারীদের মধ্যে অস্পষ্ট, প্রত্যাখ্যাত এবং এমনকি জাল হাদিসের ব্যাপক প্রচারের কারণ হচ্ছে অধিকাংশ আলেমের মতের অনুসরণ, যা এধরনের হাদিস বর্ণনার অনুমতি প্রদান করে। আমলের ফজিলত, হৃদয়কে কোমল করা, পরিহারকরণ এবং তারগিব ও তারহিব ও এমন প্রবণতাসম্পন্ন কাহিনীর উদ্দেশ্যে তারা দুর্বল হাদিসের অনুমতি দেন ঐ পর্যন্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত এই হাদিসগুলো আইনের নির্দেশনার সাথে জড়িত হয় না, পাঁচটি অনুশাসনের অন্তর্ভুক্ত হয় না, যেমন- হালাল, হারাম, নিন্দনীয়, বাধ্যতামূলক ও প্রশংসনীয়। আত-তারগিব ওয়াত তারহিব-এর মুখবন্ধে আল-মুনযিরী লিখেছেন: তারগিব ও তারহিবের দৃষ্টিতে হাদিসের প্রকরণে আলেমগণ শিথিলতা/অবকাশ অনুমোদন করেন ঐ পর্যন্ত, যাতে তাদের অনেকেই জাল হাদিস উদ্ধৃত করেন এবং এর অবস্থা স্পষ্ট না করেন!
আল-হাকিম তাঁর মুস্তাদরাক গ্রন্থে কিতাবুদ দোয়ার প্রারম্ভে যা বলেন, এটা তারই নিকটতর: এবং আমি, আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায়, এই বর্ণনাগুলোকে প্রবাহিত করব, যাতে দুই শায়খ (আল-বুখারি ও মুসলিম)-এর নীরব দোয়ার পুস্তকাদিতে-আবু সাঈদ আবদুর রাহমান ইবনে মাহদীহ এগুলো গ্রন্থনার মতবাদ অনুসরণ করেন। এরপর তিনি আবু সাঈদ আবদুর রাহমানের প্রতি তার সনদ বিন্যাস করেন এবং তার মত উদ্ধৃত করেন:
আমরা যদি হালাল-হারাম এবং হুকুম আহকাম বিষয়ে রসুল সা. এর সুত্রকে সম্পর্কিত করি, তাহলে আমরা সনদ সম্পর্কে কঠোর হই এবং আমরা রাবিদের সমালোচনা করে থাকি। যদি আমরা আমালের নেকি বর্ণনা করি এবং পরকালের পুরস্কার ও শাস্তি এবং প্রশংসনীয় আমল ও দোয়া বর্ণনা করি, তাহলে আমরা ইসনাদ সহজ করে দিই'১৮।
আহমদ ইবনে হাম্বল তাঁর সনদসহ আল-খাতিব আল-কিফায়া গ্রন্থে কাছাকাছি ভিন্ন শব্দে একই মতামত বর্ণনা করেন। তারপর বলেন : হৃদয় কোমল করার হাদিসগুলোর মধ্যে অনুশাসনের কোনো কিছু আসেনি ব্যক্তির প্রতি শৈথিল্য প্রদর্শন করে।১৯ একইভাবে, আবু যাকারিয়া আল-আনবারী বলেন : সংশ্লিষ্ট বর্ণনা যদি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল না করত এবং অনুশাসনকে বাধ্যতামূলক না করত এবং যদি তা তারগিব ও তারহিব-এর ওপর হতো, অথবা উপাদান বা ইবাদত পদ্ধতির নিবিড়করণ অথবা শিথিলকরণ হতো, তাহলে মানুষের এর প্রতি [সহিষ্ণুতার ক্ষেত্রে] চোখ বন্ধ রাখা বাধ্যতামূলক হতো-এর বর্ণনাকে সহজ করার জন্য'১৯।
কিন্তু এই চোখ বন্ধ করে থাকা এবং এর ইসনাদকে সহজ করা কতদূর পর্যন্ত?
এর দ্বারা কিছু লোক বুঝে যে, শর্ত ছাড়াই তারগিব ও তারহিবের ভিত্তিতে হাদিস গ্রহণ করা উচিত - এমনকি এর রাবি এর বর্ণনায় যদি একাকীও হন, অথবা তার ভুলে কেউ বেপরোয়া হয় অথবা কারো কাছে অসংখ্য প্রত্যাখ্যাত বর্ণনা জমা থাকে অথবা যদি কেউ মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত হয়। সুফিদের মধ্যে কিছু অর্বাচীন ব্যক্তি জাল হাদিস বর্ণনারও অনুমতি দিয়েছেন - যেগুলো মিথ্যা, উদ্ভাবিত এবং তৈরি করা-কেবল এই শর্তে যে, তা দিয়ে ভালো কাজে উৎসাহিত করা হয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখা হয়। তাদের কেউ কেউ (যেমন আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি) তাদের নিজেদেরকে ক্ষমা করতে ঐ মতলবসহ কুরআনের বিশেষ সুরার গুরুত্ব বিষয়ে কিংবা বিশেষ উত্তম কাজের সুবিধার জন্য হাদিস উদ্ভাবনে এতদূর এগিয়েছে। লোকেরা যখন সুপরিচিত মুতাওয়াতির হাদিসটি উদ্ধৃত করেছে- যে ব্যক্তি আমার বিরুদ্ধে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা বলে, সে যেন জাহান্নামে তার স্থান করে নেয়- তারা সমগ্র ধৃষ্টতাসহ বলে : আমরা কখনও তাঁর সা. বিরুদ্ধে মিথ্যা বলি না, তবে আমরা তাঁর জন্য মিথ্যা বলি। এটা এমন এক অজুহাত যা পাপের চেয়েও কুৎসিত। এটা এই রায় প্রকাশ করে যে, দ্বীন অসম্পূর্ণ এবং তারা তাঁর সা. জন্য তা পরিপূর্ণ করে।
অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেন : আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন সম্পূর্ণ করলাম (সুরা মায়িদাহ, ৫: ৩)।
সেজন্য আলেমগণ সত্য প্রতিষ্ঠায় জীবন কোরবানি করেছেন সনদ সমূহ বা ইসনাদের শর্ত শিথিল করার সীমা স্পষ্ট। আমরা এখানে কিছু সংখ্যকের সংক্ষিপ্ত উদাহরণ উল্লেখ করতে পারি।
ইবন রজব আল-হাম্বলী (তার শারহ ইলাল আল-তিরমিজি, তিরমিজির ওপর লিখিত গ্রন্থের ওপর বলতে গিয়ে বলেন যে, অসততা অথবা বিস্মৃত হওয়ার ব্যাপারে পরিচিত অথবা তার বর্ণনায় বহু ভুল হয়, এমন অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির কোনো হাদিস সংযুক্ত করেননি) বলেন :
তিরমিজি যা উল্লেখ করেছেন সে সম্বন্ধে তার অবস্থান এই যে, তিনি এমন হাদিস উদ্ধৃত করেননি যা আইনী নির্দেশনা ও আমলের সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু যদি বর্ণনাকারীগণ হৃদয় কোমল করার এবং তারগিব ও তারহিব-এর উদ্দেশ্যে ঐসব হাদিসের কিছু বর্ণনা করেন, তাহলে ইমামদের অনেকেই এসব হাদিসের বর্ণনা দুর্বল হতে অনুমতি দিয়েছেন; এদের [ঐসব ইমামদের] মধ্যে ছিলেন ইবন মাহদী ও ইবন হাম্বল।
রাওয়াদ ইবন আল-জাররাহ বলেন : আমি সুফিয়ান আল-সাওরীকে বলতে শুনেছি, প্রধানদের কাছ থেকে ব্যতীত হালাল ও হারাম বিষয়ে এই জ্ঞান গ্রহণ করো না, যারা তাদের জ্ঞানের জন্য বিখ্যাত, যারা সংযোজন ও বিয়োজন [একটি বর্ণনার গুণাগুণ বুঝতে যে সামঞ্জস্যবিধান প্রয়োজন] করতে জানেন এবং এর চেয়ে ভিন্নরূপ কি সে সম্বন্ধে কোনো প্রতিবাদ নেই [অর্থাৎ হালাল ও হারাম বিষয়ে] সম্মানিত জ্যেষ্ঠগণের [এমন লোক যারা দীনদারীর জন্য পরিচিত, কিন্তু হাদিসে বিশেষজ্ঞ নন] কাছ থেকে গ্রহণে।
ইবন আবী হাতিম বলেন:
আমার পিতা আবদাহ থেকে আমাদেরকে জানান, তিনি বলেন: ইবন আল-মুবারক যখন কোনো লোক থেকে হাদিস বর্ণনা করছিলেন তখন তাকে বলা হলো এই লোকটি দুর্বল! তখন [ইবন আল-মুবারক] বললেন: একজন দুর্বল রাবি থেকে বর্ণনা মেনে নেওয়া হয় এই [সীমা] পর্যন্ত অথবা ঐসব জিনিস পর্যন্ত। সুতরাং আমি আবদাহকে বললাম: কোন জিনিসগুলোর মতো এটা হতে পারে? তিনি বললেন: আদব কায়দা, উপদেশ, নিষেধকরণ বিষয়ে।
মুসা ইবন উবায়দা আল-রাবযী এমন এক ব্যক্তি যিনি তার দীনদারী [হাদিস বিশেষজ্ঞ নন] এবং বর্ণনায় দুর্বলতার জন্য পরিচিত। তার সম্বন্ধে ইবন মু'ঈন বলেন যে, আল-রাবযী তার হৃদয় কোমল করা হাদিস হতে লিখেছেন।
ইবন উয়ায়নাহ বলেন:
বাকিইয়‍্যা [অর্থাৎ বাকিইয়্যা ইবন ওয়ালীদ) থেকে শুনো না, যা সুন্নাহর মধ্যে রয়েছে, পরকালের) পুরস্কার এবং এছাড়া অন্যকিছু সম্পর্কে শুনবে।
আহমাদ ইবন হাম্বল ইবন ইসহাক [বিখ্যাত সিরাত গ্রন্থের লেখক মুহাম্মদ ইবন ইসহাক সম্বন্ধে বলেন: লোকেরা যুদ্ধ এবং এরূপ বিষয় সম্বন্ধে তার কাছ থেকে লেখেন।
যিয়াদ আল-বাকা'ই সম্বন্ধে ইবন মুসা বলেন:
যুদ্ধ সম্বন্ধে তার প্রতি কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু এ ছাড়া অন্য বিষয়ে: না।২০
ইবন হাজার বলেন:
প্রকৃতপক্ষে কেবল তারহিব ও তারগিব এবং তিরস্কার ও উত্তম আচরণ সম্পর্কে ঐসব লোকের হাদিস বর্ণনা করা হয় যারা বিস্মৃতিপরায়ণ হলেও মিথ্যাকথনের জন্য সন্দেহভাজন নন। সন্দেহভাজন লোকদের সম্পর্কে বলতে গেলে, মানুষ তাদের হাদিস পরিত্যাগ করে। এমনটাই বলেন ইবন আবী হাতীম এবং অন্যরা।
যে বক্তব্য এইমাত্র উদ্ধৃত করা হলো (এবং তাদের মত অন্যরা) এটা স্পষ্ট করে যে, হাদিসের ইমামগণের একজনও তারগিব ও তারহিব সংক্রান্ত বর্ণনা সবার কাছে থেকে সামগ্রিকভাবে ও পৃথকভাবে এলোমেলোভাবে গ্রহণ করেননি, যদি ঐগুলোর বর্ণনাকারীগণ মিথ্যাকথন থেকে মুক্ত ছিলেন না, যদি তারা তাদের বর্ণনাক্ষেত্রে অতিরিক্তভাবে প্রমাদ প্রবণ ছিলেন। তারা এমন কিছু বর্ণনাকারীর বর্ণনা অনুমোদন করেছেন যাদের মুখস্থ রাখার সামর্থ্যে কিছুটা নমনীয়তা বা দুর্বলতা ছিল এবং যদিও তারা জ্ঞানের বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন না (যেমন সুফিয়ান আল-সাওরী বলেন), তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সাধুতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ ছিল না। সন্দেহ ছিল কেবল তাদের মনে রাখার সামর্থ্য, তাদের সচেতনতা ও পূর্ণতা নিয়ে।
হৃদয় কোমল করা ও তারগিব সংক্রান্ত যঈফ হাদিসগুলোর গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে ইবন হাজার তিনটি শর্ত উল্লেখ করেছে। পরে আল-সুয়ূতী এগুলোকে তার তাদরিব আল-রাবি গ্রন্থে স্থান দেন।
প্রথম শর্ত: এই শর্তের ওপর ঐকমত্য হয়েছে। এটা এমন যে, বর্ণনাকারী বা বর্ণনা দুর্বল হতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত দুর্বল নয়। এক্ষেত্রে বর্ণনাকারী মাত্র একজন হলে বাদ যাবেন। পরিচিত মিথ্যুকদের মধ্যে হলে বা মিথ্যুক বলে অভিযুক্তদের একজন হলে এবং তার ভুলের ব্যাপারে নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ হলে তা পরিত্যাজ্য।
দ্বিতীয় শর্ত: হাদিসের একটা সাধারণ বিধি রয়েছে (অর্থাৎ এটা আহকাম ও দ্বীনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, বিরোধী হবে না)। এক্ষেত্রে এমন কিছু যা উদ্ভাবিত হয়েছে, যার পক্ষে কোনো প্রকার উৎসের খোঁজ পাওয়া যায় না, তা বাদ যাবে।
তৃতীয় শর্ত: এমন হাদিসের ওপর আমল করাকালে এটা এমন হয় যে, রসুল সা. থেকে তা প্রতিষ্ঠিত বলে বিশ্বাস করা যায় না। এভাবে যা রসুল সা. বলেননি, তা তাঁর প্রতি (অশুদ্ধভাবে) আরোপ করা যাবে না। এমন ধরনের হাদিস যদি আমল করা হয়ে থাকে, তাহলে এটাকে কেবল পূর্ব সতর্কতা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
আল-সুয়ূতী বলেন: শেষের দুটো শর্ত ইবন আবদুস সালাম ও তার ছাত্র ইবন দাকীক আল-ঈদ থেকে এবং প্রথমটির ব্যাপারে ঐকমত্য সম্পর্কে আল-'আলা'ই বর্ণনা দিয়েছেন২১।

টিকাঃ
১৭. আল-মুসতাদরাক, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৯০।
১৮. যদি আমরা আল্লাহর রসুল সা. হতে সম্পৃক্ত করি হালাল ও হারাম বিষয়ক সুন্নাহ্ ও বিধানাদি, তাহলে আমরা ইসনাদ সম্বন্ধে কঠোর এবং রাবিদের সমালোচনা করি। আর যদি আমরা রসুল সা., আমলের ফজিলত, পুরস্কার ও [পরকালে) শাস্তি, নির্দেশিত কার্যসমূহ এবং দোয়া সম্পর্কে আলোচনা করি, তাহলে সনদের ব্যাপারে নমনীয়তা দেখাই।
১৯. আল-খতিব, আল কিফায়া (আল-মাদিনাহ আল-মুনাওয়ারা; আল-মাকতাব আল- 'ইলমিয়্যাহ), পৃষ্ঠা ১৩৪।
২০. ইবন রজব, শারহ 'ইলাল-আল-তিরমিজি (সম্পাদনা: নূর আল-দীন আল-'ইত্র) ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা সংখ্যা-৭২-৭৪
২১. তাদরিব আল-রাবি'আলা তাকরীয আল-নাওয়াবি (সম্পাদনা: 'আবদ আল-ওয়াহহাব 'আবদ আল-লাতিফ; কায়রো দার আল-হাদিস), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯৭, ২৯৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00